বিষয়বস্তুতে চলুন

শমরীয়বাদ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
শমরীয়বাদ
ࠔࠌࠓࠉࠌ
הדת השומרונית
السامرية
শমরীয় মেজ্জুজা
ধরনআব্রাহামীয়
ধর্মগ্রন্থশমরীয় তোরাহ
Separated fromইহুদিধর্ম
সদস্যশমরীয়

শমরীয়বাদ বা শমরীয় ধর্ম (শমরীয়: ࠔࠌࠓࠉࠌ, Shamerim; হিব্রু ভাষায়: הדת השומרונית, Shomronim; আরবি: السامرية, প্রতিবর্ণীকৃত: al-Sāmiriyyah) হল শমরীয়দের জাতীয় ধর্ম।[][][][][][][] শমরীয়রা ইহুদি তোরাহের বিপরীতে শমরীয় তোরাহ অনুসরণ করে, যা তাদের মতে আসল ও অপরিবর্তনীয় তোরাহ।[] শমরীয় তোরাহের পাশাপাশি শমরীয়রা যিহোশূয়ের পুস্তককে সম্মান করে এবং এলির মতো কিছু বাইবেলীয় চরিত্রকে স্বীকৃতি দেয়।

শমরীয়বাদকে অভ্যন্তরীণভাবে মোশির সাথে যে ধর্মের সূচনা হয়েছিল, তার পরে সহস্রাব্দের পরে অপরিবর্তিত ধর্ম হিসাবে বর্ণনা করা হয়। শমরীয়রা বিশ্বাস করে যে ইহুদিধর্ম এবং ইহুদি তোরাহ সময়ের সাথে সাথে দুর্নীতিগ্রস্থ হয়েছে এবং সীনয় পর্বতে ঈশ্বরের আধ্যাত্মিক দায়িত্বগুলি আর পরিবেশন করে না। ইহুদিরা মন্দির পর্বতকে তাদের বিশ্বাসের মধ্যে সবচেয়ে পবিত্র স্থান হিসাবে দেখায়, এবং শমরীয়রা গেরিজিম পর্বতকে তাদের পবিত্রতম স্থান হিসাবে বিবেচনা করে।

ইতিহাস

[সম্পাদনা]

উৎস এবং মহান বিভেদ

[সম্পাদনা]

শমরীয়বাদ এবং ইহুদি ধর্মের মধ্যকার বিভেদ ইতিহাসের অন্যতম প্রাচীন ধর্মীয় বিভাজন।

  • শমরীয়দের দাবি: তারা নিজেদেরকে প্রাচীন ইস্রায়েল রাজ্যের উত্তরাংশের সেইসব গোত্রের (মূলত ইফ্রয়িম ও মনঃশি) বংশধর বলে দাবি করে, যারা খ্রিস্টপূর্ব ৭২২ অব্দে নব্য-আসিরীয় সাম্রাজ্যের হাতে রাজ্যের পতনের পরও নির্বাসিত হয়নি। তাদের মতে, তারা ইস্রায়েল ভূমিতেই থেকে গিয়েছিলেন এবং মোশির কাছ থেকে পাওয়া মূল ও অপরিবর্তিত ধর্মবিশ্বাসকে রক্ষা করেছেন। তাদের মতে, বিভেদের সূচনা হয় মহাযাজক ইলিকে কেন্দ্র করে, যিনি গেরিজিম পর্বতের মূল উপাসনালয় ত্যাগ করে শিলানে একটি প্রতিদ্বন্দ্বী উপাসনালয় প্রতিষ্ঠা করেন, যা ছিল মূল ধারা থেকে বিচ্যুতি।[]
  • ঐতিহ্যবাহী ইহুদি দৃষ্টিভঙ্গি: ইহুদি গ্রন্থ, বিশেষ করে রাজাবলি পুস্তক এবং তালমুদ অনুসারে, আসিরীয়রা ইস্রায়েলীয়দের নির্বাসিত করার পর সেখানে মেসোপটেমিয়া থেকে পাঁচটি ভিন্ন জাতির লোককে পুনর্বাসন করে। এই লোকেরা ইস্রায়েলের ঈশ্বরের উপাসনার সাথে নিজেদের পৌত্তলিক প্রথা মিশ্রিত করে একটি সংকর (syncretic) ধর্ম তৈরি করে। এই কারণেই শমরীয়দেরকে কখনও কখনও "কুথীয়" (Cutheans) বলে উল্লেখ করা হয়।
  • আধুনিক গবেষণা: অধিকাংশ আধুনিক পণ্ডিত মনে করেন যে, এই বিভেদটি কোনো একক ঘটনা ছিল না, বরং কয়েক শতাব্দী ধরে চলমান একটি প্রক্রিয়া ছিল। এটি চূড়ান্ত রূপ নেয় পারস্য এবং হেলেনিস্টিক যুগে, যখন জেরুজালেমের যাজকতন্ত্র এবং গেরিজিমের যাজকতন্ত্রের মধ্যে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কর্তৃত্ব নিয়ে সংঘাত তীব্র হয়। খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতকে গেরিজিম পর্বতে শমরীয়দের নিজস্ব মন্দির নির্মাণ এবং খ্রিস্টপূর্ব ১১১ অব্দে হাসমোনীয় রাজা জন হার্কেনাস কর্তৃক সেই মন্দির ধ্বংস করা এই বিভেদকে স্থায়ী করে তোলে।[১০]

রোমান, বাইজেন্টাইন ও ইসলামী যুগ

[সম্পাদনা]

রোমান শাসনামলে, বিশেষ করে চতুর্থ শতাব্দীতে কিংবদন্তিতুল্য নেতা বাবা রাব্বার অধীনে শমরীয়রা একটি স্বর্ণযুগ উপভোগ করে। তিনি প্রশাসনিক সংস্কার করেন এবং তাদের ধর্মীয় পরিচয়কে পুনরুজ্জীবিত করেন। তবে, বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের অধীনে খ্রিষ্টধর্ম রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলে শমরীয়দের উপর তীব্র নিপীড়ন শুরু হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় তারা ৪৮৪, ৫২৯ এবং ৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে বেশ কয়েকটি রক্তক্ষয়ী বিদ্রোহ করে। এই বিদ্রোহগুলো নির্মমভাবে দমন করা হয়, যার ফলে তাদের জনসংখ্যা লক্ষাধিক থেকে মাত্র কয়েক হাজারে নেমে আসে এবং তাদের বহু উপাসনালয় ধ্বংস করা হয়।[১১]

ইসলামী শাসনামলে তারা "আহল আল-কিতাব" বা কিতাবের অনুসারী হিসেবে বিবেচিত হলেও, তাদের "জিম্মি" হিসেবে কঠোর নিয়ম ও করের অধীনে থাকতে হতো। বহু শমরীয়কে জোরপূর্বক ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করা হয়, যা তাদের জনসংখ্যা আরও হ্রাস করে।

ধর্মীয় বিশ্বাস: পাঁচটি ভিত্তি

[সম্পাদনা]

শমরীয়দের ধর্মবিশ্বাস পাঁচটি মূল স্তম্ভের উপর প্রতিষ্ঠিত:[১২]

  1. এক ও অদ্বিতীয় ঈশ্বর (তোহিদ): তারা ঈশ্বরের কঠোর একত্ববাদে বিশ্বাসী। ঈশ্বর অদ্বিতীয়, নিরাকার এবং অবিনশ্বর।
  2. একমাত্র নবী (নবুয়ত): মোশি হলেন ঈশ্বরের সর্বশ্রেষ্ঠ, একমাত্র এবং চূড়ান্ত নবী। তাঁর মাধ্যমে ঈশ্বর মানবজাতিকে পূর্ণাঙ্গ ঐশী বাণী বা তোরাহ প্রদান করেছেন। তারা ইহুদিদের নবী (যেমন: যিশাইয়, যিরমিয়, যিহিষ্কেল) বা অন্য কোনো নবীকে স্বীকার করে না।
  3. একমাত্র পবিত্র গ্রন্থ (তোরাহ): শমরীয় পঞ্চপুস্তক-ই একমাত্র ঐশী গ্রন্থ। তারা মনে করে, এটিই সিনাই পর্বতে মোশির কাছে অবতীর্ণ মূল ও অপরিবর্তিত সংস্করণ। তারা ইহুদিদের তানাখ-এর বাকি অংশ (নবীগণ (ইহুদি ধর্ম)।নেভি'ইমকেতুভিম) বা তালমুদ-কে ঐশ্বরিক বা বাধ্যতামূলক বলে মনে করে না।
  4. একমাত্র পবিত্র স্থান (কেদুশাহ): গেরিজিম পর্বত হলো ঈশ্বরের নির্বাচিত চিরস্থায়ী পবিত্র স্থান। তারা বিশ্বাস করে, এখানেই আব্রাহাম তার পুত্র ইসহাক।ইসহাককে উৎসর্গ করতে গিয়েছিলেন, এখানেই যাকোব স্বর্গের সিঁড়ির স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং এখানেই মোশি কর্তৃক নির্মিত মূল উপাসনালয় (Tabernacle) ছিল। এটিই তাদের তীর্থযাত্রা ও উপাসনার কেন্দ্রবিন্দু।
  5. প্রতিদান ও প্রতিশোধের দিন (তাওম আল-দিন): তারা শেষ বিচার দিবসে বিশ্বাস করে, যেদিন মৃতদের पुनरुत्थान হবে। সেদিন ধার্মিকদের পুরস্কৃত করা হবে এবং দুষ্টদের শাস্তি দেওয়া হবে। তারা "তাহেব" (Taheb) বা "পুনঃস্থাপনকারী" নামক একজন মসিহ বা ত্রাণকর্তার আগমনে বিশ্বাস করে। তিনি মোশির মতো একজন নবী হবেন, যিনি এসে সত্য ধর্মকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবেন এবং গেরিজিম পর্বতে লুকানো পবিত্র বস্তুগুলো উন্মোচিত করবেন।[১৩]

ধর্মীয় গ্রন্থ ও সাহিত্য

[সম্পাদনা]
  • শমরীয় পঞ্চপুস্তক: এটি তাদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ। এটি প্রাচীন হিব্রু লিপির একটি সংস্করণ, যা শমরীয় লিপিতে লেখা। ইহুদিদের মাসোরেটিক পাঠ্য-এর সাথে এর প্রায় ৬,০০০ পার্থক্য রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১,৯০০টি পার্থক্য সেপ্টুয়াজিন্ট (গ্রিক অনুবাদ) এর সাথে মেলে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো দশম আজ্ঞার সংযোজন, যেখানে গেরিজিম পর্বতে একটি বেদি নির্মাণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।[১০]
  • ঐতিহাসিক গ্রন্থাবলি: এর মধ্যে রয়েছে তোলিদাহ (আদম থেকে মহাযাজকদের বংশতালিকা), ক্রনিকল অ্যাডলার, আসাতির (কিংবদন্তি) এবং যিহোশূয়ের পুস্তক-এর শমরীয় সংস্করণ, যা ইহুদি সংস্করণ থেকে অনেকটাই ভিন্ন।
  • উপাসনামূলক গ্রন্থ: এর মধ্যে রয়েছে দেফতির নামক স্তোত্র ও প্রার্থনার একটি বিশাল সংকলন, যার অনেকগুলো চতুর্থ শতাব্দীর বিখ্যাত কবি ও ধর্মতাত্ত্বিক মারকাহ কর্তৃক রচিত।

ধর্মীয় জীবন ও আধুনিক সম্প্রদায়

[সম্পাদনা]

উৎসব ও আচার

[সম্পাদনা]

শমরীয়রা তোরাহ-তে উল্লিখিত সাতটি উৎসব কঠোরভাবে পালন করে। এর মধ্যে সবচেয়ে দর্শনীয় হলো শমরীয় নিস্তারপর্ব।নিস্তারপর্বের কোরবানি, যা তারা প্রাচীন প্রথা মেনে প্রতি বছর গেরিজিম পর্বতের চূড়ায় ভেড়া কোরবানি দিয়ে উদযাপন করে। এছাড়া তারা অত্যন্ত কঠোরভাবে সাবাথ (শনিবার) পালন করে, এদিন তারা কোনো ধরনের কাজ করা, আগুন জ্বালানো বা নিজেদের গ্রামের সীমানার বাইরে যাওয়া থেকে বিরত থাকে।

আধুনিক সম্প্রদায় ও চ্যালেঞ্জ

[সম্পাদনা]

বর্তমানে শমরীয়দের জনসংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। ২০২১ সালের হিসাবে, তাদের মোট জনসংখ্যা প্রায় ৮৪০ জন।[১৪] তারা প্রধানত দুটি স্থানে বসবাস করে:

  1. ফিলিস্তিনের নাবলুস শহরের কাছে গেরিজিম পর্বত-এর উপর অবস্থিত কিরিয়াত লুজা গ্রামে।
  2. ইসরায়েলের তেল আবিবের কাছে হোলন শহরে।

এই ক্ষুদ্র সম্প্রদায়টি এক অনন্য রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার মধ্যে বসবাস করে। তাদের ইসরায়েলি এবং ফিলিস্তিনি উভয় নাগরিকত্ব রয়েছে এবং তারা দুই সংস্কৃতির মধ্যে একটি সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে।[১৫] তবে, শত শত বছর ধরে নিজেদের মধ্যে বিবাহ করার (endogamy) ফলে তারা কিছু জেনেটিক রোগের ঝুঁকিতে রয়েছে এবং সম্প্রদায়ের মধ্যে পুরুষের তুলনায় নারীর সংখ্যা কম হওয়ায় একটি "বধূ সংকট"-এর সম্মুখীন হচ্ছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তারা এখন সম্প্রদায়ের বাইরে থেকে কিছু নারীকে বিবাহ করে ধর্মান্তরিত করার অনুমতি দিচ্ছে।[১৪]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. Shulamit Sela, The Head of the Rabbanite, Karaite and Samaritan Jews: On the History of a Title, Bulletin of the School of Oriental and African Studies, University of London, Vol. 57, No. 2 (1994), pp. 255–267
  2. Mor, Reiterer এবং Winkler 2010
  3. Coggins 1975
  4. Pummer 2002, পৃ. 42, 123, 156।
  5. Grunbaum, M.; Geiger, Rapoport (১৮৬২)। "mitgetheilten ausfsatze uber die samaritaner"। Zeitschrift der Deutschen Morgenländischen Gesellschaft: ZDMG। খণ্ড ১৬। Harrassowitz। পৃ. ৩৮৯–৪১৬।
  6. David Noel Freedman, The Anchor Bible Dictionary, 5:941 (New York: Doubleday, 1996, c1992).
  7. See also: Saint Epiphanius (Bishop of Constantia in Cyprus) (১ জানুয়ারি ১৯৮৭)। The Panarion of Ephiphanius of Salamis: Book I (sects 1–46)। BRILL। পৃ. ৩০। আইএসবিএন ৯৭৮-৯০-০৪-০৭৯২৬-৭ Paul Keseling (১৯২১)। Die chronik des Eusebius in der syrischen ueberlieferung (auszug)। Druck von A. Mecke। পৃ. ১৮৪। Origen (১৮৯৬)। The Commentary of Origen on S. John's Gospel: The Text Rev. with a Critical Introd. & Indices। The University Press।
  8. Tsedaka 2013
  9. উদ্ধৃতি ত্রুটি: <ref> ট্যাগ বৈধ নয়; AndersonGiles2002 নামের সূত্রটির জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি
  10. 1 2 Purvis, James D. (১৯৬৮)। The Samaritan Pentateuch and the Origin of the Samaritan Sect। Harvard University Press। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৬৭৪-৭৮৭২৫-৭ {{বই উদ্ধৃতি}}: |আইএসবিন= মান: চেকসাম পরীক্ষা করুন (সাহায্য)
  11. Crown, Alan David (১৯৮৯)। The Samaritans। Mohr Siebeck। পৃ. ৭০–৭৫। আইএসবিএন ৯৭৮-৩-১৬-১৪৫২৩৭-৬
  12. উদ্ধৃতি ত্রুটি: <ref> ট্যাগ বৈধ নয়; Tsedaka2013 নামের সূত্রটির জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি
  13. Gaster, Moses (১৯২৫)। The Samaritans: Their History, Doctrines and Literature। British Academy। পৃ. ৮১–৯৩।
  14. 1 2 উদ্ধৃতি ত্রুটি: <ref> ট্যাগ বৈধ নয়; haaretz2021 নামের সূত্রটির জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি
  15. "Caught In The Middle, The Samaritans Of The West Bank"NPR। ২৫ অক্টোবর ২০১৫।