২০১৩ ক্যানিং দাঙ্গা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

ক্যানিং দাঙ্গা (ইংরেজি: Canning Riots) ২১ ফেব্রুবারী ২০১৩ তারিখে পশ্চিমবঙ্গের ক্যানিং নামক স্থানে হিন্দু ও মুসলমানের সংঘাতকে বোঝানো হয়[১]। অচিনাক্ত বন্দুকধারী ব্যক্তি ইমামকে হত্যা করার পর দাঙ্গাটি সংঘটিত হয়েছিল[২]। এই দাঙ্গায় ক্যানিং থানার অন্তর্গত নলিয়াখোলি, হেরোভাঙ্গা, গোপালপুরগোলাডোগ্রা অঞ্চলে মুসলমানেরা প্রায় ২০০ হিন্দুঘর জ্বালিয়ে দিয়েছিল[১]।দুষ্কৃতিকারীরা বারইপুর থানার অন্তর্গত জয়নগরে ২৪টি দোকান লুণ্ঠন করে। ক্যানিং, জয়নগর, কুন্তলীবাসন্তীনগরের পুলিশ থানায় অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত করে[৩]

পটভূমি[সম্পাদনা]

১৯ ফেব্রুবারী তারিখের মধ্যরাত্রিতে ক্যানিং অঞ্চলের অন্তর্গত ঘুটিয়াড়ী শরীফের একজন ইমাম জয়নগরের জামতলায় ধার্মিক অনুষ্ঠান শেষ করে বন্ধুদের সাথে মটর সাইকেল করে আসছিলেন।রাত প্রায় ২টার নাগাদ নোলিয়াখলির পথে তাঁদের থামানো হয় ও টাকা লুণ্ঠন করে গুলি মারা হয়[৪]। পুলিশ তথ্যমতে এক অসনাক্ত বন্দুকধারী ব্যক্তি সর্বমোট ১১৫০০০০.০০ ভারতীয় টাকা লুণ্ঠন করে ইমামকে গুলি করে ফলে তাঁর মৃত্যু হয়[৩]। অন্যদিকে তাঁর সহচরেরা গভীরভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে পালিয়ে যায়। গোলাবাড়ি থেকে ক্যানিং অভিমুখে যাত্রা করা গাড়িচালক রাস্তায় মৃতদেহটির সন্ধান পেয়ে নিকটবর্তী আরক্ষী থানায় খবর জানায়। একই পথে চলাচল করা বাসচালকেরা হত্যার সাথে জড়িত বিভিন্ন তথ্যের সন্ধান পুলিশকে অবগত করায়। পুলিশ কর্ত্তৃপক্ষ এই ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব দেন নাই অন্যদিকে নলিয়াখলি পরিদর্শনে বিরত থাকে[৫][৬]। পুলিশ অপরাধী ব্যক্তিকে সনাক্ত করতে অক্ষম হয় ও হত্যার মূল কারণ নির্নয়ে অক্ষম হয়। অন্যদিকে এক বৃহৎ মুসলমান সম্প্রদায়ের ভিড় স্থানীয় লোকদের উপর নির্যাতন করা শুরু করে[২][৬]

দাঙ্গা[সম্পাদনা]

নলিয়াখলি গোপালপুর পঞ্চায়তের অন্তর্গত এক হিন্দু সংখ্যাগুরু অঞ্চল যা ক্যানিং থানার আওয়াতাভুক্ত[৭] । সহস্র লোক ক্যানিং, জীবনতলা, সারেঙ্গাবাদ, ঝোরোরমোর, ধোঁয়াঘাটা, নারায়ণপুর থেকে এসে মৃতকের চারপাশে ভিড় করেছিল[৫][৭]।পোস্ট মর্টমের জন্য মৃতদেহটি হস্পিতাল নিয়ে যাওয়ার সময় ক্ষুব্ধ মুসলমান জনতা হিন্দু পুলিশের উপর ঈট, পাথর ছুঁড়ে মারে।পুলিশ কর্মকর্তা অনুপ কুমার ঘোষ গভীর ভাবে আঘাত হয়। তাঁকে ক্যানিং চিকিৎসালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়[৭]। আক্রমণে সর্বমোট সাঁতজন পুলিশকর্মী আঘাত প্রাপ্ত হয়[৮]। উগ্র জনতারা পুলিশের বাহন ক্ষতিগ্রস্ত করে[৮]। মৃতকের আত্মীয়রা কলকতা থেকে ট্রাক করে ক্যানিংয়ে এসে জড়ো হয়েছিল। স্থানীয় বিদ্যালয়ের প্রধাম শিক্ষকের মতে জনতার ভিড় ক্রমে সহিংসতার রূপ নিয়েছিল। কমপক্ষে ১০০০০ জন ক্ষুব্ধ জনতা দিন প্রায় ১০টার সময় নলিয়াখালি আক্রমণ করে[৪]। ঘড়ে আগুন দেওয়ায় হিন্দুরা ভয়ে গৃহ ছেড়ে পালিয়ে যায় এই সুযোগে মুসলমানেরা লুণ্ঠন করে।পেট্রোল ও বোমা নিক্ষেপ করায় ঘড় ভষ্মে পরিণত হয়[৫][৬][৬][৭][৯]। ধোপারমোর ও বাঙাল পাড়ায় দাঙ্গা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। গোপালপুর, গোলাদাগ্রা ও হিরোভাঙ্গায় হিন্দু দোকান ও গড়ে আগুন লাগিয়ে লুণ্ঠন করা হয়।ক্ষুব্ধ জনতার ভিড় ভাঙ্গনখলি, প্রিয়োরমোর, হস্পিতালমোর, নতুনহাটের পথ ঘেরাও করে। আরেকদল দক্ষিণ শিয়ালদহ লাইনের অন্তর্গত সোণারপুর-ক্যানিং বিভাগের ঘুটিয়ারি শরীফ স্টেশনের রেলপথ আবদ্ধ করে[৬][১০]

প্রায় ১১টার সময়ে দক্ষিণ ২৪ পরগনার পুলিশ সচিব প্রবীণ কুমার ত্রিপাঠী ঘটনাস্থলে সসৈন্য সহকারে উপস্থিত হয়[৫]। সেনাবাহিনী লাঠি চার্জ করায় দাঙ্গাকারীরা পালিয়ে যায়। তারপর ইমামের মৃতদেহ পোস্ট মর্টামের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়[৭]। বিধাননগর পুলিশ ও হাওড়া পুলিশের তত্বাবধানে অগ্নিনির্বাপকবাহিনী জ্বলন্ত ঘরগুলোর আগুন নিবিয়ে দেয়। প্রশাসন থেকে দাঙ্গা সংঘটিত স্থানে ১৪৪ধারা ও সান্ধ্য আইন জারী করা হয়[১১]

ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ[সম্পাদনা]

ক্যানিং দাঙ্গায় ক্যানিং, কুল্তলি, জয়নগর ও বাসন্তি থানার অন্তর্গত অঞ্চলে প্রায় ২০০ ঘড় আগুনে ভষ্মীভূত হয়েছিল। ২০০০ ব্যক্তি গৃহছাড়া হয়েছিল[১২]। কিছু সংক্ষকদের সুরক্ষা শিবিরে রাখা হয়েছিল যদিও অধিকাংশ রাস্তায় বসবাস করতে বাধ্য হয়েছিল।রাজ্য সরকারের তরফ থেকে মৃত ইমামের পরিবাবরকে ৩লক্ষ টাকা ও অন্যদিকে দাঙ্গায় পীড়িত ৯৩টি পরিবারকে ১০হাজার টাকা প্রদানের ঘোষণা করা হয়েছিল[১২]। দাঙ্গায় জড়িত ৫২জনকে পুলিশ গ্রেফতার করেছিল[৪]। কয়েকটি এনজিও সংস্থা নলিয়াখলির দাঙ্গা পীড়িতদের জন্য খাদ্য ও ঔষধের যোগান ধরেছিল[৪] । তৃণমূল নেতা গিয়াসুদ্দিন মোল্লা ক্যানিং দাঙ্গার মূল কারণ হিসেবে আসন্ন পঞ্চায়ত নির্বাচনের পরিপেক্ষিতে কংগ্রেস ও সিপিআইএম অভিযুক্ত করেছেন[৩]।মূখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সকলকে শান্তির জন্য আহ্বান করেছিলেন ও হত্যাকাণ্ডের জন্য বিশেষ তদন্তকারীর দল গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন[৬]। আসন্ন পঞ্চায়ত নির্বাচনের কারণে দাঙ্গা সংঘঠিত হওয়ার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গী পরিলক্ষিত হয়েছিল। উল্লেখযোগ্য যে তৃণমূল এবং সিপিআইএম উভয়েই মুসলমান ভোটারের আশায় ছিল[৯]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. West Bengal: 200 homes torched, shops ransacked in riots
  2. Ali, Arshad (২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৩)। "Muslim cleric shot dead in Canning"The Indian Express। সংগ্রহের তারিখ ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ 
  3. HT Correspondent (২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৩)। "Maulana murder: clashes erupt in S 24-Pgs, 46 held"Hindustan Times। সংগ্রহের তারিখ ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ 
  4. Banerjie, Monideepa (২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৩)। "200 houses burnt in Bengal village by mob protesting cleric's death"NDTV। সংগ্রহের তারিখ ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ 
  5. Caesar Mandal (২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৩)। "Violence after villager murder"Times of India। ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ 
  6. Dinda, Archisman (২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৩)। "Communal violence returns to haunt Bengal"Gulf NewsDubai। সংগ্রহের তারিখ ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ 
  7. Saha, Prasenjeet (২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৩)। "100 houses gutted in protest against murder"The Bengal Post। Kolkata। ১৩ আগস্ট ২০১৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ 
  8. "গুলিতে মৃত্যু, ক্যানিংয়ে তুলকালাম"Anandabazar Patrika (Bengali ভাষায়)। Kolkata। ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৩। ২৪ মার্চ ২০১৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ 
  9. "West Bengal: 200 homes torched, shops ransacked in riots"Oneindia News। ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৩। সংগ্রহের তারিখ ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ 
  10. "Communal flare-up in WB"UdupiNet। ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৩। ৫ মার্চ ২০১৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ 
  11. "Priest shot dead at Canning"The Statesman। Kolkata। ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৩। সংগ্রহের তারিখ ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ 
  12. "South 24 Parganas tense, calm"Hindustan Times। Kolkata। ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৩। সংগ্রহের তারিখ ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৩