অমরেন্দ্র ঘোষ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

অমরেন্দ্র ঘোষ বাংলাভাষার একজন বিখ্যাত ঔপন্যাসিক যার পূর্ণ নাম শ্রী অমরেন্দ্রনাথ ঘোষ। পূর্বপুরুষের পদবী ছিল ঘোষ রায়। তার আগে পূর্বপুরুষরাই এই রায় ফেলে দিয়ে শুধু ঘোষ লিখতে শুরু করেন। ১৯৫০ সালের পরে কোনো এক সময় তিনি তার নিজের নামের ‘শ্রী’ ও ‘নাথ’টুকু ছেঁটে দিয়ে অমরেন্দ্র ঘোষ নামে আত্মপ্রকাশ করেন। তাঁর জন্মতারিখ ৫ ফেব্রুয়ারি, মঙ্গলবার, ১৯০৭। পিতৃসূত্রে তাঁদের বাড়ি তৎকালীন বরিশাল জেলাধীন রাজাপুর থানার শুক্তাগড় গ্রামে। ড. হাজরা উল্লেখ করেছেন চার-পাঁচ পুরুষ পূর্বে তার পূর্বপুরুষের একজন তাদের আদি বাড়ি বর্তমান বানারীপাড়া থানার নরোত্তমপুর ছেড়ে রাজাপুর থানার শুক্তাগড় গ্রামে তালুক কিনে বসবাস শুরু করেন। ড. হাজরা আরো উল্লেখ করেছেন যে অমরেন্দ্রের জন্ম হয়েছিলো বর্তমান পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া থানায়। এ তথ্যের উৎস জানতে চাইলে তিনি বলেন তার মনে হচ্ছে তিনি এ তথ্য অমরেন্দ্র ঘোষের স্ত্রীর কাছ থেকে শুনেছেন। এ কথা সত্য যে, বর্তমান বাগেরহাট জেলার রামপাল থানায় মল্লিকের বেড় গ্রামে তাদের জমি ছিল, ক্ষেত ছিল, যাকে তারা পারিবারিকভাবে দক্ষিণের বিল বলতো। এই দক্ষিণের বিলকে কেন্দ্র করেই তার তিন পর্বের উপন্যাস ‘দক্ষিণের বিল’। কিন্তু মঠবাড়িয়ায় তাদের জমি ও বাড়ি থাকা কিংবা সেখানে অমরেন্দ্রর জন্ম হওয়া বিষয়ে স্মৃতিকথা ‘জবানবন্দী’ থেকে কোনো তথ্য জানা যায় না। স্মৃতিকথায় প্রদত্ত বিভিন্ন তথ্যনিরিখে বরং অণুমিত হয় তাঁর জন্মস্থান মেঘালয়ের রাজধানী শিলংয়ের কাছাকাছি কোনো থানা শহরে যেখানে তাঁর পিতা জানকীকুমার ঘোষ তখন পুলিশের কনস্টেবল পদে সাড়ে তিন টাকা বেতনে চাকুরি করতেন।

বাল্যকাল[সম্পাদনা]

জবানবন্দী’র তথ্যমতে অমরেন্দ্রের পিতা জানকীকুমার ঘোষ ছাত্রবৃত্তি ক্লাস পর্যন্ত পড়েছিলেন। মা শিবসুন্দরী কোনোমতে নাম দস্তখত করতে পারতেন। জানকীকুমার ঘোষ ও শিবসুন্দরীর মোট আট ছেলেমেয়ে। তিন পুত্র ও পাঁচ কন্যা। অমরেন্দ্রের আট ভাইবোন যথাক্রমে: শ্রীমতী মৃণালিনী বসু রায়, শ্রীমতী হেমনলিনী গুহঠাকুরতা, শ্রী অমরেন্দ্র ঘোষ, শ্রীমতী কমলিনী বসু নারায়ণ, শ্রী নারায়ণ ঘোষ, শ্রী জনার্দন ঘোষ, শ্রীমতী নীলিমা গুহ রায় ও শ্রীমতী বেলা রাণী বসু নারায়ণ। সবার বড় বোন মৃণালিনী ১৯৪৭ এর পূর্বেই এক মেয়ে নিয়ে বিধবা হন। এই মেয়ে ও তার জামাইকে নিয়ে তিনি কোলকাতা বিধানপল্লীতে একটি মাথা গোঁজার ঠাঁই করেছিলেন। সম্ভবত দ্বিতীয় বোন হেমনলিনীর স্বামীর বাড়ি ছিল বরিশালের নথুল্লাবাদে। তার এক দিদির বাড়ি ছিল নথুল্লাবাদে- এমনটা অমরেন্দ্র ঘোষের স্মৃতিকথায় উল্লেখ আছে। স্মৃতিকথা ‘জবানবন্দী’ ঘেঁটে আরো জানা যায় যে ১৯৫৭ সালের পূর্বেই মৃণালিনীসহ আরো তিন বোন গতায়ু হন। ১৯৫৭ সালে বেঁচে থাকা একমাত্র বোনের নাম ছিল বেলা। বেলার স্বামীর নাম মিনু বাবু (অবশ্যই এটি পূর্ণ নাম নয়)। ‘জবানবন্দী’ লেখার সময় ১৯৫৭ সালে অমরেন্দ্রের অপর দুই ভাই নারায়ণ ও জনার্দন জীবিত ছিলেন এবং কোলকাতায় বাস করছিলেন। তবে নারায়ণ তখন টিবি ও ডায়াবেটিসে ভুগছেন এবং অমরেন্দ্র ভুগছেন ইনসমনিয়া, ডিউডেনাল আলসার, এ্যাজমা, রাইটারস ক্র্যাম্পস ইত্যাকার অনেক কঠিন রোগে। অমরেন্দ্রের স্ত্রীর নাম পঙ্কজিনী ঘোষ। বাড়ি ফরিদপুরের উলপুর। পঙ্কজিনীর পিতার নাম কেদারেশ্বর রায় চৌধুরী এবং মাতার নাম জীবনতোষিনী দেবী। এই উলপুর ফরিদপুরের কোন থানায় আমি জানি না। অমরেন্দ্র ঘোষ ও পঙ্কজিনী ঘেষের ছয় সন্তান: হেনা, ছায়া, গীতা, বাসুদেব, রেবা ও অশোক। হেনার স্বামী অনিল, ছায়ার স্বামী সন্তোষ ও গীতার স্বামী গোপাল। ‘জবানবন্দী’ থেকে জানা যায় পঙ্কজিনী ঘোষের এক বোনের নাম হেমলতা দত্ত ও আরেক বোন শৈবালিনী ঘোষ দস্তিদার। শৈবালিনী ঘোষ দস্তিদারের এক ছেলে অমরেশ একজন স্থিতধী ডাক্তার ছিলেন এবং একসময় তিনি অমরেন্দ্র ঘোষের চিকিৎসকও ছিলেন। পঙ্কজিনী ঘোষের এক মামা নগেন্দ্রনাথ ঘোষ দস্তিদার পাটনা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন। ‘জবানবন্দী’ থেকে পঙ্কজিনী ঘোষের এক ভাইয়ের নাম জানা যায় রবীন্দ্র রায়চৌধুরী, তবে তিনি পঙ্কজিনী ঘোষের সহোদর কিনা প্রমাণিত নয়। ‘জবানবন্দী’ থেকে জানা যায় অমরেন্দ্র ঘোষের ছেলেবেলা ১৯১২-১৩ পর্যন্ত কেটেছে বাবার কর্মস্থল শিলংয়ে। এখানে পাহাড়ি স্বচ্ছ পানির সোঁতায় একবার মাছ দেখে ধরার জন্য নেমে পড়েন ছয়-সাত বছরের অমরেন্দ্র এবং মাছের পেছনে দৌড়াতে দৌড়াতে একসময় মাছও হারিয়ে যায় এবং অমরেন্দ্রের ফেরার পথও হারিয়ে যায়। এক পাহাড়ি খাসিয়া এমন পথহারা শিশুটিকে তার থাপায় করে থানায় বাবুর কাছে দিয়ে যায়। আট থেকে দশ-এগার বছর কাল পর্যন্ত কেটেছে আসামের কামাখ্যায়, বাবার পরবর্তী কর্মস্থলে। এরপর বাবার বদলি বগুড়ার ধুনট থানায়। তখন বাবা জানকী কুমার ঘোষ পুলিশের সাব ইনস্পেক্টর। ড. হাজরা অবশ্য লিখেছেন অমরেন্দ্রের পিতা পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া থেকে ধুনটে বদলী হন। কিন্তু ‘জবানবন্দী’ এই তথ্যের পক্ষে সায় দেয় না। বার-তের বছরের অমরেন্দ্র ধুনটে প্রথম ঘোড়ায় চড়তে শিখেন। ঘোড়ায় চড়ে চলে এসেছিলেন এক মুসলমান কলুর বাড়িতে। কলু লোকটির সাথে তার বেশ ভাব হয় এবং এই কলু তাকে মিতা ডাকতো। এক পয়সার বাতাসা এনে খাওয়াতো। এই লোককে ছুঁয়ে পানি খেয়ে প্রথম অমরেন্দ্র তার জাত বিসর্জন দিয়েছিলেন। ঘটনাটি অমরেন্দ্র এভাবে বর্ণনা করেছেন- ‘একবোরে বাড়ির কাছে এসে একদিন অতর্কিতে মিতাকে ছুঁয়ে ফেলে ঢকঢক করে খেয়ে ফেললাম জল। ‘মিতা স্তম্ভিত। ‘আমিও আশ্চর্য। জাত যদি যেয়েই থাকে, কিছু তো আমার বদলাবে। নইলে অন্তত মিতার কিছু হবে পাপের প্রায়শ্চিত্ত। এমন যে শিশু তাকেও আগুন ক্ষমা করে না। ‘পুরোপরি দুজনই ঠিক আছি। আমি হেসে কুটিকুটি। একটা সত্য সেদিন ধরা পড়ল কোনো মানুষই অচ্ছুৎ নয়। মনে মনে স্থির করলাম, সেদিন বাড়ি ফিরে মাকে সগর্বে জানিয়ে দেব এই বার্তাটা। বিশ্বাস না করো, তোমরা পরীক্ষা করে যাচাই করে দেখো মূল সত্যটা।’ (জবানবন্দী ৯১) ধুনট থেকে বাবা জানকীকুমার ঘোষের বদলী রাজশাহীর আদমদীঘিতে। জংলা একটা দীঘি ছিল। দীঘিটার একপাড়ে থানা, অন্যপাড়ে আদমের দরগা। অমরেন্দ্র এখানে প্রথম প্রেমে পড়েন। মেয়েটির নাম হারু। কিশোরকালীন এই না-বলা প্রেমের অনুভব পরিণত কালে তাঁর উপন্যাস ‘চড়কাশেম’-এ মনোবিকলন ধারায় অভিব্যক্ত হয়েছে। বাবা রাজশাহী আসার শুরুতে অথবা ধুনট থাকাকালীনই অমরেন্দ্রকে মায়ের কোল ছেড়ে কোলকাতায় পাড়ি দিতে হয়।

শিক্ষাজীবন[সম্পাদনা]

সম্ভবত ১৯১৬ সালে তিনি কোলকাতা কালীঘাট স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হন। সাহানগর রোডে বোন মৃণালিনীর বাসায় থেকে এই স্কুলে পড়াশুনা করেন। কালীঘাট স্কুলে পড়াকালীন চলছে ‘স্বদেশী আন্দোলনের যুগ ও হুজুগ’। পাড়ায় পাড়ায় ব্যায়ামের আখড়া। অগ্নিযুগ ও অনুশীলন পার্টির প্রভাব অপরিমেয়। অমরেন্দ্র নিয়মিত আখড়ায় যান। রাত চারটায় ঘুম থেকে ওঠেন। কানাদার আখড়ায় ছিল তাঁর ব্যায়াম। নিয়মিত মাইনে দেন, কিন্তু স্কুলে যাবার নাম নেই। বছরের শেষে কোনোরকমে হাত পা ধরে প্রমোশন পান। এভাবে ক্লাশ এইট-নাইন পর্যন্ত ওঠা। এত ব্যায়াম, এত শপথ, কিন্তু বিপ্লবের কোনো ডাক পাচ্ছেন না। শেষ পর্যন্ত হতাশাগ্রস্ত বিপ্লবী অমরেন্দ্র ডাক পেলেন জুয়া ও গাঁজার আসর থেকে। নেমে গেলেন সে পথে (জবানবন্দী ১৪৯)। ক্লাস নাইনের শেষ দিকে, ১৯২৩ সালে চিঠি এল বাবার বহুমূত্র বেড়েছে। তার ওপর হয়েছে কার্বাঙ্কেল অর্থাৎ বড় বড় পুঁজওয়ালা ফোঁড়া। মারাত্মক পরিস্থিতি। আর দেরি না করে অমরেন্দ্র মালদা হয়ে পৌঁছালেন হবিবপুর থানায়। বাবা তখন সেখানে বড় দারোগা। বাবা সুস্থ হওয়ার পরে ফিরে এলেন কলকাতা। এবার আর জুয়ার আসরের ডাকই শেষ নয়। আরো বড় অন্ধকার পথ থেকে ডাক এলো। পা বাড়ালেন সেই পথে। একদিন একেবারে সবান্ধবে বেশ্যাবাড়ি। মদের গ্লাসে চুমুক দিতেই গলা বুক জ্বলতে লাগল অসহ্য জ্বালায় (জবানবন্দী ১৫১)। তবে এপথ খুব আটকে রাখতে পারেনি অমরেন্দ্রকে। এই এইট-নাইনের সময়কালেই অমরেন্দ্রের সৃষ্টিসত্তার উদ্ভব। অমরেন্দ্রের নিজের ভাষায়- ‘বয়স তখন অণুমান ষোল সতের।. . তেরশ একত্রিশ কি বত্রিশ।. . কবি এবং কাব্যের আদর্শ রবীন্দ্রনাথ, তাঁর চলন-বলন সাজ-সজ্জারও অক্ষম অণুকরণ চলছে।. . এই সময় তাঁর ‘শিশু’ কবিতার বইখানা আমার হাতে আসে। মনে হয়, এমন কবিতা বুঝি আমিও লিখতে পারি। একলব্যের মত দ্রোণাচার্যকে ধ্যান করতে লাগলাম। বসে গেলাম কাগজ কলম নিয়ে। দেখলাম মহৎ কথা সহজ কথায় লেখা বড় সুকঠিন।. . লিখতে হলে তার ব্যাকরণ জানা চাই।’ (জবানবন্দী ১২০) কবি সত্তার এই জাগরণের পরের জাগরণ ম্যাট্রিক পরীক্ষায় পাস দেয়ার বোধ। সেই বোধের মধ্য দিয়েই হুশ হলো। কিছুদিন চোখকান বুজে পড়াশোনা এবং প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস ১৯২৫ সালে (জবানবন্দী ১৫২)। এটি অবশ্যই অণুমেয় ১৯২৫ সালে ১ম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করা কত কঠিন একটি বিষয় ছিল। মাত্র কয়েক মাসের পড়াশোনায় এই অর্জন অমরেন্দ্রের অসাধারণ প্রতিভাকে আমাদের সামনে উপস্থাপন করে। ম্যাট্রিকের ফলাফল প্রকাশের পূর্বেই বিয়ের পিড়িতে বসা। বিয়ের তারিখ ১৩৩২ সালের ১২ই বৈশাখ শনিবার (হাজরা ১৯)। অমরেন্দ্র ১৮ আর কনে পঙ্কজিনী ১৩। অমরেন্দ্রর গৌরব সে গল্প কবিতা লেখে, আর পঙ্কজিনীর গৌরব সে এই বয়সেই বঙ্কিম, শরৎ অনেকখানি পড়ে ফেলেছে। গৌরবের সাথে অমরেন্দ্রর আরো আনন্দ ম্যাট্রিকের ফল প্রকাশের আগেই বিয়েটা সম্ভব হয়েছে বলে, কেননা ফল যা-তা একটা হলে কে তাকে মেয়ে দেবে। আরো মজা নিজের কিছু করতে হয়নি, ‘বাবাই চাপিয়েছেন ঘাড়ে, মা স্বাস্থ্যহীন বলে’ (জ. ১৫৯)। এ সবই আনন্দে আনন্দে এবং ভালোয় ভালোয় হলো। ঘর সামলাতে পুত্রবধূ দরকার, তাই জানকী ও শিবসুন্দরীরও আনন্দ। তবে এ আনন্দ বেশিদিন টিকলো না। প্রথমত অমরেন্দ্র গল্প-কবিতার জগতের মানুষ, সে কেন বিজ্ঞান পড়বে। কিন্তু বাবা মায়ের আশা ছেলে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হবে। সুতরাং বাবা মায়ের ইচ্ছাপূরণে ছেলেকে ভর্তি হতে হলো কোলকাতা সাউথ সুবারবন কলেজে আইএসসিতে। এই মনোযন্ত্রণার মধ্যে আবার জাগলো সেই সৃষ্টিচেতনা যা একবার জেগেছিল স্কুল জীবনে ষোল-সতেরতে। এবার সে চেতনা জাগলো পুরো বাঁধ ভেঙ্গে। অমরেন্দ্রর নিজের বর্ণনায়- ‘আবার ধ্যানে বসলাম। লেখাপড়া ছাড়লাম একেবারে। কলেজে শুধু যাই আসি, আর আড্ডা। মনে মনে নিজের তরফে একটি যুক্তি খাড়া করেছি, বিরাট প্রতিভার পক্ষে এ্যাকাডেমিক কোয়ালিফিকেশন, ডিসকোয়ালিফিকেশন।. . আবার সাধনায় বসলাম ভাবগুরুর ছবি মনে এঁকে। এবার কিছু কবিতা লেখা হলো। . . বন্ধুমহলে পড়ে হাততালি পেলাম। হ্যারি বোধ হয় একটা গাধার টুপিতে কবি লিখে শিরোপা দিল আমায়। সেই থেকেই কবি আখ্যা।. . একজন রাইভ্যাল জুটে গেল কলেজে- সহপাঠী। পরে বন্ধুত্ব। সেও কবিতা লেখে। প্রাণতোষ দাশগুপ্ত, ডাকণাম নীতু।. . অচিন্ত্য্য্য্যকুমার সেনগুপ্তের নাকি দূর সম্পর্কের ভাগ্নে।. . নীতুর সাথে একদিন কলেজের পর অচিন্ত্য্য্য্যকুমারের বাড়ি গিয়ে উপস্থিত। . . একদিন এই অচিন্ত্য্য্য্যই আমাকে ছন্দের তালমাত্রা শিখিয়ে দিলেন। শুধু কবিতার নয়, গদ্যেরও। এই অচিন্ত্য্য্য্যই আমাকে বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। . . আমার প্রথম লেখা প্রথম গল্প ‘কলের নৌকা’ ১৩৩৪ বঙ্গাব্দে কল্লোলে ছাপা হলো, রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত না পৌঁছেও আমি যেন একটা সিঁড়ি পেলাম অচিন্ত্য্য্য্যের সহযোগিতায়। . . কিছুদিনের জন্য অচিন্ত্য্য্য্যকুমার সেনগুপ্ত আমার গৃহশিক্ষক ছিলেন। আমি পড়ি আইএসসি, উনি বোধ হয় এমএ’র সঙ্গে ল (জবানবন্দী ১২০-২৫)।’ অবশ্য ‘কলের নৌকা’ই অমরেন্দ্রের প্রকাশিত প্রথম লেখা নয়। এর অল্প আগে কবিশেখর কালিদাস রায়ের হাতে সামান্য শুদ্ধির মধ্য দিয়ে তাঁর প্রথম কবিতা ‘শ্মশানে বসন্ত’ মাসিক ‘বঙ্গবাণী’তে ছাপা হয়েছিল ১৩৩৪ এর আষাঢ় সংখ্যায়। (জবানবন্দী ১৫২)। ড. হাজরার গবেষণা তথ্যমতে এর দু মাস পরে ১৩৩৪ ভাদ্র সংখ্যায় ‘বঙ্গবাণী’তে প্রকাশিত হলো কবিতা ‘মরুভূমি’ এবং কল্লোলে ছাপা হলো গল্প ‘কলের নৌকা’। কিছুদিন পরে ১৩৩৪ সালেই ‘মানসী ও মর্মবাণী’ নামে এক পত্রিকায় ‘শ্মশানে বসন্ত’ কবিতার এক রসজ্ঞ আলোচনাও বের হলো। কিছুদিন পরে প্রবাসীতে ‘একটুখানি নুন’ নামে আরো একটি গল্প ছাপা হলো। একাডেমিক জীবন বিনষ্টের এই নন-একাডেমিক আনন্দও অমরেন্দ্রের জীবনে বেশিদিন টিকলো না। ‘দৈবের ঝাপটা এলো অকস্মাৎ। বাবার গেল চাকরি। আমার ভাঙল গড়া স্বাস্থ্য। দুটো তিনটে বছরের মধ্যে সব লণ্ডভণ্ড । কেউ বললে প্লুরেসি , কেউ বললে টি.বি.র সূত্রপাত। পরমায়ুর সন্ধানে চললাম হাওয়া বদলে।’ অমরেন্দ্র হাওয়া বদলে পৌঁছালেন বিহারের দেওঘরে, নন্দলাল রায়ের বাড়ি। নন্দলাল রায় হলো অমরেন্দ্রের কালীঘাটের দিদির বাসার সামনে ভাড়া থাকা এক বিদ্বান ব্যক্তি যাঁর হাতে অমরেন্দ্রের মার্কসিজমে হাতেখড়ি এবং যিনি প্রথম জীবনেই অমরেন্দ্রের মনে সন্দেহবাদের সামান্য বীজ রোপণ করতে পেরেছিলেন। পুরো তিনটি মাস এখানে কাটালেন। নন্দলাল রায়ের পুরো পরিবার তাঁর এত আপন হয়ে উঠলো যে, পরবর্তী জীবনে ‘পদ্মদীঘির বেদেনী’তে নন্দলাল রায়ের পিসিমার অবিস্মরণীয় ডাককে তিনি ভাষা দিয়েছেন ময়নার ডাকে- ‘তুই তো হামার গোপাল আছিস’। নন্দলাল রায়ের বোন রাণী তাঁর যে গল্প-কবিতাগুলো হাতে লিখে কপি করে দিয়েছিল পরবর্তী জীবনে যখন অমরেন্দ্র রাজাপুরের নিছক একজন চাষী তখনও সেই কপিগুলো সযতেœ সংরক্ষণ করেছিলেন স্ত্রী পঙ্কজিনী ঘোষ। চেইঞ্জের থেকে ফিরে কলকাতা আর তিষ্ঠান গেল না। ফিরে আসতে হলো চাকরিহীন বাবার সাথে গ্রামে অর্থাৎ বর্তমান ঝালকাঠি জেলার রাজাপুর থানাধীন শুক্তাগড়ে। জবানবন্দির ১৮৮ পৃষ্ঠায় ১৭/৫/৫৮ তারিখে অমরেন্দ্র লিখেছেন ‘প্রায় ত্রিশ বছর আগের গ্রাম-জীবনের কাহিনী সুরু করে এলাম’। এই বাক্য থেকে অণুমিত হয় ১৯২৮ সালে অমরেন্দ্র পারিবারিক প্রয়োজনে আইএসসি পরীক্ষা না দিয়েই কলকাতা ছেড়ে রাজাপুরে এসে উঠেছিলেন। গ্রামে এসে কিছু পা-ুলিপি এবং দু’একখানা বই বা-িল করে পঙ্কজিনীর কাছে দিলেন। তিনি কি করলেন তার আর সংবাদ নেয়ার অবকাশ নেই। এযাবৎ লেখক হিসেবে শুধুমাত্র পাঁচটি টাকা পেয়েছিলেন প্রবাসীতে ‘একটুখানি নুন’ গল্পটি লিখে। ‘এবার লেখা নয়, অন্য দায়িত্ব। বাবার চাকরি নেই, অথচ যৌথ পরিবারের দায়িত্ব রয়েছে পাহাড়ের মত কাঁধে চেপে। একটু অদল-বদল হলে ঘাড়, অমনি টের পেয়ে যাবে সাত গাঁয়ের মানুষ- ঘোষ বংশ ছন্নছাড়া হয়ে যাচ্ছে।. . . একটা বিরাট পরিবার- যার নিত্য পাতপিঁড়ি পড়ে অতিথি অভ্যাগত ছাড়াও বেলায় একশ-সোয়াশ জনার- তা ধসের মুখে দাঁড়িয়ে’।

লেখকমানসের গঠন ও বিকাশ[সম্পাদনা]

নন্দলাল রায়ের মার্কসিস্ট দৃষ্টি এবার অমরেন্দ্র পরীক্ষা করছেন সরেজমিনে। দেখছেন আর্থিক ভাঙনের সঙ্গে সঙ্গে কীভাবে আসে চারিত্রিক ভাঙন। পরিবার ভাঙলে কীভাবে গ্রাম ভাঙে।. . . এই ভাঙনের মধ্যেই তাঁর জমা হতে থাকে ‘দক্ষিণের বিল’-এর উপাদান। তবে তাঁর ভাবনার চৌহদ্দিতেও তখন নেই যে তিনি জীবনে আবার লিখবেন এবং এসব নিয়েই লিখবেন। অমরেন্দ্রের তখনকার জীবনের বর্ণনা- ‘কেত্তায় কেত্তায় মামলা- ফৌজদারী আদালত। তার সঙ্গে যোগ হল বকেয়া খাজনার নালিশ। আঘাতে আঘাতে বাবা যেন ক্ষেপে গেলেন। ছিলেন ধর্মভীরু, হয়ে উঠলেন হিং¯্র। আয়ের সঙ্গে এখন আর ব্যয়ের সঙ্গতি নেই। অথচ বজায় রাখত হবে মস্ত মান মর্যাদা সামাজিক ক্রিয়াকা- দোলদুর্গোৎসব। যাঁদের এতকাল প্রতিপালন করেছেন তাহাদের বা কি করে বলবেন তফাৎ যাও, তফাৎ যাও। শত্রুরা মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে চারিদিকে। সারা বছরের খোরাকি নেই ঘরে। চাকরিটাও গেছে ষড়যন্ত্রে। বাবাও আবার উলটে আঘাত দিতে লাগলেন- এক পাই’র জমায় আর্জি দিয়ে হাইকোর্টে। মামলা তো নয়, মৃত্যুকে নিয়ে যেন মহরত।. . . অন্ন নেই, সা¤্রাজ্য ভাঙ্গছে- আরো অন্ন চাই, ফসল চাই নানাবিধ। আরো ফসল ফলাও- আরো। ‘এই শপথ নিয়ে আবার হাল লাঙল- খাসে ধান চাষের পত্তন। একদিন এই হালুটিই আমাদের ছিল দূরে দক্ষিণের বিলে। পরে আমি সে পর্যন্তও ধাওয়া করেছিলাম গরু মোষ নিয়ে- সপ্ত ডিঙ্গা সাজিয়ে। সে বর্ণনা রয়েছে আমার উপন্যাসে ‘দক্ষিণের বিলে’।. . ভাঙার ভিতরই গড়ার আস্বাদ পেলাম খাসে চাষ জুড়ে। অঙ্কুরে বীজধানে প্রাণের স্পন্দন। আমি নিজেকে ডুবিয়ে দিলাম নতুন সৃষ্টিতে। দায়িত্ববোধের একটি মাদকতা আছে। এতগুলো মুখের জোগাতে হবে দানা- এমন একটি পরিবারের দূর করতে হবে হতাশা। আমি ঝড় তুফান রৌদ্রের মধ্যে যেন নেশায় মশগুল হয়ে খাটতে লাগলাম। ভাঙ্গা স্বাস্থ্যও জোড়াতালি দিয়ে চলল বেশ। দামী ডাক্তারী ওষুধ বাধ্য হয়ে ছেড়ে দিলাম। এবার টুকটাক কবিরাজী, নয়ত মুষ্টিযোগ। তারপর শ্রেফ খাই-সোডার ওপর নির্ভর। মাসে পাঁচ পোয়া সোডা খেতাম আমি। ‘বছর দুই বাদে প্রচুর ধান পেলাম নিজ চাষে। কিন্তু টলমল করে উঠলেন গৃহলক্ষ্মী। পড়ন্ত বেলার শুরুতেই মা চোখ বুজলেন। বাবা এবার যেন ক্ষেপেই গেলেন একেবারে- মামলা আর মামলা। কম করে হাজার ভরি সোনা ছিল মার গায়ে। বেশির ভাগই গেল উকিল মোক্তার পুলিশের পেটে, বাকিটা নিল চোরে ডাকাতে। শত্রুরা ঘরে আগুন দিল দুবার।. . বাবার মৃত্যুর পর একটা কালবোশেখীর কয়েক মুহূর্তের ধাক্কায় ভেঙে পড়ল তিন তলা টিনের বসত ঘর, সুমুখের টিনের প্রকা- নাটমন্দির ও লস্বা চওড়া ম-প।. . তবু আমি অদৃষ্টের ওপর নির্ভর করে বসেছিলাম না। আগুনে পোড়া ঝড়ে ভাঙা টিন এবং লোহা কাঠের খুঁটি কিনে আবার ঘর তুলে ছিলাম শক্তপোক্ত। দাঙ্গার সঙ্গে মামলা কিছুতে এড়াতে পারলাম না।. . বিয়ে দিতে হল দুটি বোনকে সমান ঘরে। তেমনি ছোট ভাই দুজনাকে চাকরি ব্যবসা বিয়ে দিয়ে ভাঙা জাহাজ থেকে কূলে তুলে দিলাম।. . ‘এরই মধ্যে আমি আনন্দ সংগ্রহ করেছি। ছুটে বেড়িয়েছি ঢপ কীর্তনের দলের সঙ্গে। সন্ধ্যার নদীতে শুনেছি খাঁটি ভাটিয়ালি গান। ফৌজদারী মামলার তারিখ নিয়ে জারী-কবির পালা শুনতে যেতাম। কখনো বা বৃন্দার দলকে বায়না করে নিজের নাট মন্দিরে আসর বসাতাম।. . উপন্যাস তখন কল্পনায়ও আসেনি, তবে ‘চড়কাশেম’-এ এক হুঁকোর ডাক রয়েছে, আমার বৈঠকখানায় ক্রমে ক্রমে সেই এক আসন ও এক হুঁকো চালু করেছিলাম আমি অনেক মাশুল দিয়ে। এই প্রয়াসে এমন কী শত্রু হলেন গুরু পুরুত অনেক আত্মীয় বান্ধব। ‘আবার ঝড় এলো- ভোলায় যেবার শেষবারের মত বন্যা এসেছিল।. . উড়িয়ে নিয়ে গেল আবার আমাদের বসত ঘরের টিন। ফের ঘর বাঁধলাম।. . আবার ধার কর্জ করে দক্ষিণের বিলে চাষের আশায় পাড়ি দিলাম।. .একদিন একটি অপরিচিত ভদ্রলোক এলেন আমাদের বাড়িতে। তিনি নাকি গান জানেন, প্রতিবেশী বন্ধু রমেশ ভট্টাচার্যের ভগ্নিপতি। নাম বীরেন্দ্রনাথ আচার্য, পেশা ইস্কুল মাস্টারি। . . . পঙ্কজিনী বললেন, আগে হাত দেখা হোক। এবং আমিই সাব্যস্ত হলাম প্রথম শিকার। অনেক দেখেশুনে ভদ্রলোক বললেন, শেষ জীবনে এসব ছেড়ে আপনাকে সাহিত্য করেই খেতে হবে। (জবানবন্দী ২০০-০১) ‘আরো ভাঙল গ্রাম-জীবন- আরো ভাঙল জীবিকার মাপকাঠি, মধ্যস্বত্বে তো ধরেছে বিশ্বগ্রাসী ফাটল। ষাটটা ঝুনা নারকেল একটাকা- চৌদ্দ আনা একমণ ধান। তাও নিত্য খদ্দের নাই। কতদিন যে হাট থেকে নারকেল সুপারি ধান চাউল ফিরিয়ে নিয়ে গেছি। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ঠিক আগের মরশুম। মাপের ডালার ওপর চার পাঁচ সের ফালতু নিয়ে গেছি। কিন্তু মামলা মোকদ্দমা যৌথ পারিবারিক দায়িত্ব যে ঘরে, সেখানে ব্যয় সংকোচের কোনো উপায় নেই। তার ওপর রয়েছে পুলিশ এবং সিঁদেল চোরের ট্যাকসো। একদিন দেখলাম পঙ্কজিনী নিরাভরণ। দেড়শ ভরি পড়ে থাক, একটু সোনার জলের দাগ নেই কোথাও। পঙ্কজিনীর গলায় এরপর স্বর্ণ উঠলো কোলকাতায় রেশন স্টোরের চাকরি থেকে বিদায় সম্বর্ধণা দেয়ার সময় বিদায়দাতাদের প্রদত্ত একটি সোনার মালা।’ (জ. ২০৩) যুদ্ধ আগাচ্ছে। ১৯৪৩ এর দুর্ভিক্ষ আগাচ্ছে। আর অমরেন্দ্রের কাছে আগাচ্ছে একটি প্রশ্ন- এই পূর্ববাঙলার মাটিতে মাথা গুঁজে শেষ পর্যন্ত থাকা যাবে তো? এই সব প্রশ্ন থেকেই সাতপাঁচ অনেক ভাবনা।- সাত পুরুষের ভদ্রাসন। ছাড়তে চাইলেই ছাড়া যায় না। প্রশ্ন আসে জীবিকার, প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায় আশ্রিত আত্মীয় অনাত্মীয় বন্ধুজন। প্রশ্ন করে গাছপালা। প্রশ্ন তোলে নদী জল বায়ু। এ প্রশ্নের জবাব দিয়ে শেষ নেই। এদিকে কলিকাতার সাম্প্রদায়িক বিষ ছড়িয়ে পড়ল নোয়াখালী পর্যন্ত। ১৯৪৬ এর আগস্ট ও পরবর্তী সময়ে সংঘটিত এ দাঙ্গা। আকাশে যেমন ইথার, পূর্ব বাংলায় তেমনি জল। সেই জলপথ ধরে ধেয়ে আসলো রায়ট। বাড়িতে বিষ সংগ্রহ করা হলো। ‘মাঝে মাঝে শিশুকন্যা গীতা, শিশুপুত্র বাসুদেব জিজ্ঞাসা করছে, কতটুকু বিষ খাবো বাবা?’ (জ. ২০৫)। এমনি দিনে অমরেন্দ্রের এই সংসারে উপস্থিত আরেক নতুন যন্ত্রণা। তার এক খুড়তাত ভাই। দেখতে অনেকটা কাপালিকের মত। ছিল বহুদূরে দক্ষিণে মামাবাড়ী। সঙ্গে দুটি উলঙ্গ ছেলে এবং প্রায় বিবস্ত্র স্ত্রী। দক্ষিণে নাকি আর থাকা যাবে না মান মর্যাদা নিয়ে। তাই এ সংসারে এসে আশ্রয় প্রার্থী। এই বিপন্ন কাপালিককে আরেক বিপন্ন অমরেন্দ্র ছেড়ে দিলেন বসত ঘরের চতুর্থাংশ। ছেড়ে দিয়ে সরলভাবে বললেন, ‘বাকি তিনভাগ বিক্রি করে আমি কলকাতা চলে যাব। এছাড়া আর টাকা পয়সা জোগাড় করার উপায় নেই। মধ্যস্বত্ব ইতঃপূর্বেই অনেকখানি নিলাম হয়ে গেছে। খাসের জমি তো ভোগ করা ছাড়া বিক্রি করার পথ বাবা রাখেননি’। কদিন বাদে জানা গেল সেই কাপালিক ভাই অমরেন্দ্রকে খুন করতে চাইছে। সাপের সঙ্গে একঘরে বাস করা উচিত নয়। তাই এবার অমরেন্দ্র ঘরছাড়া। এখন আর ঘরের বাকি অংশ বিক্রি করতেও পারছেন না। খদ্দের আসছে অনেক চেষ্টা যতেœ, কিন্তু ভাঙানি দিচ্ছে কাপালিক ভাই। মজার বিষয় হলো অমরেন্দ্র এই ভাইর নাম লেখেননি কোথাও, পাছে আমরা পাঠকরা এই সাধের ভাইয়ের উত্তরসূরীদের চিনে ফেলি। ১৯৪৩ (বাংলা ১৩৫০) এর দুর্ভিক্ষ শেষ, ১৯৪৬ এর দাঙ্গা শেষ। এখনো একটু দূরে দূরে নদীর চরে দেখা যায় মানুষের কঙ্কাল। এখনো দিকে দিকে বিলাপ। সে কান্না ‘সামান্য ক্রৌঞ্চমিথুনের কান্না নয়, ধরিত্রী কাঁদছে, সমস্ত সভ্যতা বিপন্ন’। অমরেন্দ্র সেই জগৎবিদারী কান্না শুনছেন, দেখছেন আর তার ভেতর ‘ভাঙছে শুধু ভাঙছে’র পটভূমি সৃষ্টি হচ্ছে। যদিও তিনি তখনো জানেন না, আবার কোনো দিন সর্বস্বান্ত কৃষক অমরেন্দ্র লেখক অমরেন্দ্র হয়ে উঠবেন। অবশ্য পড়শি রমেশ ভট্টাচার্যের ভগ্নিপতির হস্তরেখা পঠিত ভবিষ্যদ্বাণী মাঝে মাঝে মস্করার মতো তাকে বিদ্রƒপ করে। এই জগৎবিদারী কান্নার মাঝে বহুদিন বাদে অমরেন্দ্রের ‘সুপ্ত কবিচিত্ত হাহাকার করে উঠল বুঝি বুঝি ভিতরে ভিতরে।. . পঙ্কজিনীর কাছে একখানা আয়না থাকতো। সহজেই তাতে ধরা পড়ত আমার মনের ছবি। তিনি বললেন, তুমি এবার লেখো, নইলে মাথা খারাপ হয়ে যাবে এভাবে ভাবলে। বলো কি? আমি আবার লিখব? বলতে গেলে অনেক সময় যে নিজের নামটা পর্য়ন্ত সই করতে পারি কিনা তাতেই সন্দেহ জাগে।’ (জ. ২০৭)

লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশ[সম্পাদনা]

অনেক জিনিস নষ্ট হয়েছে, অনেক বস্তু আত্মসাৎ হয়েছে, শুধু একটি বস্তু সকলের দাঁত বাঁচিয়ে রক্ষা করেছিলেন পঙ্কজিনী, সেটি হল কল্লোল যুগের ছাপা লেখা ও দেওঘরের নন্দবাবুর বোন রানীর হাতের নকল করা কিছু গল্প বা কবিতার পা-ুলিপি। অমরেন্দ্রের ভেতরে তখন অপরিমেয় ধন্যবাদ ফরিদপুর জেলার উলপুরের বিলাঞ্চলের এই মেয়েটিকে। এই মেয়ে পঙ্কজিনী তার এক সময়ের লেখক স্বামীর এই কীর্তিটুকু এত ঝড়ঝাপটার মধ্যেও এখনো বিনষ্ট হতে দেননি। এ ঘটনা ১৯৪৬ এর শেষ দিকের। ১৯২৭-২৮ সালে লেখা ছেড়ে দেয়ার দীর্ঘ সতের-আঠার বছর পরে তিনি আবার লিখতে বসার দুর্নিবার তাগিদ অনুভব করছেন। তার অভিজ্ঞতা এমন কঠিন চিৎকার রূপে তার ভেতরে জমা হয়েছে যে, এ চিৎকার ভিতরে আটকে থাকলে তিনি দম বন্ধ হয়ে মারা যাবেন। তাই তাকে লিখতে হবে, বুকের চিৎকারকে বুক থেকে বের করে কাগজের জমিনে আটকে দিতে হবে। কিন্তু কাগজ কোথায় পাওয়া যাবে? কালি কলম কোথায় পাওয়া যাবে? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়। সমস্তই গেছে কালোকারবারীদের হাতে। ভাল দু’দিস্তা কাগজ তখন শুক্তাগড় থেকে রাজাপুর সর্বত্র দুর্লভ। এই অজগ- গ্রামে খুঁজলে হয়ত ব্লাকে কেনা যাবে দুদশ টিন কেরোসিন। ছিল একটা আপার প্রাইমারী স্কুল তাও বন্ধ হয়েছে সাম্প্রদায়িক টানাহেঁচড়ায়। অতএব কাগজ কলম নিষ্প্রয়োজন। এমন পরিস্থিতিতে অমরেন্দ্র একটা কলম আনতে ছুটলেন একদিন এক রাত্তিরের পথ দিদির কাছে, বরিশালের নথুল্লাবাদে- নাও ভাড়া করে। মাঝখানে ঝালকাঠি নেবে একখানা চিঠি ছাড়লেন কলকাতায় বড় শালীর কাছে। দিদি দিলেন একটা আধভাঙ্গা ব্ল্যাকবার্ড কলম, শালী পাঠালেন ছোট ছোট খান কয়েক রাইটং প্যাড। সব গুছিয়ে লিখতে বসা। কিন্তু কি লিখবেন- কবিতা, গল্প না প্রবন্ধ? ঠিক করে উঠতে পারছেন না। মেজো মেয়ের বিয়েতে একখানা বই উপহার পেয়েছিলেন। একবার খুলেও দেখা হয়নি। যে-মন নিয়ে বইখানা কোলকাতা থেকে রাজাপুরে নিয়ে এসেছিলেন, সে-মন শতধা হয়ে গেছে পথে। স্ত্রী বললেন- ‘আমি পড়েছি, তুমি পড়ে দেখো- লেখিকা নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন, নাম পার্ল বাক’। স্ত্রীলোকের লেখা হলেও অমরেন্দ্র আগ্রহ নিয়ে পড়লেন ‘গুড আর্থ’। পড়ে মনে হলো- চীন দেশের এই কি প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র? পূর্ববঙ্গের পল্লীজীবনের উপকরণ নিয়ে তো এর চাইতেও ভালো বই লেখা যায়। এই হলো ‘দক্ষিণের বিল’-এর সূত্রপাত। শুরু হলো ‘দক্ষিণের বিল’ লেখা। কিন্তু লেখক জানেন না কোথায় থামবেন। বর্ষার ধারা¯্রােতের মত আসতে লাগলো তার কাহিনী, এ ঢল সামাল দেয়া দায়। ক্ষুদে মাছির মত শত শত অক্ষরে হয়ে যাচ্ছে পাতা বোঝাই। কম করে দেড়শ লাইনের ঠাশ বুনোট এক পাতায়। আনুমানিক ছাপা পৃষ্ঠার পাঁচশ লিখে একবার নিশ্বাস ফেললেন। এবার কাকে পড়ে শোনান। স্ত্রীকে রোজই কিছু লিখে শোনান, কিন্তু তার ওপর তখনও তেমন আস্থা জন্মেনি। কৃষাণ জবেদালীকে ডাকেন, ডাকেন নেয়ে মাঝি চিনামদ্দিকে- আর আসে তাঁর খুড়িমা। চুপ করে এসে দূরে উঠানে বসে শোনে তার কাপালিক ভাই। পাঠ শেষ হলে সকলে বলে মন্দ হয়নি। একটি পনর ষোল বছরের ছেলে এল, লেখকের পড়শী। নাম মানিক গাঙ্গুলী। সে এমনি সময় নিয়ে এল নারায়ণ গাঙ্গুলীর পরিচয়। কিছুদিন কংগ্রেসের কাজে মানিক নাকি নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের দেশে ছিল। কে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়? ‘এ-কালের একজন বিখ্যাত লেখক। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস পড়েছেন - টোপ? একটা ছোট গল্প ‘বিতংস’ লিখে তিনি এগার হাজার টাকা পুরস্কার পেয়েছেন সেদিন।. . . তখন থেকে মানিক হলেন অমরেন্দ্রর লেখার প্রধান সমঝদার, অর্থাৎ কিনা শ্রোতৃম-লীর চেয়ারম্যান।’ (জবানবন্দী ২১১-১৩)। ‘দক্ষিণের বিল’ শুনতে শুনতে কাপালিক ভাইর কী যে পরিবর্তন হলো! সে আর প্রতিবন্ধক হয় না খদ্দের এলে। কিন্তু দেশে রাজনৈতিক ডামাডোল যত বাড়ে, তত দাম কমে ঘরের অংশটার। প্রায় পাঁচ হাজার টাকা মূল্যের জিনিস বেঁচে অমরেন্দ্র মাত্র চারশ টাকা পেলেন। পাড়াপ্রতিবেশিরা বললে, একি করলে? অমরেন্দ্র বললেন, এখানে আর বাস করা যাবে না। ‘কেন’? ‘পাকিস্তান হচ্ছে’। একটি লোকও লেখকের কথা বিশ্বাস করলো না। যারা বুদ্ধিমান তারা মনে মনে বুঝলেও, মুখে স্বীকার করলো না। ছোট বড় প্রায় সকলের অভিশাপ নিয়ে অমরেন্দ্র সপরিবারে বাপদাদার ভদ্রাসন ছাড়লেন চিরকালের মত। ১৯৫৮ সালে জবানবন্দিতে অমরেন্দ্র লিখেছেন- ‘আজ আমাদের গ্রামটা একেবারে ছাড়া, কিন্তু সেদিন যাবতীয় অভিশম্পাতের ভাগী হয়েছিলাম আমি একা’। (জবানবন্দী ২১৯)। তখনো পার্টিশান হয়নি। উনিশ শ’ সাতচল্লিশের মাঝামাঝি, অমরেন্দ্র বরিশাল টাউনে এসে উঠলেন। বাড়ি-বেচা টাকা চারশ একজনের কাছে একটা প্যাঁচে আটকে গেল। অমরেন্দ্র স্বামী স্ত্রীতে এক পরিবারের নিকট প্রায় দাসত্ব বরণ করলেন। সেই পরিবারের নামটা অবশ্য অমরেন্দ্র কোথাও বলেননি। তবে একটি করুণ বর্ণনা দিয়েছেন- ‘এবার সময়মত জোটেনা ছেলেমেয়ের দানাপানি। স্বাধীনতাহীনতা যে কী জিনিস এই প্রথম টের পেলাম। এটুকু আমার সাহিত্য জীবন নয়, দুর্বিষহ অপমান ও লাঞ্ছনার কাল। সারা দিন রাত এক দোকান সামলানোর কর্মচারী- সকাল পাঁচটা থেকে রাত একটা পর্যন্ত বেচাকেনা। কোনোদিন ছেলেমেয়ে স্ত্রীর সাথে দেখা হয়, কোনোদিন হয় না। এ দোকান আমার হাতেই প্রতিষ্ঠিত, শরিক হয়েও এখন আর তা নই, গ্রহদোষে করুণার পাত্র। ভয় আছে সামান্য ত্রুটিতে জবাবদিহি করার। মাথা নুয়েই খাটছি। কিন্তু রাত জেগে আবার ‘দক্ষিণের বিল’ সেজে ঢেলে লিখছি। এবার টের পেলাম কাহিনীর সাথে ভাষার সঙ্গতি হচ্ছে। টাইট হচ্ছে ঢিলা নাট বলটু স্ক্রু।’ (জবানবন্দী ২১৮) ‘দক্ষিণের বিল’ দ্বিতীয় পর্যায় লেখা সারা হল। অমরেন্দ্রের মনে হলো কি লিখেছেন তা তো বিদগ্ধ কারোর কাছ থেকে সঠিক জানা হল না। এই ভাবনা নিয়ে ব্রজমোহন কলেজের বাঙলার অধ্যাপক সুধাংশু চৌধুরীর কাছে ছুটলেন সাইকেলে চড়ে। পরনে লুঙ্গি ও গেঞ্জি, স্থানে স্থানে খয়ের চুনের দাগ। বললেন, ‘পানের দোকান করি বড় স্টেশনারি দোকানটার সঙ্গে, সদর রাস্তায় জগদীশ হলের অপজিটে। একখানা বই লিখেছি, শোনাতে চাই।’ অধ্যাপকের কৌতূহল হল। তিনি একা এলেন না। আরো চার পাঁচ জনকে সঙ্গে নিয়ে এলেন। তার মধ্যে একজন যুবক, শামসুদ্দীন আবুল কালাম, যার মধ্যে প্রথম দর্শনেই অমরেন্দ্র নব জাগৃতির বিদ্যুৎ শিখার সন্ধান পেলেন। একজনের নাম কিরণময় রাহা, ইনকাম ট্যাক্স অফিসার, যিনি পরবর্তীতে কোলকাতার জীবনে লেখকের অনেক উপকারে এসেছেন। প্যাকিং বাক্স, পুরাণ কাগজ, নস্যর ভাঙ্গা ফাইল সরিয়ে এই বিদগ্ধ শ্রোতাদেরকে দোকানের একটা গুদাম খোপে বসতে দিলেন। একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে পা-ুলিপি খুলে পড়তে বসলেন। প্রায় তিন ফর্মা পড়ে গেলেন একটানা। এঁরা কেউ ওঠার নাম করলেন না, সকলের কৌতূহল যেন বিস্ময়ে পরিণত হয়েছে। শামসুদ্দিন বললেন, বাঙলা সাহিত্যে এ লেখার স্বীকৃতি অনিবার্য। শ্রীযুক্ত রাহা বললেন, আপনি তারাশঙ্করকে চেনেন? অমরেন্দ্র বললেন, না। মানিককে চেনেন? অমরেন্দ্র বললেন, না। আরো কদিন এঁরা এলেন। পরিচয় আরো একটু নিবিড় হল। অধ্যাপক চৌধুরী অমরেন্দ্রের হয়ে সিগণেট প্রেসের মালিক আধুনিক প্রকাশনা শিল্পের পথিকৃৎ দিলীপ গুপ্তের কাছে চিঠি লিখবেন বললেন। এঁরা যেন দায়িত্ব নিতে চাইলেন অমরেন্দ্রের অদৃষ্ট গড়ার। একদিন শামসুদ্দিন আবুল কালামকে একান্তে ডেকে অমরেন্দ্র গোটা পা-ুলিপিটা হাতে দিয়ে অণুরোধ জানালেন, ‘ভাই একটু পড়ে দেখো, এই সাম্প্রদায়িক ঘনঘটায় আমি কিছু ভুল করেছি কিনা’। যতœ করে শামসুদ্দিন পড়ে ফেরত দিলেন পা-ুলিপি। বললেন, ‘আপনার রাজনৈতিক চেতনা সহজ সরল প্রগতিশীল। কোনো ত্রুটি পেলাম না আমি।’ কোলকাতা থেকে চিঠি এলো দিলীপ গুপ্ত নাকি এখানে নেই। আপাতত অমরেন্দ্রের সাহিত্যজীবন নতুন কোনো চেহারা নিলো না। ক্রমে পার্টিশানের চাপ অনিবার্য হয়ে এলো। সাহিত্য গেল তলিয়ে।

দেশভাঙ্গার দুর্যোগ ও সাহিত্য সাধনা[সম্পাদনা]

এমন সময় একদিন অমরেন্দ্রের সাথে দেখা হলো সুবারবন কলেজের সেই ১৯২৭ সালের প্রাক্তন বন্ধু ক্যাপ্টেন হ্যারি অর্থাৎ মাস্টার ব্যানার্জির সঙ্গে। এই হ্যারির সঙ্গেই শেষ পর্যন্ত একদিন অমরেন্দ্র তার অনেক ভালবাসার দেশ পূর্ববাংলা ছাড়লেন। সুমুখে সাহিত্যের কোনো স্বপ্ন নেই। উল্লেখ্য দেশ ছাড়ার পূর্বে তাঁর প্যাঁচেপড়া টাকা কিছু উদ্ধার হয়েছিল। দেশ ছেড়ে কোলকাতার উদ্বাস্তু জীবনে তিন সন্তান ও স্ত্রীসহ পাঁচজনের পরিবার নিয়ে প্রথম দিন-পনর এক আত্মীয়ের রান্না ঘরে কাটালেন। কিন্তু লেখা বন্ধ করেননি ‘দক্ষিণের বিল’। ধুয়ে ধুয়ে খাচ্ছেন হাতের জমা টাকা কটি। স্ত্রীর তাড়ায় ঠিক পনর দিন বাদেই ৩৮ প্রিন্স বক্তিয়ার শা রোডে একটি কোঠায় এসে উঠলেন। ছোট্ট একটি পায়রার খোপ। কল পায়খানা থাকলেও রান্নাঘর নেই। এরই মধ্যে লেখককে হাত দেড়েক চওড়া জায়গায় বসিয়ে দিয়ে স্ত্রী বললেন, ‘তুমি লেখো’। স্ত্রী দেখেন, তার হাতে আর অবশিষ্ট জমা আছে মাত্র পঞ্চাশটি টাকা। পাঁচটি মুখ। রিফিউজিরও অতিথি অভ্যাগত আছে। হ্যারি একটা দোকানঘর ভাড়া করলো। দখল নেয়ার ভার পড়ল অমরেন্দ্রের ওপর। এঘটনা স্বাধীনতা প্রাপ্তির ঠিক পরের কাহিনি যাকে লেখক বলেছেন- ‘আমাদের কলজে-চেরা স্বাধীনতা’। আগস্ট না হলেও সেপ্টেম্বরের প্রথম। ডেকোরেশনের পর মূল ব্যবসা চালাবার আর টাকা নেই হ্যারির কাছে। ফলে একদিন বিছানা গুটিয়ে বাসায় ফিরলেন লেখক অমরেন্দ্র। একবোরে বেকার বসে আছেন। ‘দক্ষিণের বিল’ লেখা শেষ হয়ে গেছে তিনবারের মত। একদিন সংবাদ পেলেন শামসুদ্দীন আবুল কালাম এসেছেন কোলকাতা। লেখক দেখা করলেন। সব শুনে জিজ্ঞাসা করলেন- ‘দক্ষিণের বিল’ কোথায়? চলুন দিলীপ গুপ্তের কাছে নিয়ে যাব’। কথামত কাজ। কিন্তু দিলীপ গুপ্ত এখানে নেই। চললেন ‘বসুমতী’ মাসিক পত্রিকার অফিসে। ধারাবাহিক ছাপা হলে কিছু টাকা পওয়া যাবে। মাসিক ‘বসুমতী’র সম্পাদক প্রাণতোষ ঘটকের সঙ্গে অমরেন্দ্রর এই প্রথম সাক্ষাৎ। অমরেন্দ্রের নিজ ভাষায় রয়েছে এ সাক্ষাতের বিবরণটি: ‘আজ জীবনের যে এত বড় একটা লয় তা বুঝতে পারছিনে। এসেছি টাকার জন্যে, কিছু অর্থ প্রাপ্তি ঘটলেই ধন্য। অর্থের বাইরেও যে একটা পরমার্থ আছে এই পথে, তা এখন আমার অনুভূতির বাইরে। এসেছি মুদীর মন নিয়ে। সব বিকিয়ে দিয়ে কিছু টাকা পেলেই হল। প্রাণতোষ কথা বলছিলেন শামসুদ্দীনের সাথে- ‘লেখা আমাদের পছন্দ হলে ছাপব বই কী! মাশখানেক তো সময় দিতে হবে’। হঠাৎ মাঝখান থেকে আমি বললাম, ‘অত দেরি করা আমার পক্ষে অসম্ভব’।. . . বললেন, তাহলে দু সপ্তাহ বাদে আসুন। . . . দুসপ্তাহ বাদে ফের হাজির। . . শ্রীঘটক জিজ্ঞাসা করলেন, উপন্যাশখানা ছাপব আমরা, কত টাকা চাই? কত চাইতে হয়-না-হয় আমি তো জানিনে। আপনি কি কপিরাইট কিনে নিবেন? প্রাণতোষ হেসে বললেন, না, না- এখানে শুধু ধারাবাহিক বেরুবে, তারপর আর সমস্ত রাইট আপনার। . .কত টাকা চাই বলুন? একটু ভেবে বললাম, আপাতত দু’শ দিলেই চলবে। এক মাসে না যদি সম্ভব হয় দু’মাসে দিন। মৃদু হেসে জিজ্ঞাসা করলেন, দু’শ চাইলেন যে? দুমাস সংসার চলবে। এর ভিতর আর একখানা বই লিখব। তবে খুদে লেখা লিখে চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে গেছে, এক জোড়া চশমা দরকার। প্রাণতোষ আড়াইশ টাকার ব্যবস্থা করে দিলেন। এমাসে দেড়শ, পরের মাসে একশ। এ টাকাকে আমি শুধু অগ্রিম বলে কখনো ধরে নিতে পারিনি- প্রাণতোষ করলেন যেন এক অন্ধকে দৃষ্টিদান। ‘দক্ষিণের বিল’ বসুমতীতে একটা সংখ্যা বেরুন মাত্র আমি প্রতিষ্ঠার গন্ধ পেলাম।’ (জবানবন্দী ২২৯-২৩০)। চশমা কিনে অমরেন্দ্র আবার লিখতে বসলেন। ‘দক্ষিণের বিলে’ যা লিখবেন খণ্ডে খণ্ডে তার মাল মসলা আলাদা করে নিলেন। মনে এলো সন্যাস বড়, না সংসার বড়? তার জবাবে ‘পদ্মদীঘির বেদেনী’তে হাত দিলেন। ‘পদ্মদীঘির বেদেনী’তে ভৈরব সংযম এবং ত্যাগের আদর্শ, ময়না ভোগের- মাতৃত্বের। লিখতে লিখতে নায়িকা ময়নাই বড় হয়ে উঠল। দুমাসে ‘পদ্মদীঘির বেদেনী’ রচনা সারা হল। দুমাস পরে আবার অভাব। আবার শামসুদ্দীনের সাথে দেখা। এবার ‘পদ্মদীঘির বেদেনী’কে নিয়ে ছোটাছুটি। শামসুদ্দীন এবার ‘অগ্রণী’ মাসিকে ব্যবস্থা করে দিলেন ‘পদ্মদীঘির বেদেনী’। প্রতি মাসে পনর টাকা করে পাওয়া যাবে। ঘর ভাড়াটা অন্তত কুলিয়ে যাবে। ‘পদ্মদীঘির বেদেনী’র পরের প্রয়াস ‘মন্থন’ উপন্যাসের জন্য। ‘মন্থন’-এর জন্য বক্তব্য স্থির হলো- ‘এই স্বাধীনতায় হিন্দু মুসলমান জনসাধারণ পেল কী’? ছোট উপন্যাস এক মাস দশ দিনেই লেখা সারা হল। এই সময় একদিন অমরেন্দ্রের সাথে হঠাৎ দেখা তাঁর একসময়ের সাহিত্যগুরু অচিন্ত্য্য্য্যকুমার সেনগুপ্তের সাথে। তিনি তখন একজন মহামান্য হাকিম। অমরেন্দ্র এক নগন্য উদ্বাস্তু। সাতচল্লিশের আকালগ্রস্ত এক ভূঁইফোড় লেখক। সাতচল্লিশের শেষ কিংবা আটচল্লিশের শুরুর দিকে একদিন ‘মন্থন’ উপন্যাশখানা নিয়ে ঘুরছেন অমরেন্দ্র। ভাবছেন, দশ টাকায়ও বিক্রি করে যদি রেশনটা আনা যায়! অনেক সাহস করে একা একাই গেলেন দিলীপকুমার গুপ্তের কাছে। দিলীপ বললেন, ‘মন্থন’ আমরা ছাপলে বাইশ ইম্প্রেশন দেব- দাম হবে আনুমানিক তিন টাকা পার কপি- আপিন পাবেন ন’শো- এডিশন হলে আবার ন’শো। অমরেন্দ্রের কাছে মনে হলো- এ তো টাকা নয়, টাকার পাহাড়। শ্রীগুপ্ত এক রাত্তিরে পা-ুলিপিখানা পড়ে শেষ করলেন। পরের দিন অমরেন্দ্র উপস্থিত। শ্রীগুপ্তের প্রশ্ন- আপাতত কত টাকা চাই? অমরেন্দ্রের যথারীতি উত্তর- ‘দু’শ- দু’মাস বাদে আবার একখানা উপন্যাস নিয়ে আসব।’ দিলীপ গুপ্তের বৈঠকখানায় বসেই দুমাস পরের সে উপন্যাস ‘চড়কাশেম’-এর বহিরেখা নির্দিষ্ট হলো। দুমাসও লাগলো না ‘চড়কাশেম’ লিখতে। কিন্তু এবার আর কিছুতেই সময় করে উঠতে পারেন না শ্রীগুপ্ত। পরে দেখা গেল শ্রীগুপ্ত ‘মন্থন’ও ছাপতে পারছেন না। অনেক দিন পরে অমরেন্দ্র জানতে পারলেন মি. গুপ্ত এ গ্রন্থ ছাপতে পারেন নি, কারণ এ বইয়ের বক্তব্য বাংলার মাটিকে ঘিরে এত বেশি সত্য যে তা নাকি বিশ্বপ্রেমের অন্তরায়। অমরেন্দ্রের আক্ষেপ- ‘জাতির বুকে ছুরি পড়েছে, টুকরো টুকরো হয়ে গেছে বাংলার মাটি। সব জেনে আমি মৃত্তিকার কবি কী করে বিশ্বপ্রেমের স্বপ্ন দেখি?’ (জবানবন্দী ২৪৪)। ১৯৪৯ কিংবা ১৯৫০ সাল। অমরেন্দ্র ‘চড়কাশেম’ এর পা-ুলিপি নিয়ে বসে আছেন। ছেলেমেয়ে ভাত চায়, স্ত্রী বলেন, আর ধার করা চলে না। ক্রমে পুষ্টির অভাবে নেতিয়ে পড়ছে গোটা পরিবার। একদিন কাশির সাথে রক্ত উঠতে লাগল তাজা। লেখক অমরেন্দ্র ভাবলেন, আর দেরি করা চলে না। যে ভাঙন তিনি দেখেছেন তার তো রূপ দেওয়া হল না সাহিত্যে। সমস্ত পরিবারকে উপোসের মুখে রেখে, রক্ত বমি করতে করতে তিনি ধ্যানস্থ হলেন এবং শুরু করলেন ‘ভাঙছে শুধু ভাঙছে’। পূর্ববাংলার ভাঙনের উপকরণে হাত দিলেন। মুখোশ খুলে দিলেন সমস্ত রাজনীতি ও অর্থনীতির। এবার নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় বেঙ্গল পাবলিসারের মনোজদার কাছে নিয়ে গেলেন। ‘পদ্মদীঘির বেদেনী’ প্রকাশের চুক্তি করে বেঙ্গল পাবলিসার ৫০টি টাকা অগ্রিম দিল। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের মাধ্যমেই পরবর্তীতে ‘চড়কাশেম’ প্রকাশিত হলো বুকওয়ার্ল্ড থেকে। ‘পদ্মদীঘির বেদেনী’ ও ‘চড়কাশেম’ একই তারিখে প্রকাশিত হল জমজ ভাইবোনের মত। অমরেন্দ্র বলছেন- ‘রমেশদার বন্ধু দীনেশ দা একদিন কথায় কথায় উচ্চারণ করলেন একটি শব্দগুচ্ছ ‘এ বার্থ অফ এ সঙ’। শব্দটা আমার মনে ধরল। নি¤œ বাঙলার ঢপ কীর্তন কবির পালা আমার ভিতরে ঢোল মৃদঙ্গ খোল মন্দিরা নিয়ে বেজে উঠল। ঈশ্বরাশ্রয়ী সমাজে দেখলাম যারা পুণ্য নাম কীর্তন করে তারাই বঞ্চিত অপাংক্তেয়। দেখলাম কুরূপা গদাইয়ের অপরূপা প্রণয়তৃষ্ণা। লিখলাম ‘একটি সঙ্গীতের জন্ম কাহিনী’।’ (জবানবন্দী ২৫২)। সম্ভবত ১৯৫০ এর শুরুর দিকে অমরেন্দ্র একদিন চাকরির জন্য গিয়েছিলেন এক মাড়োয়ারীর ফার্মে। সাগরময় ঘোষ, মন্মথ স্যান্যাল প্রমুখের সুপারিশসহ। যখন পৌঁছালেন তখন দুটো, পাঁচটায় জানা যাবে চাকরি হলো কিনা। তেতলায় বসে আছেন। দেখলেন বৈশাখের দ্বিপ্রহরে একটা জীর্ণ পরিত্যক্ত বাড়ির আঙ্গিনায় ‘বেআইনি জনতা’ প্রবেশ করছে। অন্ধ-খঞ্জ-জুতোপালিশ-ভিখারী-বেকার। আছে সুন্দরী যাযাবর, রয়েছে বলিষ্ঠ জোয়ান। শিল্পী আছে, গায়ক আছে, আছে রঙ্গিন কিন্তু ছেঁড়া ঘাগরা পরা মধুয়ালী। এঁরা সব জড়িয়ে সমাজের একটা শক্তির উৎস। মাথা গোজার ঠাঁই চায়। কিন্তু এত হর্ম্যমালার মাঝেও এদের তৈজসপত্রটুকু রাখার স্থান নেই। তুমুল ঝগড়া হল, কার যেন হারিয়ে গেছে বাঁশের বাঁশিটা। অমরেন্দ্র দেখলেন খঞ্জের দৃষ্টি এবং অন্ধের শক্তির অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে। সাময়িক একটা সংসার সাজালো দুজনে। এরা নারী-পুরুষ। অমরেন্দ্র অনুভব করলেন এদের প্রাণকামনার সঙ্গে গর্ভ সঞ্চার হয় বেআইনি স্থানে- ভূমিষ্ঠ হয় মানবশিশু পিতৃপরিচয়হীন। সমাজ তাকে বলে জারজ, তখন বেআইনি মাতা বুকে তুলে হয়ত দুধ দেয়, ঘন ঘন খায় চুমো। এভাবেই বাস্তবের সঙ্গে কল্পনা মিশে গেল। একখানা উপন্যাসের কাঠামো খাড়া হল। নাম হলো ‘বে-আইনি জনতা’। অমরেন্দ্রের সামনে তার বন্ধু রবীন মিত্র একদিন বললেন, ‘চার্লি চ্যাপলিনের নিজের ডিরেকশনে দি গ্রেট ডিকটেটর যখন বক্তৃতা দিলো, হুবহু যেন হিটলার- তার মুদ্রাদোষগুলো পর্যন্ত নিখুঁত তুলেছে চার্লি- এসব সিরিও কমিকের কল্পনা আমাদের দেশের পর্দায় এখনো এক শ বছর দেরি।’ কথাটি অমরেন্দ্রকে নাড়িয়ে দিল। পর্দায় দেরি থাক অমরেন্দ্র নাটকের আকারে লেখার চেষ্টায় অবতীর্ণ হলেন। ঠিক পনর দিনে লিখে ফেললেন ‘এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ’। পরে একদিন তাঁর বান্ধবী শৈলজা চৌধুরীর কণ্ঠে একটি গান শুনছিলেন- ‘রোদন ভরা এ বসন্ত’। ‘এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ’ এর কাহিনিকে মনে হলো ‘রোদন ভরা এ বসন্ত’ই বটে। নাটক ‘এমপ্লয়মেনন্ট এক্সচেঞ্জ’ রূপান্তরিত হলো ‘রোদন ভরা এ বসন্ত’ উপন্যাসে।

খ্যাতির দর্শনলাভ[সম্পাদনা]

মাড়োয়ারী ফার্মের চাকরিটা অমরেন্দ্রের হয়েছিল। তবে কয়েক মাসেই ফার্মটা উঠে গেল। চাকরি শেষ। সম্ভবত এ ঘটনা ১৯৫০ এর একদম শুরুতে। এই চাকরি যাওয়ার পরে ধরলেন দালালি। এজেন্ট পি.সি. চক্রবর্তীর মাধ্যমে চালান পাস করেন। লক্ষ লক্ষ টাকার চালান। রাত চারটায় ঘুম থেকে ওঠেন। ইনসমনিয়া তখনো শুরু হয়নি। ভোর পাঁচটায় লিখতে বসেন ‘জোটের মহল’। ‘জোটের মহল’-এ দেখাতে চেষ্টা করছেন, মানুষ বিপন্ন হলেই একতাবদ্ধ হয়ে চলে, সংগ্রাম করে হাতে হাত মিলিয়ে। এর জন্য কোনো পার্টির প্রেরণা অনিবার্য নয়। সকাল সাড়ে সাতটায় কোনো রকমে চারটা মুখে দিয়ে দৌড় আর দৌড়। সারাদিন কাস্টমস হাউস, চিৎপুর শিয়ালদা রেলইয়ার্ড অথবা জগন্নাথঘাট। পি সি চক্রবর্তী সকলের কাছে কমিশনের হিসাবে নেন কড়া, শুধু অমরেন্দ্রের কাছেই একটু শিথিল। বিনয় ঘোষ যোগাযোগ করিয়ে দিলেন কমলা বুক ডিপোর সঙ্গে। কমলা বুক ডিপো ‘ভাঙছে শুধু ভাঙছে’ ও ‘বেআইনি জনতা’ প্রকাশের দায়িত্ব নিল। মাসিক একশ করে দেড় হাজার টাকা দিয়ে গেলেন। এখানে কপিরাইট নয়, প্রথম প্রকাশের মাত্র চুক্তি। অথচ কয়েকদিন আগে লেখক এক কবি পাবলিসারের কাছে ‘ভাঙছে শুধু ভাঙছে’ এর কপিরাইট বেচতে গিয়েছিলেন মাত্র একশ টাকায়, পাবলিসার তাও গছেনি। ‘চড়কাশেম’ ও ‘পদ্মদীঘির বেদেনী’ প্রকাশের ছমাস পর একটা লাল সালুতে মীরা কেমিকেলসের গেটে লেখা হলো ‘অমরেন্দ্র ঘোষ সংবর্ধনা’। একুশে শ্রাবণ ১৩৫৭ (১৯৫১?) অমরেন্দ্র ঘোষের সংবর্ধনা সভা। সভাপতি শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রধান অতিথি মনোজ বসু। শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় সভাপতির ভাষণে বলেছিলেন, যদি খনিগর্ভ থেকে মণি তুলতে পেরে থাকেন অমরেন্দ্র ঘোষ, তবে সংবর্ধনা জানাতে আপত্তি কি? কাজী আব্দুল ওদুদের সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় অন্যত্র লিখেছেন- ‘শরৎচন্দ্র তাঁহার মৃত্যুর পূর্বে মুসলমান সমাজের ওপর ভিত্তি করিয়া যে নতুন ধরনের উপন্যাস রচনার প্রতিশ্রুতি দিয়াছিলেন সেই প্রতিশ্রুতি অমরেন্দ্র ঘোষের এই উপন্যাসে পালিত হইয়াছে। . . . তাঁহার ‘কুসুমের স্মৃতি’ নামে ছোট গল্প সংগ্রহের মধ্যেও তাঁহার শিল্পবোধ, সাঙ্কেতিক পরিম-ল রচনা ও আঙ্গিক বিন্যাস-নৈপুণ্যের নিদর্শন সুপরিস্ফুট। . . . উপন্যাসে যিনি একাগ্রভাবে সমাজনীতি রাষ্ট্রব্যবস্থা বিশ্লেষণে তৎপর, ছোটগল্পে আবার তিনিই স্বপ্নাবিষ্ট, সৌন্দর্য ধ্যানমগ্ন, ভাবতন্ময়।’ (জবানবন্দী ২৭১)। সংবর্ধনায় আরো বক্তৃতা করলেন নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, কবিশেখর কালিদাস রায়, অতুলচন্দ্র গুপ্ত, বাণী রায় ও মনোজ বসু। অনুষ্ঠান শেষে পাঁচশো পঁয়ত্রিশ টাকার একটি তোড়া হাতে পেলেন অমরেন্দ্র। ১৯৫৮ সালে টালিগঞ্জে দ্বিতীয়বার সংবর্ধনা হল অমরেন্দ্রের। এ উপলক্ষে মুখ্যমন্ত্রী বিধান রায় চ্যারিটি শো’র জন্য ‘পথের পাঁচালী’ দিয়েছিলেন। এবার অনুষ্ঠানের সভাপতি অচিন্ত্য্য্য্যকুমার সেনগুপ্ত। সেবারে অমরেন্দ্র চেক পেলেন পাঁচশো এক টাকার। এই সকল প্রাপ্তির প্রতিক্রিয়ায় অমরেন্দ্র লিখেছেন- ‘১৩৫০ এর দুর্ভিক্ষে আমি পূর্ববাঙলায় বসে গোলা কেটে ধান দিয়েছিলাম, প্রত্যেকের কাছে প্রতিশ্রুতি আদায় করে রেখেছিলাম, যখন শস্য উঠবে তখন তারা আমায় ষোলআনা ফিরিয়ে দিবে। কিন্তু কেহ সে প্রতিশ্রুতি পালন করেনি। পরবর্তীকালে পশ্চিম বাঙলায় ভিক্ষাভা- হাতে নিয়ে এলাম, তা বহুর আশীর্বাদে পূর্ণ হলো।’ (জবানবন্দী ২৮২)। এ আশীর্বাদ শুধু অর্থসাহায্যে নয়, এ আশীর্বাদ ছিল অমরেন্দ্রের সর্বৈব হিতৈষণায় ও কল্যাণ কামনায়। ১৯৫০ সালে সজনীকান্ত দাস, বাণী রায়, দেবপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, সাগরময় ঘোষ প্রমুখ গুণী ব্যক্তিবর্র্গ যৌথভাবে পার্লামেন্টারি সেক্রেটারি নিশাপাতি মাঝির নিকট সুপারিশ করেন অমরেন্দ্রের একটি চাকুরির জন্য। ফলশ্রুতিতে অমরেন্দ্র ১৯৫০ সালে গভর্নমেন্ট রেশন স্টোরের ম্যানেজার পদে চাকরি লাভ করেন। রেশন স্টোরের ফার্স্ট গ্রেড আদিত্য চক্রবর্তীর ওপর স্টোরের ভার দিয়ে তিনি লিখে চলেন উপন্যাস ‘কনকপুরের কবি’। নায়িকা জয়ন্তীরাণী। কবি বিমলচন্দ্র ঘোষের একটি বিখ্যাত কবিতার নির্যাস রয়েছে এ উপন্যাসের আদিগন্ত জোড়া। ১৯৫৩ সালে অসুস্থতার কারণে অমরেন্দ্র রেশন স্টোরের ম্যানেজারের চাকুরি থেকে বিদায় নিতে বাধ্য হন। পরবর্তীতে ‘কাব্য জিজ্ঞাসা’র লেখক অতুলচন্দ্র গুপ্ত কোলকাতার সাবেক মেয়র শ্রী সতীশ চন্দ্র ঘোষকে অমরেন্দ্র ঘোষের প্রতি সাহায্যের হাত প্রসারিত করণার্থে এক চিঠিতে লিখলেন - My acquaintance with him is in connection with literary activities. In fact I noticed one of his novels in public press, as it struck me as a genuine piece of literary work. It will be a loss to the country if he is compelled to stop writing owing to poverty (জ. ১৫৫)। এছাড়া রামপরায়ণ. রমেশচন্দ্র, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, শামসুদ্দীন আবুল কালাম, মুজাফফর আহমদ এমন অজ¯্র বন্ধু হিতৈষী তো অমরেন্দ্রের শেষ জীবনে বন্ধুত্বের ও সৌজন্যের প্রচারযোগ্য উদাহরণ। এরাই শেষ নয়। এদের সাথে ডাক্তারদের নামও সমানভাবে স্মরণযোগ্য। ১৯৫৪ সাল থেকেই অমরেন্দ্র মরণাপন্ন রকমের অসুস্থ। ১৯৫৪ই বা বলি কেন, অমরেন্দ্র অসুস্থ তো আরো অনেক কাল আগে থেকেই। বিয়ের পরে ১৯২৬ সালে দেওঘরে হাওয়া বদল থেকেই তো এর শুরু। এরপর ১৯৩২ সালে চিকিৎসার জন্য পাটনায় ছিলেন অনেকদিন মামা শ্বশুড় নগেন্দ্রনাথ ঘোষ দস্তিদারের বাসায়। সেখানে অনেক বড় বড় চিকিৎসককে দেখানো হয়েছিল। ডাক্তাররা একসঙ্গে রায় দিলেন অমরেন্দ্র আর বড় জোর ছ’মাস বাঁচবে। ১৯৫৮ সালে অমরেন্দ্র লিখেছেন ‘ছমাসের পরমায়ু নিয়ে এসে প্রায় ছত্রিশ বছর কাটিয়ে দিলাম। কেবল খাই-সোডার বদৌলতেই পঁচিশ বছর।. . . যুদ্ধের বাজারে যে যা পুঁজি করুক, আমি হাটে বন্দরে বেনে দোকানে পাগল হয়ে খুঁজে ফিরেছি, আছে নাকি খাই-সোডা? কী কষ্টে যে জোগাড় করেছিলাম আধমণ সোডি-বাই-কার্ব সেই অজ গ-গ্রামে বসে!’ (জ. ১৯৬-৯৭)। ১৯৩২ সাল থেকে এই মরণাপন্নতা অমরেন্দ্রের জীবনে। এই রোগের সাথে লড়তে অনেক ডাক্তার স্বজনের চেয়েও স্বজন হয়ে দাঁড়িয়েছে অমরেন্দ্রের পাশে। ১৯৫০ সালে অমরেন্দ্রের করুণ দারিদ্র্যের দিনে ডা. সন্তোষ পাল চিকিৎসা চালিয়েছেন বাকিতে। ৭/২ ডব্লিউ জামির লেনের ডা. প্রফুল্ল কুমার চৌধুরী একইভাবে চিকিৎসা দিয়েছেন, টাকাপয়সা নেননি। ১৯৫৬-৫৭ সালে যখন তিনি ভয়াবহ রকম অসুস্থ, সমস্ত পাঁজড়ার সুমুখ দিকটায় খিচুনিতে হাড় এবং মাংসপেশীগুলো ধনুকের মতে বেঁকে যাচ্ছে- ইনসমনিয়ায় সারারাত কাটাতে হচ্ছে কোলকাতার রাস্তায় রাস্তায় কুকুর দাবড়িয়ে- ঊর্ধগতি পেটের বায়ু হৃদপি-টিকে খামচে ধরার চেষ্টা করছে- তখনও এই বিপন্ন মানুষটির পক্ষে লড়তে ডাক্তারদের সাথে সাথে নেমে আসলেন আরো অনেকে। এগিয়ে আসলেন কোলকাতা ট্রপিকাল স্কুল অব মেডিসিনের ডিরেক্টর ডা. আর. এন. চৌধুরী। সাথে আসলেন অনেক সুশীলজন- অধ্যাপক দিলীপ গুপ্ত, মাকালপুরের ভবানী সিংহ, রানাঘাটের অরবিন্দ ঘোষ, রমেশ চন্দ্র, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব বসু, মুজাফফর আহমদসহ আরো অনেকে। চিকিৎসার জন্য খোলা হলো ‘অমরেন্দ্র ঘোষ তহবিল’। আশীর্বাদ এমন বহুল পথে যত বহুই হোক তা দ্বারা আশীর্বাদিত অমরেন্দ্রের যন্ত্রণার বহুত্ব বিমোচন সম্ভব হয় না। কীর্তিতে অমর হলেও কায়ায় মরণশীল অমরেন্দ্র দিন দিন আগাতে থাকেন গন্তব্য মরণধামের দিকে। শেষ পর্যন্ত ১৯৬২ সালের ১৪ জানুয়ারি ‘ভাঙছে শুধু ভাঙছে’র লেখক অমরেন্দ্র বাঁচার তীব্র লড়াইয়ের রণে ভঙ্গ দিয়ে ভেঙ্গে পড়লেন মৃত্যুর কোলে। গোটা এক জীবন শুধু ভাঙনের গান শোনা এই শিল্পী তাঁর লেখনিতে তুলে আনার জন্য ভাঙনের সুর ছাড়া আর কিছু পাননি। তবে সে ভাঙনকে শিল্পরূপে ধারণ করতে তাঁর তাত্ত্বিক আশ্রয় অন্য অনেকের মতোই মার্কসিজম। যদিও সে মার্কসিজম বিশুদ্ধ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মার্কসিজম নয়। মার্কসিজমের ছায়ায় তাঁর গল্প উপন্যাসগুলো দেখিয়েছে- সভ্যতা ভাঙে অসম বণ্টনে। সে অসম বণ্টন শুধু অর্থের নয়। অর্থের সাথে সাথে সে অসম বণ্টন মনের এবং সে অসম বণ্টন ভূমি ব্যবস্থার। এই অসম বণ্টনের প্রতিবাদের পথে ছিলেন বলেই বাম পন্থাই তাঁর পথ। তাঁর জনতা এই পথেই এগিয়ে চলে। ‘দক্ষিণের বিল’-এ সে জনতা প্রকৃতির সাথে সংগ্রামশীল, ‘চড়কাশেম’-এ তাদের উপোসী কণ্ঠে প্রতিবাদ, ‘বে-আইনি জনতা’য় তারা তথাকথিত আইন ভঙ্গকারী, ‘জোটের মহলে’ তারা পূর্ণ বিপ্লবী। ‘ভাঙছে শুধু ভাঙছে’তে তারা মৃত্যুপথে শয়তানির মুখোশ উন্মোচনকারী, আর ‘কলেজ স্ট্রীটে অশ্রু’তে নায়ক নিতাইয়ের চোখের কান্নিকের ইঙ্গিতে তারা সমাজের অনেক গোপন তথ্যের ফাঁসকারী। এই তারা যদি আমরা হই তাহলেই অমরেন্দ্রের সৃষ্টিকর্ম আমাদের জীবনের চিরপ্রাসঙ্গিক সাহিত্য।

গ্রন্থপরিচিতি[সম্পাদনা]

উপন্যাস ১. চড়কাশেম (বুকওয়ার্ল্ড, ৫ হেস্টিংস স্ট্রিট, কোলকাতা, আশ্বিন ১৩৫৬) ‘চড়কাশেম’-এর বহিরেখা নির্দিষ্ট হয় সিগণেট প্রেসের মালিক দিলীপ গুপ্তের সম্মুখে যেদিন শ্রীগুপ্ত ‘মন্থন’ উপন্যাশখানা ছাপার জন্য কবুল করেন এবং অমরেন্দ্রকে সে-বাবদ দু’শ টাকা অগ্রিম দেন। অমরেন্দ্র বললেন, শ্রীগুপ্ত একান্ত হয়ে শুনলেন। ভূমিহীন একদল হিন্দুমুসলমান জেলেকৃষাণের অভিযান। রূপক কিন্তু ইতিহাস আশ্রয়ী। এ অন্ধকারের ইতিবৃত্ত নয়, জীবন্ত বলিষ্ঠ মানুষের সংগ্রামের কাহিনি। ওরা যুগযুগ ধরে বাঁচতে চায়, কিন্তু সে বাঁচার সংগ্রামে এ্যাটম বমের মত অন্তরায় সৃষ্টি করে দুর্ভিক্ষ। ওরা প্রতিবাদ করে বাঁচে। ছিয়াত্তর, তেরশ পঞ্চাশের মন্বন্তর নির্মূল করতে পারে না ওদের প্রাণকামনাকে। এই হলো ‘চড়কাশেম’-এর বক্তব্যের সারাৎসার। ১৯৪৯ সালে এটি লিখিত হয় (দীপংকর ঘোষ ৮)। সরোজ দত্ত ‘পরিচয়’তে লিখেছিলেন ‘চড়কাশেম’ পড়ে কোথায় যেন পুরো জনতা দাঙ্গা বিরোধী মনোভাবে জাগ্রত হয়েছিল। ‘চড়কাশেম’ ও ‘পদ্মদীঘির বেদেনী’ প্রকাশিত হওয়ার পরে সাহিত্যাঙ্গণে লেখক অমরেন্দ্রের যে মূল্যায়ন বহুমুখে উচ্চারিত হয় তার ভিত্তিতে বিজয় ব্যানার্জী এনসাইক্লোপিডিয়া অব ইনফরমেশন গণ্থে ‘লিটারেচার ইন ১৯৫০’ এনিট্রতে নিচের কথাগুলো লেখেন: : But most powerful and objective type of fiction, and yet romantic, produced in the recent time in Bengali are those of Amarendra Ghosh. His outstanding works are ‘Charkashem’ and Padmadighir Bedidni’. His ‘Dakshiner Bil’ which is being published in Basumati has the qualities of an epic and yet different in treatment compared with the other two books. ২. পদ্মদীঘির বেদেনী (বেঙ্গল পাবলিশার্স, ১৪ বঙ্কিম চাটুজ্যে স্ট্রীট, কোলকাতা, আশ্বিন ১৩৫৬) ১৯৪৮ সালে ‘পদ্মদীঘির বেদেনী’ কেবলমাত্র একটি অধ্যায় মাসিক ‘অগ্রণী’তে প্রকাশিত হলে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় অমরেন্দ্রকে বুকে জড়িয়ে ধরে স্বাগতম জানিয়েছিলেন বাংলা সাহিত্যে। বলেছিলেন ‘আপনার ‘পদ্মদীঘির বেদেনী’ পড়ে আশ্চর্য হলাম’। লেখক হাওয়া বদলে দেওঘরে থাকাকালীন নন্দলালের পিসিমার যে ¯েœহের ডাক পেয়েছিলেন ‘পদ্মদীঘির বেদেনী’র ময়নার মর্ম থেকে লেখক বের করেছেন সেই ¯েœহের ডাক। সন্তান ¯েœহে চিরবঞ্চিতা পূর্ণযুবতী বিধবা ময়না বয়সী ছেলে নয়নকে বুকে জড়িয়ে ধরে মন্ত্রজাগা দুর্যোগের রাত্রে ডাকছে ‘তুইতো হামার গোপাল আছিস’। এই ময়নার চরিত্রের মাধ্যমে লেখক তুলে ধরলেন- সন্যাস বড়, না সংসার বড়? উপন্যাসের নায়ক ভৈরব সংযম এবং ত্যাগের আদর্শ, নায়িকা ময়না ভোগের- মাতৃত্বের। লিখতে লিখতে নায়িকা ময়নাই বড় হয়ে উঠল। পরবর্তীতে বই আকারে প্রকাশিত হওয়ার পরে ‘চড়কাশেম’ ও ‘পদ্মদীঘির বেদেনী’র দুই কপি নিয়ে লেখক একদিন দুরুদুরু বুকে গেলেন ব্রিটিশ আমলের আইসিএস অন্নদাশঙ্করের বাড়ি। ‘চড়কাশেম’ পড়ে অন্নদাশঙ্করের স্ত্রী লীলা রায় অমরেন্দ্র সম্পর্কে বলেছিলেন- His return is an event in Bangla literature. ৩. দক্ষিণের বিল (১ম খ-: গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এ্যন্ড সন্স, ২০৩/১/১ কর্ণওয়লিস স্ট্রীট, কোলকাতা, ১৩৫৭; ২য় খ-: গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এ্যন্ড সন্স, আশ্বিন ১৩৬০; ৩য় খ-: অপ্রকাশিত) ‘দক্ষিণের বিল’ অমরেন্দ্রের লিখিত প্রথম উপন্যাস, তবে বই আকারে প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস নয়। এ উপন্যাস কৃষক অমরেন্দ্রের প্রজন্ম পরম্পরার ইতিহাস এবং একই সাথে বাংলা সাহিত্যে দক্ষিণ বাংলার কাদা মাটি জলের মাটির-মানুষগুলোর প্রথম উপন্যাসীকৃত রূপ। ১৯৫১ সালে এই গ্রন্থ ছাপানোর জন্য গেলে স্বনামধন্য প্রকাশক বলেছিলেন- ‘এত মোটা এক নামে কি একখানা কেউ বই লেখে, যার আছে ন্যূনতম কমার্শিয়াল কা-জ্ঞান!’ (জবানবন্দী ৭)। উক্ত প্রকাশকের কেরানি আরো বলেছিলেন- ‘এবার থেকে ফর্মা হিসেব করে লিখবেন, নইলে প্রকাশে অসুবিধে। বারো চৌদ্দ ফর্মাই যখেষ্ট। সেই একই তো কথা, বেশি ফেনিয়ে লাভ কি!’ এ জ্ঞানবাণী শুনছিলেন আর অমরেন্দ্র উপলব্ধি করছিলেন জীবন কতো কান্নার ও করুণার। উপন্যাসের নায়ক বিপ্রপদ সেকালের প্রতিভূমূলক চরিত্র। নায়িকা কমলকামিনীও। লেখক তাঁর পিতা ও মাতাকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেই এ উপন্যাসের কম্পাস ঘুরিয়েছেন। এ উপন্যাস পড়লে উপলব্ধি হবে সেকালের ও একালের সমাজআদর্শে কত পার্থক্য। তখন মানুষ ছিল আদর্শবাদে বিশ্বাসী। এখন জীবনবাদে। ‘দক্ষিণের বিল’ কে আদর্শবাদ থেকে হিউম্যানিজমে পৌঁছানোর লক্ষ্যে- ‘সর্বকালের সবমানুষের শেষ ঠিকানা’য় পৌঁছানোর জন্য লেখকের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু প্রকাশক এভাবে আকারের কারণে তাঁকে আটকে দিলেন। এ উপন্যাস ১৯৪৮ থেকে মাসিক ‘বসুমতী’ পত্রিকায় বের হয়েছে। উল্লেখ্য ‘একটি স্মরণীয় রাত্রি’ উপন্যাসে প্রদত্ত অমরেন্দ্রের গ্রন্থ তালিকায় দক্ষিণের বিল ৩য় খ-ের উল্লেখ থাকলেও এই খ- আদৌ কখনো প্রকাশিত হয়েছে কিনা আমাদের কাছে এ মর্মে কোনো তথ্য নেই। ৪. ভাঙছে শুধু ভাঙছে (কমলা বুক ডিপো, ১৫ বঙ্কিম চাটুজ্যে স্ট্রিট, কোলকাতা, জ্যৈণ্ঠ ১৩৫৮) পূর্ববাংলার ভাঙনের উপকরণে তৈরী উপন্যাস ‘ভাঙছে শুধু ভাঙছে’। এ উপন্যাসে মুখোশ খুলে দেয়া হয়েছে পূর্ববাংলাকে ঘিরে গড়ে ওঠা তৎকালীন সমস্ত রাজনীতি ও অর্থনীতির। প্রথম বার লেখা শেষে লেখকের মনে হয়েছিল বেশ একটু শিথিল হয়ে গেছে ভিতরের বাঁধন। আবার শুরু করলেন লেখা। এবার পচিশ দিনে শেষ করলেন। ‘ভাঙছে শুধু ভাঙছে’তে একে একে আত্মাহুতি দিয়েছে ঊর্বশী, মাধবী, চাঁপা, ঊর্মিলা। দেশ বিভাগের দাউ দাউ শিখায় পুড়ে গেছে গ্রন্থ গীতা। মহীয়সী বুঢ়া আম্মা তা রুখতে পারেননি। শেষ হয়ে গেছে পূর্ব বাংলার ঐতিহ্য। হিন্দু মুসলমানের মিলিত সংস্কৃতি। এ. কে. ব্যানার্জি বলেছেন- ‘ভাঙছে শুধু ভাঙছে’ হচ্ছে সমকালের ঐতিহাসিক দলিল- more realistic । নিজে পার্টিশনের শিকার হয়ে কি করে যে অমন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বই লিখলেন।’ একদা অচিন্ত্য্য্য্যকুমার ‘ভাঙছে শুধু ভাঙছে’র পা-ুলিপি পড়ে লেখককে দু’খানা সপ্রশংস চিঠি লিখেছিলেন। ৫. একটি সঙ্গীতের জন্ম কাহিনী (ডি.এম. লাইব্রেরি, ৪২ কর্ণওয়ালিস স্ট্রিট, কোলকাতা, ১৯৫১) ১৯৫০ এর দিকে একদিন লেখকের ঘনিষ্ঠজন রমেশদার বন্ধু দীনেশ দা কথায় কথায় উচ্চারণ করলেন একটি শব্দগুচ্ছ ‘এ বার্থ অফ এ সঙ’। শব্দটা লেখকের মনে ধরল। নি¤œ বাঙলার ঢপ কীর্তন কবির পালা লেখকের ভিতরে ঢোল মৃদঙ্গ খোল মন্দিরা নিয়ে বেজে উঠল। লিখলেন ‘একটি সঙ্গীতের জন্ম কাহিনী’। কাহিনিতে করুণভাবে ফুটে উঠলো ঈশ্বরাশ্রয়ী সমাজে যারা পুণ্য নাম কীর্তন করে তারাই বঞ্চিত ও অপাংক্তেয় থাকে। ৬. বেআইনি জনতা (কমলা বুক ডিপো, ১৫ বঙ্কিম চাটুজ্যে স্ট্রিট, কোলকাতা, ১৩৫৮) যেমনটা ওপরে আলোচিত হয়েছে, এক মাড়োয়ারীর ফার্মের তেতলা থেকে দেখা এক ‘বেআইনি জনতা’র দৃশ্য থেকে এ উপন্যাসের জন্ম। তারা বে-আইনি জনতা কারণ তারা উদ্বাস্তু এবং তারা বাস্তুওয়ালাদের জীবনের জন্য উৎপাত। সমাজের আইনে এরা বে-আইনি হলেও প্রকৃতির আইনে এরা কতখানি মানুষ তা প্রদর্শনই উপন্যাসের মূল বিষয়বস্তু। সেই প্রদর্শনে এ উপন্যাসে যে বিদ্রƒপের ঝাঁঝ আছে অমরেন্দ্রের শিল্পকর্মে সেই ঝাঁঝ জন্ম নেয়ার পেছনে আছে আরেকটি কাহিনি রয়েছে। অমরেন্দ্র তাঁর গল্প-উপন্যাসের বিদগ্ধ মূল্যায়নের লক্ষে একসময় যাতায়াত শুরু করেছিলেন মোহিতলাল মজুমদারের দরবারে। মোহিতলালের যা স্বভাব, সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে নিজের রচনারই আবৃত্তি আর নিজের প্রশস্তি। একদিন সাহস করে অমরেন্দ্র বললেন, রোজ আপনার লেখা শুনি, আমাদের লেখা শুনবেন না? একটু থতমত খেয়ে গেলেন মোহিতলাল। তিনি ছাড়া এখানে যে আর কেউ মাথা তুলে কোনো অধিকার দাবি করতে পারে তা তার জানা ছিলনা। বললেন, লেখা এনেছেন, বেশ তাড়াতাড়ি পড়–ন। অমরেন্দ্র ‘কসাই’ গল্পটি পড়লেন। মোহিতলাল বললেন, এমন গল্প কি কেউ লেখে? ছি! ছি! উল্লেখ্য গল্পের নায়ক কুট্টি শুধু মুসলমান নয়, একেবারে চাবুক খাওয়া নিচু তলার মানুষ। মাংসে বীতস্পৃহ, কিন্তু ভাগ্যদোষে কসাই। দিয়েছিল একখানা মাংসের দোকান অনেক ঘাম ঝরিয়ে, তাও ধূলিসাৎ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায়। ‘কষ্টিপাথরের মত কালো মোহিতলালের’ মূল্যায়নের কষ্টিপাথরে এ গল্প অতিমাত্রায় মুসলমানী, সুতরাং ছি! ছি! মোহিতলালের আঘাতে প্রতিজ্ঞা নিয়ে তাঁকে শিক্ষা প্রদানের মানসে ঝাঁঝসমৃদ্ধ এই গল্পটি ব্যবহৃত হলো ‘বেআইনি জনতা’র বীজ হিসেবে। ৭. কনকপুরের কবি (ডি.এম. লাইব্রেরি, ৪২ কর্ণওয়ালিস স্ট্রিট, কোলকাতা, ১৩৬০) ‘কনকপুরের কবি’ বাস্তবধর্মী উপন্যাসের কাঠামোতে একখানা সাবজেক্টিভ ধারার রোমান্টিক উপন্যাস। ‘কিন্তু যাকে বলা হয় স্ত্রী-পাঠ্য আদৌ তা নয়’। রেশন স্টোরের ফার্স্ট গ্রেড আদিত্য চক্রবর্তীর ওপর স্টোরের ভার দিয়ে অমরেন্দ্র লিখেছিলেন এ উপন্যাস। কবি বিমলচন্দ্র ঘোষের একটি বিখ্যাত কবিতার নির্যাস রয়েছে এ উপন্যাসের আদিগন্ত জোড়া। রোমান্টিক হলেও সমগ্র সমাজের আদ্যোপান্ত কাহিনি মার্কসীয় দৃষ্টিতে বিশ্লেষিত। এক ফোঁটা চোখের জলও। প্রেম এখানে গৌণ- বঞ্চনা ও বৈষম্য হচ্ছে মুখ্য। প্রকাশক বিরাম মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন- ‘বইখানা তো হাফফিনিসড।. . . নায়ক কবির অনুভূতি এলো, সে ভাব বিপ্লব করলো- কর্মবিপ্লব ব্যতীত সার্থকতা এবং সংগতি রক্ষা হয় না যে!’ এই বললেন এবং উপন্যাসটি ছাপলেন না। অবশেষে শ্রী গোপালদাস মজুমদার উপন্যাসটি ছাপলেন। টেন পার্সেন্ট রয়াল্টিতে। অধ্যাপক কবি মাখনলাল মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন এটি অমরেন্দ্রের শ্রেষ্ঠ রচনা। এ বইটি সত্যেন সরকারকে উৎসর্গীকৃত যিনি অমরেন্দ্রকে ১৯৫৮ সালে ট্রপিকাল স্কুল অব মেডিসিনে ভর্তি করিয়েছিলেন। ৮. জোটের মহল (ডি.এম. লাইব্রেরি, ৪২ কর্ণওয়ালিস স্ট্রিট, কোলকাতা, ১৩৬১) ‘জোটের মহল’এর নায়ক দিবাকর এক বিপ্লবী বিদ্রোহী নেতা। জোটের মহল এর বিদ্রোহিনী মুক্তা লেখকের দেখা একটি বলিষ্ঠ নারী চরিত্রের রূপ। ৯. মন্থন (নবভারতী, ৫ শ্যামাচরণ দে স্ট্রিট, কোলকাতা, ১৯৫৪) ‘পদ্মদীঘির বেদেনী’র পরে লেখকের প্রয়াস মন্থন উপন্যাস। এ উপন্যাসের বক্তব্য- বৃটিশ থেকে স্বাধীনতায় হিন্দু মুসলমান জনসাধারণ কী পেল? ছোট উপন্যাস এক মাস দশ দিনেই লেখা শেষ হয়েছিল। যেমনটা পূর্বেই বলা হয়েছে, বিখ্যাত প্রকাশক দিলীপ গুপ্ত ‘মন্থন’ ছাপার জন্য লেখককে টাকা দিয়েও গ্রন্থটি ছাপেননি, কারণ এ বইয়ের বক্তব্য বাংলার মাটিকে ঘিরে এত সত্য যে তা বড় বড় রাজনীতিকদের বিশ্লেষিত বিশ্বপ্রেমের ধারণার অন্তরায় বোধ হয়েছে। লেখক অমরেন্দ্র দুঃখ করে বলেছেন- জাতির বুকে ছুরি পড়েছে, টুকরো টুকরো হয়ে গেছে বাংলার মাটি, সব জেনে আমি মৃত্তিকার কবি কী করে বিশ্বপ্রেমের স্বপ্ন দেখি? ১০. অহল্যাকন্যা (এস ব্যানার্জি এ্যান্ড কোং, ৬ রমানাথ মজুমদার স্ট্রিট, কোলকাতা, ১৩৬২) ১১. কলেজ স্ট্রীটে অশ্রু (শ্রীগুরু লাইব্রেরি, ২০৪ কর্ণওয়ালিস স্ট্রিট, কোলকাতা, ১৩৬৪) একদিন রামপরায়ণের আসরে বসে দীপ্তেন্দ্রকুমার সান্যাল একটা শব্দ উচ্চারণ করলেন- নছোল্লা। খানিকটা ককেট্রির শামিল অর্থবোধক পূর্ববাংলার শব্দ। ‘কলেজ স্ট্রীটে অশ্রু’র নায়িকা অশ্রু অমনি এলো নছোল্লার ভঙ্গি নিয়ে অমরেন্দ্রের কল্পলোকে। শিল্পী জীবনের লাঞ্ছনা নিয়ে এ উপন্যাস। হাসলেও জ্বলুনি এর স্টাইলে। কমলাকান্তের দপ্তর এবং বার্ণার্ড শ’ এর স্টাইল মডেল। লেখক প্রকাশক পাঠক- এই তিন রাজ্যের চিত্র এ উপন্যাস। ভেতরে আছে অমরেন্দ্রের ব্যক্তিগত জীবনে এক বড় শিল্পী কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হওয়ার মর্মান্তিক কোড়ার জখম ও রক্ত। ১৯৫৬ সালের পূজায় এটি বেরিয়েছিল গল্প আকারে। এরপরে উপন্যাসে রূপান্তরিত। ১২. ঠিকানা বদল (বাকসাহিত্য, ৩৩ কলেজ রো কোলকাতা, ১৩৬৪) ১৩. রোদন ভরা এ বসন্ত (ক্যালকাটা বুক ক্লাব, কোলকাতা, ১৯৫৮) নাটক ‘এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ’ মঞ্চায়িত হচ্ছে না দেখে লেখক নাটকটিকে রূপান্তর করলেন ‘রোদন ভরা এ বসন্ত’ উপন্যাসে। ১৪. নাগিনীমুদ্রা (বিদ্যোদয় লাইব্রেরি, ৭২ মহাত্মা গান্ধী রোড, ১৩৬৬) ১৫. মন দেয়া নেয়া (সাহিত্য, ৯ শ্যামাচরণ দে স্ট্রিট, ১৩৬৮ ) ১৬. মৃগসৌরভ (সারস্বত লাইব্রেরি, ২০৬ বিধান সরণি, কোলকাতা, ১৩৯৭) ১৭. একটি স্মরণীয় রাত্রি (দে’জ পাবলিশিং, ১৩ বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিট, কোলকাতা, ১৯৯১) [ড. হাজরা অবশ্য উল্লেখ করেছেন এ উপন্যাসের প্রকাশক ‘বাকসাহিত্য’ এবং প্রকাশকাল ১৯৯৬, তথ্যটি সম্ভবত সঠিক নয়] ‘জবানবন্দী’ থেকে জানা যায় এ উপন্যাসটি ১৯৫৫ সালে লেখা। এই উপন্যাস লেখার সময় প্রতি রাতে সত্যেন সরকার ইনসমনিয়ার রোগী অমরেন্দ্রকে সামলাতে আসতেন। এ উপন্যাসের নায়ক অনেকটাই সত্যেন সরকার। দে’জ পাবলিশিং কর্তৃক প্রকাশিত ‘একটি স্মরণীয় রাত্রি’ উপন্যাসের ইনার অংশে অমরেন্দ্রের বইয়ের তালিকায় নি¤œলিখিত ১৮ থেকে ২৩ নম্বরভুক্ত গ্রন্থগুলোর নাম রয়েছে। আমরা নিশ্চিত নই এগুলো কোন্ ধর্মী গ্রন্থ- উপন্যাস নাকি অন্য কিছু । এগুলো কখনো গ্রন্থ আকারে প্রকাশিত হয়েছিল কিনা তাও আমরা জানি না। ১৮. জি-হুজৌর ১৯. এপার ওপার ২০. অনাস্বাদিত চুম্বন ২১. অথচ সিঁড়িটা একদিন এমন ছিল না ২২. ধূসর রাগিনী ২৩. সমুদ্র পোত ২৪. ব্যাঙ্গাচি শুধু ব্যাঙ্গাচি (বাকেরগঞ্জ গেজেটিয়ারে এই নামে অমরেন্দ্রের একটি বই আছে বলে উল্লেখিত হয়েছে। আমরা অবশ্য অন্য কোথাও এই নামে অমরেন্দ্রের কোনো বইয়ের উল্লেখ দেখিনি।) দীপংকর ঘোষ তার ‘উপেক্ষিত অমরেন্দ্র ঘোষ, অবহেলিত চড়কাশেম’ শীর্ষক প্রবন্ধে নিচে ২৫ ও ২৬ নম্বরে লিখিত নামদুটোকে অমরেন্দ্রের গ্রন্থ বলে উল্লেখ করেছেন। আমরা এ দুটোরও কোনো সন্ধান পাইনি। ২৫. রাজভোগ ২৬. বলেছিলেম এসো

নাটক[সম্পাদনা]

২৭. এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ এটি লেখকের একটি সিরিও কমিক লেখার প্রয়াস। সম্ভবত কখনো গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়নি। পা-ুলিপিরও কোনো সন্ধান আমরা পাইনি। ২৮. ফসল এটি অমরেন্দ্রের একমাত্র গীতিনাট্য। সম্ভবত এটিও কখনো গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়নি। পা-ুলিপিরও কোনো সন্ধান আমরা পাইনি।

গল্পগ্রন্থ[সম্পাদনা]

২৯. কুসুমের স্মৃতি (সাহিত্য প্রকাশ, ৫ শ্যামাচরণ দে স্ট্রিট, কোলকাতা, ১৯৫০) এ গ্রন্থের গল্পগুলো হলো: ১. কুসুমের স্মৃতি; ২. বাঁদী; ৩. সারোঙ্গীর সুর; ৪. ভেজাল; ৫. একটুখানি নুন; ৬. ফেরারী; ৭. কসাই; ৮. বনলতা সোম; ৯. সূর্যমুখীর মৃত্যু; ১০. একটি স্মরণীয় রাত্রি; ও ১১. কল্যাণ স্বাক্ষর। ৩০. স্ব-নির্বাচিত গল্প (প্রকাশক: শ্রী গদাই চাঁদ দে, ১৭ ডি শম্ভুবাবু লেন, কোলকাতা, ১৯৫৬) ড. হাজরার প্রদত্ত তথ্যমতে এটি ছোটদের জন্য লিখিত একটি গল্পগ্রন্থ। এ গ্রন্থের গল্পগুলো হলো: ১. পোড়ো বাড়ির ছেলে; ২. জন্মদিন; ৩. মা; ৪. কালশত্রু; ৫. মেনকা মালিনী; ৬. দাঙ্গা; ও ৮. জবাব। ৩১. অমরেন্দ্র ঘোষের সেরা গল্প (দে’জ পাবলিশিং কর্তৃক প্রকাশিত ‘একটি স্মরণীয় রাত্রি’ উপন্যাসের ইনার অংশে অমরেন্দ্রের বইয়ের তালিকায় এই গ্রন্থটির নাম রয়েছে। আমরা গ্রন্থটির কোনো হদিস কোথাও পাইনি। অমরেন্দ্রের অগ্রন্থিত গল্পসমূহ: ১. পথিক বন্ধু; ২. কুলায় প্রত্যাশী; ৩. শুভার্থী; ৪. স্ফুলিঙ্গ; ৫. পুনর্বাসন; ৬. অপরিচিত; ৭. ইন্ধন; ৮. এ নাকি অনিবার্য এবং অনস্বীকার্য; ৯. আহ্বান; ১০. শহরতলীর আশেপাশে; ১১. দহন; ১২. ডালিয়া; ১৩. স্বপ্নবাস্তব; ১৪. প্রেমের কবিতা; ১৫. মুখোমুখি; ১৬. স্বরভঙ্গ; ১৭. চলনদার; ১৮. অসমাপ্ত চুম্বন (দীপংকর ঘোষ এটিকে বইয়ের নাম হিসেবে উল্লেখ করেছেন); ১৯. মৃগমদ; ২০. বাণী দিন বাণী দিন; ২১. ঠিকানা; ২২. আত্মসাৎ; ২৩. সাহিত্য পাড়া; ২৪. গড়িয়ে দিলাম; ও ২৫. ডিউটি। উল্লেখ্য এ তালিকা ড. হাজরার বইয়ের ভিত্তিতে প্রণীত। ড. হাজরা অমরেন্দ্রের স্ত্রী পঙ্কজিনী ঘোষের বরাত দিয়ে বলেছেন অমরেন্দ্রের গল্পসংখ্যা ১২৯। আমরা দেখছি তার মধ্যে বইয়ে প্রকাশিত মাত্র ১৯টি। আর সব মিলিয়ে ৪৪টি গল্পের নাম আমরা ড. হাজরার মাধ্যমে খুঁজে পেয়েিেছ। বাকিগুলো সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না। শিশুগ্রন্থ ৩২. চারি আনার পারিজাত (এ গ্রন্থটির নামও দীপংকর ঘোষের ‘উপেক্ষিত অমরেন্দ্র ঘোষ, অবহেলিত চড়কাশেম’ শীর্ষক প্রবন্ধে পাওয়া যায়। আমরা এটিরও কোনো সন্ধান কোথাও পাইনি। স্মৃতিকথা ৩৩. জবানবন্দী (শ্রীগুরু লাইব্রেরি, ২০৪ কর্ণওয়ালিস স্ট্রিট, কোলকাতা, ১৩৭০)

উপসংহার[সম্পাদনা]

ওপরে অমরেন্দ্রের ৩৩খানা গ্রন্থের যে তালিকা প্রদান করা হলো এ তালিকায় ভুলভ্রান্তি থাকার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে। এগুলোর দুয়েকটি এমনও থাকতে পারে যা আদপে কোনো বইয়ের নামই নয়, কিংবা হয়তো কোনো ছোটগল্পের নাম। অমরেন্দ্রের সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে আজকেই তথ্যের এই দোষ্প্রাপ্যতা আমাদেরকে তাঁর উত্তরসূরী হিসেবে এতটাই অযোগ্য বলে প্রমাণ করে যে আমাদের লজ্জিত হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। কোলকাতা কে. কে. দাস কলেজের অধ্যক্ষ সুলেখক তারক সরকার আক্ষেপ করে বলেছেন, আজ কোলকাতার নামী দামী গণগ্রন্থাগারগুলোতেও অমরেন্দ্রের চার পাঁচটার বাইরে একটি বইও খুঁজে পাওয়া যায় না। এমনকি তাঁর কোন্ বইগুলো প্রকাশিত হয়েছিল এবং কোন্ বইগুলো আদৌ প্রকাশিতই হয়নি তাও আজ কেউ নির্দিষ্ট করে বলতে পারে না। অমরেন্দ্রের সাহিত্যকর্মের এই ভাসমানতা একটু দূরত্ব থেকে হলেও অমরেন্দ্রের প্রথম গল্পের কিছু কথা মনে করিয়ে দেয়। অমরেন্দ্রের প্রথম গল্প ‘কলের নৌকা’র শুরু এভাবে- মা মারা গেল আগে তারপর তার বাপ। যাবার সময় রেখে গেল দু’শ টাকার দেনা, আর তা শোধ দেয়ার জন্য একখানা কুড়োল। তাই সে তার বাবার মতোই দিনমজুর-- আর শেষাংশে প্রিয়ার অন্তিম বিরহে মুহ্যমান নায়ক রহিম নৌকাখানা জল¯্রােতে ঠেলে দিয়ে প্রিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলছে- ‘তুমি ফিরে এসো, নাও পাঠালাম’। এই রহিম আর অমরেন্দ্রে প্রভেদ করা দোষ্কর। রহিমের মতোই পূর্ববাংলার বিরহে মুহ্যমান অমরেন্দ্র তাঁর সাহিত্য কর্মের তরীখানা এই প্রার্থনায়ই ভাসিয়েছিলেন- ‘তুমি ফিরে এসো হে পূর্ববাংলা, আমি তরী পাঠালাম’। অমরেন্দ্রের গল্প-উপন্যাস রহিমের সেই নৌকা হয়েই আজ ভাসছে আমাদের সাহিত্য ¯্রােতে, তবে সে নৌকার একমাত্র সওয়ার- পূর্ববাংলার হারিয়ে যাওয়া জীবনের শিল্পরূপ- তীরের সন্ধান দেখছে না কোনো দিকে। অথচ অমরেন্দ্রের মৃত্যুর পরে তাঁর স্ত্রীরও আমৃত্যু প্রচেষ্টা ছিল পূর্ববাংলার হারিয়ে যাওয়া জীবনের শিল্পরূপ এই সাহিত্যসম্পদের এমন ভাসমান দশা যাতে না হয়। জেরক্সরূপে আমাদের সংগৃহীত অমরেন্দ্রের বেশকিছু বইয়ের কপিতে আমরা দেখেছি স্ত্রী পঙ্কজিনী ঘোষ ১৯৭০ সালের পরে বিভিন্ন সময়ে বইগুলো সুসাহিত্যিক লীনা সেনকে অর্পণ করছেন এই বলে- ‘লীনা সেনকে অমেরন্দ্র জায়া পঙ্কজিনী ঘোষ’। পঙ্কজিনী কর্তৃক এই অর্পণের উদ্দেশ্য খুব সম্ভবত এই ছিল যে, এমন একজন সুসাহিত্যিক যাঁকে অমরেন্দ্র ‘জবানবন্দী’তে ‘কলমে প্রবীণ কথাশিল্পী’ বলে প্রশংসা করেছেন তাঁর হাতে তুলে দিতে পারলে গ্রন্থগুলো হয়তো ভাসমান দশায় পড়বে না। কিন্তু পঙ্কজিনীর সে আশাও শূন্যে মিলিয়ে গেছে। এ অবস্থায় আমাদের এটুকুই কামনা- ভাসতে ভাসতে এ তরী নোঙর পাক অমরেন্দ্রের যোগ্য কোনো উত্তরসূরী বা উত্তরসূরীদের ডাঙায়। পরিভ্রমণ মেনু

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]