মার্ক্সের মানুষের-প্রকৃতি তত্ত্ব

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

মার্ক্সের মানুষের-প্রকৃতি তত্ত্ব মার্ক্সের পুঁজিবাদের সমালোচনা, সাম্যবাদের ধারণা, এবং তার 'ঐতিহাসিক বস্তুবাদের' মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। যদিও তিনি কখন মানুষের প্রকৃতি শব্দটি ব্যবহার করেননি। কিন্তু Gattungswesen, যেটা অনুবাদ করলে দাঁড়ায় 'প্রজাতি' (species-being) বা 'প্রজাতি-সারাংশ' (species-essence)। তিনি যেটা বুঝাতে চেয়েছেন মানুষ তার নিজের প্রকৃতি ও কিছু পরিমান তৈরি ও তার আকার দান করতে পারে। যুবক মার্ক্সের ১৮৪৪ এর পাণ্ডুলিপি এর একটি নোটে বলা হয়, এই শব্দটি ফায়ারবাখের দর্শন থেকে এসেছে, যেখানে এই শব্দটির দ্বারা একই সাথে মানব প্রকৃতি এবং মানবতা বুঝিয়ে থাকে।[১]

যাই হোক, ষষ্ঠ থিসিজ অন ফায়ারবাখ (১৮৪৫) এ মার্ক্স "মানব প্রকৃতি" এর গতানুগতিক ধারণাকে "প্রজাতি" হিসেবে সমালোচনা করেন, যেখানে "প্রজাতি" শব্দটি দ্বারা প্রতিটি আলাদা আলাদা মানুষের মানব প্রকৃতিকে নির্দেশ করা হয়, কিন্তু সেখানে "সামাজিক সম্পর্কের" দ্বারা মানব প্রকৃতির গঠনের কথা নির্দেশ করা হয় না। তাই, চিরায়ত আইডিয়ালিস্ট দর্শন দ্বারা পূর্ণাঙ্গভাবে মানব প্রকৃতিকে বোঝা যায় না। অন্যদিকে মার্ক্সের "প্রজাতি সারাংশ" মানব প্রকৃতির কিছু জীববিজ্ঞানগত অবদানের সাথে সাথে সামাজিক ও ঐতিহাসিক অবদানকেও বিবেচনা করে।

ষষ্ঠ থিসিজ অন ফায়ারবাখ এবং সামাজিক সম্পর্কের দ্বারা মানব প্রকৃতি নির্ণয়[সম্পাদনা]

থিসিজ অন ফায়ারবাখ এর ষষ্ঠটি লেখা হয় ১৮৪৫ সালে, এখানে মার্ক্স মানব প্রকৃতির ধারণা সম্পর্কিত প্রাথমিক আলোচনা করেন। এখানে বলা হয়:

ফায়ারবাখ ধর্মের সারাংশকে মানুষের সারাংশের সাথে মিলিয়ে দিয়ে সমাধান দানের চেষ্টা করেছেন [menschliches Wesen = 'মানব প্রকৃতি']। কিন্তু মানুষের সারাংশ কখনই প্রতিটি আলাদা আলাদা ব্যক্তির মধ্যে অন্তর্নিহিত নয়। বাস্তবে, এটা হচ্ছে সামাজিক সম্পর্কগুলোর মিলিত ফলাফল। ফায়ারবাখ, যিনি এর প্রকৃত সারাংশ নিয়ে সমালোচনা করেন নি, তিনি এরকমটা মেনে নিয়েছিলেন:

১। এখানে একে ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া থেকে সিদ্ধান্ত টানতে এবং এর দ্বারা ধর্মীয় অনুভূতিকে সংজ্ঞায়িত করতে এবং আলাদা আলাদা একক মানুষের ধারণাকে পূর্বেই ধরে নিতে ধরে নেয়া হয়।

২। এজন্য তার দেয়া এই সারাংশকে কেবলই "স্পিসিজ" বা প্রজাতি বলা যায়, যা মানুষের ভেতরের একটি অন্তঃস্থ "বুদ্ধিহীন" সাধারণতা (generality) এবং যেখানে প্রাকৃতিকভাবেই অনেক অনেক একক ব্যক্তি যুক্ত হয়।[২]

তাই মার্ক্স বলেছিলেন যে, মানব প্রকৃতি আসলে "সামাজিক সম্পর্কসমূহ" দ্বারা তৈরি ছাড়া আর কিছুই নয়। নরমান গেরাস তার মার্ক্স এন্ড হিউম্যান নেচার এ, এই যুক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন।[৩] এখানে গেরাস দেখিয়েছেন, যেখানে সামাজিক সম্পর্ক মানুষের প্রকৃতি নির্ণয় করার চেষ্টা করে, তারা কেবলই মানব প্রকৃতির নির্ণায়ক নয়। যাই হোক, মার্ক্স তার একটি বিবৃতিতে একটি কথা বিশেষভাবে বলেছিলেন যে, একজনের জীবনের ফলাফলের মাধ্যমে যা তৈরি হয় মানব প্রকৃতি তার থেকেও বেশি কিছু। তার পুঁজি (capital) গ্রন্থে উপযোগবাদ (utilitarianism) এর সমালোচনা করার সময় বলেছিলেন, উপযোগবাদীদেরকে সাধারণভাবে মানব প্রকৃতি নিয়ে বিবেচনা করা উচিৎ, এরপর তাদেরকে প্রতিটি ঐতিহাসিক যুগে যে পরিবর্তিত মানব প্রকৃতি তৈরি হয় সেটা নিয়ে বিবেচনা করা উচিৎ।[৪] মার্ক্স কোন চেতনাগত জীবনের ভেতরে প্রোথিত অবস্থার নয়, বরং মানব প্রকৃতির একটি বিমূর্ত ধারণার বিরুদ্ধে যুক্তি দিয়েছেন। মার্ক্স বলেছেন, প্রতিটি আলাদা আলাদা ব্যক্তিই তাদের উৎপাদনের বস্তুগত অবস্থার উপর নির্ভরশীল।[৫] তিনি আরও বিশ্বাস করতেন যে, মানব প্রকৃতি সেইভাবে ঠিক হবে যেভাবে আলাদা আলাদা ব্যক্তি নিজেদের জীবনকে প্রকাশ করে (উৎপাদনশীল শক্তি এবং উৎপাদনের সম্পর্কসমূহের পটভূমির বিরুদ্ধে)। ইতিহাসে 'মানব প্রকৃতির একটি অনবরত পরিবর্তন দেখা যায়',[৬] যদিও এর দ্বারা এটা বোঝায় না যে মানব প্রকৃতির প্রতিটি দিক সম্পূর্ণভাবে পরিবর্তনশীল, যা পরিবর্তিত হয়, তার পুরোপুরি পরিবর্তিত হবার প্রয়োজন নেই।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. [1]
  2. "Theses On Feuerbach" 
  3. See in particular Chapter Two
  4. [2]
  5. [3]
  6. [4]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]