গুণবর্ধক মাত্রা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
মার্কিন জাতীয় রোগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র সিডিসি'র ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত একটি প্রাচীরচিত্র, যাতে সিডিসি-র প্রতিনিধিত্বকারী "ওয়েলবি" (Wellbee) নামক প্রতিমা বা মাস্কটটি মার্কিন জনগণকে টিকার গুণবর্ধক মাত্রা নিতে উৎসাহ দিচ্ছে। ইংরেজিতে লেখা বার্তাটির ভাবানুবাদ হল: "টিকা নিয়েছেন? তাহলে এখন গুণবর্ধক মাত্রাটি গ্রহণ করুন !" গুণবর্ধক মাত্রাটিকে একটি রকেটের মাধ্যমে প্রতীকায়িত করা হয়েছে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের আলোচনায় গুণবর্ধক মাত্রা বা উদ্দীপক মাত্রা বলতে কোনও টিকার প্রাথমিক মাত্রা প্রদানের কিছু সময় পরে যে অতিরিক্ত বা সম্পূরক মাত্রাটি প্রদান করা হয়, তাকে বোঝায়। প্রাথমিক টিকাদানের পরে সময়ের সাথে সাথে টিকাতে উপস্থিত অনাক্রম্য প্রত্যুৎপাদকটির (অ্যান্টিজেন) বিরুদ্ধে দেহের অনাক্রম্যতন্ত্রের কোষগুলির স্মৃতি হ্রাসপ্রাপ্ত হয়। তাই গুণবর্ধক মাত্রা প্রয়োগের উদ্দেশ্য হল দেহকে অনাক্রম্য প্রত্যুৎপাদকটির সাথে আবারও পরিচিত করিয়ে দেওয়া, যাতে ঐ প্রত্যুৎপাদকটির বিরুদ্ধে দেহের অনাক্রম্যতা তথা রোগ-প্রতিরোধী ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়ে পুনরায় সুরক্ষামূলক মাত্রায় ফেরত যায়। যেমন প্রতি দশ বছর পর পর ধনুষ্টংকার টিকার গুণবর্ধক মাত্রা প্রদানের সুপারিশ করা হয়, কেননা ১০ বছরের মধ্যে ধনুষ্টংকারের বিরুদ্ধে সৃষ্ট স্মৃতিকোষগুলি হয় তাদের স্বাভাবিক ক্রিয়া হারিয়ে ফেলে নতুবা কোষপতনের শিকার হয়।[১] গুণবর্ধক মাত্রাকে ইংরেজি পরিভাষায় "বুস্টার ডোজ" (Booster dose) বা "বুস্টার ইঞ্জেকশন" (Booster injection) বলা হয়ে থাকে।

প্রাথমিক টিকাদানের পরে গুণবর্ধক মাত্রা প্রদানের প্রয়োজন আছে কি না, তা বেশ কিছু উপায়ে মূল্যায়ন করা হতে পারে। একটি উপায় হল কোনও রোগের টিকার প্রাথমিক মাত্রা প্রদানের কয়েক মাস বা কয়েক বছর পরে ঐ রোগের বিরুদ্ধে দেহের বিশেষ প্রতিরক্ষিকাসমূহের (অ্যান্টিবডি) মাত্রা কতটুকু বিদ্যমান, তা পরিমাপ করা। কোনও প্রত্যুৎপাদকের উদ্দীপনায় প্রতিরক্ষিকাসমূহের দ্রুত উৎপাদনকে বিস্মৃতিরোধক প্রতিক্রিয়া (অ্যানামনেস্টিক রেসপন্স) বলে। কোনও নির্দিষ্ট টিকার জন্য গুণবর্ধক মাত্রার প্রয়োজন আছে কি না, তা পরিমাপ করতে সাধারণত এই বিস্মৃতিরোধক প্রতিক্রিয়া নির্ণয় করা হয়। যদি বহু বছর আগে টিকালাভ করার পরেও বিস্মৃতিরোধক প্রতিক্রিয়া উচ্চ মাত্রায় বিরাজ করে, তাহলে টিকার গুণবর্ধক মাত্রার প্রয়োজন হয় না বললেই চলে।[২] এছাড়া টিকার প্রাথমিক মাত্রা প্রদানের কিছু সময় পরে ঐ প্রত্যুৎপাদকের বিরুদ্ধে দেহের সক্রিয় টি কোষবি কোষগুলির সক্রিয়তা পরিমাপ করা হতে পারে, কিংবা টিকালাভকারী জনসমষ্টিতে রোগটির ব্যাপ্তি নির্ণয় করা হতে পারে।[৩]

যদি কোনও রোগীর দেহের ইতিমধ্যেই উচ্চমাত্রায় প্রতিরক্ষিকাসমূহ বিরাজ করে এবং এ সময় যদি তাকে গুণবর্ধক মাত্রা প্রদান করা হয়, তাহলে তার দেহে আর্থাসের প্রতিক্রিয়া নামের একটি প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হতে পারে, যা হল ইমিউনোগ্লোবিউলিন জি নামক প্রতিরক্ষিকাগুলির উচ্চমাত্রার কারণে সৃষ্ট ৩ নং প্রকারের (টাইপ থ্রি) অতিসংবেদনশীলতার একটি স্থানীয়কৃত রূপ, যার ফলে দেহে প্রদাহের সৃষ্টি হয়।[৪] এই প্রদাহটি সাধারণত কয়েক দিনের মধ্যে নিজে থেকেই সেরে যায়। তবে প্রাথমিক মাত্রা ও গুণবর্ধক মাত্রার মধ্যবর্তী সময় বৃদ্ধি করার মাধ্যমে এই প্রতিক্রিয়াটির উদ্ভব এড়ানো সম্ভব।[৫]

কেন কিছু কিছু টিকা (যেমন হেপাটাইটিস এহেপাটাইটিস বি টিকা, অর্থাৎ এ ও বি ধরনের যকৃৎপ্রদাহ) সারা জীবন কার্যকর থাকে, আবার অন্য কিছু কিছু টিকার (যেমন ধনুষ্টংকারের টিকা) কেন গুণবর্ধক মাত্রার প্রয়োজন হয়, তার কারণ এখনও পরিস্কার নয়। বিদ্যমান তত্ত্ব অনুযায়ী যদি দেহের অনাক্রম্যতন্ত্র (রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা) কোনও রোগের টিকার প্রাথমিক মাত্রার বিরুদ্ধে দ্রুত সাড়া দেয়, তাহলে দেহ ঐ রোগের বিরুদ্ধে অনাক্রম্য স্মৃতি গঠন করার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ সময় পায় না এবং স্মৃতিকোষগুলি মানুষের জীবনকালের সম্পূর্ণ সময়ের জন্য উচ্চসংখ্যায় টিকে থাকে না।[৬] টিকাদানের পরে অনাক্রম্যতন্ত্রের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ার পরে স্মৃতিমূলক সহায়ক টি ও বি কোষগুলি জননিক কেন্দ্রগুলিতে মোটামুটি অপরিবর্তনশীল মাত্রায় টিকে থাকে এবং এগুলির কোষ বিভাজনের হার খুবই ধীরগতির হয় বা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত থাকে। যদিও এই স্মৃতিকোষগুলি দীর্ঘজীবী হয়, তা সত্ত্বেও এগুলির তেমন কোষ বিভাজন (মাইটোসিস) ঘটে না, এবং শেষ পরিণামে এই কোষগুলির মৃত্যুর হার সেগুলির বৃদ্ধির হার অপেক্ষা বেশি হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে স্মৃতি বি কোষ ও টি কোষগুলির সংখ্যা বৃদ্ধি করতে টিকার একটি গুণবর্ধক মাত্রা প্রদানের প্রয়োজন হয়।[৭]

বিভিন্ন রোগের টিকার গুণবর্ধক মাত্রা[সম্পাদনা]

পোলিও টিকার গুণবর্ধক মাত্রা[সম্পাদনা]

হেপাটাইটিস বি টিকার গুণবর্ধক মাত্রা[সম্পাদনা]

ধনুষ্টংকার টিকার গুণবর্ধক মাত্রা[সম্পাদনা]

হুপিং কাশির টিকার গুণবর্ধক মাত্রা[সম্পাদনা]

কোভিড-১৯ টিকার গুণবর্ধক মাত্রা[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Tetanus: Prevention, Mayo Clinic, ২০০৬-০৯-২১, ২০০৮-০৬-২৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা, সংগ্রহের তারিখ ২০০৮-০৭-১৭ 
  2. Van Damme, Pierre; Van Herck, Koen (২০০৭-০৩-০১)। "A review of the long-term protection after hepatitis A and B vaccination"। Travel Medicine and Infectious Disease। 1st International Conference of Travel Medicine and Infectious Disease1st International Conference of Travel Medicine and Infectious Disease। 5 (2): 79–84। ডিওআই:10.1016/j.tmaid.2006.04.004পিএমআইডি 17298912 
  3. Leuridan, Elke; Damme, Pierre Van (২০১১-০৭-০১)। "Hepatitis B and the Need for a Booster Dose"। Clinical Infectious Diseases (ইংরেজি ভাষায়)। 53 (1): 68–75। আইএসএসএন 1058-4838ডিওআই:10.1093/cid/cir270অবাধে প্রবেশযোগ্যপিএমআইডি 21653306 
  4. Committee, Institute of Medicine (US) Vaccine Safety; Stratton, Kathleen R.; Howe, Cynthia J.; Richard B. Johnston, Jr (১৯৯৪-০১-০১)। "Immunologic Reactions" (ইংরেজি ভাষায়)। National Academies Press (US)। 
  5. University of the Sciences in Philadelphia; David B. Troy; Joseph Price Remington; Paul Beringer (২০০৫)। Remington: the science and practice of pharmacy। Lippincott Williams & Wilkins। আইএসবিএন 978-0-7817-4673-1 
  6. "Top 20 Questions about Vaccination — History of Vaccines"www.historyofvaccines.org। সংগ্রহের তারিখ ২০১৬-০১-৩০ 
  7. Charles A Janeway, Jr; Travers, Paul; Walport, Mark; Shlomchik, Mark J. (২০০১-০১-০১)। "Immunological memory" (ইংরেজি ভাষায়)।