আমর ইবনে উমাইয়া

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

আমর ইবন উমাইয়া(রাঃ) (মৃত্যু-৬০ হিজরি) রাসুল(সঃ) এর একজন বিশিষ্ট সাহাবী । যিনি বিভিন্ন সময়ে রাসুল(সঃ) দূত হিসেবে কাজ করেছেন । তিনি ইসলাম গ্রহণের পূর্বে বদর ও উহুদ যুদ্ধে মক্কার পৌত্তলিকদের পক্ষে মুসলমানদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত বীরত্ব ও সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করেন। উহুদের পরই তিনি ইসলাম গ্রহণ করে মদীনায় হিজরাত করেন। ইসলাম গ্রহণের পর সর্ব প্রথম বীরে মাউনা এর ঘটনায় অংশ গ্রহণ করেন। [১]

নাম ও বংশ পরিচয়[সম্পাদনা]

আমর(রাঃ) এর ডাক নাম আবু উমাইয়া, পিতার নাম উমাইয়া। আমর ইবনে উমাইয়া বনী কিনানা গোত্রের সন্তান। ইবন হিশাম তাকে রাসূলুল্লাহর সা: নবুওয়াত প্রাপ্তির কাছাকাছি সময়ের জাহিলী আরবের একজন শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিমান ব্যক্তিরূপে উল্লেখ করেছেন [২][২] মৃত্যুকালে জাফর, আবদুল্লাহ ও ফাদল নামে তিন ছেলে রেখে যান।

বীরে মাউনার খণ্ড যুদ্ধ[সম্পাদনা]

উহুদ যুদ্ধের পর চতুর্থ মাসে নাজদের বনী কিলাব গোত্রের সরদার আবু বারা আমের ইবন মালেক মদীনায় হযরত রাসূলে কারীমের সা: খিদমতে হাজির হয় । এবং তার নিজের গোত্রের ইসলাম গ্রহণের জন্য একটি দলের আরজ করেন । রাসুল(সঃ) নাজদ গোত্রের ব্যপারে সংশয় প্রকাশ করলেও আবু বারা আমের এই দলের দায়িত্ব নিলে রাসুল রাজি হন এবং মুনজির ইবন আমেরের নেতৃত্বে ৪০ জন মতান্তরে ৭০ জনের একটি দল পাঠান ।

তারা ‘বীরেমাউনা’ নামক স্থানে পৌঁছে তাবু ফেলে অবস্থান করতে থাকেন এবং ইসলামের দাওয়াত সম্বলিত রাসূল সা: পত্র হারাম ইবন মালজানের মাধ্যমে নাজদ গোত্রের প্রধান আমের ইবন তুফাইলের নিকট পৌঁছে দেন। আমের ইবন তুফাইল দূত হারামকে হত্যা করে এবং আসিয়্যা, রা’ল, জাকওয়ান প্রভৃতি গোত্রে নিয়ে মুসলিম দলটির বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দিয়ে সবাই বের হয়ে পরে ।

এদিকে তাদের দূত ‍হারাম ইবনে মালজানের ফিরতে দেরী দেখে মুসলমানরা তার খোঁজে বেরিয়ে পড়ে। কিছু দূর যেতেই তারা রা’ল, জাকওয়ান প্রভৃতি গোত্রের মুখোমুখি হয়। নাজদ গোত্রের সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে মুসলিম দলটির ওপর আক্রমণ করে এবং মুসলিম বাহিনীর সকলকে হত্যা করে। একমাত্র আমর ইবন উমাইয়া প্রাণে রক্ষা পান। তিনি শত্রু বাহিনীর হাতে বন্দী হন। তাকে আমের ইবন তুফাইলের সামনে আনা হলো। যখন সে জানতে পেল আমর ইবন উমাইয়া মুদার গোত্রের লোক তখন তাকে এই কথা বলে ছেড়ে দিল যে, আমার মায়ের একটি দাস মুক্ত করার মান্নত ছিল। তবে অপমানের চিহ্ন সরূপ তার মাথার সামনের দিকের চুল কেটে দেয়। [৩] এই বীরে মাউনার ঘটনায় প্রখ্যাত সাহাবী আমের ইবন ফুহাইরাও শাহাদাত বরণ করেছিলেন। [৪]

হাবশায় দূত প্রেরন[সম্পাদনা]

হিজরী ৬ষ্ঠ সনে হযরত রাসূলে কারীম সা: আমর ইবন উমাইয়্যাকে ইসলামের দাওয়াত সম্বলিত একটি পত্র সহকারে হাবশা যাওয়ার নির্দেশ দেন। এই পত্রে রাসূল সা: নাজ্জাশীকে হাবশায় অবস্থিত মুহাজিরদের আতিথেয়তার সুপারিশ করেন এবং হযরত উম্মু হাবীবা বিনতু আবী ‍সুফিয়ান (ইসলাম গ্রহণের কারণে স্বামীর সাথে সম্পর্কছেদ হয়ে গিয়েছিলো),যিনি তখনও পর্যন্ত হাবশার মুহাজিরদের সাথে সেখানে অবস্থান করছিলেন- তার সাথে নিজের বিয়ের পয়গাম পাঠান। এই দাওয়াতপত্র পেয়ে নাজ্জাশী হযরত জাফর ইবন আবী তালিবের হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং হযরত রাসূলুল্লাহর সা: পত্রের জবাবে একটি পত্র লিখেন। এই পত্রে তার ইসলাম গ্রহণ, রাসূল সা:এর প্রতি সালাম, মুহাজিরদের প্রতি আতিথেয়তা ইত্যাদি বিষয়ের উল্লেখ ছিল। রাসূল সা: পত্র অনুসারে তার পক্ষ থেকে নাজ্জাশী নিজেই উম্মু হাবীবাকে বিয়ের পয়গাম দেন। তিনি নিজেই রাসূলুল্লাহর উকিন হন এবং বিয়ের পর রাসূলুল্লাহর সা: পক্ষ থেকে চারশো দীনার মোহর আদায় করেন। [৫][৬] অতঃপর হাবশায় যে সকল মুহাজির অবস্থান করছিলেন, তাদের দুটো জাহাজে করে নিয়ে আমর ইবন উমাইয়া খাইবার যুদ্ধের সময় মদীনায় পৌঁছেন। (সীরাতু ইবন হিশাম-২/৩৫৯)।

হাবশার এই অভিযান শেষে রাসুল(সঃ) ইসলামের চক্রান্তকারী আবু সুফিয়ান হত্যা করার জন্য আমর ইবন উমাইয়া এবং সালামা ইবন আসলাম মতান্তরে জাব্বার ইবন সাখার আল আনসারীক একটি টিম গঠন করে মক্কায় প্রেরন করেন । কিন্তু মক্কায় বিষয়টি জানাজানি হয়ে গেলে তারা আবু সুফিয়ানকে হত্যা না করেই মদিনায় ফিরতে বাধ্য হন এবং পথিমধ্যে তাদের অনুসারী উবাইদুল্লাহ ইবনে মালিক ও বনী হুজাইল কে হত্যা করেন ।তাদের খোঁজে মক্কার কুরাইশরা বের হলে এদের মধ্যে দুইজন গোয়েন্দা কে আবু উমাইয়া সালামা ইবনে আসলাম দেখতে পান এবং এই দুইজন গোয়েন্দার মধ্যে একজনকে হত্যা করেন এবং অন্যজনকে বন্দী করে মদীনায় রাসূলুল্লাহর সা: নিকট নিয়ে আসেন। [৭]

উল্লেখযোগ্য ছাত্র[সম্পাদনা]

আমর ইবনে উমাইয়া ছিলেন তৎকালীন আরবের জ্ঞানী ব্যক্তি তার কাছে অনেকেই জ্ঞান ও হাদিস শুনতে আসতো । এরমধ্যে আবদুল্লাহ, জাফর, ফাদল, যাবারকান,শাবী, আবু সালামা ইবন আবদির রহমান,আবু কিলাবা, জুরমী এবং আবুল মুহাজির তার উল্লেখযোগ্য ছাত্র।

মৃত্যু[সম্পাদনা]

হযরত রাসূলে কারীমের সা: ইনতিকালের পর হযরত আমর ইবন উমাইয়া দীর্ঘদিন জীবিত ছিলেন। কিন্তু ইতিহাসে তার পরবর্তী জীবনের বিশেষ কোন তথ্য পাওয়া যায় না। হযরত আমীর মুআবিয়ার রা: শাসনকালে হিজরী ৬০ সনের পূর্বে তিনি মদীনায় ইনতিকাল করেন। হাদীসের গ্রন্থ সমূহে আমর ইবন উমাইয়া থেকে বর্ণিত ২০ টি হাদীস পাওয়া যায়।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব - নাজ্জাসির কাছে নবীর চিঠি 
  2. সীরাতু ইবন হিশাম- (১/২০৪,২০৭) 
  3. সীরাতু ইবন হিশাম- (২/১৮৪,১৮৫) 
  4. হায়াতুসসাহাবা- (৩/৫৯৫) 
  5. সীরাতু ইবন হিশাম- (১/২২৪, ৩২৪) 
  6. হায়াতুস সাহাবা- (১/ ১৫৮, ৩/৫৯৬-৯৭) 
  7. সীরাতু ইবন হিশাম- (২/ ৬৩৩-৩৪)