সিন্ডার কোণ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
একটি সাধারণ সিন্ডার কোণের অভ্যন্তরীণ কাঠামোর

সিন্ডার কোণ হল খাড়া শঙ্কু পাহাড়, যেটি তৈরি হয়েছে আগ্নেয়গিরিজাত ঝামা, আগ্নেয় ছাই, বা সিন্ডারের মত আলগা পাইরোক্লাস্টিক খণ্ড দিয়ে। এটি আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখের চারপাশে তৈরি হয়।[১][২] সাধারণত আগ্নেয়গিরির নলাকার মুখ থেকে ভীষণ অগ্ন্যুৎপাত বা লাভার ফোয়ারা থেকে পাইরোক্লাস্টিক খণ্ড তৈরি হয়। উচ্চ চাপে গ্যাস-মিশ্রিত লাভা উদ্গীরন হবার সময় সেটি ছোট ছোট খণ্ডে ভেঙে যায়। সেটি জমে যায় এবং মুখের আশেপাশে কঠিন ছাই, ঝামা বা স্কোরিয়া (আগ্নেয় শিলা) হিসাবে প'ড়ে শঙ্কুর মত তৈরি করে। সেটি প্রায়শই প্রতিসম হয়, যার ঢাল থাকে ৩০–৪০°; এর ভূমিতল হয় মোটামুটি গোলাকার। বেশিরভাগ সিন্ডার শিখরগুলিতে একটি বাটি আকারের গর্ত থাকে।[১]

বিস্ফোরণের পদ্ধতি[সম্পাদনা]

একটি সিন্ডার কোণ বা স্কোরিয়া কোণের প্রস্থচ্ছেদের ছবি

শিলা খণ্ডগুলি, যেগুলি সিন্ডার বা স্কোরিয়া নামে পরিচিত, সেগুলি চেহারায় কাঁচের মত। ম্যাগমা বায়ুতে বিস্ফোরিত হওয়ার সাথে সাথে দ্রুত ঠান্ডা হয়ে যাওয়ায় অসংখ্য গ্যাস বুদবুদ তার মধ্যে "হিমায়িত" হয়ে থাকে।[২] সিন্ডার কোণগুলির আকারে কয়েকশো মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। [২] সিন্ডার কোণ পাইরোক্লাস্টিক উপাদান দিয়ে তৈরি। অনেকগুলি সিন্ডার কোণের শীর্ষে একটি বাটি-আকারের গর্ত থাকে। একটি সিন্ডার-কোণের বিস্ফোরণের ক্ষয় পর্যায়ে, ম্যাগমা থেকে বেশিরভাগ গ্যাস মুক্ত হয়ে যায়। এই গ্যাস-ক্ষয়প্রাপ্ত ম্যাগমা ঝর্ণার মত অগ্ন্যুৎপাত করে না তবে ধীরে ধীরে গর্তে বা কোণের ভূমিস্থলে লাভা হিসাবে জমতে থাকে।[৩] লাভা খুব কমই শীর্ষস্থান বার হয় (যদি না ঝর্ণার মত বার হয়) কারণ গলিত শিলা যখন প্রধান জ্বালামুখের মধ্য দিয়ে উপরিতলে ওঠে, ঢিলে এবং খোলা সিন্ডার সেই চাপকে নিতে পারেনা।[২] গলিত লাভায় খুব কম পরিমানে গ্যাসের বুদ্বুদ থাকার কারণে বুদ্বুদ সমৃদ্ধ সিন্ডারের চেয়ে সেটি বেশি ঘন হয়।[৩] তাই, অনেক সময়েই লাভা সিন্ডার কোণের নিচ দিয়ে বের হয়ে আসে, কম ঘন সিন্ডার জলের উপর কর্কের মতো এতে ভেসে থাকে। লাভা বাইরের দিকে অগ্রসর হয় এবং কোণের ভূমিতলের চারপাশে একটি লাভা প্রবাহ তৈরি করে।[৩] বিস্ফোরণ শেষ হলে, লাভা শয্যায় সিন্ডারের একটি প্রতিসম কোণ তৈরি হয়ে যায়।[৩] গর্তটি পুরোপুরি ভরাট হয়ে গেলে, বাকিগুলি জ্বালামুখের চারপাশে অ্যাম্ফিথিয়েটার বা অশ্বক্ষুরাকৃতি আকার তৈরি করে।

প্রাপ্তিস্থান[সম্পাদনা]

১৯৪৩ সালে পারিকুটিনের অগ্ন্যুৎপাত।

সিন্ডার কোণগুলি সাধারণত ঢাল আগ্নেয়গিরি, মিশ্র আগ্নেয়গিরি এবং ক্যালডেরার পার্শ্বদেশে দেখতে পাওয়া যায়।[২] উদাহরণস্বরূপ, ভূতাত্ত্বিকগণ হাওয়াইদ্বীপের মওনা কি ঢাল আগ্নেয়গিরির প্রান্তে প্রায় ১০০ টি সিন্ডার কোণ খুঁজে পেয়েছেন।[২]

সর্বাধিক বিখ্যাত সিন্ডার কোণ, পারিকুটিন, ১৯৪৩ সালে মেক্সিকোর একটি ভুট্টা ক্ষেতে একটি নতুন জ্বালামুখ থেকে গড়ে উঠেছিল।[২] বিস্ফোরণ নয় বছর ধরে চলেছিল। কোণের উচ্চতা হয়েছিল ৪২৪ মিটার (১,৩৯১ ফু), এবং উৎপন্ন লাভা ২৫ কিমি (৯.৭ মা) অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল।[২]

পৃথিবীর সবচেয়ে ঐতিহাসিকভাবে সক্রিয় সিন্ডার কোণ হল নিকারাগুয়ার সেরো নেগ্রো[২] এটি চারটি নবীন সিন্ডার কোণেরর একটি অংশ। এটি লাস পিলাস আগ্নেয়গিরির উত্তর পশ্চিম দিকে অবস্থিত। ১৮৫০ সালে এটির প্রাথমিক বিস্ফোরণ হওয়ার পরে, এটি ২০ বারেরও বেশি বার অগ্ন্যুৎপাত করেছে। সম্প্রতি ১৯৯৫ এবং ১৯৯৯ সালে এটির অগ্ন্যুৎপাত হয়েছিল।[২]

উপগ্রহ চিত্রের উপর ভিত্তি করে অনুমান করা গিয়েছিল যে সৌরজগতে অন্যান্য স্থলভাগেও সিন্ডার কোণ থাকতে পারে।[৪] থারসিসয়ে পাভোনিস মনস এর পার্শ্বদেশে,[৫][৬]হাইড্রোটেস কেওস অঞ্চলে[৭] কপ্রেটস চসমার নিচে,[৮] এবং উলেসেস কলসের আগ্নেয় ক্ষেত্রে সিন্ডার কোণ আছে আন্দাজ করা হয়।[৯] আরও অনুমান করা হয়েছে যে,মরিয়াস হিলসের গম্বুজাকৃতি কাঠামোটি একটি চান্দ্র সিন্ডার কোণ।[১০]

পরিবেশগত অবস্থার প্রভাব[সম্পাদনা]

সোজা দাঁড়িয়ে থাকা এসপি ক্রেটার, অ্যারিজোনায় একটি বিলুপ্ত সিন্ডার কোণ

সিন্ডার কোণেরর আকার এবং আকৃতি পরিবেশগত বৈশিষ্ট্যের উপর নির্ভর করে। বিভিন্ন স্থানের বিভিন্ন মাধ্যাকর্ষণ এবং / বা বায়ুমণ্ডলীয় চাপের ফলে বিক্ষিপ্ত স্কোরিয়া কণার বিচ্ছুরণের পরিবর্তন হতে পারে।[৪] উদাহরণস্বরূপ, মঙ্গলগ্রহের সিন্ডার কোণ অন্য গ্রহের সিন্ডার কোণের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি প্রশস্ত বলে মনে হয়[৯] সেখানে বায়ুমণ্ডলীয় চাপ এবং মাধ্যাকর্ষণ কম হওয়ার ফলে বৃহত্তর অঞ্চল জুড়ে বহির্মুখী কণাগুলি ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম হয়েছে।[৪][১১] সুতরাং, এটি মনে হয় যে, মঙ্গলগ্রহে, উদ্গীরিত বস্তুপুঞ্জের পক্ষে পার্শ্ববর্তী ঢালু অঞ্চলে সংকট অবতরণ কোণ অর্জন করা সম্ভব নয়। মঙ্গল গ্রহের সিন্ডার কোণগুলি মূলত ক্ষেপক বিতরণ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বলে মনে হয়, যেখানে পৃথিবীতে, সেটি উপাদানগুলির পুনরায় বিতরণ দ্বারা হয়।[১১]

মনোজেনেটিক কোণ[সম্পাদনা]

কিছু সিন্ডার কোণ হল মনোজেনেটিক – অর্থাৎ এই ক্ষেত্রে শুধুমাত্র একবার উদ্গীরণ হয়, কখনোই অগ্ন্যুৎপাতের পুনরাবৃত্তি হয়না। মেক্সিকোয় পারিকুটিন, হাওয়াই দ্বীপের ডায়মন্ড হেড, কোকো হেড, পাঞ্চবোল ক্রেটার এবং মওনা কিয়ায় কয়েকটি সিন্ডার কোণ হল মনোজেনেটিক সিন্ডার কোণ।

মনোজেনেটিক বিস্ফোরণগুলি ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে হতে পারে।[১২] পারিকুটিন ১৯৪৩ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত উদ্গীরণ করেছিল।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Poldervaart, A (১৯৭১)। "Volcanicity and forms of extrusive bodies"। Green, J; Short, NM। Volcanic Landforms and Surface Features: A Photographic Atlas and Glossary। New York: Springer-Verlag। পৃষ্ঠা 1–18। আইএসবিএন 978-3-642-65152-6 
  2. টেমপ্লেট:USGS
  3. টেমপ্লেট:USGS
  4. Wood, C.A. (১৯৭৯)। "Cinder cones on Earth, Moon and Mars"। Lunar Planet. Sci.X। পৃষ্ঠা 1370–72। 
  5. Bleacher, J.E.; Greeley, R.; Williams, D.A.; Cave, S.R.; Neukum, G. (২০০৭)। "Trends in effusive style at the Tharsis Montes, Mars, and implications for the development of the Tharsis province"। J. Geophys. Res.112 (E9): E09005। ডিওআই:10.1029/2006JE002873বিবকোড:2007JGRE..112.9005B 
  6. Keszthelyi, L.; Jaeger, W.; McEwen, A.; Tornabene, L.; Beyer, R.A.; Dundas, C.; Milazzo, M. (২০০৮)। "High Resolution Imaging Science Experiment (HiRISE) images of volcanic terrains from the first 6 months of the Mars Reconnaissance Orbiter primary science phase"। J. Geophys. Res.113 (E4): E04005। ডিওআই:10.1029/2007JE002968বিবকোড:2008JGRE..113.4005Kসাইট সিয়ারX 10.1.1.455.1381অবাধে প্রবেশযোগ্য 
  7. Meresse, S; Costard, F; Mangold, N.; Masson, Philippe; Neukum, Gerhard; the HRSC Co-I Team (২০০৮)। "Formation and evolution of the chaotic terrains by subsidence and magmatism: Hydraotes Chaos, Mars"। Icarus194 (2): 487। ডিওআই:10.1016/j.icarus.2007.10.023বিবকোড:2008Icar..194..487M 
  8. Brož, Petr; Hauber, Ernst; Wray, James J.; Michael, Gregory (২০১৭)। "Amazonian volcanism inside Valles Marineris on Mars"Earth and Planetary Science Letters473: 122–130। ডিওআই:10.1016/j.epsl.2017.06.003বিবকোড:2017E&PSL.473..122B 
  9. Brož, P; Hauber, E (২০১২)। "A unique volcanic field in Tharsis, Mars: Pyroclastic cones as evidence for explosive eruptions"। Icarus218 (1): 88–99। ডিওআই:10.1016/j.icarus.2011.11.030বিবকোড:2012Icar..218...88B 
  10. Lawrence, SJ; Stopar, Julie D.; Hawke, B. Ray; Greenhagen, Benjamin T.; Cahill, Joshua T. S.; Bandfield, Joshua L.; Jolliff, Bradley L.; Denevi, Brett W.; Robinson, Mark S.; Glotch, Timothy D.; Bussey, D. Benjamin J.; Spudis, Paul D.; Giguere, Thomas A.; Garry, W. Brent (২০১৩)। "LRO observations of morphology and surface roughness of volcanic cones and lobate lava flows in the Marius Hills"। J. Geophys. Res. Planets118 (4): 615–34। ডিওআই:10.1002/jgre.20060বিবকোড:2013JGRE..118..615L 
  11. Brož, Petr; Čadek, Ondřej; Hauber, Ernst; Rossi, Angelo Pio (২০১৪)। "Shape of scoria cones on Mars: Insights from numerical modeling of ballistic pathways" (PDF)Earth and Planetary Science Letters406: 14–23। ডিওআই:10.1016/j.epsl.2014.09.002বিবকোড:2014E&PSL.406...14B 
  12. "Monogenetic volcanic fields: Origin, sedimentary record, and relationship with polygenetic volcanism"। সংগ্রহের তারিখ ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০