রামচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

রামচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন একজন দেশভক্ত, বাঙ্গালী দড়াবাজিকর, মল্লবিদ, বেলুনে চড়ে শূন্যভ্রমণকারী, প্যারাশূটের সাহায্যে ভূতলে অবতরণে দক্ষ ব্যক্তি। তিনিই প্রথম ভারতীয় তথা বঙ্গ সন্তান যিনি প্রথম বেলুনে চড়ে শূন্যভ্রমণ এবং প্যারাশূটের সাহায্যে ভূতলে অবতরণ করেছিলেন।[১] ব্যোমযানে ভ্রমণ বা বেলুনে চড়ে শূন্যভ্রমণকে পেশা হিসাবে গ্রহণ করার ক্ষেত্রেও তিনিই প্রথম ভারতীয় । বেলুন ও প্যারাশূটের সাহায্যে সাহসী কার্যকলাপ তাঁকে জাতীয় নায়কের আসনে অধিষ্ঠিত করেছিল।

প্রথম জীবন[সম্পাদনা]

উত্তর কলকাতার শিমুলিয়া অঞ্চলের কাঁসারিপাড়ার বাসিন্দা ছিলেন এই সাহসী বাঙ্গালী পুরুষ। হিন্দু মেলার প্রতিষ্ঠাতা নবগোপাল মিত্রের ন্যাশানাল সার্কাস কোম্পানির দড়াবাজিকর হিসাবে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। তিনি একজন ফ্লায়িং ট্রাপীজও ছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি গ্রেট ইউনাইটেড সার্কাস কোম্পানির পরিচালক পদ অলঙ্কৃত করেছিলেন। তিনি গভর্নমেন্ট নর্মাল স্কুলে মল্লক্রীড়া বা শরীরচর্চার শিক্ষক হিসাবেও শিক্ষকতা করেছিলেন।

ব্যোমযান ভ্রমণে আগ্রহের সূত্রপাত[সম্পাদনা]

রামচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ব্যোমযান ভ্রমণের আগ্রহের সূত্রপাত কলকাতায় পারসিভাল জি. স্পেন্সারের বেলুনে চড়ে শূন্যভ্রমণের একটি প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে। স্পেন্সারের এই প্রদর্শনী রামচন্দ্রের মনের সুপ্ত সাহসিকতাকে উজ্জীবিত করে এবং তিনি এই ব্রিটিশ ব্যক্তিকে বেলুনের সাহায্যে শুন্যভ্রমণের কৌশল শিখিয়ে দিতে অনুরোধ করেন। অবশেষে তৎকালীন সময়ে পাঁচ শত টাকার বিনিময়ে রামচন্দ্র এই বিদ্যা রপ্ত করেছিলেন।

প্রথম একক উড্ডয়ন[সম্পাদনা]

এরপর , রামচন্দ্র স্পেন্সারের কাছ থেকে 'দ্য ভাইসরয়' নামক বেলুনটি কিনে নেন এবং তার নামকরণ করেন 'দ্য সিটি অফ ক্যালকাটা'। তিনি ক্যালকাটা বেলুনিস্টস কোম্পানির বেলুনেও উড্ডয়ন করেছিলেন এবং ১৮৮৯ সালের ২৭ শে এপ্রিল তিনি প্রথম একক উড্ডয়ন করবেন বলে ঘোষণা করেন। যদিও দুর্ভাগ্যবশত খারাপ আবহাওয়ার কারণে ঐ নির্দিষ্ট দিনে তাঁকে তাঁর উড্ডয়নের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে হয় এবং ৪ঠা মে পর্যন্ত এই অনুষ্ঠান স্থগিত থাকে। অবশেষে এক সপ্তাহ পরে আসে সেই বহু প্রতীক্ষিত দিন। এক ভারতীয়ের দ্বারা এই চমৎকার প্রদর্শনীর সাক্ষী থাকতে সেইদিন নারকেলডাঙা প্রাঙ্গণে সমাগম হয়েছিল আট হাজার মানুষের । প্রসঙ্গত উল্লেখ্য সেইদিন গ্যাস কোম্পানির সহযোগী পরিচালক জে. রেইড গ্যাস দ্বারা বেলুন ভরাট করার কাজে নিযুক্ত ছিলেন। অবশেষে বৈকাল ৫:১০ ঘটিকায় সাদা স্যুট পরিহিত অবস্থায় গলায় দূরবীন ঝুলিয়ে উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে টুপি নাড়িয়ে তিনি তাঁর আরোহণ শুরু করেন। চল্লিশ মিনিট উত্তরমুখে ভ্রমণ করার পর সোদপুর থেকে দুই মাইল দূরে নাটাগড় নামক এক স্থানে অবতরণ করেন। তাঁর এই অবিশ্বাস্যকর ভ্রমণের কথা ১১ই মে এর 'দ্য বেঙ্গলী' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।

পেশাদারী ব্যোমযান ভ্রমণ[সম্পাদনা]

এতদিন ধরে যে ব্যোমযান ভ্রমণ বা বেলুনে চড়ে আকাশে উড্ডয়নকে তিনি উত্তেজনাপূর্ণ এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার অংশ হিসাবে নিজের জীবনের সাথে জড়িয়ে নিয়েছিলেন সেই ব্যোমযান ভ্রমণকেই শীঘ্রই তিনি এক পেশাদারীত্বের মোড়কে মুড়ে নিজের পেশা হিসাবে নিয়ে নিলেন এবং চ্যাটারজী'স বেলুনিং কোম্পানির প্রতিষ্ঠা করলেন। এবং ভারতের যে যে স্থানে বেলুন ওড়ানোর জন্য গ্যাস প্রাপ্তির সুবিধা ছিল , সেই সকল স্থানগুলিতে তিনি তাঁর প্রদর্শনী করবেন বলে আশা পোষণ করতেন । তাই তিনি এলাহাবাদ, লাহোর, লখনউ, ঢাকা, কাশ্মীর ভ্রমণের জন্যও মনস্থ করেছিলেন।

দ্বিতীয় একক উড্ডয়ন[সম্পাদনা]

রামচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জীবনের দ্বিতীয় একক উড্ডয়নের ঘটনা ঘটেছিল ১৮৮৯ সালের ২৭ শে জুন , এলাহাবাদের খুশরোবাগ নামক স্থানে দশ হাজার মানুষের সামনে। দ্বিতীয়বারেও তাঁর এই উড্ডয়নের ক্ষেত্রে বাঁধা এসেছিল। যে বেলুনে চড়ে এই দ্বিতীয় প্রদর্শনী করবেন বলে স্থির হয়েছিল , সেই বেলুনে অপর্যাপ্ত গ্যাস অথবা ত্রুটিপূর্ণ গ্যাসের কারণে তা উড়তে পারেনি। কিন্তু এমতাবস্থায় উপস্থিত দর্শককুলকে নিরাশ না করার অভিপ্রায়ে তিনি বেলুনের সাথে সংলগ্ন ঝুড়িটিকে অপসারিত করে ইস্পাতের হুফটিকে ধরে শূন্যে বিচরণ করেন। যদিও এই অবস্থায় শূন্যভ্রমণ খুবই ঝুঁকিপূর্ণ এক সাহসী কাজ, কিন্তু তিনি তাঁর সাহসিকতার সাহায্যে এই অবিশ্বাস্য কাজটিকে বাস্তবে রূপায়িত করেন এবং নিরাপদে স্থলে অবতরণ করেন।

প্যারাশূটের সাহায্যে প্রথম অবতরণ[সম্পাদনা]

বেলুনের সাহায্যে শূন্যভ্রমণের পর তাঁর দ্বিতীয় রোমাঞ্চকর প্রদর্শনী ঘটে ১৮৯০ এর ২২শে মার্চ বিকাল ৫:৩০ ঘটিকায় যখন তিনি কলকাতার মিন্টো পার্কের কাছেই অবস্থিত টিভোলি গার্ডেনসের ৩,৫০০ ফুট উচ্চতা থেকে মহামহিম দ্য আম্বান , চৈনিক রাষ্ট্রদূত, পারসিভাল স্পেন্সার, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও যোগীন্দ্রনাথ সরকারের উপস্থিতিতে প্যারাশূটের সাহায্যে প্রথম অবতরণ করেন। প্যারাশূটের সাহায্যে সাফল্যের সাথে অবতরণের জন্য ওনাকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল।

ভারত ভ্রমণ[সম্পাদনা]

এরপর তিনি তাঁর পূর্বতন বেলুনটির নাম দ্য সিটি অফ ক্যালকাটা থেকে পরিবর্তিত করে দ্য স্টার অফ ইন্ডিয়া রাখেন। তিনি কলকাতা এবং এলাহাবাদের মধ্যে তাঁর প্রদর্শনী সীমাবদ্ধ না রেখে দিল্লীতে ১৮৯০ সালের নভেম্বর মাসে তিস হাজারি নামক স্থান থেকে বেলুনের সাহায্যে আরোহণ এবং প্যারাশূটের সাহায্যে অবতরণ করেন। ফলস্বরূপ নবাব জালাল-উদ-দৌলাহ মুহাম্মদ মুমতিয়াজ আলি খানের কাছ থেকে পুরস্কার পান এবং তাঁর এই কৃতিত্বের পুনরাবৃত্তি ঘটে ১৮৯১ সালের ৮ই মার্চ লাহোরে এবং পরে রাওয়ালপিন্ডিতে। এরপর ইন্দোরের মহারাজার অনুরোধে তৎকালীন ভাইসরয়ের উপস্থিতিতে তিনি তাঁর ব্যোমযানের সাহায্যে আরোহণ ও প্যারাশূটের সাহায্যে অবতরণের চমকপ্রদ কৌশল দেখান এবং তা জারি থাকে ১৮৯২ এর ফেব্রুয়ারীতে আগ্রা এবং এপ্রিলে বারাণসীতে প্রদর্শনী পর্যন্ত।

প্রাণনাশক দুর্ঘটনা[সম্পাদনা]

এই রোমাঞ্চপ্রিয় মানুষটির মৃত্যুর ঘটনা খুবই করুণ। তিনি যখন শূন্যে তাঁর প্রিয় বেলুনে করে উড্ডয়নরত ছিলেন তখন একটি পাহাড়ের সাথে তাঁর বেলুনটির ধাক্কা লাগে এবং তিনি গুরুতর আহত হন। এরপর তাঁকে কলকাতায় আনা হলেও শেষরক্ষা হয়নি। অবশেষে ১৮৯২ সালের ৯ই অগাস্ট গোপাল চন্দ্র মুখারজির বাগান বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

পরবর্তী প্রজন্মের উপর তাঁর প্রভাব[সম্পাদনা]

রামচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের এই সাহসী কার্যকলাপ প্রবোধ চন্দ্র লাহাকে এই রোমাঞ্চকর খেলার দিকে চালিত হতে উদ্বুদ্ধ করে। তিনি ১৮৯০সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি স্পেন্সারকে সাথে নিয়ে 'দ্য সিটি অফ ইয়র্ক' নামক বেলুনে চড়ে কলকাতা থেকে আকাশে আরোহণ করেন। এরপর তিনি ৮ই মার্চ স্পেন্সারের থেকে ক্রীত 'দ্য ভাইসরয় অফ ইন্ডিয়া' নামক বেলুনে চড়ে একক উড্ডিয়ন করেন এবং ১৮৯২ এর মার্চ মাসে কানপুর থেকে সাফল্যের সাথে তাঁর পরবর্তী প্রচেষ্টা সম্পাদন করেন। তৃতীয় ব্যোমযান আরোহী হলেন বিখ্যাত ব্যারিস্টার এবং মেট্রোপলিটন কলেজের অধ্যাপক যোগেশ চন্দ্র চৌধুরী। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য তিনি সুরেন্দ্রনাথ ব্যানারজীর জামাতা ছিলেন। তবে তিনি শুধুমাত্র রোমাঞ্চের জন্য নয়, বৈজ্ঞানিক কাজের উদ্দেশে শূন্যে আরোহণ করেছিলেন। দীর্ঘদিন কলকাতায় বসবাসকারী মেজর হ্যারি হবস নাম্নী এক ব্যক্তি তাঁর স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেছিলেন যে রামচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কন্যা তাঁরই মত সাহসিনী ছিলেন যিনি বহুবার ব্যোমযানে আরোহণ করে শূন্যে বহু দূরত্ব অতিক্রম করেছিলেন।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. গুপ্ত, অভিজিৎ (৮ আগষ্ট ২০১০)। "First solo balloon flier"দ্য টেলিগ্রাফ (ইংরেজি ভাষায়)। কলকাতা। সংগ্রহের তারিখ ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ 

আরো পড়ুন[সম্পাদনা]

  • Indian Journal of History of Science. 1992.
  • The Bengalee. April 27, 1889.