মাগরিবি মহল্লা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
১৮৯৮ থেকে ১৯৪৬ সালের মধ্যবর্তী সময়ে মাগরিবি মহল্লা।

মাগরিবি মহল্লা[১][২] (আরবি: حارَة المَغارِبة‎‎ হারাত আল-মাগারিবা, হিব্রু ভাষায়: שכונת המוגרבים‎, সখুনাত হামাগরাবিম) ছিল জেরুজালেমের পুরনো শহরের দক্ষিণপূর্বে অবস্থিত ৭৭০ বছর পুরনো একটি মহল্লা। এর পূর্বে হারাম আল শরিফের পশ্চিম দেয়াল, দক্ষিণে বাব আল-মাগরিবিসহ পুরনো শহরের দেয়াল ও পশ্চিমে ইহুদি মহল্লা অবস্থিত ছিল। এটি মূলত উত্তরের মুসলিম মহল্লার বর্ধিতাংশ। ১২শ শতাব্দীতে সুলতান সালাহউদ্দিনের এক ছেলে এই মহল্লা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।[৩]

পশ্চিম দেয়ালে ইহুদিদের প্রার্থনার সুবিধার্থে ছয় দিনের যুদ্ধের তিন দিন পর ইসরায়েলি বাহিনী এই মহল্লাটি গুড়িয়ে দেয়।[৪]

ইতিহাস[সম্পাদনা]

আইয়ুবীয় ও মামলুক যুগ[সম্পাদনা]

১৫শ শতাব্দীর ইতিহাসবিদ মুজিরউদ্দিন আল-উলাইমির মতে ১১৯৩ সালে সুলতান সালাহউদ্দিনের ছেলে মালিক আল-আফদাল মরক্কান অভিবাসীদের জন্য ওয়াকফ হিসেবে এই মহল্লাটি প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি এখানে আফদালিয়াহ নামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও গড়ে তুলেছিলেন।[৩] পরবর্তীতে অন্যান্য ধার্মিক মরক্কানরা অন্যান্য ওয়াকফ চালু করে এর বৃদ্ধি ঘটান। ১৩০৩ সালে উমর ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আবদুন নবী আল-মাসমুদি আল-মুজাররাদ মরক্কান বাসিন্দাদের পড়াশোনার জন্য এখানে আল-মাসমুদিয়া জাওইয়া প্রতিষ্ঠা করেন। ১৩২০ সালে সুফি আবু মাদিয়ানের নাতি শুয়াইব ইবনে মুহাম্মদ ইবনে শুয়াইব দ্বিতীয় একটি জাউইয়া স্থাপন করেন এবং আইন কারিমে অবস্থিত তার জমি থেকে এর খরচের যোগান দেয়ার ব্যবস্থা করেন। ১৩৫২ সালে মরক্কোর মারিনি সুলতান আবু ইনান ফারিসও এখানে ওয়াকফ চালু করেন।[৩][৫]

উসমানীয় যুগ[সম্পাদনা]

ইহুদি ও মাগরিবি মহল্লা
পশ্চিম দেয়াল সংলগ্ন মাগরিবি মহল্লার অংশ, ১৮৯৮–১৯১৪

ফরাসি পর্যটক শ্যাটাওব্রিয়ান ১৮০৬ সালে এখানে সফর করেন। তার মতে মহল্লার কিছু বাসিন্দা ১৫শ শতাব্দীতে স্পেন থেকে নির্বাসিত মুরদের বংশধর। স্থানীয় বাসিন্দারা তাদের স্বাগত জানায় এবং এখানে একটি মসজিদ নির্মিত হয়।[৬] ১৯শ শতাব্দীতে পুরনো শহরের সাথে একীভূত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত মহল্লার বাসিন্দারা খাদ্য, পোষাক ও ঐতিহ্যের ক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি বজায় রেখেছিল।[৭] ফলে আল-আকসা মসজিদে ইবাদতের উদ্দেশ্যে আসা মরক্কোর বাসিন্দারা এখানে অবস্থান করত।[৭] সময় পরিক্রমায় এখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ ইত্যাদি গড়ে উঠে। আল-আকসা মসজিদে দায়িত্ব পালনকারী মুসলিম আলেমরাও এখানে অবস্থান করতেন।[৭]

মহল্লার বাড়িগুলি পশ্চিম দেয়াল থেকে চার মিটার দূরে ছিল। পশ্চিম দেয়াল সংলগ্ন এই স্থানটি ইহুদিদের কাছে ধর্মীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একটি সরু গলি দিয়ে যাতায়াত করতে হত।[৮]

টি. টবলার ১৮৪৫ সালে এই অঞ্চল সফরের বিবরণে মহল্লায় একটি মসজিদ ছিল বলে উল্লেখ করেছেন।[৯]

১৮৮৭ সালে ব্যারন রথচাইল্ড মহল্লার বাসিন্দাদেরকে অন্যত্র স্থানান্তর করে স্থানটি ইহুদিদের জন্য ব্যবহারোপযোগী করার উদ্দেশ্যে মহল্লাটি ক্রয় করার চেষ্টা করেছিলেন।[১০][১১] জেরুজালেমের উসমানীয় গভর্নর রউফ পাশা ও মুফতি মুহাম্মদ তাহির আল-হুসাইনি তার প্রস্তাবে অনুমোদন দেন। তবে আরবদের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার আশংকাসহ কিছু কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি।[১২]

উসমানীয় সাম্রাজ্য প্রথম বিশ্বযুদ্ধে প্রবেশের দুইমাসের মধ্যে জেরুজালেমের তুর্কি গভর্নর জাকি বে ইহুদিদের উপাসনার উদ্দেশ্যে ব্যবহারের স্বার্থে মহল্লাটি ইহুদিদের কাছে বিক্রির প্রস্তাব দেন। এসময় এখানে ২৫টি বাড়ি ছিল। তিনি মূল্য হিসেবে ২০,০০০ পাউন্ড চেয়েছিলেন। এই অর্থ দিয়ে মুসলিম পরিবারগুলিকে অন্যত্র পুনর্বাসন করার পরিকল্পনা ছিল। তবে শহরের ইহুদিরা অর্থের যোগান দিতে সক্ষম হয়নি।[১৩]

ব্রিটিশ মেন্ডেট যুগ[সম্পাদনা]

১৯১৮ সালে জায়নবাদি নেতা চেইম ওয়েইজমেন ব্রিটেনের ফরেন এন্ড কমনওয়েলথ অফিসে মহল্লাটি খালি করে ইহুদি মালিকানায় দেয়ার জন্য আবেদন জানিয়ে চিঠি পাঠান। তবে ব্রিটিশরা এই ব্যাপারে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করে। মহল্লাটি পূর্বের মত ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে বজায় ছিল এবং ইহুদিরা উপাসনার অধিকার ভোগ করছিল। ১৯২৯ সালের দাঙ্গার পর বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য লীগ অব নেশনসের অনুমোদন নিয়ে একটি কমিশন স্থাপন করে। কমিশন কিছু কর্মকাণ্ডে বিধিনিষেধ আরোপ সাপেক্ষে পূর্বের মত নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখার কথা পুনর্ব্যক্ত করে। বিধিনিষেধের মধ্যে ছিল শিঙা বাজিয়ে অনুষ্ঠিত ইয়োম কিপুরের প্রার্থনা থেকে ইহুদিদের বিরত রাখা এবং মুসলিমদেরকে পশ্চিম দেয়ালের কাছে জিকির অনুষ্ঠান থেকে বিরত রাখা।[৮]

জর্ডানি যুগ[সম্পাদনা]

১৯৪৮ সালের আরব-ইসরায়েলি যুদ্ধের সময় জর্ডানি সেনারা পুরনো শহর দখল করে নেয়। এসময় ১,৫০০ ইহুদি বাসিন্দা ইহুদি মহল্লা থেকে নির্বাসিত হয়।[১] যুদ্ধের সময় ইহুদি মহল্লা ও মাগরিবি মহল্লার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল।[১৪]

১৯৬৫ সালে জর্ডান সরকার মাগরিবি মহল্লার পার্শ্ববর্তী ইহুদি সম্পত্তিতে অবৈধ ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদেরকে স্থানান্তর করে পুরনো শহরের চার কিলোমিটার দূরে শুফাত উদ্বাস্তু শিবিরে সরিয়ে আনে।[১]

ইসরায়েলি যুগ[সম্পাদনা]

পশ্চিম দেয়ালের সামনের অংশ অপসারণের দৃশ্য, জুলাই ১৯৬৭

ইসরায়েলি বাহিনী পুরনো শহর দখলের তিন দিন পরে ১৯৬৭ সালের ১০ জুন শনিবার সন্ধ্যায় মাগরিবি মহল্লার ৬৫০ জন বাসিন্দাকে স্বল্প সময়ের নোটিশে আবাসস্থল ত্যাগের নির্দেশ দেয়া হয়। প্রহরীদের নিরাপত্তাধীন শ্রমিকরা এরপর বাড়িঘর ভাঙতে শুরু করে।[১৫] এর মধ্যে ১৩৫টি বাড়ি ও আবু মাদিয়ান জাওইয়া ছিল। কিছু বাসিন্দা তাদের বাড়ি ধ্বংস করার আগ পর্যন্ত স্থান ত্যাগে আপত্তি জানিয়েছিল। পরে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে এক বৃদ্ধ মহিলার লাশ পাওয়া যায়।[১৬]

শেখ ঈদ মসজিদও এসময় ভেঙে ফেলা হয়। এটি সালাহউদ্দিনের সময় থেকে টিকে থাকা অন্যতম মসজিদ ছিল।[১৭]

জেরুজালেমের মেয়র তেদ্দি কোল্লেক বাড়িঘর ধ্বংসের অনুমোদন দিয়েছিলেন। ১৯৭৮ সালে তিনি তার আত্মজীবনী রচনা করেছেন।[১৮][১৯] জাতিসংঘে প্রেরিত একটি চিঠিতে ইসরায়েলি সরকার জানায় যে জর্ডানি সরকার এলাকাটিকে বস্তিতে পরিণত হতে দেয়ার পর বাড়িঘরগুলি ভেঙে ফেলা হয়।[২০] ইহুদি প্রার্থনাকারীদের কথা মাথায় রেখে খুব দ্রুত এই কাজ সমাধা করা হয়।[১][১৯] জেনেভা কনভেনশনের আইনি দিক বিবেচনা করে অপারেশনের ডেপুটি সামরিক গভর্নর লেফটেন্যান্ট কর্নেল ইয়াকভ সালমান পূর্ব জেরুজালেমের পৌরসভা থেকে মহল্লার পরিচ্ছন্নতার দুরবস্থা ও মহল্লা খালি করার জর্ডানি পরিকল্পনার উল্লেখ ছিল এমন দলিলপত্র সংগ্রহ করেন।[১৫]

ইসরায়েল সরকার ১৯৬৮ সালের ১৮ এপ্রিল স্থানটি জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য বাজেয়াপ্ত করে। স্থানচ্যুত প্রতিটি পরিবারকে ২০০ জর্ডানি দিনার ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়।[১][১৮] দেয়ালের নিকটবর্তী মাদ্রাসা ফাখরিয়া ও ১৬শ শতাব্দী থেকে আবু আল-সাওদ পরিবারের মালিকানাধীন বাড়িটি এসময় ভাঙা না হলেও ১৯৬৯ সালে ভেঙে ফেলা হয়।[২১][২২]

প্রার্থনার স্থান দক্ষিণ দিকে ২৮মিটার থেকে বৃদ্ধি করে ৬০মিটার করা হয়। মূল প্লাজাটি ৪মিটার থেকে বৃদ্ধি করে ৪০মিটার করা হয়। দেয়ালের সামনের ১২০ বর্গমিটার স্থান পশ্চিম দেয়াল প্লাজায় পরিণত হয় যার আয়তন বর্তমানে ২০,০০০ বর্গমিটার।[১৮]

১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর মহল্লার অনেক বাসিন্দা বাদশাহ দ্বিতীয় হাসানের সহায়তায় মরক্কোয় অভিবাসী হয়।[১] অন্যান্য পরিবারগুলি শুফাত উদ্বাস্তু শিবির এবং জেরুজালেমের অন্যান্য স্থানে চলে যায়।[১]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. T. Abowd, The Moroccan Quarter: A History of the Present, in: Jerusalem Quarterly File (Institute of Jerusalem Studies), no. 7 (2000), pp. 6–16 [১] (retrieved October 16, 2012)
  2. Alternative spelling reported by :
     • The Legacy of Solomon। সংগ্রহের তারিখ নভেম্বর ২৮, ২০১২ 
     • Henry Cattan। The Palestine Question। সংগ্রহের তারিখ নভেম্বর ২৮, ২০১২ 
     • Annelies Moors। Discourse and Palestine: Power, Text and Context। সংগ্রহের তারিখ নভেম্বর ২৮, ২০১২ 
  3. F. E. Peters (১৯৮৪)। Jerusalem। Princeton, New Jersey: Princeton University Press। পৃষ্ঠা 357–359, 394–396। one of the best documented endowments, one that embraced the entire quarter of Western muslims or Maghrebis 
  4. M. Dumper, Jerusalem: Then and Now, in Middle East Reeport, 182 [২] : "On June 10, 1967, within days of the Israeli occupation of Jerusalem, Israeli authorities flattened an area between the Western Wall and the Jewish Quarter known as the Harat al-Magharibeh, or Moroccan Quarter, and forced the Palestinian inhabitants to leave."
  5. Abdul Latif Tibawi (১৯৭৮)। The Islamic Pious Foundations in Jerusalem। London: The Islamic Cultural Centre। পৃষ্ঠা 10–15। 
  6. François-René Chateaubriand (১৮১২)। Travels in Greece, Palestine, Egypt, and Barbary During the Years 1806 and 18072। Translated by Frederic Shorberl। পৃষ্ঠা 89। 
  7. "The Moroccan Community in Palestine ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ২২ আগস্ট ২০০৭ তারিখে", Noura al-Tijani, This Week In Palestine (retrieved August 25, 2007)
  8. "Report from the International Commission for the Wailing Wall", December 1930 (available as UN doc A/7057 - S/8427 at UNISPAL ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ২৮ ডিসেম্বর ২০০৭ তারিখে)
  9. Jerusalem in the Nineteenth Century: The Old City, Yehoshua Ben-Arieh, Yad Yitzhak Ben Zvi and St. Martin's Press, 1984 p.162–163
  10. Rossoff, Dovid (১৯৯৮)। "Beyond the Walls: 1870–1900"। Where Heaven Touches EarthJerusalem: Guardian Press। পৃষ্ঠা g.331। আইএসবিএন 0-87306-879-3 
  11. Martin Gilbert (২০০৮)। The Routledge Historical Atlas of Jerusalem: Fourth Edition। Routledge। পৃষ্ঠা 27। আইএসবিএন 978-0-415-43343-3। সংগ্রহের তারিখ ২৯ মে ২০১৩ 
  12. Stockman-Shomron, Israel (১৯৮৪)। "Jerusalem in Islam: Faith and Politics"। Israel, the Middle East and the Great Powers। Transaction Publishers। পৃষ্ঠা g.43। আইএসবিএন 965-287-000-5 
  13. Gilbert, Martin (১৯৯৬)। "War, 1914–1917"। Jerusalem in the Twentieth Century। London: Chatto & Windus। পৃষ্ঠা g.42। আইএসবিএন 0-7011-3070-9 
  14. Israel cements ownership of Jewish Quarter in Jerusalem's Old City
  15. Occupied territories: the untold stories of Israel's settlements, Gershom Gorenberg
  16. Tom Segev (২০০৭)। 1967। Metropolitan Books। পৃষ্ঠা 400–401। 
  17. Nit Hasson (জুন ১৫, ২০১২)। "Rare photograph reveals ancient Jerusalem mosque destroyed in 1967"Haaretz 
  18. "Simone RIcca: Heritage, Nationalism and the Shifting Symbolism of the Wailing Wall", Jerusalem Quarterly (Summer 2005/24), Institute of Jerusalem Studies (retrieved August 17, 2007)
  19. "Teddy Kollek and the Native Question", Joost R. Hiltermann, Middle East Report 05-06/1993 (available at merip.org [ত্রুটি: আর্কাইভের ইউআরএল অজানা] আর্কাইভকৃত [তারিখ অনুপস্থিত] তারিখে)
  20. Letter to the Secretary General ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ১ মার্চ ২০১০ তারিখে, letter from the Permanent Representative of Israel to the United Nations, March 6, 1968 (retrieved August 25, 2007)
  21. Reinventing Jerusalem:Israel's Reconstruction of the Jewish Quarter after 1967, Simone Ricca, pp. 67–113
  22. Robert Schick। "Mamluk and Ottoman Jerusalem"। Gideon Avni and Katharina Galor। Unearthing Jerusalem : 150 Years of Archaeological Research in the Holy City। পৃষ্ঠা 475–490। 

স্থানাঙ্ক: ৩১°৪৬′৩৫.৯৩″ উত্তর ৩৫°১৪′২.৭৫″ পূর্ব / ৩১.৭৭৬৬৪৭২° উত্তর ৩৫.২৩৪০৯৭২° পূর্ব / 31.7766472; 35.2340972