সলিমুল্লাহ এতিমখানা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

স্যার সলিমুল্লাহ এতিমখানা বাংলাদেশের ঢাকায় অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক এতিমখানা, যেটি মূলত স্যার সলিমুল্লাহ মুসমিল এতিমখান নামে পরিচিত। এটি ১৯০৯ সালে নবাব স্যার সলিমুল্লাহ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়। এতিমখানাটি আজিমপুরে অবস্থিত।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

১৯০৯ সালে নবাব স্যার সলিমুল্লাহ ঢাকায় সলিমুল্লাহ এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করেন যেটি প্রাথমিকভাবে ইসলামিয়া এতিমখানা নামে পরিচিত ছিল। এটি আহসান মঞ্জিলের নিকটবর্তী কুমারটুলিতে একটি ভাড়া বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।[১] এতিমখানাটি পরিচালনার জন্য স্যার সলিমুল্লাহ মাসিক ২০০ রুপি অনুদান হিসেবে দান করেন। ১৯১২ সালে এতিমখানা পরিচালনার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়। এতিমের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় ১৯১৩ সালে লালবাগ দুর্গের নিকটবর্তী আজিমপুরে এটি স্থানান্তর করা হয়।[১]

১৯১৩ সালে বাংলার গভর্নর লর্ড কারমাইকেল (১৯১২-১৯৭১) এতিমখানা পরিদর্শন করেন এবং এর কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ১০০০( এক হাজার) রুপি প্রদান করেন। তিনি এতিমখানার ভবন নির্মাণের জন্য, আমলাপাড়া গোরে শহীদ মসজিদের নিকট একটি সরকারী জমিও বরাদ্দ করেন। এর বেশিরভাগ ব্যয় বহন করেছেন খাজা সলিমুল্লাহ। তাঁর মৃত্যুর পর এতিমখানাটির ব্যবস্থাপনা এক বিশাল অর্থনৈতিক সংকটের সন্মুখীন হয়। এহেন অবস্থায় ঢাকা শহরের অনেক স্থানীয় বাসিন্দা আর্থিক সহায়তার দ্বার উন্মোচন করেন এবং এতিমখানাটির নতুন নামকরণ করেন সলিমুল্লাহ এতিমখানা।[১]

লর্ড কারমাইকেল ১৯১৬ সালে এতিমখানাটি পুনরায় পরিদর্শনকালে নবাব হাবিবুল্লাহ ওয়ার্ডের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। ১৯২৩ সালে এতিমখানাটি আবারও আর্থিক সঙ্কটের সন্মুখীন হলে, সংকট কাটিয়ে উঠার জন্য নবাব হাবিবুল্লাহ এবং চৌধুরী ফরিদ উদ্দিন আহমেদ সিদ্দিকীকে যথাক্রমে চেয়ারম্যান ও সচিব মনোনীত করে পরিচালনা কমিটি পুনর্গঠন করা হয়। ১৯২৬ সালে লর্ড লিটন (১৯২২-১৯২৭) এতিমখানায় সৌজন্য সাক্ষাতকালে ২৫০০ (আড়াই হাজার) রুপি অনুদান হিসেবে প্রদান করেন। তিনি এতিমদের কারিগরি শিক্ষা দেওয়ার জন্য কারখানা-বিভাগের উদ্বোধন করেন। একই বছর সৈয়দ নবাব আলী চৌধুরীর পরিদর্শনকালে এতিমখানার বর্ধিত ভবনের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপিত হয়।

১৯৩১ সালে তৎকালীন বাংলার গভর্নর স্যার স্ট্যানলি জ্যাকসনের স্ত্রী লেডি জ্যাকসন এতিমখানায় পরিদর্শনে গিয়ে ২২,৮৫৩ (বাইশ হাজার আটশত তিপ্পান্ন) রুপি ব্যয়ে নির্মিত স্যার আহসানউল্লাহ ওয়ার্ড নামে একটি ভবন উদ্বোধন করেন। নওয়াব আলি চৌধুরী এই উদ্দেশ্যে ১০০০০ (দশ হাজার) রুপি অনুদান দিয়েছিলেন। তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিন সরকারের কোষাগার থেকে অবশিষ্ট ব্যয় পরিচালনা করেছিলেন। লেডি জ্যাকসন ২৩,১৭৫ (তেইশ হাজার একশত পচাত্তর) রুপি ব্যয়ে নির্মিত জেনানা মহল (মহিলা ওয়ার্ড) নামে নতুন একটি ভবনের ফলক উন্মোচন করেন। এই পরিমাণের মধ্যে খাজা সালাহউদ্দিন ১০,০০০ (দশ হাজার) রুপি দান করেন এবং অবশিষ্ট অর্থ সরকারী কোষাগার থেকে খরচ করা হয়। পরবর্তীতে জেনানা মহলকে নবাব বেগম আসমত-উন-নেসা ওয়ার্ড হিসাবে নামকরণ করা হয়। একই বছর, একটি বর্ধিত ওয়ার্ডে তাঁত বিভাগের উদ্বোধন করা হয়।

১৯৩২ সালে এতিমখানার উন্নয়নের জন্য একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়। পর্যাপ্ত তহবিল সংগ্রহ ও একটি নতুন ভবন নির্মাণ এবং এতিমদের প্রশিক্ষণের জন্য যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদি ক্রয় করা হয়। দর্জি, কামার, বুনন, রাজমিস্ত্রি, সরকারী চাকরি এবং উদ্যান সম্পর্কিত বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ কোর্স পরিচালনার জন্য শিক্ষক নিযুক্ত করা হয়। এই প্রশিক্ষণগুলো সম্পন্ন করার পর অনেক শিক্ষার্থী আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল এবং শ্রী রামপুর তাঁত বিদ্যালয়ে শিক্ষা গ্রহণ করেন।

সমাজকল্যাণ বিভাগের অধীনে নিবন্ধিত সংস্থা হিসাবে সরকারী এবং বেসরকারী উভয় খাতের অনুদান দ্বারা এতিমখানাটি পরিচালিত হয়। এতিমখানার পরিচালনা পর্ষদের সদস্য সংখ্যা ১৫ জন। ২০০৩ সালে পরিচালনা কমিটির সভাপতি এতিমখানার জমিতে ভবন নির্মাণের জন্য কনকর্ডের সাথে চুক্তিবদ্ধ হন।[২] চুক্তিতে এতিমখানা ক্ষতিগ্রস্ত হবে বিধায় পরিচালনা কমিটির মধ্যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। ২০০৮ সালের ২ জানুয়ারি সরকার পরিচালনা কমিটি বাতিল করে এতিমখানাকে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানে পরিনত করে। পরিচালনা কমিটির দুর্নীতির বিরুদ্ধে চারজন শিক্ষার্থী হাইকোর্টে রিট আবেদন করে। ২০১৩ সালে এতিমখানার চার শিক্ষার্থীর পক্ষে হাইকোর্টে করা রিটে যুক্ত হয় মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যাণ্ড পিস ফর বাংলাদেশ এবং ২০১৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর রিটের রায়ে কনকর্ডের ভবন বাজেয়াপ্ত করে এতিমখানাকে বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেয়। পরে কনকর্ড আপীল করলে আপীলের রায়ে কনকর্ডের নির্মিত ১৮তলার ভবন এতিমখানাকে বুঝিয়ে দিতে নির্দেশ প্রদান করা হয়।[৩]

চিত্রশালা[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]