অস্থিতিস্থাপক বিক্ষেপণ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

রসায়ন, নিউক্লিয়ার পদার্থবিজ্ঞান এবং কণা পদার্থবিজ্ঞানে অস্থিতিস্থাপক বিক্ষেপণ হলো স্থিতিস্থাপক বিক্ষেপণের বিপরীত সেই মৌলিক বিক্ষেপণ প্রক্রিয়া যেখানে সংঘর্ষে লিপ্ত কণার গতিশক্তি সংরক্ষিত থাকে না। অস্থিতিস্থাপক বিক্ষেপণে সংঘর্ষে লিপ্ত কণার কিছু শক্তি হয় হারিয়ে যায় নয়তো এর শক্তি বৃদ্ধি পায়। যদিও "অস্থিতিস্থাপকতা" পরিভাষাটি ঐতিহাসিকভাবে গতিবিদ্যার অস্থিতিস্থাপক সংঘর্ষের ধারণাটির সাথে সম্পর্কযুক্ত তবুও এ দুটি বিষয় সম্পূর্ণভাবে আলাদা; গতিবিদ্যায় অস্থিতিস্থাপক সংঘর্ষ বলতে এমন সব প্রক্রিয়াকে বোঝায় যেখানে মোট স্থুল (ম্যাক্রোস্কোপিক) গতিশক্তি সংরক্ষিত থাকে না। সাধারণভাবে অস্থিতিস্থাপক সংঘর্ষের কারণে সৃষ্ট বিক্ষেপণ অস্থিতিস্থাপক হবে। কিন্তু স্থিতিস্থাপক সংঘর্ষগুলোর মাধ্যমে প্রায়ই কণার মধ্যে গতিশক্তির স্থানান্তর ঘটায় স্থিতিস্থাপক সংঘর্ষের কারণে সৃষ্ট বিক্ষেপণও অস্থিতিস্থাপক হতে পারে, যেমন: কম্পটন বিক্ষেপণ

ইলেকট্রনের অস্থিতিস্থাপক বিক্ষেপণ[সম্পাদনা]

কোন ইলেক্ট্রন সংঘর্ষে লিপ্ত হলে অস্থিতিস্থাপক বিক্ষেপণ ঘটার সম্ভাব্যতা সাধারণত স্থিতিস্থাপক বিক্ষেপণ ঘটার সম্ভাব্যতার চেয়ে ক্ষুদ্রতর হয় যা আবার নির্ভর করে সংঘর্ষে লিপ্ত ইলেকট্রনের শক্তির উপর। অর্থাৎ ইলেক্ট্রনের ক্ষেত্রে অস্থিতিস্থাপক বিক্ষেপণ ঘটার সম্ভাবনা কম। একইভাবে গ্যাস ইলেক্ট্রন অপবর্তন (GED), প্রতিফলন উচ্চ-শক্তি ইলেকট্রন অপবর্তন (RHEED) এবং সঞ্চালন ইলেকট্রন অপবর্তনের ক্ষেত্রে সংঘর্ষে লিপ্ত ইলেক্ট্রনের শক্তির পরিমাণ উচ্চ হওয়ায় ইলেকট্রনের অস্থিতিস্থাপক বিক্ষেপণ খুব সামান্যই ঘটে যা উপেক্ষা করা যেতে পারে। প্রোটন থেকে ইলেকট্রনের গভীর অস্থিতিস্থাপক বিক্ষেপণের ঘটনা কোয়ার্কের অস্তিত্বের প্রথম প্রত্যক্ষ প্রমাণ প্রদান করে।

ফোটনের অস্থিতিস্থাপক বিক্ষেপণ[সম্পাদনা]

যখন একটি ফোটন সংঘর্ষে লিপ্ত হয় তখন রমন বিক্ষেপণ নামক একটি অস্থিতিস্থাপক বিক্ষেপণ প্রক্রিয়ার দেখা মেলে। এই বিক্ষেপণ প্রক্রিয়ায় সংঘটন ফোটন পদার্থের (গ্যাস, তরল এবং কঠিন) সাথে মিথস্ক্রিয়া করে এবং ফোটনের কম্পাঙ্কের স্থানান্তর লাল অথবা নীলের দিকে ঘটে। যখন ফোটনের শক্তির কিছু অংশ মিথস্ক্রিয়ারত পদার্থে সঞ্চালিত হয় যেখানে ফোটনটি স্টোকস রমন বিক্ষেপণ নামক একটি প্রক্রিয়ায় তার অন্তর্জাত শক্তি যোগ করে তখন একটি লোহিত সরণের দেখা যেতে পারে। আবার পদার্থের অন্তর্জাত শক্তি ফোটনে সঞ্চালিত নীল সরণের দেখা পাওয়া যেতে পারে; এই প্রক্রিয়াটিকে বলা হয় প্রতি-স্টোকস রমন বিক্ষেপণ।

একটি ইলেকট্রন এবং একটি ফোটনের মধ্যকার মিথস্ক্রিয়ায় অস্থিতিস্থাপক বিক্ষেপণ দেখা যায়। যখন উচ্চ শক্তি সম্পন্ন একটি ফোটন একটি মুক্ত ইলেকট্রনের (আরও ভালভাবে বলা যায় দুর্বলভাবে বদ্ধ ইলেক্ট্রন, কারণ মুক্ত ইলেকট্রন ফোটনের সাথে অস্থিতিস্থাপক বিক্ষেপণে অংশ নিতে পারে না) সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় এবং শক্তির স্থানান্তর ঘটায় তখন এই প্রক্রিয়াটিকে কম্পটন বিক্ষেপণ বলা হয়। অধিকন্তু আপেক্ষিক শক্তির একটি ইলেকট্রন যখন একটি অবলোহিত বা দৃশ্যমান ফোটনের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, তখন এই ইলেকট্রনটি ফোটনটিকে শক্তি প্রদান করে। এই প্রক্রিয়াটিকে বিপরীত কম্পটন বিক্ষেপণ বলা হয়।

নিউট্রনের অস্থিতিস্থাপক বিক্ষেপণ[সম্পাদনা]

নিউট্রনের স্থিতিস্থাপক এবং অস্থিতিস্থাপক উভয় প্রকার বিক্ষেপণ সহ আরও অনেক ধরনের বিক্ষেপণ ঘটে। স্থিতিস্থাপক কিংবা অস্থিতিস্থাপক যে বিক্ষেপণই ঘটুক তা নির্ভর করে দ্রুত কিংবা তাপীয় অথবা এদের মাঝের যেকোন নিউট্রনের গতির উপর। উপরন্তু নিউট্রনটি যে নিউক্লিয়াসকে আঘাত করে নিউট্রনের বিক্ষেপণ নির্ভর করে তার উপর এবং নিউট্রন ক্রস সেকশনের উপর। নিউট্রন তার অস্থিতিস্থাপক বিক্ষেপণের ক্ষেত্রে নিউক্লিয়াসের সাথে মিথস্ক্রিয়া করে আর এতে সিস্টেমের গতিশক্তির পরিবর্তন ঘটে। এর ফলে সচরাচর নিউক্লিয়াসটি একটি উত্তেজিত, অস্থিতিশীল এবং ক্ষীণ-স্থায়ী শক্তি স্তরে উত্তীর্ণ হয়ে সক্রিয় হয়ে পড়ে যার কারণে আবার নিউক্লিয়াসটি একটি স্থিতিশীল বা ভূমি অবস্থায় ফিরে আসার নিমিত্তে অতি দ্রুত কয়েক ধরনের বিকিরণ নির্গত করে। এ সময় নিউক্লিয়াস থেকে আলফা, বিটা, গামা এবং প্রোটন নির্গত হতে পারে। এই ধরনের নিউক্লীয় বিক্রিয়ায় বিক্ষিপ্ত কণার কারণে নিউক্লিয়াসটির ভিন্ন কোন দিকে প্রতিক্ষিপ্ত (recoiled) হতে পারে।

আণবিক সংঘর্ষ[সম্পাদনা]

আণবিক সংঘর্ষের ক্ষেত্রে অস্থিতিস্থাপক বিক্ষেপণ একটি সাধারণ ঘটনা। রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটায় এমন যে কোন সংঘর্ষ অস্থিতিস্থাপক হবে, কিন্তু যে সব সংঘর্ষ বিক্রিয়া ঘটায় না তাদের ক্ষেত্রে অস্থিতিস্থাপক বিক্ষেপণের শর্তটি সংরক্ষিত থাকে।[১] অনুবাদী অবস্থা (গতিশক্তি) এবং ঘূর্ণন ও কম্পন অবস্থাগুলোর মধ্যে শক্তির স্থানান্তর ঘটে। স্থানান্তরিত শক্তির পরিমাণ বিক্ষিপ্ত কণার সংঘটন (সংঘর্ষে ব্যবহৃত) শক্তির তুলনায় ক্ষুদ্র হলে একে আপাত-স্থিতিস্থাপক বিক্ষেপণ (quasielastic) বলা যায়।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]