মৃৎশিল্প

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
মৃৎশিল্প

পৃথিবীর সবথেকে প্রাচীন শিল্প হচ্ছে মাটির শিল্প অর্থাৎ মৃৎশিল্প। মাটির তৈরি শিল্পকর্মকে আমরা বলি মৃৎশিল্প। কারণ, এ শিল্পের প্রধান উপকরণ হলো মাটি। তবে সব মাটি দিয়ে মৃৎশিল্প তৈরি করা যায় না। এ কাজে পরিষ্কার এঁটেল মাটির প্রয়োজন হয়। কেননা, এঁটেল মাটি বেশ আঠালো। দোআঁশ মাটি তেমন আঠালো নয়। আর বেলে মাটি তো ঝরঝরে—তাই এগুলো দিয়ে মাটির শিল্প হয় না।

আবার এঁটেল মাটি হলেই যে তা দিয়ে এই শিল্পের কাজ করা যাবে, তা-ও নয়। এর জন্য অনেক যত্ন আর শ্রম দরকার। দরকার হাতের নৈপুণ্য ও কারিগরি জ্ঞান। তবে কুমোরদের কাছে এসব খুব সহজ।বাঙালির ঐতিহ্য এর ভীতর অন্যতম হলো মাটির শিল্প অর্থাৎ শিল্প।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

মৃৎশিল্প মানুষের উদ্ভাবিত প্রারম্ভিক শিল্পকলার একটি। তাই ভারতবর্ষে ইতিহাসে মৃৎশিল্পের ঐতিহ্য সুপ্রাচীন। নিয়োলিথিক যুগের স্থুল মৃৎপাত্রাদির নিদর্শন পশ্চিবঙ্গের উঁচুভূমি ও সাঁওতাল পরগনায় পাওয়া গেছে। মহেঞ্জদারো, তক্ষশীলা ও হরপ্পা সভ্যতার ঐতিহাসিক নিদর্শন বিভিন্ন রকমের মৃৎপাত্র ও অলঙ্কারের ঐতিহ্য তো আছেই। বলতে গেলে আবহমান কাল থেকেই নদীবহুল বাংলার পলিমাটি শুধু প্রাত্যহিক জীবনযাত্রার নানা কাজে যে লেগেছে তা নয়, বাংলা শিল্পকলার অন্যতম উপাদান হিসেবেও ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পাথর এদেশে দুর্লভ বলে তার ব্যবহার ছিল সীমাবদ্ধ। বাঁশ, কাঠ, নলখাগড়া প্রভৃতি ছিল ঘড়-বাড়ি তৈরির প্রধান উপাদান। এছাড়া পোড়ামাটি ও ইট মন্দির হিবার প্রভৃতি নির্মাণে বহুলভাবে ব্যবহৃত হত। পুতুল ও খেলনা হাড়ি-পাতিল, সানকি-কলস, সৌখিন দ্রব্য ইত্যাদি উৎপাদনে মৃত্তিকার ব্যবহার হতো। যে দেশে বৃষ্টিপাত প্রচুর, বন্যা ও নদী ভাঙ্গন প্রায় প্রতি বছরই অনিবার্য, সেখানে মাটির সামগ্রী কত দিনই না টিকে থাকতে পারে। তবুও রাজশাহীর পাহাড়পুর, বগুড়া মহাস্থানগড় ও কুমিল্লার ময়নামতির বিহার এবং দিনাজপুরের কান্তজীর মন্দিরে আমাদের ঐতিহ্যমন্ডিত ও সুপ্রাচীন মৃৎশিল্পের ও পোড়ামাটি কাজের উৎকৃষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। বাংলা মৃৎশিল্প ও পোড়ামাটির কাজ যে একসময় চরম উৎকর্ষতা ও জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল তা বিভিন্ন বিহার, স্তূপ, প্রলনফলকে উৎকীর্ণ প্রতিকৃতি চিত্র, মূর্তিখোদিত চিত্র, পান্ডুলিপি চিত্র এবং বিভিন্ন চিত্রিত হাঁড়ি-পাতিল, কলস ইত্যাদি থেকে সহজেই অনুমান করা যায়।

মৃৎশিল্পে উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ[সম্পাদনা]

মানবসভ্যতার ইতিহাস ও ক্রমবিবর্তনের ধারার সঙ্গে মৃৎশিল্পে উদ্ভব ও ক্রমবিকাশের ধারা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিশ্ববিখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ লুই হেনরি মর্গান ‘মৃৎশিল্পে আবিষ্কারকে বন্য অবস্থা থেকে বর্বর অবস্থায় উত্তরণের সূচনা বলে চিহ্নিত করেছেন। মৃৎশিল্পে ঐতিহ্য শত-সহস্র বছর আগের। প্রস্তর যুগের আদিম মানুষ এ শিল্পের আদি শিল্পী। এ যাবৎকালে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে উদ্ধাকৃত প্রাচীনতম মৃৎপাত্রের নিদর্শন হচ্ছে-- নব্য প্রস্তরযুগের স্থূল মৃৎপাত্র, যা ঝুড়ি কাঠামোতে (Basket form) তৈরি। একই ধরনের আরেকটু উন্নত পাত্র পাওয়া গেছে নিল, ইউফ্রেটিস ও সিন্ধু তীরবর্তী এলাকাগুলোতে। ধারণা করা হয়, মধ্যপ্রাচ্যেই সর্বপ্রথম মাটি পাত্র তৈরি হয়, মধ্যপ্রাচ্যেই সবচেয়ে উন্নতমানের অলংকৃত মৃৎপাত্র তৈরি হতো দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানের সুসা অঞ্চলে। এতে জ্যামিতিক নকশা ছাড়াও জলপ্রপাত ও ছুটন্ত কুকুরের ছবি চিত্রিত আছে। মিসর ও মেসোপটেমিয়া ছাড়াও সিন্ধু তীরবর্তী এলাকা, চীন, পারস্য ও এশিয়া মাইনরের বিভিন্ন স্থানে প্রাচীন মৃৎশিল্পে নিদর্শন পাওয়া গেছে।

ভারতীয় উপমহাদেশের মৃৎশিল্পে ইতিহাস কম্পক্ষে পাঁচ হাজার বছরের প্রাচীন। ভূমধ্যসাগরের পূর্বাঞ্চল থেকে হরপ্পা-মহেঞ্জদারো অবধি বিস্তৃত ভূ-খন্ডে একদা যেসব আদিম সভ্যতার উদ্ভব হয়েছিল, সেগুলোর পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শনের মধ্য অন্যতম হচ্ছে বিভিন্ন ছাঁচের ও নানা আকারে হাঁড়ি, কলসি, সরা, মটকা, গেলাস, পেয়ালা, থালা বাটি চামচ, ঢাকনি ইত্যাদি। এসবই মূলত চাকে তৈরি হত। প্রাগৈতিহাসিক যুগে মাটির তৈরি জিনিসপত্র রোদে শুকিয়ে শক্ত করা হত এবং প্রধানত শস্য ও শুকনো দ্রব্যাদি সংরক্ষণের জন্য ব্যবহার করা হতো। মৃৎশিল্পে ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এর উৎপত্তি ঘটেছে ‘নিয়োলিথিক' বা নব্য প্রস্তরযুগে।

মিসরে খ্রি. পূ. ৪০০০ বছর আগের মৃতদেহে ভস্ম রাখার কিছু মৃৎপাত্র পাওয়া গেছে। নিলনদ উপত্যকার কিছু মৃৎশিল্পের নমুনা থেকে দেখা যায়, সেগুলো খ্রি. পূ. বছরের। এভাবে আবিষ্কার চলছে ইউরোপ ও আমেরিকাসহ পৃথিবীর অন্যান্য দেশে। তবে খ্রি. পূ. ৩১০০ অব্দে মিসরের বিভিন্ন জায়গায় আগুনে পোড়ানো নকশা করা মৃৎপাত্রের নিদর্শন পাওয়া গেছে। ৩০০০ খ্রি. পূ. উত্তর মেসোপটেমিয়ায় এবং ২০০০ খ্রি. পূ. মাঞ্চুরিয়ায় নানারকম মেটালিক অক্সাইড সহযোগে অঙ্কিত উৎকৃষ্ট মৃৎশিল্প বিকাশের প্রমাণ পাওয়া যায়।

প্রথম প্রথম মৃৎশিল্প হাতে তৈরি হত ঝুঁড়ি বা এ জাতীয় অন্য কিছুর চারধারে কাদামাটি জড়িয়ে। পোড়ানোর প্রচলন ঘটে অনেক পরে। মিসরে হাতে তৈরি পলিশড রেডপার, ব্ল্যাক টপ্ড্ ভ্যাস পাওয়া যায় যা খ্রি.পূ. ৪০০০ বচর আগের তৈরি। ইরানে ২৫০০ খ্রি. পূর্বের ধূসর কাদামাটিরন পাত্রের নিদর্শন পাওয়া যায়। এরপর প্রচলন ঘটে কয়েল্ড্ পটারের, অর্থাৎ কাদামাটির তালকে লম্বা ও গোল করে স্তরে স্তরে জুড়ে দেয়া হত। চাঁছা ও মসৃণ করার কাজ হত পরে। কুমোরের চাকার প্রচলন, উদ্ভব ও বিকাশ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যায় না। তবে হাত ও পা দিয়ে চাকা ঘুরানোর সূচনা হয় অনেক আগে থেকেই; কেন-না, মাটির তালকে ইচ্ছেমত সুগঠিত, মসৃণ ও সুগোল করার অথবা আকার দেবার ইতিহাস মৃৎশিল্পের একটি প্রধান ও অপরিহার্য অংশ। অধিকাংশ ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিকের মতে, মৃৎশিল্পে উদ্ভব ও বিকাশ ঘটে মধ্যপ্রাচ্যে। কিন্তু ১৯৬০ সালে জেমস্ মেলার্ট তুরস্কের এ্যানাতোলিয়ান প্ল্যাটোতে নিয়োলিথিক বসতি কাতাল হুযুকে প্রায় খ্রি. পূ. ৯০০০ বছরের পুরনো কিছু স্থূল ও নরম মৃৎপাত্র খুঁজে পান। ৬৫০০ খ্রি. পূ. হাতে তৈরি আগুনে পোড়ানো শক্ত ও বার্নিশ করা মৃৎপাত্রের নিদর্শনও পাওয়া গেছে। উত্তর মেসোপটেমিয়ার খ্রি.পূ. ৩০০০ বছর পূর্বের ফাড ডিপোজিটের নিজের হাতে তৈরি মৃৎশিল্পে নিদর্শন স্যার লিওনার্ডউলি আবিষ্কার করেন। ৩২০০-৩০০০ খ্রি. পূ. ঢাকার তৈরি উৎকৃষ্ট মৃৎশিল্পে নিদর্শন ইরানের দক্ষিণ পশ্চিমে সুসায় পাওয়া গেছে। অধিকাংশ ঐতিহাসিক এ বিষয়ে একমত যে, নিয়োলিথিক যুগে ইরান, মিসর ও চিনে মৃৎশিল্প ‘ঐতিহ্যমন্ডিত ও উৎকর্ষ শিল্প' হিসেবে মর্যাদা লাভ করে।

এছাড়াও মৃৎশিল্পে বিকাশ ও উন্নয়নে চিনের শ্রেষ্ঠত্ব প্রশ্নাতীত। এ প্রসঙ্গে সাং ডাইনাস্টি (৯৬০-১২৭৯ খ্রি.)-র কথা স্মরণীয়। এ সময় চিনামাটির পাত্র ও শিল্পদ্রব্য চরম উৎকর্ষতা লাভ করে। পোরসিলিনও আবিষ্কৃত হয় চিন তাং ডাইনাস্টির (৬১৮-৯০৫ খ্রি.) আমলে। পোরসিলিনের প্রধান উপাদান কাওলিন বা হোয়াইট চায়না ক্লে এবং পেটুন্সের মিশ্রণ। এই মিশ্রণ ১৪৫০ সেলসিয়াস তাপে পোড়ানো হয়। ঐতিহ্যবাহী চিনা মৃৎশিল্পে স্বচ্ছতার বিষয়টিও এক্ষেত্রে স্মরণ করা যেতে পারে। পাশ্চাত্যে ১২৮০-১৩৬৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে মৃৎশিল্পে প্রচলন ঘটে।মৃৎশিল্প স্থানীয় প্রথাগত হাতিয়ার ও উপকরণ ব্যবহার করে চাহিদা মাফিক বিভিন্ন ধরনের মাটির জিনিস তৈরি করার শিল্পকেই ‘মৃৎশিল্প' বলা হয়। সাধারণ অর্থে, মৃৎশিল্প বলতে প্রধানত কাদামাটি থেকে তৈরি যাবতীয় ব্যবহার্য ও সৌখিন শিল্প সামগ্রীকেই বোঝায়। ব্যাপক অর্থে, মৃৎশিল্প বলতে কাদা-মাটি দিয়ে তৈরি এবং পরবর্তীকালে আগুনে পোড়ানো যাবতীয় উপকরণকেই বোঝায়।


শ্রেণীবিভাগ[সম্পাদনা]

উন্নত গুণগতমানের মৃত্তিকা আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে মৃৎশিল্পে শ্রেণীবিভাগও শুরু হয়। মৃৎশিল্পকে সাধারণভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় ও সৌখিন এই শ্রেণীতে ভাগ করা যায়। দৈনন্দিন জীবনযাপনে ব্যবহার্য জিনিসপত্রই নিত্যপ্রয়োজনীয় মৃৎশিল্প বলে পরিগণিত। নিত্যপ্রয়োজনীয় মৃৎপাত্রের মধ্যে রয়েছে মাটির হাঁড়ি, নানা রকম পাত্র, বাসন, কলস, সুরাই, ডিশ, কোলা ইত্যাদি। অপরদিকে জনজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন, যা ব্যবহারিক প্রয়োজনে প্রায় লাগে না, তাই শৌখিন শিল্প হিসেবে গণ্য হতে পারে। এক্ষেত্রে সৌখিন মৃৎশিল্পের মধ্যে তামাকের পাইপ, নানা রকম পুতুল, ফুলদানি, ছাইদানি, মাটির ভাস্কর্য প্রভৃতির নাম উল্লেখ করা যায়।


মৃৎ শিল্পের বৈশিষ্ট্য[সম্পাদনা]

মৃৎশিল্পের প্রধান উপাদান কাদামাটি ১.এটি অাঁঠালো হবে, যেন একে যে কোন আকার দেয়া সম্ভব হয় এবং এটি আগুনে পোড়ালে শক্ত হয়ে যাবে। ২.কাদামাটি দিয়ে তৈরি করার পর আগুনে পুড়িয়ে শক্ত করে এবং রং করে সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা হয়।