শশধর তর্কচূড়ামণি

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
শশধর তর্কচূড়ামণি
জন্ম
শশধর তর্কচূড়ামণি

১৮৫১
মৃত্যু১৯২৮
পিতা-মাতাহলধর বিদ্যামণি (পিতা)
সুরেশ্বরী দেবী (মাতা)

শশধর তর্কচূড়ামণি (১৮৫১ — ১৯২৮) ছিলেন একজন প্রসিদ্ধ পণ্ডিত, বাগ্মী, হিন্দুধর্মের ব্যাখ্যাতা ও প্রচারক। [১]

জীবনী[সম্পাদনা]

শশধর তর্কচূড়ামণির জন্ম বৃটিশ ভারতের অধুনা বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার মুখডোবা গ্রামের যজুর্বেদী কাশ্যপ বংশে। পিতা হলধর বিদ্যামণি ও মাতা সুরেশ্বরী দেবী। তিনি পিতার কাছেই নানা শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। ঊনিশতকের দ্বিতীয়ার্ধে তিনি হিন্দুধর্ম প্রচারে আগ্রহী হয়ে বাংলার বিভিন্ন স্থানে বক্তৃতা করতে বের হন। [২]একসময় চলে আসেন বহরমপুরে। কাশিমবাজার রাজার সভাপণ্ডিত নিযুক্ত হন। ইতিমধ্যে বর্ধমানের ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের  মাধ্যমে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। বঙ্কিমচন্দ্রের সঙ্গে শশধর তর্কচূড়ামণির পরিচয় এবং শশধর  চূড়ামণির হিন্দুধর্মের দৃষ্টিভঙ্গির প্রচার-প্রসারের স্বার্থে প্রাথমিকভাবে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সমস্ত উদ্যোগও নিয়েছিলেন। ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে অ্যালবার্ট হলে সর্বসমক্ষে শশধর তর্কচূড়ামণির আনুষ্ঠানিক পরিচয় প্রদান করেছিলেন সাহিত্য সম্রাট।[৩] ধর্মালোচনার সভায় তার বাচনভঙ্গিতে বঙ্কিমচন্দ্রও বচনমুগ্ধ হন এবং তার কলকাতার বাড়িতে রবিবাসরীয় সন্ধ্যায় সাহিত্য বৈঠকে তিনি ধর্মালোচনার প্রসার করতেন। রামকৃষ্ণদেব শশধর তর্কচূড়ামণির ধর্ম প্রচারাদির কথা জানতে পেরে তাকে দেখার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। অতঃপর ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে ভক্ত ঈশান মুখোপাধ্যায়ের ঠনঠনিয়ার বাড়ি হতে গাড়িতে তার সঙ্গে দেখা করতে যান। রামকৃষ্ণদেবের কথায় ও উপদেশে এমন মুগ্ধ হন যে এক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুরের কাছে আসেন। ওই বৎসরেই উল্টোরথের দিন বলরাম মন্দিরে ঠাকুর ভাবাবিষ্ট অবস্থার শশধরের হৃদয় স্পর্শ করেন। পরে আরো কয়েকবার শশধর তর্কচূড়ামণি রামকৃষ্ণদেবের সংস্পর্শে এসেছিলেন।[২] তবে শশধর তর্কচূড়ামণি হিন্দুধর্মের প্রচার যে ব্যাখ্যায় করতেন তাতে কেবল রক্ষণশীল হিন্দুসমাজের স্বার্থ রক্ষিত হত। সহবাস-সম্মতি আইন প্রণয়নের বিরুদ্ধে তিনি আন্দোলন পরিচালনা করেন। তিনি প্রথম দিকে বঙ্গবাসী পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন এবং মূলত তারই কারণে পত্রিকাটি হিন্দুধর্মের মুখপত্র হয়ে দাঁড়ায়। তিনি নিজেও 'বেদব্যাস' নামে এক মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন। তার রচিত গ্রন্থ গুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল-

  • ধর্মব্যাখ্যা
  • ভবৌষধ
  • সাধন-প্রদীপ
  • চূড়ামণি দর্শন
  • দুর্গোৎসবপঞ্চক (ভক্তিসুধালহরী)

শেষ বয়সে শশধর তর্কচূড়ামণি বহরমপুরের জুবিলী টোলের অধ্যক্ষ হন। মুর্শিদাবাদের খাগড়ায় স্থায়ী বাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করতে থাকেন এবং সেখানেই প্রয়াত হন।

শশধর তর্কচূড়ামণির শ্রেষ্ঠত্বে বঙ্কিমচন্দ্রের ভূমিকা[সম্পাদনা]

ঊনিশ শতকে সনাতন ভারতের সর্বজ্ঞ মহাপণ্ডিতদের শ্রেষ্ঠত্বের বিচারে শশধর তর্কচূড়ামণি অন্যতম দাবিদার ছিলেন। শশধর তর্কচূড়ামণি ছিলেন একজন স্বনামধন্য বাগ্মী। বাচনভঙ্গিতে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করতে পারতেন। হিন্দুধর্ম সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি বাংলায় ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি বঙ্কিমচন্দ্রের সাহায্য নিয়েছিলেন - ছুটে গিয়েছিলেন রামকৃষ্ণদেবের কাছে। বঙ্কিমচন্দ্র প্রথমদিকে তার বাচনভঙ্গিতে মুগ্ধ হন, তার বক্তৃতা মঞ্চে উপস্থিত থেকেছেন, এমনকি তার ভাষণ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথকে উদ্বুদ্ধ করতে চেষ্টা করেছিলেন। কিন্ত পরবর্তীতে শশধর তর্কচূড়ামণির বক্তব্যের সঙ্গে নিজের চিন্তাভাবনার মৌলিক পার্থক্য অনুভব করেন। কেননা, শশধর তর্কচূড়ামণি শতাব্দীর শেষভাগে হিন্দুধর্মের তান্ত্রিকতা সর্বস্ব আচার-বিচারে, বিভিন্ন বিষয়ের অপব্যাখার (যেমন, অগস্তমুণি কর্তৃক সমুদ্র শোষণ, হাঁচি, টিকটিকির বাধা নিষধ প্রভৃতি সংস্কারের বৈজ্ঞানিক অপব্যাখ্যা) পেছনে নিজের দৃষ্টিভঙ্গিতে গড়া অবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিতে শুরু করেছিলেন। সেকারণে, তার সঙ্গে খানিকটা দূরত্ব তৈরি হয়। কিন্ত ততদিনে শশধরকে সমাজে পরিচিত করে দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি যে ভূমিকা নিয়েছিলেন তার সূত্র ধরেই তৎকালীন বঙ্গসমাজে উপরতলার মানুষের সাহচর্য ও সমর্থন পেয়ে যান এবং রক্ষণশীল হিন্দুসমাজের নেতৃত্ব প্রদান তার পক্ষে সহজসাধ্য হয়। ।[৩]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. সুবোধ সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু সম্পাদিত, সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান, প্রথম খণ্ড, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা, নভেম্বর ২০১৩, পৃষ্ঠা ৭০২,৭০৩, আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-৭৯৫৫-১৩৫-৬
  2. "শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃতে উল্লিখিত ব্যক্তিবৃন্দের পরিচয়"। সংগ্রহের তারিখ ২০২২-০৫-১৩ 
  3. সায়ন্তন মজুমদার, বহরমপুর। "সম্পাদক সমীপেষু - বিশ্বাস বনাম বিজ্ঞান: একটি ইতিহাস"। সংগ্রহের তারিখ ২০২২-০৫-১৩