কম্পিউটিং-এর ইতিহাস

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
Jump to navigation Jump to search
কম্পিউটিং-এর ইতিহাস
১৯৬০-এর পূর্বে হার্ডওয়্যার
১৯৬০-এর দশক থেকে বর্তমান পর্যন্ত হার্ডওয়্যার
সাম্যবাদী দেশগুলোতে হার্ডওয়্যার
অপারেটিং সিস্টেমসমূহ
সফটওয়্যার প্রকৌশল
প্রোগ্রামিং ভাষাসমূহ
গ্রাফিকাল ইউজার ইন্টারফেস
ইন্টারনেট
ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব
কম্পিউটার গেম ও ভিডিও গেম
কম্পিউটিং-এর সময়রেখা
আরও...

কম্পিউটিং তথা স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রভিত্তিক গণনার ইতিহাস আধুনিক কম্পিউটার যন্ত্রের আবির্ভাবের বহু আগে শুরু হয়। প্রাচীন যুগ থেকেই (আনুমানিক ১১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) অ্যাবাকাস যন্ত্রের মাধ্যমে বড় অঙ্কের সংখ্যা যোগ-বিয়োগ-গুণ-ভাগের পদ্ধতি প্রচলিত ছিল। অ্যাাবাকাস ছিল সর্বপ্রথম ডিজিটাল (অর্থাৎ ১ ও ০-ভিত্তিক) গণনাযন্ত্র; এটি বাণিজ্যিক হিসাব নিকাশের কাজে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হত। এর বহু পরে ১৭শ শতকে এসে স্কটীয় গণিতবিদ জন নেপিয়ার লগারিদম পদ্ধতি আবিস্কার করলে বিশাল অঙ্কের সংখ্যার গুণ ও ভাগ করা অনেক সহজ হয়ে যায়। ফলে যন্ত্রের মাধ্যমে গণনা সম্পাদন ইতিহাস এক নতুন দিকে মোড় নেয়।

১৭শ শতক[সম্পাদনা]

১৬১৭ সালে স্কটীয় গণিতবিদ ও বিজ্ঞানী জন নেপিয়ার "নেপিয়ারের অস্থিসমূহ" (ইংরেজি Napier’s bones) নামক যন্ত্রের কর্মপদ্ধতির ব্যাখ্যা প্রকাশ করেন। নেপিয়ারের অস্থিসমূহ ছিল লগারিদম-ভিত্তিক গণনায় সহায়তা করার জন্য একটি হস্তচালিত যন্ত্র। এই যন্ত্রটি "স্লাইড রুল" নামক দ্রুত লগারিদম-ভিত্তিক হিসাবকরণ যন্ত্রের পূর্বপুরুষ ছিল।

১৬২৪ সালে জার্মান জ্যোতির্বিজ্ঞানী ভিলহেল্ম শিকার্ড একটি যান্ত্রিক গণনাযন্ত্র বা ক্যালকুলেটর উদ্ভাবন করেন যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংখ্যাসমূহ যোগ ও বিয়োগ করতে পারত। এছাড়াও এটি বারংবার যোগ ও বিয়োগের মাধ্যমে গুণ ও ভাগ-ও করতে পারত।

১৬৪২ সালে ফরাসি গণিতবিদ ও বিজ্ঞানী ব্লেজ পাসকাল একটি গণনাযন্ত্র বা ক্যালকুলেটর উদ্ভাবন করেন যার নাম তিনি দেন "পাসকালিন"। এটিতে যোগ বা বিয়োগের সময় হাতে থাকা অঙ্ক পরবর্তী ঘরে নিয়ে যাওয়ার জন্য উন্নততর পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু যন্ত্রটির কয়েকটি গুচ্ছ বাজারজাত করা হলেও শেষ পর্যন্ত এটির ব্যাপক প্রচলন ঘটেনি।

১৬৭৩ সালে জার্মান গণিতবিদ গটফ্রিড ভিলহেল্ম লাইবনিৎস (যিনি আইজাক নিউটনের সাথে সমসাময়িকভাবে কলনবিদ্যা বা ক্যালকুলাস উদ্ভাবন করেছিলেন) লাইবনিৎস চক্র নামক একটি গণনাযন্ত্র বা ক্যালকুলেটর উদ্ভাবন করেন। এছাড়া তিনি দ্বিমিক (বাইনারি) সংখ্যা ব্যবস্থার উপরেও লেখেন, যে ব্যবস্থাটি পরবর্তীতে আধুনিক কম্পিউটিং-এর ভিত্তিতে পরিণত হয়।

১৮শ শতক[সম্পাদনা]

ফন ম্যুলারের যোজন যন্ত্র, ১৭৮৪, হেসিশে লাণ্ডমুজেয়ুম ডার্মষ্টাট জাদুঘরে সংরক্ষিত

১৭৮৬ সালে ইয়োহান হেলফরিশ ফন ম্যুলার নামক একজন জার্মান প্রকৌশলী একটি "ব্যবধান ইঞ্জিন" (difference engine) যা পৌনঃপুণিক যোজন বা বিয়োজনের মাধ্যমে বহুপদী রাশির সমাধান করতে পারত।

১৯শ শতক[সম্পাদনা]

১৮০৪ সালে ফরাসি তাঁতি জোসেফ মারি জাকার এক বিশেষ ধরনের তাঁত বা বয়নযন্ত্র উদ্ভাবন করেন (যাকে পরবর্তীতে জাকার তাঁত নামে ডাকা হত)। এই যন্ত্রে তাঁত যন্ত্রটিতে ভিন্ন ভিন্ন ছিদ্রযুক্ত কার্ড প্রবিষ্ট করে সুতা ভিন্ন ভিন্ন নকশায় বোনা যেত। কার্ড বদলে নতুন নতুন নকশা করা যেত। জাকার তাঁতকে তাই কম্পিউটিং প্রক্রিয়াতে ব্যবহৃত উপাত্ত প্রবিষ্টকরণ (data entry) এবং প্রোগ্রাম লিখন (programming)-এর অগ্রদূত হিসেবে গণ্য করা হয়।

ইংরেজ গণিতবিদ ও বহুশাস্ত্রজ্ঞ চার্লস ব্যাবেজ জাকার তাঁত সম্পর্কে জানতেন। তাঁর কাছে রেশম কাপড়ে জাকার তাঁত দিয়ে বোনা জাকারের একটি প্রতিকৃতি ছিল, যা তৈরি করতে ২৪ হাজার ছিদ্রিত কার্ড লেগেছিল। সম্পূর্ণ গণনামূলক উপায়ে কিন্তু যন্ত্র দিয়ে তৈরি এই কাপড়ে বোনা প্রতিকৃতি ব্যাবেজকে অনুপ্রাণিত করে। তিনি ১৮২২ সালে অতীতের তুলনায় অনেক বেশি উন্নত একটি ব্যবধান ইঞ্জিন নকশা করেন ও এটি আংশিকভাবে নির্মাণ করতে সক্ষম হন।

১৮৩২ সালে ব্যাবেজ একটি বিশ্লেষণী যন্ত্রের বিস্তারিত খুঁটিনাটি ব্যাখ্যা সম্বলিত একটি নকশা প্রণয়ন করেন। এই যন্ত্রটি ছিদ্রিত কার্ড দিয়ে প্রোগ্রাম করা যেত, উপাত্তগুলিকে একটি যান্ত্রিক স্মৃতিতে সংরক্ষণ করা যেত এবং এমনকি একটি মুদ্রণযন্ত্রেরও ব্যবস্থা ছিল এটিতে। যদিও ব্যাবেজের জীবদ্দশাতে এই যন্ত্রটি নির্মাণ করা হয়নি, এটিতে আধুনিক কম্পিউটার যন্ত্রের বেশিরভাগ ধারণাই রূপ পেয়েছিল।

১৮৪৩ সালে ইংরেজ গণিতবিদ অ্যাডা লাভলেস ব্যাবেজের ইতালীয় অনুসারী মেনাব্রেয়া'র রচিত একটি গ্রন্থের (যা ছিল ইতালিতে ব্যাবেজের দেয়া একটি বক্তৃতার ইতালীয় অনুলিখন) ওপর বিস্তারিত মন্তব্য প্রকাশ করেন। অ্যাডা ছিলেন কম্পিউটিং বিষয়ে প্রথম কারিগরি লেখক। এছাড়া লাভলেস বিশ্বের সর্বপ্রথম কম্পিউটার প্রোগ্রাম রচনা করেন।

১৮৪৪ সালে মার্কিন উদ্ভাবক স্যামুয়েল মোর্স তড়িচ্চুম্বকীয় টেলিগ্রাফ বা দূরলিখন যন্ত্রের কার্যপদ্ধতি জনসমক্ষে প্রদর্শন করেন। তিনি ওয়াশিংটন থেকে বাল্টিমোর পর্যন্ত একটি বার্তা পাঠাতে সক্ষম হন। মোর্সের টেলিগ্রাফ যন্ত্রের মাধ্যমে একই সাথে বৈদ্যুতিক উপাত্ত প্রেরণ ও বিন্দু ও রেখার মাধ্যমে দ্বিমিক সংকেতের ব্যবহার করা এক নতুন যুগের সূচনা হয়।

১৮৫০ সালে ফরাসি গণিতবিদ আমেদে মানাইম বিশ্বের প্রথম স্লাইড রুল বা চলমান রুলার উদ্ভাবন করেন। ১৯৭০-এর দশকে স্বল্পমূল্যের ইলেকট্রনিক ক্যালকুলেটর বাজারে আসার আগ পর্যন্ত এই স্লাইড রুল প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানীদের জন্য একটি অবশ্যপ্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ছিল।

১৮৫৪ সালে জর্জ বুল দ্য লজ অভ থট (The Laws of Thought) নামের একটি বই প্রকাশ করেন, যেখানে তিনি বর্তমানে বুলিয়ান বীজগণিত নামে পরিচিত ধারণাটি ব্যাখ্যা করেন। কম্পিউটার প্রোগ্রামের কর্মসম্পাদনকে নিয়ন্ত্রণকারী শাখা-বিবৃতি ও লুপ-বিবৃতিগুলির জন্য বুলিয়ান অপারেটরগুলি অত্যাবশ্যক।

১৮৭০ সালে ফরাসি টেলিগ্রাফ প্রকৌশলী ও উদ্ভাবক এমিল বোদো (Émile Baudot) ফরাসি বর্ণমালা (তথা যেকোন লাতিন বর্ণমালার জন্য) ৫ বিটের একটি ক্যারেকটার সেট উদ্ভাবন করেন যা পরবর্তীতে "বোদো সংকেত" নামে খ্যাতি লাভ করে। এতে প্রতিটি বর্ণকে ৫ বিটের একটি সংকেত দিয়ে প্রতিনিধিত্ব করা হত। বোদো সংকেত ব্যবস্থাটিকে পরবর্তীতে "১ নং আন্তর্জাতিক টেলিগ্রাফ বর্ণমালা" নাম দেওয়া হয়। এটিই আধুনিক আসকি ক্যারেকটার সেটের পূর্বসূরী। বোদো'র টেলিগ্রাফ যন্ত্রটিতে ৫টি পিয়ানোর চাবির মত চাবি ছিল, যেগুলি টিপে টিপে ৫ বিটের একেকটি ক্যারেকটার বা লিখনচিহ্ন প্রেরণ করা যেত। বর্তমানে কোন টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থাতে সংকেত স্থানান্তরের হারের একককে বোদো'র নামানুসারে বড (Baud সংক্ষেপে Bd.) নামে ডাকা হয়।

১৮৮৪ সালে মার্কিন উদ্ভাবক উইলিয়াম সিউয়ার্ড বারোজ তাঁর প্রথম যোজনযন্ত্রটিকে বাজারজাত করেন। এই ঘটনা থেকেই ক্যালকুলেটর যন্ত্র ও কম্পিউটার যন্ত্র নির্মাণের ব্যবসা শুরু হয়।

১৮৯০ সালে মার্কিন উদ্ভাবক হারম্যান হলারিথ ছিদ্রিত কার্ড সারণিকার যন্ত্র (punched card tabulator) উদ্ভাবন করেন। এই যন্ত্রের মাধ্যমে মার্কিন সরকার রেকর্ড সময়ে ১৮৯০ সালের আদমশুমারি বা লোকগণনা সম্পাদন করতে সক্ষম হয়।

১৮৯৬ সালে হোলরিট ট্যাবুলেটিং মেশিন কোম্পানি নামের একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। এটি পরবর্তীতে ১৯১১ সালে কম্পিউটিং, ট্যাবুলেটিং অ্যান্ড রেকর্ডিং কোম্পানি নাম নেয়। ১৯২৪ সালে এর নাম বদলে রাখা হয় ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস মেশিনস তথা আইবিএম।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Hyman, Anthony, ed. Science and Reform: Selected Works of Charles Babbage, Cambridge, England: Cambridge University Press, 1989, p. 298.