সাত ভাই চম্পা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান

সাত ভাই চম্পা বা সাত ভাই চাম্পা হলো বাংলাদেশের একটি জনপ্রিয় রূপকথার গল্প। গল্পটি অনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম প্রকাশ হয়েছিল ১৯০৭ সালে দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের ঠাকুরমার ঝুলি নামক রূপকথার বইয়ে। সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই বইয়ের ভূমিকা লিখেছিলেন। ১৯৪৪ সালে বিষ্ণু দে কর্তৃক গল্পটি পুনরায় বিস্তারিতভাবে সাত ভাই চাম্পা নামে প্রকাশিত হয়েছিল।[১] সাত ভাই চম্পার গল্প অবলম্বনে বেশ কয়েকটি বাংলা চলচ্চিত্র নির্মীত হয়েছিল। ১৯৬৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সাত ভাই চম্পা চলচ্চিত্রটিকে ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউট সর্বকালের সেরা দশটি বাংলা চলচ্চিত্রের মধ্যে স্থান দিয়েছে।[২]

কাহিনীসংক্ষেপ[সম্পাদনা]

এক দেশে থাকে এক রাজা ছিল ও তাঁর ছিল ৬ বউ। রাজা পরপর ৬টি বিয়ে করেছেন কিন্তু কোনো বিবির ঘরেই কোনো সন্তান হয় নি। এই নিয়ে রাজার মনে অনেক দুঃখ। শুধু রাজাই নয়, রাজ্যের সকল প্রজাদের মাঝেও অসন্তোষ। একদিন রাজা স্বপ্নে জানতে পারলেন, আরো একটি বিয়ে করলে সপ্তম বিবির ঘরে আসবে সন্তান।

সন্তানের আশায় তিনি বিয়ে করলেন আবার। নতুন বিবি ঘরে এনেছে দেখে আগের ছয় বিবির গায়ে জ্বালা উঠে যায়। আগের রানীদের ছয় জনই খুব অহংকারী, দেমাগী। ছোট রানী খুব শান্ত ও নম্র। এ জন্য রাজা ছোট রানীকে বেশি ভালোবাসতেন। ফলে ছয় রানীর চোখের বিষ হয়ে যায় ছোট রানী। একদিন খবর আসে ছোট রানী সন্তানসম্ভবা। এই খুশিতে প্রজাদের জন্য রাজকোষ এবং রাজভাণ্ডার খুলে দেন রাজা। সেখান থেকে প্রয়োজন মতো অর্থ ও সম্পদ নিতে পারবে প্রজারা। দেখতে দেখতে জন্মের সময় চলে এলো। আতুর ঘরে রইলেন ছয় রানী এবং একজন গৃহপরিচারিকা। বাইরে সন্তানের মুখ দেখার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন রাজা।

অজ্ঞান অবস্থায় ছোট রানী সাতটি ছেলে এবং একটি সন্তানের জন্ম দেন। হিংসুটে ছয় রানী চক্রান্ত করে জন্মের পরপরই ছেলেগুলোকে সরিয়ে ফেলে। কাঁচা মাটির পাত্রে ভরে তাদেরকে পুতে দেয় প্রাসাদের পেছনের বাগানে এবং জানায় রাণীর গর্ভে সাতটি ব্যাঙ ও একটি ইঁদুর জন্মগ্রহন করেছে। রাজা খবর শুনে রেগে গিয়ে ছোট রাণীকে রাজপ্রাসাদ থেকে বের করে দেন।

এভাবে চলতে থাকে, দিন দিন খাঁ খাঁ করতে থাকে রাজবাড়ি। একদিন রাজ বাগানের মালী এসে জানায় পূজা দেবার জন্য বাগানে যথেষ্ট ফুল নেই। একটি গাছে শুধু সাতটি চম্পা আর একটি পারুল ফুল আছে। রাজা বললেন, এগুলোকেই নিয়ে আসো। মালী ফুল আনতে গেলে তারা হাতের নাগালের বাইরে উপরে উঠে যায়। মালী আবারো ধরতে গেলে বলে, রাজা না আসলে এই ফুল ছিঁড়তে দেবে না। এমন অদ্ভুত ঘটনা শুনে রাজা সাথে সাথে চলে আসলেন। আসার পর তারা আবার জানায়, বড় রানী না আসলে ফুল দেবে না। বড় রানী আসার পর জানায়, মেজ রানী না আসলে দেবে না। মেজ রানী আসলে আবার জানায় সেজ রানীর দাবী। এভাবে সকল রানী আসার পর সাতটি চম্পা ফুল বলে বনবাসে যাওয়া দুঃখী ছোট রানী না আসলে কাউকে ফুল ছিঁড়তে দেয়া হবে না। ঘোড়সওয়ার পাঠিয়ে বন থেকে খুঁজে বের করে আনা হলো ছোট রানীকে।

ছোট রানীর গায়ের কাপড় ছেড়া। এই বেশেই ফুল তোলার জন্য হাত বাড়ালেন, আর অমনিই কোলে নেমে আসে সাতটি রাজপুত্র আর একটি রাজকন্যা। মানবরূপ ধারণ করার সাথে সাথেই তারা মা মা বলে ডাকা শুরু করলো ছোট রানীকে। পুতে দেবার ফলে তারা মরে যায়নি, বাগানের ফুল হয়ে বেঁচে ছিল এতদিন। এরপর তারা ছয় রানীর অপকর্মের কথা বললেন রাজাকে। এমন অমানবিক কাজের কথা শুনে ছয় রানীকে কাটা দিয়ে পুতে ফেলার আদেশ দিলেন রাজা। এরপর রাজা সুখে শান্তিতে দিন কাটাতে লাগলেন এবং রাজ্যেও অপয়া কেটে গিয়ে বিরাজ করতে লাগলো সুখ।

চলচ্চিত্রায়ন[সম্পাদনা]

সাত ভাই চম্পা (১৯৬৮)[সম্পাদনা]

১৯৬৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান আমলে চলচ্চিত্রটি তৈরি করা হয়েছিল। চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেছেন দীলিপ সোম এবং প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন, কবরীখান আতাউর রহমান। চলচ্চিত্রটিকে ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউট সর্বকালের সেরা দশটি বাংলা চলচ্চিত্রের মধ্যে স্থান দিয়েছে।[২]

সাত ভাই চাম্পা (১৯৭৮)[সম্পাদনা]

১৯৭৮ সালের চলচ্চিত্রটি পশ্চিমবঙ্গ, ভারতে তৈরি হয়েছিল। চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেছেন চিত্রস্বারথী এবং সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন রগুনাথ দাস। চলচ্চিত্রটিতে অভিনয় করেছেন, বিশ্বজিত, সন্ধ্যা রায়, গীতা কর্মকার, মৃনাল মুখপাধ্যায়, বিশ্বনাথ চট্টপাধ্যায় ও চন্দা চট্টপাধ্যায়।

সাত ভাই চাম্পা (১৯৯৪)[সম্পাদনা]

চলচ্চিত্রটি বাংলাদেশে তৈরি করা হয়েছিল এবং এটি ছিল ১৯৬৮ সালে নির্মীত চলচ্চিত্রের পুনর্নির্মাণ।

শিল্পকর্ম[সম্পাদনা]

গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর দ্বারা অঙ্কিত সাত ভাই চাম্পা চিত্রকর্মটি সমসাময়িক ভারতীয় চিত্রকলার একটি মাষ্টারপিস বলে মনে করা হয়।[৩] বর্তমানে এটি কলকাতার অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসে রয়েছে।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. 0. Sat Bhai Champa, সংগ্রহের তারিখ ২০১০-০৩-১৭ 
  2. "Top 10 Bangladeshi Films"ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউট। ২০০৭-০৭-১৭। ২০০৯-০৫-২৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১৫-১০-১৭ 
  3. 0. Academy of Fine Arts, সংগ্রহের তারিখ ২০১০-০৩-১৭ 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]