এমভি এসএসএল কলকাতা বিপর্যয়

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
এমভি এসএসএল কলকাতা বিপর্যয়
তারিখ১৪ জুন ২০১৮ (2018-06-14)
অবস্থানবঙ্গোপসাগরের স্যান্ডহেডে এলাকায়, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত
কারণআগুন

১৪ ই জুন ২০১৮ সালে বৃহস্পতিবার ভোরে, পণ্যবাহী জাহাজ এমভি এসএসএল কলকাতায় আগুন লাগে হুগলি নদীর মোহনার কাছে বঙ্গোপসাগরের স্যান্ডহেডে এলাকায়।[১] ১৪ই জুন, জাহাজটি কলকাতার বন্দর ছেড়ে যায় ইন্দোনেশিয়ার উদ্দেশ্যে। তারপর হলদিয়া বন্দর থেকে ৬০ নটিক্যাল মাইল দূরে অগুনের কবলে পরে জাহাজটি। এর পর শক্তিশালী বায়ু প্রবাহের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে জাহাজে। হলদিয়া বন্দর থেকে বলা হয় কলকাতার পথ দিয়ে অন্ধ্রপ্রদেশর কৃষ্ণাপত্তনাম বন্দর থেকে কলকাতা বন্দর হয়ে ইন্দোনেশিয়া যাচ্ছিল জাহাজটি। প্রায় ৭০ শতাংশ পুড়ে গেছে জাহাজির। জাহাজ ৪৬৪ টি কন্টেইনার ছিল। তবে বেশির ভাগ কনটেইনারে আগুন ধরে গিয়েছিল। বিস্ফোরণের ফলে সমগ্র জাহাজে আগুন লাগে। এটি প্রাথমিকভাবে বিশ্বাস করা হচ্ছে যে জাহাজ মধ্যে বয়ু-সংযোজন সরঞ্জাম থেকে জাহাজে আগুন লাগে।

কিন্তু ক্রু জাহাজের ২২ জন ক্রু সদস্যকে উদ্ধার করা হয়। তাদের হলদিয়া বন্দরে আনা হয়।[২]

পটভূমি[সম্পাদনা]

কনটেইনার জাহাজ এমভি এসএসএল কলকাতা, ১৩ জুন ২০১৮ বুধবার অন্ধ্রপ্রদেশের কৃষ্ণাপত্তনাম বন্দর থেকে হালদিয়া বন্দরের (কলকাতা বন্দর) উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। বৃহস্পতিবার ভোরে হলদিয়া বন্দরের কাছে জাহাজটি স্যান্ডহাইডে পৌঁছালে সমুদ্রের মাঝেই জাহাজটিতে বিস্ফোরণ ঘটে। এর ফলে জাহাজে আগুন লাগে। এর পর আগুনে জ্বলতে থাকা জাহাজের অধিনায়ক উপকূলীয় বাহিনীর কাছে সংকেত পাঠান।

বুধবার রাতে স্যান্ড হেডের কাছে কন্টেনার বোঝাই ভেসেলটিতে আগুন লাগে। খবর পেয়ে উপকূলরক্ষী বাহিনী গিয়ে ২২ জন কর্মীকে উদ্ধার করে। [৩] কিন্তু আগুন নেভানো যায়নি। জ্বলন্ত জাহাজটি ভাসতে ভাসতে শনিবার সকাল পর্যন্ত বাংলাদেশের দিকে প্রায় ২৫ নটিক্যাল মাইল এগিয়েছিল। এক দিকে সুন্দরবন, অন্য দিকে বাংলাদেশ সীমান্ত, তা ছাড়া জ্বলন্ত জাহাজ এ ভাবে ভাসতে থাকলে অন্য জাহাজের পথ আটকে যাওয়ার সম্ভবনা তৈরি হয়।

উদ্ধার কার্য[সম্পাদনা]

বিপদ সংকেত পাওয়ার পড়েই হলদিয়া উপকূলরক্ষী বাহিনী উদ্ধার কার্যে নেমে পড়ে। উপকূলরক্ষী বাহিনী উদ্ধারকারী জাহাজ নিয়ে জলন্ত জাহাজের কাছে পৌচ্ছে জলন্ত জাহাজ থেকে ২২ জন জাহাজ কর্মীকে উদ্ধার করে। এর পর তাদের সঙ্গে নিয়ে হলদিয়া ফিরে আসে। মাঝ সমুদ্রে মৃত্যুর মুখ থেকে ফেরা নাবিক ও উদ্ধারকারী জওয়ানদের স্বাগত জানাতে হলদিয়া কোস্টগার্ডের জেটিতে অপেক্ষায় ছিলেন ডিআইজি কমান্ডার এম এ ওয়ারসি সহ অন্যান্য আধিকারিকরা। কোস্টগার্ডের বিভিন্ন জাহাজের ক্যাপ্টেন ও নৌসেনারাও জড়ো হয়েছিলেন ‘আনমোল’ নামে একটি জাহাজের ডেকের ওপর। খানিকক্ষণ পর রাজকিরণের ক্যাপ্টেন টি নামলিনের নেতৃত্বে জাহাজের কেবিন থেকে একে একে বেরিয়ে আসেন উদ্ধার হওয়া নাবিকরা। সবার শেষে ছিলেন জাহাজ থেকে নেমে আসেন অগ্নিদগ্ধ জাহাজের ক্যাপ্টেন।

মাটিতে পা রাখার পরই জাহাজের উদ্বিগ্ন নাবিকদের মুখে হাসি ফোটে এবং তারা কোস্টগার্ডের নামে জয়ধ্বনি দেন। কোস্টগার্ড জেটিতে উদ্ধারকারী জাহাজের সামনে নাবিকদের নিয়ে ফটোও তোলেন কোস্টগার্ডের জওয়ানরা।

কোস্টগার্ড সূত্রে জানা গিয়েছে, টলুইন নামে প্রচন্ড দাহ্য রাসায়নিক ছিল জাহাজে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন,টলুইন একটি বিপজ্জনক রাসায়নিক যা রঙ শিল্পে ব্যবহার করা হয়। এর ভেপার শরীরের পক্ষে ক্ষতিকর। কোস্টগার্ড জানায়, ১৪৭মিটার লম্বা ও ২৩ মিটার চওড়া ও ৯হাজার টন পণ্যবহন ক্ষমতাসম্পন্ন জাহাজটিতে ৪৬৪টি পণ্যবোঝাই কন্টেনার ছিল।

এই কন্টেনারগুলির সিংহভাগই পুড়ে গিয়েছে। জ্বলন্ত অবস্থাতেই সেটি বর্তমানে সমুদ্রে ভাসছে। তাকে ট্র্যাক করার জন্য শুক্রবারও ডর্নিয়ার টহল দিয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে,জাহাজটি কোনভাবে ডুবে গেলে ২১১টন জ্বালানি তেল ও বিপজ্জনক টলুইন সমুদ্রের জলে মিশে বড়সড় দূষণ ঘটার সম্ভনা তৈরি হয়। জাহাজটিকে উদ্ধারের জন্য সিঙ্গাপুর ভিত্তিক একটি সংস্থার সাহায্য নেওয়া হয়।

প্রবল বায়ু প্রবাহের কারণে জলন্ত জাহাজ বাংলাদেশ জলসীমায় প্রবেশের সম্ভনা তৈরি হয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে শুক্রবার বিকেলে নৌসেনা, উপকূলরক্ষী বাহিনী, কলকাতা বন্দর এবং ভেসেলের মালিক সংস্থা বৈঠক করে কম্যান্ডো ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেন।[৪] এ দিন সকাল সওয়া সাতটা নাগাদ কলাইকুণ্ডা থেকে কম্যান্ডোদের নিয়ে নৌসেনার একটি ‘সি কিং’ হেলিকপ্টার সাগরের দিকে উড়ে যায়। পৌনে দশটা নাগাদ অপারেশন শেষ করে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে কলাইকুণ্ডায় ফেরেন কম্যান্ডোরা।

ভেসেলের কোথায় কী রয়েছে, তা চেনানোর জন্য জাহাজের তিন জন কর্মীকে নেওয়া হয়েছিল। তবে বিস্ফোরণের পর ওই কন্টেনারে থাকা রাসায়নিক নিয়ে ধন্দ তৈরি হয়েছিল। কী ধরনের রাসায়নিক ছিল, তা সকলের কাছে স্পষ্ট করেছিল না নৌসেনা বা জাহাজ মালিক সংস্থা। জাহাজ থেকে সাগরে তেল ছড়ায়নি বলে জানিয়েছিল নৌসেনা। জাহাজের কোনও ত্রুটি ছিল না বলে দাবি করেছিল মালিক সংস্থার সভাপতি ক্যাপ্টেন রাকেশ প্রসাদ। তিনি বলেছিলেন, বিপজ্জনক পণ্য ছিল। এর পর কন্টেনারে ঠিক কী ছিল এবং কী ভাবে আগুন লাগল, তা নিয়ে তদন্ত শুরু করা হয়। শনিবার সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ প্রথমে তিন জন মেরিন কম্যান্ডো (মার্কোস) হেলিকপ্টার থেকে দড়ি বেয়ে জাহাজে নামেন। তার পরে জাহাজের তিন কর্মীকেও নামিয়ে আনা হয়। বাংলাদেশ জলসীমান্ত থেকে ২২ নটিক্যাল মাইল আগে ভেসেলটিকে নোঙর করা হয়। ওই দিন রাতে জাহাজের মালিক সংস্থার নিযুক্ত কর্মী আগুন নেভানোর কাজ শুরু করে।

জাহাজের আগুন নেভাতে ব্যারাকপুর থেকে উড়ে যায় বায়ুসেনার এমআই-১৭ হেলিকপ্টার। ওই হেলিকপ্টর প্রায় ১৫ হাজার লিটার জল ঢালে জাহাজে। তাতেই প্রায় চার দিন পরে নিভে যায় সুন্দরবনের কাছে আটকে থাকা ‘এমভি এসএসএল কলকাতা’র আগুন। জাহাজ থেকে কোনও তেল বা রাসায়নিক সাগরের জলে মেশেনি বলে জানিয়েছে উপকূলরক্ষী বাহিনী।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের মুখপাত্র জানান, ১৭ জুন ২০১৮ রবিবার সকালে বায়ু কম্যান্ডার নিখিল মেহরোত্রা ও ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট অতুল মিশ্র প্রথমে ফ্রেজারগঞ্জ হেলিপ্যাডে যান। সেখান থেকে ছ’বার জল নিয়ে উড়ে যেতে হয়েছিল জাহাজের উপরে। মেরিন কম্যান্ডো দ্বারা শনিবার জাহাজটিকে নোঙর করানো হয়। সেটি সুন্দরবন থেকে মাত্র আট নটিক্যাল মাইল দূরে নোঙর করেছিল।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "হলদিয়ার জাহাজে আগুনের ঘটনা নিয়ে ধোঁয়াশা অব্যাহত"www.kolkata24x7.com। kolkata24x7। সংগ্রহের তারিখ ১৯ জুন ২০১৮ 
  2. মাঝসমুদ্রে আগুন লেগে পুড়ে গেল রাসায়নিকের কন্টেনার বোঝাই একটি ভেসেল। তবে ভেসেলের ২২ জন কর্মীকে উদ্ধার করা হয়েছে।, ২২ জন কর্মীর সকলকে নিরাপদ জায়গায় আনা হলেও ভেসেলের আগুন রাত পর্যন্ত পুরোপুরি নেভেনি। ধীরে ধীরে ভেসেলটি ডুবেও যাচ্ছে। উপকূল রক্ষী বাহিনী জানিয়েছে, পরিস্থিতির উপর নজর রাখা হয়েছে।। "মাঝসমুদ্রে ভেসেলে আগুন, উদ্ধার ২২ কর্মী"www.anandabazar.com। আনন্দবাজার পত্রিকা। সংগ্রহের তারিখ ১৫ জুন ২০১৮ 
  3. ভারতের উপকূলরক্ষী বাহিনীর জাহাজ রাজকিরণ এবং ডর্নিয়ের এয়ারক্রাফট আজ বৃহস্পতিবার আগুন লেগে যাওয়া মালপত্র বহনকারী ভারতীয় জাহাজ এমভি এসএসএলের 22 জন কর্মীকে উদ্ধার করে। গতকাল রাতে ওই জাহাজটিতে আগুন লেগে গিয়েছিল।, ওই 464’টি কন্টেনারের মধ্যে একটিতে বিস্ফোরণ হওয়ায় আগুন লেগে যায়। তারপর সেই আগুন ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে বাকি বেশ কিছু কন্টেনারে।। "আগুন লেগে গেল মার্চেন্ট ভেসেল এসএসএল কলকাতায়, উদ্ধার করা হল 22 জন কর্মচারীকে"www.ndtv.com। NDTV বাংলা। সংগ্রহের তারিখ ১৯ জুন ২০১৮ 
  4. যে জায়গাটিতে আপাতত জাহাজটি দাঁড়িয়ে রয়েছে, সেদিকেও খেয়াল রেখেছে ওই দুটি ভেসেল।, অগ্নিদগ্ধ পণ্যবাহী জাহাজে কমান্ডো অপারেশন। চারজন ক্রু মেম্বারের একটি দল ওই জাহাজটি পরিদর্শন করে। (১৬ জুন ২০১৮)। "হলদিয়ায় জ্বলন্ত জাহাজ পরিদর্শনে কমান্ডোরা"। সংবাদ প্রতিদিন। সংগ্রহের তারিখ ১৯ জুন ২০১৮ 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]