আবাবিল

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
আবাবিল
লালকোমর আবাবিল
বৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস
জগৎ/রাজ্য: Animalia
পর্ব: Chordata
শ্রেণী: Aves
বর্গ: Passeriformes
উপ-বর্গ: Passeri
পরিবার: Hirundinidae
Vigors, 1825

আবাবিল (ইংরেজি: Swallow) গায়ক পাখির নির্দিষ্ট একটি গোত্রের সকল পাখিদের সাধারণ বাংলা নাম। সাধারণত, হাইরানডিনিডি (Hirundinidae) গোত্রের পাখিদের আবাবিল বলা হয়। আবার পারিডি (Paridae) গোত্রের পাখিরাদেরও অনেকসময় আবাবিল বলা হয়। আবার কেবল হাইরানডু গণের পাখিদেরও আবাবিল বলা হয়। হাইরানডিনিডি গোত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এদের লম্বা ও সরু পাখা এবং দ্বিধাবিভক্ত পা।[১] আবাবিল পোকামাকড় খেয়ে জীবনধারণ করে। এদের প্রায়ই দলবদ্ধভাবে আকাশে উড়তে দেখা যায়। এরা খুব পারদর্শীতার সাথে আকাশে উড়তে, পাক দিতে এবং ঘুরতে সক্ষম।[২]

হাইরানডিনিডি গোত্রে প্রায় ৮৯টি প্রজাতি রয়েছে। বাংলাদেশে এর ৩টি গণে ১০টি প্রজাতি রয়েছে।[৩]

বর্ণনা[সম্পাদনা]

আবাবিল এবং নাকুটি পাখিদের শারীরিক গঠন বিবর্তন প্রক্রিয়ায় খুব একটা পরিবর্তিত হয়নি। অর্থাৎ খানিকটা রক্ষণশীল রয়ে গেছে। তাই গায়ক পাখিদের অন্য পরিবারগুলোর সাথে তাই এদের বেশ পার্থক্য করা যায়।[৪] এদের দেহ মসৃণ এবং পাখার প্রান্ত সূক্ষ্ম হওয়াতে এর শারীরিক গঠন ওড়ার জন্য সহায়ক। এদের উড্ডয়ন ক্ষমতা অনেক বেশি। একই আয়তনের অন্য গায়ক পাখির চাইতে এরা ৫০-৭৫ শতাংশ শক্তি কম খরচ করে উড়তে পারে। আবাবিলের ঠোঁট অনেকটা বাতাসি (ইংরেজি: Swift) এবং দিনেকানা (ইংরেজি: Nightjar) এর মতো ছোট ও সুঁচালো। এদের দেহ লম্বায় ১০-২৪ সে.মি.। এদের ওজন ১০-৬০ গ্রাম পর্যন্ত হতে পারে। এদের লেজ ১২টি পালক দিয়ে গঠিত। ধারণা করা হয়, এদের লেজ অনুরাগের সময় আকর্ষণীয়তা বৃদ্ধি করে যেহেতু পুরুষ পাখির লেজ প্রায়শই অধিকতর লম্বা হয়ে থাকে।[৪] মেঠো আবাবিলের ক্ষেত্রে দেখা যায়, পুরুষ পাখির লেজ স্ত্রী পাখির তুলনায় ১৮ শতাংশ লম্বা এবং সঙ্গী নির্বাচনের সময় লেজের দৈর্ঘ্য দিয়ে স্ত্রী পাখি পুরুষ পাখির আকর্ষণীয়তা বিচার করে।[৫] গঠনগত দিক থেকে আবাবিলের দুর্বল দিক হচ্ছে এদের পা, যা ছোট আকৃতির এবং এজন্য এদের পক্ষে গাছ আঁকড়িয়ে ধরে রাখা খুবই কষ্টসাধ্য। এদের জন্য সবচেয়ে সহজ আঁকরানোর স্থান হলো টেলিফোনের তার। এরা আবহাওয়া পূর্বাভাসের পাখি হিসেবে খ্যাত।[১]

মানুষ ও আবাবিল[সম্পাদনা]

আবাবিল বিষয়ক বেশ কিছু রূপকথা চালু আছে বিভিন্ন সমাজে। পাখিটিকে কাজেও ব্যবহার করেছেন অনেকে। আবাবিলকে ঘোড়দৌড়ের রেফারি করতে দেখা গেছে এমনটি লিখেছেন প্রাচীন রোমের ঐতিহাসিক প্লেইনি দ্য এল্ডার।[৬] জিন ডেসবাউভ্রি নামক একজন জীববিজ্ঞানী আবাবিলকে বার্তাবাহক পাখি হিসেবে শিক্ষা প্রদানের চেষ্টা করেন এবং সফল হন। তিনি কবুতরের বিকল্প হিসেবে আবাবিলকে ব্যবহারের সম্ভাবনা জাগিয়ে তোলেন।[৬][৭] উড়োজাহাজ নির্মানকালে আবাবিল অনেক দেশে মডেল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে দুটি যুদ্ধবিমানের নামও আবাবিলের নামে হয়।

সমুদ্রের নাবিকদের কাছে আবাবিল একটি ভালো চিহ্ন অনেককাল ধরে। আবাবিল দেখা মানে তাদের কাছে তীরের সন্ধান পাওয়া।[৮] মুসলমানদের কাছে আবাবিল পবিত্র পাখি। সাধারণত তারা আবাবিল মারে না। কেননা বর্ণিত আছে যে, আব্রাহা ইবনে আল সাবাহ পবিত্র ক্বাবা শরীফ ধ্বংসের জন্য মক্কার দিকে ধাবিত হয়। এই আক্রমণ বানচাল করতে "বিশাল এক আবাবিলের দল ছোট ছোট পাথর বহন করে সমুদ্র থেকে উড়ে আসে এবং আব্রাহার লোকদের মাথার উপর নিক্ষেপ করে। আঘাত পাওয়া প্রত্যেক ব্যক্তির মৃত্যু হয়।"[১]

আবাবিলের প্রজাতি ও শ্রেণীবিন্যাস[সম্পাদনা]

শ্রেণিবিন্যাস[সম্পাদনা]

আবাবিলের শারীরিক গঠন অন্যান্য গায়ক পাখি থেকে ভিন্ন হলেও, চশমাপাখি (white-eye) এবং ফুটফুটির (warbler) সাথে এর কিছু মিল দেখা যায়। হাইরানডিনিডি পরিবারেও দুটি উপপরিবারের মাঝে স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যায়। এর ৮১টি প্রজাতি আছে (কারো কারো মতে ৮৯টি)। এর একটি শ্রেণিবিন্যাসকৃত তালিকা নিচে দেওয়া হলো।[৪] স্বাভাবিকভাবেই সব প্রজাতির বাংলা নামকরণ হয়নি।

তারের উপর একটি তারলেজা আবাবিল
মেঠো আবাবিলের বাসা ও ডিম

পরিবার: HIRUNDINIDAE

  • উপপরিবার: Pseudochelidoninae (নদ নাকুটি)
    • গণ: Pseudochelidon
      • African River Martin, Pseudochelidon eurystomina
      • White-eyed River Martin, Pseudochelidon sirintarae
  • উপপরিবার: Hirundininae (অন্যান্য আবাবিল ও নাকুটি)
    • গণ: Psalidoprocne
      • Square-tailed Saw-wing, Psalidoprocne nitens
      • Mountain Saw-wing, Psalidoprocne fuliginosa
      • White-headed Saw-wing, Psalidoprocne albiceps
      • Black Saw-wing, Psalidoprocne pristoptera
      • Fanti Saw-wing, Psalidoprocne obscura
    • গণ: Pseudhirundo
      • Grey-rumped Swallow, Pseudhirundo griseopyga
    • গণ: Cheramoeca
      • White-backed Swallow, Cheramoeca leucosternus
    • গণ: Phedina
      • Mascarene Martin, Phedina borbonica
      • Brazza's Martin, Phedina brazzae
    • গণ: Riparia
      • Brown-throated Martin, Riparia paludicola
      • Congo Martin, Riparia congica
      • Sand Martin, Riparia riparia
      • Banded Martin, Riparia cincta
    • গণ: Tachycineta
      • Tree Swallow, Tachycineta bicolor
      • Violet-green Swallow, Tachycineta thalassina
      • Golden Swallow, Tachycineta euchrysea
      • Bahama Swallow, Tachycineta cyaneoviridis
      • Tumbes Swallow, Tachycineta stolzmanni
      • Mangrove Swallow, Tachycineta albilinea
      • White-winged Swallow, Tachycineta albiventer
      • White-rumped Swallow, Tachycineta leucorrhoa
      • Chilean Swallow, Tachycineta meyeni
    • গণ: Progne
      একটি বেগুনি নাকুটি বা Purple Martin; এই পাখি উপমহাদেশে দেখা যায় না; পাখিটি উত্তর আমেরিকার বাসিন্দা
      • Purple Martin, Progne subis
      • Cuban Martin, Progne cryptoleuca
      • Caribbean Martin, Progne dominicensis
      • Sinaloa Martin, Progne sinaloae
      • Grey-breasted Martin, Progne chalybea
      • Galapagos Martin, Progne modesta
      • Peruvian Martin, Progne murphyi
      • Southern Martin, Progne elegans
      • Brown-chested Martin, Progne tapera
    • গণ: Notiochelidon
      • Brown-bellied Swallow, Notiochelidon murina
      • Blue-and-white Swallow, Notiochelidon cyanoleuca
      • Pale-footed Swallow, Notiochelidon flavipes
      • Black-capped Swallow, Notiochelidon pileata
    • গণ: Haplochelidon
      • Andean Swallow, Haplochelidon andecola
    • গণ: Atticora
      মেঠো আবাবিলের গান
      • White-banded Swallow, Atticora fasciata
      • Black-collared Swallow, Atticora melanoleuca
    • গণ: Neochelidon
      • White-thighed Swallow, Neochelidon tibialis
    • গণ: Stelgidopteryx
      • Northern Rough-winged Swallow, Stelgidopteryx serripennis
      • Southern Rough-winged Swallow, Stelgidopteryx ruficollis
    • গণ: Alopochelidon
      • Tawny-headed Swallow, Alopochelidon fucata
    • গণ: Hirundo
      ইংল্যান্ডের একটি মেঠো আবাবিলের ভিডিও
      • Barn Swallow, Hirundo rustica
      • Red-chested Swallow, Hirundo lucida
      • Angola Swallow, Hirundo angolensis
      • Pacific Swallow, Hirundo tahitica
      • Welcome Swallow, Hirundo neoxena
      • White-throated Swallow, Hirundo albigularis
      • Ethiopian Swallow, Hirundo aethiopica
      • Wire-tailed Swallow, Hirundo smithii
      • White-bibbed Swallow, Hirundo nigrita
      • Pied-winged Swallow, Hirundo leucosoma
      • White-tailed Swallow, Hirundo megaensis
      • Pearl-breasted Swallow, Hirundo dimidiata
      • Blue Swallow, Hirundo atrocaerulea
      • Black-and-rufous Swallow, Hirundo nigrorufa
    • গণ: Ptyonoprogne
      • Eurasian Crag Martin, Ptyonoprogne rupestris
      • Pale Crag Martin, Ptyonoprogne obsoleta
      • Rock Martin, Ptyonoprogne fuligula
      • Dusky Crag Martin, Ptyonoprogne concolor
    • গণ: Delichon
      একটি এশীয় ঘরনাকুটি পাখি
      • Common House Martin, Delichon urbicum
      • Asian House Martin, Delichon dasypus
      • Nepal House Martin, Delichon nipalense
    • গণ: Cecropis
      • Greater Striped Swallow, Cecropis cucullata
      • Lesser Striped Swallow, Cecropis abyssinica
      • Red-breasted Swallow, Cecropis semirufa
      • Mosque Swallow, Cecropis senegalensis
      • Red-rumped Swallow, Cecropis daurica
      • Striated Swallow, Cecropis striolata
      • Rufous-bellied Swallow, Cecropis badia
    • গণ: Petrochelidon
      • Red-throated Cliff Swallow, Petrochelidon rufigula
      • Preuss's Cliff Swallow, Petrochelidon preussi
      • Red Sea Cliff Swallow, Petrochelidon perdita
      • South African Cliff Swallow, Petrochelidon spilodera
      • Forest Swallow, Petrochelidon fuliginosa
      • Streak-throated Swallow, Petrochelidon fluvicola
      • Fairy Martin, Petrochelidon ariel
      • Tree Martin, Petrochelidon nigricans
      • American Cliff Swallow, Petrochelidon pyrrhonota
      • Cave Swallow, Petrochelidon fulva
      • Chestnut-collared Swallow, Petrochelidon rufocollaris

বাংলাদেশে আবাবিলের প্রজাতি[সম্পাদনা]

নাকুটি পাখি বা বাদামি-গলা মার্টিন

বাংলাদেশে আবাবিলের অর্থাৎ হাইরানডিনিডি গোত্রে যেসমস্ত প্রজাতি দেখা যায় সেগুলো হলো:

পরিবার: HIRUNDINIDAE

পশ্চিমবঙ্গে আবাবিলের প্রজাতি[সম্পাদনা]

বাংলাদেশের সকল আবাবিল প্রজাতি পশ্চিমবঙ্গেও দেখা যায়। তবে সেখানে তারলেজা আবাবিল (ইংরেজি: Wire-tailed Swallow;Hirundo smithii) বেশি পরিচিত। ভারতের সর্বত্রই তারের উপর এদের বসে থাকতে দেখা যায়। মাথার উপর লালটুপি আর তারের মতো দুটো লম্বা লেজ দেখলে এদের চিনতে অসুবিধা হয় না।[১০] ভারতে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় মেঠো আবাবিল/ আবাবিল (ইংরেজি: Barn Swallow)। পশ্চিমবঙ্গে দেখা মেলে অথচ বাংলাদেশে খুব একটা দেখা যায় না এমন একটি পাখি পাথুরে চটি (Dusky Crag Martin)। বৈজ্ঞানিক নাম: Ptyonoprogne concolor বা Hirundo concolor। হিন্দী নাম: চাতান-আবাবিল। এর বাংলায় কখনো নামকরণ হয়নি।[১১]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. ১.০ ১.১ ১.২ এ. কে. এম. নুরুল ইসলাম, এ. এম. হারুন অর রশীদ, আমিনুল ইসলাম, অজয় রায়, সৈয়দ মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির, আবু জাফর মাহমুদ (সম্পাদক)। "আবাবিল"। বাংলা একাডেমী বিজ্ঞান বিশ্বকোষ: পঞ্চম খণ্ড (প্রিন্ট) (বাংলা ভাষায়)। ঢাকা: বাংলা একাডেমী। পৃ: ৫৯৭। আইএসবিএন 984-07-4510-7  |origmonth= প্যারামিটার অজানা, উপেক্ষা করুন (সাহায্য)
  2. http://eol.org/pages/7544/overview এনসাইক্লোপিডিয়া অফ লাইফ: হাইরানডিডিনডি, আবাবিল ও নাকুটি
  3. Kamal Uddin Siddiqui, M Anwarul Islam (সম্পাদক)। "Hirundinidae"। Encyclopedia of Flora and Fauna of Bangladesh: Volume 26 (প্রিন্ট) (English ভাষায়)। ঢাকা: Asiatic Society of Bangladesh। পৃ: ৪১৪। আইএসবিএন 984-300-000286-0 |isbn= মান পরীক্ষা করুন (সাহায্য)  |origmonth= প্যারামিটার অজানা, উপেক্ষা করুন (সাহায্য)
  4. ৪.০ ৪.১ ৪.২ Turner, Angela (2004)। "Family Hirundinidae (Swallows and Martins)"। in Josep del Hoyo, Andrew Elliott, David A. Christie (eds)। Handbook of the Birds of the World. Volume 9। Lynx Edicions। পৃ: 602–638। আইএসবিএন 84-87334-69-5 
  5. Møller, Anders pape (1992)। "Sexual selection in the monogamous barn swallow (Hirundo rustica). II. Mechanisms of sexual selection"। Journal of Evolutionary Biology 5 (4): 603–624। ডিওআই:10.1046/j.1420-9101.1992.5040603.x 
  6. ৬.০ ৬.১ P.W. Brian (1955)। Bird Navigation। Cambridge University Press। পৃ: 57–58। সংগৃহীত 2009-03-01 
  7. author not named (1889)। Zoologist: A Monthly Journal of Natural History, ser.3 v.13। J. Van Voorst। পৃ: 398–399। সংগৃহীত 2009-03-01 
  8. Eyers, Jonathan (2011). Don't Shoot the Albatross!: Nautical Myths and Superstitions. A&C Black, London, UK. ISBN 978-1-4081-3131-2.
  9. Kamal Uddin Siddiqui, M Anwarul Islam (সম্পাদক)। "Hirundinidae"। Encyclopedia of Flora and Fauna of Bangladesh: Volume 26 (প্রিন্ট) (English ভাষায়)। ঢাকা: Asiatic Society of Bangladesh। পৃ: ৪১৪–৪২১। আইএসবিএন 984-300-000286-0 |isbn= মান পরীক্ষা করুন (সাহায্য)  |origmonth= প্যারামিটার অজানা, উপেক্ষা করুন (সাহায্য)
  10. প্রণবেশ সান্যাল, বিশ্বজিৎ রায়চৌধুরী। "তারলেজা"। পশ্চিম বাংলার পাখি (প্রিন্ট) (বাংলা ভাষায়)। কলকাতা: আনন্দ। পৃ: ৫৯। আইএসবিএন 81-7215-254-X  |origmonth= প্যারামিটার অজানা, উপেক্ষা করুন (সাহায্য)
  11. অজয় হোম। "ভাণ্ডিক বংশ"। বাংলার পাখি (প্রিন্ট) (বাংলা ভাষায়)। কলকাতা: শৈব্যা প্রকাশন বিভাগ। পৃ: ১৫৩।  |origmonth= প্যারামিটার অজানা, উপেক্ষা করুন (সাহায্য)

আরও দেখুন[সম্পাদনা]