মৌমাছি পালন

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান
কাঠের বাক্সে মৌমাছি পালন
মধু

মৌমাছি পালন (ইংরেজি: Beekeeping) ফলিত প্রাণিবিজ্ঞান এর একটি শাখা। মৌমাছি কে তাদের প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে এনে মৌচাকের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করে আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পালন করাকেই মৌমাছি পালন বলা হয়। পালনের জন্য ভারতীয় জাতের মৌমাছি সবচেয়ে উপযোগী।[১] ছোট সেনালি বর্ণের ও সাদা ডোরাকাটা এ মৌমাছিরা গাছের গর্তে বা অন্য কোন গহবরে একাধিক সমান্তরাল চাক তৈরি করে বসবাস করে। গর্তে প্রবেশ পথের সঙ্গে চাকগুলো সমান্তরালভাবে সাজানো থাকে। মৌমাছিদের এরূপ বাসস্থানের সাথে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি করা হয় কাঠের বাক্স। কাঠের মৌবাক্স মৌমাছি পালনই আধুনিক ব্যবস্থা।

মৌমাছির প্রজাতি[সম্পাদনা]

বাংলাদেশে সাধারণত তিন প্রজাতির মৌমাছি পাওয়া যায়।

  1. পাহাড়ী মৌমাছি: এরা আকারে সবচেয়ে বড়। বড় বড় গাছের ডালে, পাহাড়ের গায়ে এরা চাক বাঁধে। চাক প্রতি মধুর উৎপাদন প্রতিবারে গড়ে প্রায় ১০ কেজি। এরা পোষ মানে না তাই বাক্সে লালন-পালন করা যায় না।
  2. ভারতীয় মৌমাছি: এরা আকারে মাঝারি ধরনের। অন্ধকার বা আড়াল করা স্থান গাছের ফোকর, দেয়ালের ফাটল, আলমারি, ইটের স্তুপ ইত্যাদি স্থানে এরা চাক বাঁধে। চাক প্রতি মধুর উৎপাদন প্রতিবারে গড়ে প্রায় ৪ কেজি। এরা শান্ত প্রকৃতির। তাই বাক্সে লালন-পালন করা যায় ।
  3. ক্ষুদে মৌমাছি: এরা আকারে সবচেয়ে ছোট। এরা ঝোপ জাতীয় গাছের ডালে, পাতায় ও শুকনো কাঠি প্রভৃতিতে চাক বাঁধে। চাকার আকার খুব ছোট। বাঁধে। চাক প্রতি মধুর উৎপাদন প্রতিবারে গড়ে প্রায় ২০০ গ্রাম । এরা শান্ত প্রকৃতির। তবে এক স্থানে বেশিদিন থাকে ন।

মৌমাছির পরিবার[সম্পাদনা]

একটি মৌচাকে বা পরিবারে তিন শ্রেণীর মৌমাছি থাকে, যথা: (১) রাণী, (২) পুরুষ ও (৩) শ্রমিক মৌমাছি।

রাণী মৌমাছি (মাঝখানে)
শ্রমিক মৌমাছি
  1. রাণী মৌমাছি: রাণী মৌমাছি সবচেয়ে বড় প্রকৃতির। এর পেট বেশ লম্বা ও প্রশস্ত এবং ডানা দুটো ছোট। একটি চাকে একটি মাত্র রাণী মৌমাছি থাকে। এর একমাত্র কাজ ডিম পাড়া। রাণী মৌমাছি জীবনে একবারই মাত্র একটি পুরুষ মৌমাছির সঙ্গে মিশিত হয়। জন্ম নেওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে নতুন রাণী কিছু পুরুষ ও শ্রমিক মৌমাছি নিয়ে আকাশে উড়ে যায়। মিলন শেষে রাণী শ্রমিকসহ চাকে ফিরে আসে। জীবনে একবার মিলিত হলে ও রাণী পর্যাপ্ত শুক্রাণু জমা রাখে তার দেহের ভিতর শুক্রাধাণীতে। রাণী দু,ধরণের ডিম পাড়ে-নিষিক্ত ডিম (শুক্রাণু মিশানো) ও অনিষিক্ত ডিম (শুক্রাণু অমিশানো)। রাণী কোন ধরণের ডিম পাড়বে তা তার ইচ্ছাধীন। নতুন রাণী তৈরী হবে নিষিক্ত ডিম থেকে। শ্রমিক মৌমাছির তত্ত্ববধানে এক বিশেষ ধরণের খাবার (রয়াল জেলী বা রাজসুধা) খেয়ে নতুন রাণী তৈরী হয়। এ খাবারের জন্য সে পরবর্তীতে ডিম পাড়তে সক্ষম হয় ও আয়ুষ্কাল বেড়ে যায়। একটি রাণী মৌমাছির আয়ুষ্কাল প্রায় ২/৩ বছর।
  2. পুরুষ মৌমাছি: এরা মধ্যম আকৃতির । এদের চোখ বড়। কিন্তু এদের হুল নেই। এদের একমাত্র কাজ রাণীর সাথে মিলিত হওয়া । এরা খুব অলস প্রকৃতির । এমনকি এরা অনেক সময় নিজের খাবার নিজেরা গ্রহণ করে না। শ্রমিকেরা খাইয়ে দেয়। রাণীর সঙ্গে শুধুমাত্র একটি পুরুষ মৌমাছি মিলিত হতে সম্ক্ষম । তবে মিলিত হওয়ার পর সেই পুরুষটি মারা যায়। পুরুষ মৌমাছির আয়ুষ্কাল প্রায় দেড়মাস।
  3. শ্রমিক মৌমাছি:এরা সবচেয়ে ক্ষুদ্রাকৃতির। এদের চোখ ছোট, কিন্তু হুল আছে। রাণী ও পুরুষ বাদে অবশিষ্ট সকল সদস্যই শ্রমিক মৌমাছি। এরা নানা দলে ভাগ হয়ে চাকের যাবতীয় কাজ (যথা চাক নির্মাণ করা, ফুলের মিষ্টি রস ও পরাগরেণু সংগ্রহ করা, মধু তৈরী করা , চাকের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা, চাকে বাতাস দেওয়া চাক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা ইত্যাদি ) সম্পন্ন করে। এদের জন্ম নিষিক্ত ডিম থেকে এদের আয়ুষ্কাল প্রায় একমাস।

মৌমাছির চাক[সম্পাদনা]

মৌমাছির চাক মোম দিয়ে তৈরী। চাক ছোট ছোট খোপ বিশিষ্ট। প্রতিটি খোপে থাকে ছয়টি দেওয়াল। তবে শিশু শ্রমিকের ও মধু জমানোর খোপগুলো পরিমাপে একটু ছোট, শিশু পুরুষদের একটু বড় এবং শিশু রাণীর বেশ বড় ও লম্বাটে। শিশুদের খুপগুলো সাধারণত চাকের নিচের দিকে ও মধু জমানোর খুপগুলো উপরের দিকে থাকে। শিশু রাণীর খোপে থাকে সাধারণত চাকের নিচের দিকের কিনারায়। ডিম পাড়ার পূর্বে রাণী দেখে নেয় খোপের মাপ, যাতে নির্দিষ্ট মাপের খোপে নির্দিষ্ট প্রকারের ডিম পাড়ে। ডিম পাড়ার তিন দিনের মধ্যে ডিম ফুটে শ্রককীট বা শিশু মৌমাছি বেড়িয়ে আসে। শ্রমিক মৌমাছি এসব শিশু মোমাছিদের প্রথম তিন দিন মধু ও পরাগরেণুর পাশাপাশি রাজসুধা খেত দেয়। রাজসুধা তৈরী হয় শ্রমিক মৌমাছির মুখের এক বিশেষ গ্রন্থি থেকে । প্রায় ৮/৯ দিন পর শ্রমিকের সব শুককীটের মুখ মোম দিয়ে বন্ধ করে দেয়। এ বন্ধ খোপের মধ্যে শুককীট মুককীটে বা পুত্তলিতে রুপান্তরিত হয়। ভাবী রাণীর ক্ষেত্রে খোপের বন্ধ থাকার সময় প্রায় ৭ দিন, শ্রমিকের ক্ষেত্রে ১২ দিন ও পুরুষদের ক্ষেত্রে ১৫ দিন। এরপর মুককীট পূর্ণ বয়স্ক মৌমাছিতে রুপান্তরিত হয় এবং খোপের মুখ কেটে বেড়িয়ে আসে।

মধু ও মোম[সম্পাদনা]

মধু একান্তভাবে মৌমাছির তৈরী এক প্রকার উপাদেয় খাদ্য। শ্রমিক মৌমাছিরা ফুলের মিষ্টি রস শুষে নেয় এবং তা জমা করে পাকস্থলীর উপরে এক বিশেষ অঙ্গে যাকে মধুথলি বলে। ফুলের মিষ্টি রস মধুথলিতে জমা করার সময় এর সঙ্গে লালা গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত বিভিন্ন উৎসেচক মেশায়। এর ফলে মিষ্টি রস পরিবর্তিত হয়ে আংশিক মধু তৈরী হয়, যা চাকে এনে ঢেলে দেয় মধু রাখার খোপগুলোতে। তরুণ শ্রমিক মৌমাছিরা এ সময় ছুটে এসে ঐ মধু আবার মুখে ভরে এবং তাদের লালার সংগে মিশিয়ে তৈরী করে আসল মধু এবং তা জমা করে খোপে। শ্রমিক মৌমাছিরা জোরে ডানা নেড়ে খোপে রক্ষিত মধু থেকে বাড়তি পানি সরিয়ে দেয়। ফলে এক সময় ফুলের মিষ্টি রস হয়ে যায় ঘন মধু, যা জমা রাখে নিজেদের ও বাচ্চাদের খাবার হিসাবে। মধু জমা রাখার পর খোপগুলোর মুখ মোম দিয়ে বন্ধ করে দেয়। শ্রমিক মৌমাছির পেটের তলায় পকেটের মত ভাজ থাকে মোমগ্রন্থি। সেখানে তৈরী হয় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাতের মত মোম কণা। এ মোম দিয়ে শ্রমিকেরা বানায় বাসা।

মৌমাছি পালন ব্যবস্থাপনা[সম্পাদনা]

মৌমাছি পালন বাক্স

মৌমাছি পালনের বাক্স[সম্পাদনা]

বাংলাদেশে প্রধানত ভারতীয় মৌমাছি লালন-পালন করা হয়। এ মৌমাছির বাক্স সাধারণত কাঠাল কাঠের তৈরী এবং ২৮.৬ সে.মি x ২৭.৭ সে.মি x ১৭.৪ সে.মি মাপ বিশিষ্ট হয়। এর নিচের দিকে খোলা, যা একটি কাঠের পাটাতনের উপর বসানো থাকে। বাক্সের উপর কাঠের একটি ঢাকনা থাকে। ঢাকনার নিচে সাতটি সমান্তরাল কাঠের ফ্রেম থাকে । এ মৌমাছিরা চাক বাঁধে। এ প্রকোষ্ঠের উপর ফ্রেমসহ আরেকটি প্রকোষ্ঠ বসানো থাকে। উপরের প্রকোষ্ঠকে মধু প্রকোষ্ঠ ও নিচের প্রকোষ্ঠকে বাচ্চা প্রকোষ্ঠ বলে। যে স্থানটি অপেক্ষাকৃত উচু, নির্জন, ধোয়া অথবা গ্যাসমুক্ত, শুকনো এবং ছায়াযুক্ত এবং আশে-পাশে পর্যাপ্ত ফুল সমৃদ্ধ গাছ-গাছড়া আছে সেখানে মৌমাছির বাক্স বসাতে হয়।

মৌমাছি সংগ্রহ ও কৃত্রিম খাবার[সম্পাদনা]

প্রকৃত থেকে ভারতীয় মৌমাছি (রাণী ও কিছু শ্রমিক) সংগ্রহ করে অথবা প্রতিষ্টিত মৌচাষীর নিকট থেকে ক্রয় করে মৌচাষ কার্যক্রম আরম্ভ করা হয়। বাক্সবন্দীর প্রথম ৩/৪ দিন কৃত্রিম খাবার যথা চিনির ঘন সরবত বা সিরাপ দেবার প্রয়োজন হয়। এরপর মৌমাছিরা নিজেদের খাবার নিজেরা সংগ্রহ করে থাকে। কখনো কখনো পরিবেশে খাবার ঘাটতি পড়লে ও কৃত্রিম খাবার দেওয়ার প্রয়োজন হয়।

মৌমাছির উপযোগী গাছ-পালা[সম্পাদনা]

মৌমাছির জন্য ফুলের মিষ্টি রস ও পরাগরেণু সমৃদ্ধ গাছ-পালার প্রয়োজন। সারা বছর মিষ্টি রস ও পরাগরেণু সমৃদ্ধ ফুল প্রাপ্তি যাতে নিশ্চিত হয়, সেজন্য নিম্নলিখিত গাছ-পালা মৌমাছি এলাকার আশে-পাশে (২/৩ কিলোমিটারের মধ্যে) স্থানভেদে রোপণ বা চাষ করা যেতে পারে। আম, জাম, কলা, লিচু পেয়ারা, ডালিম, নারিকেল, বেল, কমলা লেবু, ছোলা, সয়াবিন শিমূল ,কার্পাস, কাজু বাদাম ইত্যাদি।

মৌমাছির ঝাঁক বাঁধা[সম্পাদনা]

সাধারণত বসন্ত ও গ্রীষ্মকালে মৌমাছির ঝাঁক বাঁধার প্রবণতা দেখা যায়। বাক্সে মৌমাচছর সংখ্যা বেড়ে গেলে, খাদ্যভাব হলে মৌমাছিরা ঝাঁক বেঁধে উড়ে যায়। পুরাতন রাণী উড়ে যাবার পূর্বে শ্রমিকরা চাকে প্রথমে ভাবী পুরুষ ও পরে ভাবী রাণী মৌমাছির খোপ তৈরী করে। এগুলো খুজে বের করে সাবধানে কেটে ফেলে দিলে ঝাঁক বাঁধা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ফ্রেমের চাকে নতুন রাণীর খোপ দেখা গেলে সেই ফ্রেম কিছু মৌমাছিসহ নতুন বাক্সে স্থানান্তর করে নতুন চাক তৈর করা যায়।

মৌ কলোনির পরিচর্যা[সম্পাদনা]

বিভিন্ন ঋতুতে মৌমাছির পরিচর্যাকে তিনটি ভগে ভাগ করা যায়। যেমন-মৌমাছির বংশ বৃদ্ধির সময়ে, যখন প্রকৃতিতে প্রচুর খাদ্য পাওয়া যায় তখন এবং খাদ্যসঙ্কট চলাকালে।

বংশ বৃদ্ধিকালে পরিচর্যা[সম্পাদনা]

বংশ বৃদ্ধিকালে রানী মৌমাছি যখন প্রচুর ডিম পেড়ে একটি মৌবাক্সে মৌমাছির সংখ্যা বাড়তে থাকে সে সময়টাই হল বৃদ্ধিকাল। এ সময় প্রকৃতিতে ফুলের সমারোহ দেখা যায় এবং মৌমাছিরা প্রচুর পরিমানে পরাগরেণু এবং ফুলের রস সংগ্রহ করে। বংশ বৃদ্ধিকালে বাচ্চাঘরে নতুন ফ্রেম দিতে হবে। বাক্সে কোনো পুরনো ও ত্রুটিপূর্ণ রাণীকে সরিয়ে নতুন রানীর সংযোজন করতে হবে। সাধারণত বৃদ্ধিকালের শেষ দিকে মৌমাছিরা ঝাঁক বাঁধে। ঝাঁক বেঁধে মৌমাছিরা যাতে অন্য কোথাও উড়ে চলে না যায় এজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। তাহলে চাকে নবনির্মিত পুরুষ, রাণী মৌমাছিরা বাঁক বেঁধে অন্য কোথাও উড়ে যাবে না। মৌমাছির সংখ্যা যদি অনেক বেশি হয় তবে তাদের একাধিক বাক্সে ভাগ করে দেয়া উচিত। মৌমাছির বংশ বৃদ্ধিকালে মাঝে মাঝে কলোনী পরীক্ষা করে তাদের অন্যান্য সমস্যার প্রতিও দৃষ্টি রাখতে হবে।

খাদ্য সঞ্চয়কালে পরিচর্যা[সম্পাদনা]

এ সময়ে প্রকৃতিতে প্রচুর ফুল পাওয়া যায়। মৌমাছিদের সংগ্রহীত পরাগরেণু বাচ্চা মৌমাছিদের খাওয়ানো হয়। ফুলের রস দিয়ে মৌমাছিরা মধু তৈরি করে মধুঘরের চাকে জমা করে। মধু রাখার স্থানের যাতে অভাব না হয় এজন্য মধু ঘরে আরও নতুন চাক দিতে হবে। চাকের শতকরা ৭৫টি কঠুরি যখন ঘন মধুতে ভরে মৌমাছিরা ঢাকনা দিয়ে ফেলবে, তখন সে চাক থেকে মদু নিষ্কাশন করে নিতে হবে। প্রয়োজনবোধে মৌমাছি পালনক্ষেত্র তেকে কিছু মৌবাক্স সরিয়ে অন্য স্থানে নিতে হবে যাতে বিশেষ কোনো এলাকা থেকে মৌমাছিরা আরও বেশি মধু সঞ্চয় করতে পারে। শীতের প্রচন্ড প্রকোপে মৌমাছিদের যেন কষ্ট না হয় এজন্য শীতের রাতে মৌবাঙ্টি চট বা ছালা দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে।

খাদ্য সঙ্কটকালে পরিচর্যা[সম্পাদনা]

এ সময়ে প্রকৃতিতে খাদ্য সংগ্রহ করার মতো ফুল খুব কম থাকে, ফলে মৌমাছিরা খাদ্য সঙ্কটে পড়ে। খাবারের অভাব মিটাতে এ সময় চিনির সিরাপ মিশিয়ে এই সিরাপ তৈরি করা হয়। যে পাত্রে সিরাপ পরিবেশন করা হবে সেটি বাঙ্রে ভেতরে রেখে সিরাপের পরে একটি কাঠি বা পাতা দিতে হবে, যাতে মৌমাছিরা তার ওপরে বসে রস খেতে পারে। সিরাপ রাতে একটি নির্দিষ্ট সময়ে (সন্ধ্যা) পরিবেশন করা উচিত, যাতে অন্য বাঙ্রে মৌমাছিরা এসে খাবারের জন্য মারামারি না বধায়। ঝড়বৃষ্টিতে ক্ষতির সম্ভাবনা থাকলে মৌবাঙ্টির প্রবেশ পথ বাতাস ও বৃদ্ধির বিপরীতমুখী করে নিরাপদ, শুল্ক স্থানে রাখতে হবে। অন্যথায় বাক্সে ছাদের উপর আবরণ দিয়ে প্রবল বৃষ্টি হাত থেকে মৌমাছিদের রক্ষা করতে হবে। খাদ্য সঙ্কটকালে কলোনী দূর্বল হয়ে পড়তে পারে। বাক্স চারটি চাকের কম সংখ্যাকে চাকে মৌমাছি একত্র করে একটি মৌবাক্স স্থান করে দেয়া উচিত। খাদ্য সঙ্কট সব এলাকায় একই সময়ে দেখা দেয় না। এ জন্য মৌবাক্স এমন এলাকায় স্থানান্তর করা যায়, যেখানে প্রচুর ফুল পাওয়া যাবে। খাদ্য সঙ্কটকালে মৌমাছিদের রোগ-জীবানূ বেশী হয় বলে এ সময় কলোনীর দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।

মধুঋতুতে পরিচর্যা[সম্পাদনা]

  • এলাকার বি-প্লান্টসের পরিচর্যা করা।
  • অধিক মধু সংগ্রহের জন্য কলোনি পর্যাপ্ত বি-প্লান্টস পরিবেষ্টিত এলাকায় সাময়িকভাবে স্থানান্তর করা।
  • নির্ধারিত ফুল ফোটার সময়ে মধু পাওয়ার জন্য প্রয়োজনবোধে কলোনি একত্রীকরণের ব্যবস্থা করা।
  • চলাচল দরজার সম্পূর্ণ অংশ দিনের বেলায় খুলে দেয়া। তবে ঝাঁক ছাড়ার প্রবণতা পরিলক্ষিত হলে অবশ্যই কুইনগেট লাগাতে হবে।
  • কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্রুড ও সুপার চেম্বারের মাঝে কুইন এক্সক্লুডার স্থাপন আবশ্যক।
  • রানী মৌমাছির অধিক ডিম দেয়ার সুবিধার্থে ব্রুড চেম্বারে ভিত্তিচাক এবং পুরনো ভালো চাক পর্যায়ক্রমে দুটি ফ্রেমের মাঝখানে স্থাপন করা দরকার।
  • একইভাবে সুপার চেম্বারেও অধিক মধু জমানোর জোগান দেয়াসাপেক্ষে ভিত্তিচাক এবং পুরনো ভালো চাক স্থাপন করা যায়।
  • সুপার চেম্বারে শতকরা ৭০ ভাগ মধু জমানো কোষে ঢাকনা দিলে মধু নিষ্কাশন যন্ত্রের সাহায্যে মধু সংগ্রহ করতে হবে।
  • মধুঋতু শেষে সর্বশেষ মধু সংগ্রহের সময় মধুসহ কমপক্ষে একটি চাক কলোনিতে রেখে দিতে হবে।
  • কোনো কারণে যথাসময়ে মধু সংগ্রহ করা সম্ভব না হলে সাময়িকভাবে আরও একটি সুপার চেম্বার স্থাপন করা শ্রেয়।
  • বিনা প্রয়োজনে পুরুষ ও রানী কোষ তৈরি করে থাকলে তা কেটে বাদ দিতে হবে।
  • সংগৃহীত মধু আধুনিক পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াজাত করে পরিষ্কার এয়ারটাইট পাত্রে রাখতে হবে।
  • মধুঋতু শেষে সুপার চেম্বারের সব চাক এবং ব্রুড চেম্বারের অতিরিক্ত চাকগুলো রৌদ্রে শুকিয়ে সংরক্ষণ করতে হবে।
  • কোনো কোনো সময় কলোনিতে পর্যাপ্ত মৌমাছি থাকা সত্ত্বেও শ্রমিক মৌমাছির দ্বারা সুপার চেম্বারে চাক তৈরি করতে অনীহা প্রকাশ পায় কিংবা চাক দিলেও তাতে মধু জমা করে না। এসব ক্ষেত্রে ব্রুড চেম্বার থেকে ২/১টি চাকের উপরের অংশ মধুসহ (আংশিক/সম্পূর্ণ) কেটে সুপার ফ্রেমের সঙ্গে লাগিয়ে সুপার চেম্বারে দিলে ভালো ফল পাওয়া যায়। এছাড়া অন্য কোনো কলোনি থেকেও মধুসহ চাক সুপার ফ্রেমে এনে এধরনের কলোনির সুপার চেম্বারে স্থাপন করা যেতে পারে।
  • মধুঋতুর শেষ পর্যায়ে কিছু কিছু মৌ কলোনি বিভাজন করে কলোনির সংখ্যা বাড়ানো যেতে পারে।
মধু নিষ্কাষন যন্ত্র

মধু সংগ্রহ[সম্পাদনা]

মধু সংগ্রহ করার সময় আস্ত চাক হাত দিয়ে চিপে মধু বের করা হয়। এ মধুতে মৌমাছির দেহাংশ ও বজ্য পদার্থ বিদ্যমান থাকে। এছাড়া এ ধরনের মধু অশ্প দিনের মধ্যে পচে নষ্ট হয়ে যায়। অপর দিকে বাক্সে লালন-পালন করা মৌমাছির চাক থেকে মধু নিষ্কাশন যন্ত্রের সাহায্য মধু বের করা যায়। এতে চাক থেকে শুধু মধু বের হয়ে আসে, অথচ চাক নষ্ট হয় না এবং তা আবার ব্যবহার করা যায়।

মৌমাছির শত্রু এবং রোগ[সম্পাদনা]

বিভিন্ন প্রকার শত্রু ও রোগের আক্রমণে মৌমাছি কলোনী ক্ষতিগ্রস্থ হয়।

মোমপোকা[সম্পাদনা]

ভিজে, স্যাতসেঁতে আবহাওয়ায় মোমপোকার আক্রমণ সবচেয়ে বেশী হয়। চাকের কুঠুরির উপরে মাকড়সার জালের ন্যায় আবরণ দেখেই বোঝা যায়। একটি মোপোকারয় আক্রান্ত ঢাকনাযুক্ত পিউপার কুঠুরির মুখ খোলা এবং ভেতরে মৃত পিউপা পাওয়া যায়। এ সমস্যার প্রতিকার হল মৌবাক্স পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, পুরনো ও ময়লা চাক সরিয়ে ফেলা এবং পটাসিয়াম পারম্যাঙ্গানেট দিয়ে বাঙ্রে মেঝে পরিস্কার করা। মোমপোকার আক্রমণ দেখা দিলে প্যারাডাইক্লোরো বেনজিন নামক ওষুধ সামান্য পরিমানে বাক্স কোণায় রেখে দিলে এই পোকার আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। এ ময়ে রাতে বাক্সের গেইট বন্ধ করে রাখতে হবে এবং সকালে খুলে দিতে হবে।

অ্যাকারাইন[সম্পাদনা]

এ রোগ সাধারণত পূর্ণবস্ক মৌমাছিদের হয়ে থাকে। রুগ্ন মৌমাছির ডানাগুলো বিভক্ত হয়ে ইংরেজি অক্ষর 'J' এর মতো হয়ে যায় এবং অনেক মৌমাছিকে বাক্সে সামনে বুকে হাঁটতে দেখা যায়। বাক্সে সামনে আমাশয় এর মতো হলুদ পায়খানা পড়ে থাকে। মৌমাছিরা কলোনীর মধ্যে বিশৃংখলাভাবে ঝাঁক বেঁধে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে প্যারালাইসিস হতে দেখা যায়। আক্রান্ত রানী ডিম দেয়া বন্ধ করে দেয়। এ্যাকারাইন হতে দেখা যায়। এ্যাকরাইন রোগের প্রতিকার হল-মৌবাঙ্রে ভেতরে মিথাইল স্যালিসাইলেটের বাষ্প দেয়া। এজন্য ছোট একটি বোতলে মিথাইল স্যালিসাইলেট নিয়ে রবার কর্ক দিয়ে মুখ বন্ধ করতে হবে।

মৌমাছি পালনের আয়-ব্যয়[সম্পাদনা]

মৌমাছি পালন প্রকল্প স্থাপনের জন্য আলাদাভাবে কোনো জায়গার প্রয়োজন হয় না। বাড়ির আনাচে-কানাচে, ঘরের বারান্দায়, ছাদে কিংবা বাগানেও মৌ-বাক্স রাখা যায়। অ্যাপিস সেরানা প্রজাতির ৫টি মৌ-কলোনি সম্বলিত মৌ-খামার স্থাপনের জন্য মোট বিনিয়োগ হবে ১৫-১৬ হাজার টাকা। প্রতিবছর গড়ে প্রতি বাক্স থেকে ১০ কেজি মধু পাওয়া যাবে, যার বাজারমূল্য ২৫০ টাকা হিসেবে ২৫০০ টাকা। এ হিসেবে ৫টি বাক্স থেকে উত্পাদিত মধুর মূল্য দাঁড়াবে ৫–১০ কেজি – ২৫০ টাকা (প্রতি কেজি)= ১২,৫০০ টাকা। এই আয় ১০-১৫ বছর অব্যাহত থাকবে অর্থাৎ প্রথমে মাত্র একবার ১৫-১৬ হাজার টাকা ব্যয় করে প্রকল্প স্থাপন করলে মৌ-বাক্স এবং অন্যান্য সরঞ্জামাদি ১০-১৫ বছর ব্যবহার করা যাবে। আর কোনো বিনিয়োগ বা খরচ নেই বললেই চলে।[২]

অন্যদিকে অ্যাপিস মেলিফেরা প্রজাতির ৫টি মৌ-কলোনি সম্বলিত মৌ-খামার স্থাপনের জন্য মোট ব্যয় হবে ২৫ থেকে ২৭ হাজার টাকা। এক্ষেত্রেও ১০-১৫ বছর পর্যন্ত মৌ-বাক্স ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি এবং সরঞ্জামাদি ব্যবহার করা যাবে। আর কোনো অর্থ বিনিয়োগ করতে হবে না। মেলিফেরা প্রজাতির প্রতিটি মৌ-বাক্স থেকে বছরে ৫০ কেজি পর্যন্ত মধু সংগ্রহ করা সম্ভব, যার বাজারমূল্য ৫০ কেজি –২৫০ টাকা (প্রতিকেজি) – ৫টি বাক্স= ৬২,৫০০ টাকা। প্রকল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে মাত্র ২৫-২৭ হাজার টাকা এককালীন বিনিয়োগ করে প্রতিবছর ৬০ হাজার টাকার ঊর্ধ্বে আয় করা সম্ভব। মৌ-বাক্সের সংখ্যা প্রতিবছর বৃদ্ধির মাধ্যমে এ আয় অনেকগুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব। স্বল্প পরিশ্রমে এ ধরনের প্রকল্প স্থাপনের মাধ্যমে একদিকে যেমন আর্থিক দিক থেকে লাভবান হওয়া যায়, তেমনি পরাগায়ন প্রক্রিয়ায় সহায়তা দানের মাধ্যমে দেশের ফল ও ফসলের উত্পাদনে পরোক্ষভাবে সহযোগিতা দান করা যায়।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. বেগম, প্রফেসর জাহানারা। ফলিত ও অর্থনৈতিক প্রাণিবিজ্ঞান। কবির পাবলিকেশন্স। 
  2. "মৌমাছি চাষের বিস্তারিত তথ্য"। জাতীয় ই-তথ্যকোষ।