পুরকৌশল

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের মত জটিল সব স্থাপনায় পুরকৌশলের সুগভীর জ্ঞান প্রয়োজন হয়

পুরকৌশল হল পেশাদার প্রকৌশল ব্যবস্থার একটি অন্যতম শাখা যেখানে নকশা, নির্মান কৌশল, বাস্তবিক বা প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা পরিবেশের ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা করা হয় যার মধ্যে সেতু, রাস্তা, পরিখা, বাঁধ, ভবন ইত্যাদি নির্মান অন্তর্ভুক্ত।[১][২] সামরিক প্রকৌশল ব্যবস্থার পর পুরকৌশল হল সবচেয়ে পুরাতন প্রকৌশল ব্যবস্থা এবং ইহা অসামরিক ও সামরিক প্রকৌশল ব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্যকারী বিভাগ। পুরকৌশল বিভিন্ন অন্তঃবর্তী বিভাগে ভাগ করা হয়েছে যেমন পরিবেশবিজ্ঞান, ভূতত্ববিদ্যা, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা, অবকাঠামো প্রকৌশল, বস্তুবিদ্যা, জলবিজ্ঞান, ভূমি জরিপ ইত্যাদি। সরকারী-বেসরকারী সকল বিভাগেই পুরকৌশল সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

পুরকৌশল পেশার ইতিহাস[সম্পাদনা]

মানব সভ্যতার শুরু থেকে প্রকৌশল জীবন ব্যবস্থার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০০ এবং ২০০০ সালে প্রচীন মিশরীয় সভ্যতামেসোপটেমিয়ার সভ্যতা (প্রচীন ইরাক) থেকে পুরকৌশলের যাত্রা শুরু বলে ধারনা করা হয়, ঠিক যখন থেকে মানুষ তাদের বসবাসের জন্য আবাস নির্মানের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। সেই সময়ে চাকা এবং পাল আবিস্কার হবার ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থার গুরুত্ব দারুনভাবে বৃদ্ধি পায়।

বেশ কিছুদিন আগ পর্যন্তও পুরকৌশল এবং স্থাপত্যবিদ্যার মধ্যে কোন সুস্পষ্ট পার্থক্য ছিল না এবং প্রকৌশলী ও স্থপতি শব্দ দ্বারা ভৌগলিক স্থানভেদে, মূলত একই ব্যাক্তিকে বোঝান হত।[৩] মিশরের পিরামিডকে (খ্রিস্ট পূর্ব ২৭০০-২৫০০) বিশ্বের ইতিহাসে বড় কাঠামো নির্মাণের প্রথম দৃষ্টান্ত বিবেচনা করা হয়। অন্যান্য পুরকৌশল নির্মাণকাজের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে কানাত পানি ব্যাবস্থাপনা কৌশল (সবচেয়ে পুরানোটি ৩০০০ বছর পূর্বের ও প্রায় ৭১ কিলোমিটার লম্বা,[৪]),দ্যা অ্যাপেইন ওয়ে, চীনের গ্রেট ওয়াল ইত্যাদি। রোমানরা, তাদের সাম্রাজ্যজুড়ে নালা পোতাশ্রয়, সেতু বাঁধ, রাস্তাসহ অসংখ্য বেসামরিক স্থাপনা গড়ে তোলে।

১৮শ শতাব্দীতে পুরকৌশল শব্দটিকে সামরিক প্রকৌশলবিদ্যার বিপরীত হিসেবে ব্যবহার করা হত। বিশ্বের প্রথম স্বঘোষিত সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন জন স্মিয়াথন যিনি এডিস্টোন লাইটহাউস তৈরি করেছিলেন। ১৭৭১ সালে স্মিয়াথন ও তার কয়েকজন সহকর্মী মিলে স্মিয়াথন সোসাইটি অফ সিভিল ইঞ্জিনিয়ার নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। যদিও তাদের কারিগরি বিষয় নিয়ে কিছু বৈঠক হয় তথাপিও এটি একটি সামাজিক সংগঠনের চেয়ে বেশি কিছু ছিল না।

১৮১৮ সালে লন্ডনে ইন্সিটিউট অফ সিভিল ইঞ্জিনিয়ার প্রতিষ্ঠিত হয়, ১৯২০ সালে থমাস টেলফোর্ড এর প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৮২৮ সালে প্রতিষ্ঠানটি রাজকীয় সনদ গ্রহণ করে যা পুরকৌশলকে একটি পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

যুক্তরাষ্ট্রে নরউইচ ইউনিভার্সিটিতে প্রথম বেসরকারি কলেজ হিসেবে পুরকৌশল পড়ান শুরু করা হয়, ১৮১৯ সালে।[৫]যুক্তরাষ্ট্রে ১৮৩৫ সালে রেন্সিলেয়ার পলিটেকনিক ইন্সিটিউট থেকে পুরকৌশলে সর্বপ্রথম ডিগ্রি প্রদান করা শুরু হয়।[৬] ১৯০৫ সালে প্রথম নারী হিসেবে পুরকৌশলে সেই ডিগ্রী পান নোরা স্ট্যান্টোন ব্লাচ কর্নেল ইউনিভার্সিটি থেকে।[৭]

পুরকৌশলের ইতিহাস[সম্পাদনা]

আর্কিমিডিসের স্ক্রু, যা হাত দিয়ে পরিচালনা করা হত এবং এর সাহায্যে অত্যান্ত কার্যকরভাবে পানি তোলা যেত
পোন্ট দু গার্ড, ফ্রান্স, একটি রোমান পানি সরবরাহের কৃত্রিম প্রণালী যা আনুমানিক ১৯ খ্রিস্ট পূর্ব সালে তৈরি করা হয়েছিল

পুরকৌশল হচ্ছে সমাজের বিভিন্ন সমাধানের নিমিত্তে প্রাকৃতিক এবং বৈজ্ঞানিক ধারনা এবং নীতিগুলোর প্রয়োগ। গণিতপদার্থবিজ্ঞানের সূত্রকে অধিকতর বাস্তবভিত্তিক সমস্যা সমাধানে ব্যবহারের মধ্য দিয়ে পুরকৌশল পেশা আজকের অবস্থানে আসতে সক্ষম হয়েছে। যেহুতু পুরকৌশলের বিস্তৃতি অনেক ব্যপক, এর জ্ঞান কাঠামোবিদ্যা, বস্তুবিদ্যা, ভূবিজ্ঞান, ভূতত্ত্ব, মাটি, জলবিজ্ঞান, পরিবেশবিদ্যা, বলবিদ্যা এবং বিজ্ঞানের আর শাখার সাথে সংযুক্ত।

প্রাচীনকাল ও মধ্যযুগীয় সময়কালে সকল সকল স্থাপত্যের নকশা এবং নির্মাণ রাজমিস্ত্রি এবং কাঠমিস্ত্রি দ্বারা করা হত, যার ফলে একসময় স্থপতির প্রয়োজন অনুভব করায়। সকল জ্ঞান একদল বিশেষ গোষ্ঠীর কাছে মুষ্ঠিবধ্য ছিল এবং তা খুব কম সময়ই অন্যদের জানানো হত। এর ফলে একটি নির্দিষ্ট এলাকায় একই ধরনের স্থাপনা, রাস্তা ও অবকাঠামো দেখা যেত এবং তা আকারে ক্রমান্বয়ে আর বড় হতে থাকে। [৮]

পদার্থবিজ্ঞান এবং গণিতের সূত্রগুলিকে পুরকৌশলের জন্য ব্যবহার উপযোগী করে গড়ে তোলার প্রথম প্রচেষ্টাটি করেন আর্কিমিডিস তৃতীয় খ্রিস্টপূর্বাব্দ সালে, যার মধ্যে আর্কিমিডিসের তত্ত্ব অন্তর্গত ছিল, যা প্লবতা সম্পর্কে আমাদের ধারণা মজবুত করতে সাহায্য করে এবং আমাদেরকে বিভিন্ন ব্যবহারউপযোগী সমাধান যেমন আর্কিমিডিসের স্ক্রু বানাতে সাহায্য করে। ব্রহ্মগুপ্ত, একজন ভারতীয় গণিতবিদ, সপ্তম খ্রিস্টাব্দে হিন্দু-আরবিক সংখ্যাতত্ত্বের উপর ভিত্তি করে, পাটিগণিত ব্যবহার করে খননকৃত এলাকার আয়তন বের করবার পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। [৯]

চিত্রকক্ষ[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. The American Heritage Dictionary of the English Language, Fourth Edition
  2. পুরকৌশলের ইতিহাস ও ঐতিহ্য
  3. The Architecture of the Italian Renaissance Jacob Burckhardt ISBN 0-8052-1082-2
  4. p. 4 of Mays, L. (2010-08-30)। Ancient Water Technologies। Springer। আইএসবিএন 978-90-481-8631-0 
  5. "Norwich University Legacy Website"
  6. Griggs, Francis E Jr. "Amos Eaton was Right!". Journal of Professional Issues in Engineering Education and Practice, Vol. 123, No. 1, January 1997, pp. 30–34. See also RPI Timeline
  7. "Nora Stanton Blatch Barney"Encyclopædia Britannica Online। সংগৃহীত 2010-10-08 
  8. Victor E. Saouma। "Lecture notes in Structural Engineering"। University of Colorado। সংগৃহীত 2007-11-02 
  9. Henry Thomas Colebrook, Algebra: with Arithmetic and mensuration (London 1817)

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

  1. আমেরিকার পুরকৌশল সমিতি
  2. ইনিষ্টিটিউট অব সিভিল ইঞ্জিনায়ার্স যুক্তরাজ্য
  3. যুক্তরাজ্যে পুরকৌশল সমিতি
  4. ইনিষ্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ
  5. ইঞ্জিনিয়ার্স ইনিষ্টিটিউশন ভারত
  6. ভারতীয় পুরকৌশলীদের ইনিষ্টিটিউশন