আরব্য রজনী

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
ফার্ডিনান্ডের আঁকা শেহেরযাদ ও শাহরিয়ার, ১৮৮০

আরব্য রজনী (আরবি: كتاب ألف ليلة وليلة‎ Kitāb 'alf layla wa-layla; পারসিক: هزار و یک شب Hezār-o yek šab) মধ্য পূর্ব এবং দক্ষিণ এশিয়ার একটি সংগ্রহিত লোক গল্প যা ইসলামি স্বর্ণযুগের সময় আরবিতে সঙ্কলন করা হয়েছিল। এটি এরবিয়ান নাইটস্‌ বা আরব্য রজনী নামেও পরিচিত। আরব রাত্রির বিনোদন (The Arabian Nights' Entertainment[১]), এটি ১৭০৬ সালে ইংরেজি ভাষায় ইংল্যান্ডে প্রথম প্রকাশিত হয়।

পশ্চিম, মধ্য ও দক্ষিণ এশীয় লেখক, অনুবাদক ও গবেষকগণ বহু বছর ধরে আরব্য রজনীরগল্পগুলো সংগ্রহ করেছেন । মূলত আরব, পারস্য, ভারত, মিশর ও মেসপেটমিয়ার লোককাহিনী ও সাহিত্য এ গল্পগুলোর উৎস । এর মাঝে অনেক গল্পই খলিফাদের যুগের। বাকিগুলো পাহ্লভীয় সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত যার মাঝে কিছু ভারত।ভারতীয় উপাদান বিদ্যমান। আরব্য রজনীর সকল সংস্করণেই সম্রাট শাহরিয়ারকে তাঁর স্ত্রী শেহেরেযাদ কাহিনীগুলো শোনায়। কোন সংস্করণে কয়েকশ’ আবার কিছু সংস্করণে এক হাজার একটি বা তার চেয়ে বেশি কাহিনী সঙ্কলন করা হয়েছে। কাহিনীগুলো গদ্যরীতিতে বর্ণনা করা হয়েছে। অতিরিক্ত আবেগ, গান এবং ধাঁধার ক্ষেত্রে পদ্যরীতি অনুসরণ এর অন্যতম বৈশিষ্ট। আরব্য রজনীর গল্পগুলোর মাঝে “আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ”, “আলী বাবা এবং চল্লিশ চোর” আর “ সিন্দাবাদের সমুদ্রযাত্রা” মধ্যপূর্বের লোককাহিনী যা এর আরবী ভাষার সংস্করণের অন্তর্ভুক্ত না। অ্যান্টিয়ন গ্যালেন্ড ও অন্যান্য ইয়োরোপীয় অনুবাদক আরব্য রজনীর মাঝে এগুলো অন্তর্ভুক্ত করে।

সারসংক্ষেপ ঃ আরব্য রজনীর মূল কাহিনী কাঠামো গড়ে উঠেছে পারস্যের রাজা এবং তাঁর নববধূকে ঘিরে। তাঁর ভাইয়ের বধূর অবিশ্বস্ততা তাঁকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়। পরবর্তীতে তাঁর নিজের স্ত্রীর প্রতারণায় তিনি পুরোই হতভম্ব হয়ে পড়েন এবং এই অভিজ্ঞতা তাঁকে নারীবিদ্বেষী করে তোলে। তিনি তাঁর স্ত্রীকে মৃত্যুদণ্ড দেন এবং একের পর এক কুমারী বিয়ে করে তাঁদের পরের দিন সকালেই মৃত্যুদণ্ড দেয়া শুরু করেন যাতে তাঁরা প্রতারণার সুযোগই না পায়। রাজার উজির ছিলেন কুমারী সন্ধানের দায়িত্বে। রাজ্যে আর কোন কুমারী খুঁজে না পেয়ে অবশেষে উজির নিজের কন্যার সাথে রাজার বিয়ে দেন। বিয়ের রাতে শাহ্‌রাযাদ রাজাকে একটা গল্প বলা শুরু করে কিন্তু শেষ করে না। রাজা গল্পের শেষ জানতে এতই আগ্রহী থাকে যে মৃত্যুদণ্ড বিলম্বিত করার সি্দ্ধান্ত নেয়। শাহ্‌রাজাদ একটা গল্প শেষ হওয়ার সাথে সাথেই আরেকটা গল্প শুরু করে। পরের গল্পটাও রাতের মাঝে শেষ হয় না। এভাবেই তাঁর মৃত্যুদণ্ড বিলম্বিত হতে থাকে ১০০১ রাত থাকে পর্যন্ত।

আরব্য রজনীর পাণ্ডুলিপি

‘’’’’আরব্য রজনীতে’’’’’ বিভিন্ন ধরনের গল্প সন্নিবেশিত হয়েছে। এতে একই সাথে রয়েছে ইতিহাস দ্বারা অনুপ্রাণিত গল্প, প্রেম কাহিনী, বিয়োগাত্মক কাহিনী, রম্যরচনা, কবিতা এবং প্রহসন। গল্পগুলোকে বিভিন্ন কাল্পনিক চরিত্র ও ঐতিহাসিক চরিত্র দিয়ে সাজানো হয়েছে। আরব্য রজনীর প্রধান চরিত্র আব্বাসীয় খলিফা হারুন আল রসিদ। এছাড়াও এতে তাঁর উজির জাফর আল বারমাকি এবং বিখ্যাত কবি আবু নুয়াসের উল্লেখ রয়েছে যদিও যে সময়কালের প্রেক্ষাপটে কাহিনী সাজানো, এঁদের সময়কাল তারও ২০০ বছর পর ।বিভিন্ন গল্পে দেখা যায় কথক অন্য কথকের মাধ্যমে কাহিনী বর্ণনা করেছে। এর বিভিন্ন সংস্করণে কাহিনীর ইতি টানা হয়েছে বিভিন্নভাবে কিন্তু সব সংস্করণেই কাহিনীর শেষে রাজা তাঁর স্ত্রীর মৃত্যুদণ্ডাদেশ বাতিল করেন।

ইতিহাস ঃ বিভিন্ন সংস্করণ ও অনুবাদ আরব্য রজনীর ইতিহাস বেশ জটিল। আধুনিক গবেষকেরা গল্পগুলো সংগ্রহের ইতিহাস নিয়ে অনেক গবেষণা করেছেন। রবার্ট আরউইন তাঁদের গবেষণালব্ধ তথ্যগুলোকে সংক্ষেপে লিখেছেন, “ ১৮৮০ এবং ১৮৯০ এর দিকে যটেনবার্গ ও অন্যান্যরা আরব্য রজনীর উপর অনেক কাজ করেন যার ভিত্তিতে একটি সম্মিলিত ধারণার সৃষ্টি হয়। বেশিরভাগ গবেষক এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে আরব্য রজনীর গল্পগুলো অনেকের দ্বারা সংগৃহীত এবং এর পূর্বেকার গল্পগুলো ভারত ও পারস্য থেকে এসেছে। অষ্টম শতকের দিকে এই গল্পগুলো আরবিতে অনুবাদ করে ‘আলিফ লায়লা’ শিরোনামে সংকলিত করা হয়। পরবর্তীতে নবম ও দশম শতকের দিকে ইরাকে মূল গল্পগুলোর সাথে আরবদের গল্প সংযুক্ত হয় যার মাঝে খলিফা হারুন-আল-রশিদকে নিয়েও কিছু গল্প ছিল। দশম শতকের পরে আরও কিছু আলাদা গল্প এর মাঝে সংযুক্ত হয়। ত্রয়োদশ শতকের পরে সিরিয়া ও মিশরে আরও গল্প যুক্ত হয় যার বেশিরভাগ ছিল যৌনতা ও জাদু সম্পর্কিত।

সম্ভাব্য ভারতীয় যোগসূত্র ঃ গবেষকেরা আরব্য রজনীর অনেক গল্পের মূল ধারণার উপাদান সংস্কৃত সাহিত্যে খুঁজে পেয়েছেন। আরব্য রজনীতে ভারত।ভারতীয় লোকসাহিত্য কিছু জীবজন্তুর গল্পের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়েছে যাতে সংস্কৃত উপকথার প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। পঞ্চতন্ত্র ও বেতাল পঞ্চবিংশতি এর মাঝে উল্লেখযোগ্য। জাতক কাহিনিমালা ৫৪৭ টি বৌদ্ধ নীতিকাহিনীর সংকলন । “ষাঁড় ও গাধার গল্প” এবং এর সাথে সম্পর্কিত “এক বণিক ও তাঁর স্ত্রীর গল্প” দু’টোরই উল্লেখ রয়েছে জাতক এবং আরব্য রজনীতে। সম্ভবত পঞ্চতন্ত্রের প্রভাব এসেছে সংস্কৃত তন্ত্রপক্ষ থেকে।

দিনপঞ্জি ঃ গবেষকেরা আরব্য রজনীর প্রকাশনা সংক্রান্ত ইতিহাস লিপিবদ্ধ করেছেন এভাবে ঃ

  • ১৯৪৮ সালের দিকে গবেষক নাবিয়া সিরিয়ায় নবম শতকের প্রথম দিকের কিছু আরবি পাণ্ডুলিপি খুঁজে পান।
  • দশম শতকে বাগদাদে ইবন-আল-নাদিমের “ফিহ্‌রিস্ত”-এ (বইয়ের তালিকা) হাজার আফসানের উল্লেখ রয়েছে। আল-নাদিমের মাধ্যমে জানা যায় বইটিতে ২০০ গল্প রয়েছে। আল-নাদিম বইটি সম্বন্ধে ভালো অভিমত দেননি।
  • দশম শতকে আল-মাসুদির মুরুজ আল-দাহাব –এ (সোনালি উপত্যকা) ফার্সি হাজার আফসানের অনুবাদ রয়েছে।
  • একাদশ শতকে কাতারান তাব্রিযির ফার্সি কবিতায় আরব্য রজনীর উল্লেখ রয়েছে।

هزار ره صفت هفت خوان و رويين دژ فرو شنيدم و خواندم من از

  • কায়রোর এক নথিতে এক ইহুদী বই বিক্রেতার আরব্য রজনীর একটি সংখ্যা ধার দেয়ার উল্লেখ রয়েছে।
  • চতুর্দশ শতকে ফ্রান্সের জাতীয় পাঠাগারে সিরিয় পাণ্ডুলিপি স্থান পায় যাতে ৩০০ টি গল্প রয়েছে।
  • ১৭০৪ সালে অ্যান্টিয়ন গ্যালেন্ড এটি ফরাসি ভাষায় অনুবাদ করেন যা প্রথম ইয়োরোপীয় সংস্করণ।
  • ১৭০৬ সালে এটি ইংরেজিতে অনুদিত হয়।
  • ১৭৬৮ সালে এটি প্রথম পোলিশ ভাষায় অনুদিত হয়।

আরো দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. The Arabian Nights and Orientalism Prespecitves from East and West.
  • Robert Irwin The Arabian Nights: A Companion (Tauris Parke, 2005)
  • David Pinault Story-Telling Techniques in the Arabian Nights (Brill Publishers, 1992)
  • Ulrich Marzolph, Richard van Leeuwen, Hassan Wassouf,The Arabian Nights Encyclopedia (2004)
  • Ulrich Marzolph (ed.) The Arabian Nights Reader (Wayne State University Press, 2006)
  • Dwight Reynolds, "A Thousand and One Nights: a history of the text and its reception" in The Cambridge History of Arabic Literature Vol 6. (CUP 2006)
  • Eva Sallis Scheherazade Through the Looking-Glass: The Metamorphosis of the Thousand and One Nights (Routledge, 1999),
  • Yamanaka, Yuriko and Nishio, Tetsuo (ed.) The Arabian Nights and Orientalism – Perspectives from East and West (I.B.Tauris, 2006) ISBN 1-85043-768-8
  • Ch. Pellat, "Alf Layla Wa Layla" in Encyclopædia Iranica. Online Access June 2011 at [3]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]