মারিয়া আল-কিবতিয়া

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

মারিয়া আল-কিবতিয়া ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান ছিলেন। তার বাবা ছিলেন মিশরীয় আর মা মিশরে বসবাসকারী একজন গ্রীক মহিলা ছিলেন। তাকে অল্পবয়সেই মিশরের শাসক মুকাকিসের দরবারে দেওয়া হয়েছিল। তিনি কিভাবে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর স্ত্রী হয়েছিলেন- এই নিয়ে ইসলামিক ইতিহাসবিদদের বিভিন্ন মতামত রয়েছে।

হুদাইবিয়ার সন্ধি স্বাক্ষরের পর, মহানবী (সা.)-কে যখন মহান আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ দিয়েছিলেন ইসলামের বাণী বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার, তখন

মহানবী (সা.) তাঁর সাহাবীদের একত্রিত করলেন এবং তাদের বললেন যে তিনি (সা.) অমুসলিম দেশের শাসকদের কাছে বিভিন্ন প্রতিনিধি দল পাঠাবেন যাতে তারা ইসলাম ধর্মে প্রবেশ করে।

এরই প্রেক্ষিতে, হাতিব বিন আবির নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদলকে মিশরে পাঠানো হয়েছিল-যেটি তখন মুকাকিদের দ্বারা শাসিত ছিল।

তখনকার আলেকজান্দ্রিয়ার আর্চবিশপ জর্জ বিন মেনা ভিন্ন পদ্ধতিতে প্রতিনিধি দল এবং এর বার্তার প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন। তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন যে তার ইসলাম গ্রহণ না করার কারণ ছিল উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অব্যাহতিপ্রাপ্ত হওয়ার ভয়ে।  কোনোভাবে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলে নেতা হিসেবে তার অবস্থান হুমকির মুখে পড়বে।

কিন্তু তিনি মহানবী (সাঃ) কে শেষ নবী হিসাবে স্বীকার করেন এবং হাতিব বিন আবিকে সাদরে স্বাগত জানান।

প্রতিনিধিদলের সাথে ভাল ব্যবহার করা হয় এবং তারা নবী (সাঃ) এর জন্য উপহার প্রদান করেন।  

উপহারের মধ্যে ছিল দুই ক্রীতদাসী মারিয়া আল-কিবতিয়া এবং তার বোন সিরিন, একটি সাদা খচ্চর, একটি গাধা, কিছু টাকা এবং বিভিন্ন মিশরীয় পণ্য।

প্রতিনিধি দলটি জর্জ বিন মেনার সৌজন্যে দেয়া উপহার নিয়ে মহানবী (সা.)-এর কাছে ফিরে আসে। মদীনায় ফেরার পথে, হাতিব বিন আবি দুই ক্রীতদাসী - মারিয়া আল কিবতিয়া এবং তার বোন সিরিনকে - ইসলাম গ্রহণ করতে রাজি করান এবং তাদের আগমনের সাথে সাথে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলাম ধর্মগ্রহণ করে। যখন দাসীদেরকে মহানবী (সা.)-এর কাছে পেশ করা হয়, তখন তিনি মারিয়া আল-কিবতিয়াকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন এবং তার বোন (সিরিন) হাসান বিন সাবিতকে দিয়ে বিয়ে দেন।

৬২৮ খ্রিস্টাব্দে যখন প্রতিনিধি দল মদীনায় আসে তখন মারিয়া আল-কিবতিয়ার বয়স ছিল প্রায় ২০ বছর।  তিনি একজন সুন্দরী, দয়ালু এবং দানশীল মহিলা হিসাবে পরিচিত ছিলেন যিনি তাঁর মৃত্যুর পরেও মহানবী (সা.)-এর প্রতি অনুগত ছিলেন - কারণ তিনি আর কখনও বিয়ে করেননি।  

মসজিদের আশেপাশে বসবাসকারী নবী (সা.)-এর অন্যান্য স্ত্রীদের থেকে ভিন্ন মদিনার উপকণ্ঠে একটি বাসস্থান দিয়েছিলেন যা আজ আমাদের কাছে "মাশরাবাত উম্মে ইব্রাহিম" নামে পরিচিত।

মহান আল্লাহর রহমতে মারিয়া আল-কিবতিয়া মহানবী (সা.)-এর সাথে বিয়ের পর একটি সুন্দর ছেলের জন্ম দেন।  যেহেতু তিনি পূর্বে একজন ক্রীতদাসী ছিলেন, তাই মারিয়া আল-কিবতিয়ার নবীর (সাঃ) স্ত্রী হিসাবে মর্যাদা প্রাথমিকভাবে বিতর্কিত ছিল।  যাইহোক, তিনি ৮ম হিজরীতে একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দেওয়ার পর, তার মর্যাদা একজন স্বাধীন স্ত্রীর মতো উন্নীত হয় এবং প্রকৃতপক্ষে তিনি মহানবী (সা.)-এর সবচেয়ে প্রিয় স্ত্রীদের একজন হয়ে ওঠেন।  নবী (সাঃ)ও পুত্রের খবর শুনে আনন্দিত হয়েছিলেন এবং ইসলামের পূর্বপুরুষের নামানুসারে তার নাম রাখেন "ইব্রাহিম"। মদিনার গরীব-দুঃখীদের শস্যদানের মাধ্যমে ইব্রাহিমের জন্ম উদযাপন করা হয়।  এবং মহানবী (সা.) পুত্রের জন্মের পর প্রতিদিন মারিয়া আল-কিবতিয়ার বাড়িতে যেতেন এবং তার যত্ন নিতেন এবং তাকে যে কোনও মহান পিতার মতো ভালবাসতেন।  ইব্রাহিমের জন্ম নবী (সাঃ) এবং তাঁর স্ত্রীর জন্য যে আনন্দ নিয়ে এসেছিল তা খুব বেশি দিন স্থায়ী হয়নি।  শীঘ্রই ইব্রাহিম গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং তার মা এবং খালা সিরিন তার যত্ন নেন। যত দিন যাচ্ছে, তার অবস্থা আরও খারাপ হতে লাগল এবং যখন স্পষ্ট হল যে তিনি বাঁচবেন না, তখন নবী (সাঃ) কে ডাকা হল।  নবী (সাঃ) ইব্রাহিমকে তার কোলে ধরেছিলেন যখন তিনি তার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন এবং তার মৃত্যু মহান আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছা হিসাবে মেনে নেন । ইব্রাহিমের মৃত্যু নবী (সাঃ) এবং তাঁর স্ত্রী উভয়ের জন্যই একটি বড় ক্ষতি ছিল, যিনি সন্তানকে খুব ভালোবাসতেন।

ইব্রাহিমের মৃত্যুর পর, অবিশ্বাসীরা নবী (সা.)-কে উপহাস করতে শুরু করে এবং বলে যে তার আল্লাহ তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে এবং তার নাম এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তার আর কেউ নেই।  

মহানবী (সা.) বিধ্বস্ত হয়েছিলেন এবং তাই আল্লাহ তায়ালা শোকাহত নবী (সা.)-এর পক্ষে সূরা আল-কাউসার (প্রচুর) এর নিম্নোক্ত আয়াত নাজিল করেন:

"নিঃসন্দেহে, আমরা আপনাকে [হে মুহাম্মদ] আল-কাওসার দান করেছি।  অতএব তোমার পালনকর্তার উদ্দেশ্যে নামায পড় এবং কুরবানী কর।  প্রকৃতপক্ষে, তোমাদের শত্রু সেই বিচ্ছিন্ন।" (কুরআন ১০৮:১-৩)।

এটা সত্য যে, আল্লাহ তার সৃষ্টিকে প্রয়োজনের সময় একা রাখেন না যেমন তিনি নবী (সা.)-কে পরিত্যাগ করেননি যখন তাঁর একমাত্র পুত্রের মৃত্যুর পর অবিশ্বাসীরা তাঁর বিরুদ্ধে ছিলেন।

মারিয়া আল-কিবতিয়া ছিলেন একজন সম্মানিত মহিলা যিনি তাঁর জীবনের তিন বছর মহানবী (সা.)-এর সাথে কাটিয়েছিলেন কারণ তিনিও তাঁর পুত্রের মৃত্যুর কয়েক মাস পরে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যান।  তিনি তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুই ব্যক্তিকে হারানোর পর, মারিয়া আল-কিবতিয়া তার বাড়ির চার দেয়ালে নিজেকে আবদ্ধ করে ফেলেন।  যে পাঁচ বছর তিনি নবী (সাঃ) এর বাইরে বেঁচে ছিলেন, তিনি কেবল তার প্রিয় পুত্র বা তার স্বামীর কবর জিয়ারত করতে বেরিয়েছিলেন।  তিনি ১৬ হিজরিতে মারা যান এবং উমর বিন খাত্তাব তার জানাযার নামাজের নেতৃত্ব দেন।  তাকেও জান্নাতুল বাকিতে দাফন করা হয়েছে।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]