মসনবী

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
১৪৯০ সালের হস্তলিখিত মসনবী, মেভলানা জাদুঘর, তুরস্ক।

মসনবী বা মসনবী-ই মা'নবী (ফার্সি: مثنوی معنوی‎) হল জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ রুমি রচিত একটি বিখ্যাত ফার্সি সুফী কবিতা। সুফিবাদের উপর রচিত এটি সবচেয়ে বিখ্যাত ও প্রভাবশালী রচনার মধ্যে একটি। মসনবী ছয়টি কবিতার বইয়ের সংকলন।[১][২] এই আধ্যাত্মিক ধাঁচের লেখনীটি কীভাবে ঈশ্বরের সাথে প্রেমের লক্ষ্যে পৌঁছানো যায় তার শিক্ষা দেয়।[৩] এতে কুরআন ও আধ্যাত্মিক জীবন সম্পর্কিত রুমির গভীর উপলব্ধির বর্ণনা রয়েছে। মসনবীকে প্রায়ই 'ফার্সি কুরআন' বলে অভিহিত করা হয়।[৪]

সাধারণ বর্ণনা[সম্পাদনা]

মসনবী-ই মা'নবী (ফার্সি: مثنوی معنوی‎) শিরোনামটির অর্থ হল 'আধ্যাত্মিক শ্লোক'। মসনবী হল কোরআন, হাদিস ও প্রাত্যহিক ঘটনা থেকে নেওয়া সংক্ষিপ্ত কাহিনী বা গল্প। গল্পগুলো একটি নির্দিষ্ট বিষয়কে কেন্দ্র করে বর্ণনা করা হয়েছে এবং সবগুলো নীতিকথা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। এতে বিভিন্ন রকমের ইসলামি জ্ঞানের সমাহার রয়েছে, কিন্তু প্রাথমিক দৃষ্টিকোণ থেকে এতে ব্যক্তিগত সুফিবাদকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। রুমির দিওয়ান বইয়ের সাথে তুলনা করলে এটি তুলনামূলকভাবে পরিমিত মাত্রা মেনে চলে। এতে আধ্যাত্মিক জীবনের বিভিন্ন দিক এবং সুফিবাদের শিষ্যত্ব গ্রহণকারী বা যারা জীবনের অর্থ খুঁজে বেড়াচ্ছেন তাদের অনুশীলন সম্পর্কে বর্ণনা রয়েছে।[৫][৬]

রচনার ইতিহাস[সম্পাদনা]

রুমি তার জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে মসনবী লেখা শুরু করেন। তিনি ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দে ৫৪ বছর বয়সে প্রথম বইটির লেখা শুরু করেন এবং ১২৭৩ সালে তার মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত লিখতে থাকেন। ষষ্ঠ ও সর্বশেষ বইটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়।[৭]

রুমি তার প্রিয় শিষ্য হুসাম-আল-দীন চালাবির অনুরোধে মসনবী লিখতে শুরু করেন বলে উল্লেখ রয়েছে। চালাবি পর্যবেক্ষণ করে দেখেন যে রুমির অনেক অনুসারী সানাইআত্তার বই দুটি গুরুত্বের সাথে পড়েছিল। ফলে রুমি সানাইআত্তার-এর মত নির্দেশের ভাষ্যে আরেকটি রচনায় হাত দেন। রুমির অনুসারীরা বিভিন্ন সভায় তার সাথে দেখা করতেন। রুমি সেখানে মসনবীর পদ্যগুলো আলোচনা করতেন। চালাবি সেগুলো লিখে রাখতেন এবং পরে তাকে আবৃতি করে শোনাতেন।[৮]

বিষয়বস্তু ও বর্ণনাশৈলী[সম্পাদনা]

মসনবীর ছয়টি বইকে দুটি যুগল করে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়, কারণ দুটি যুগলে একই রকম বিষয়বস্তু নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।[৯]

  • বই ১ ও ২: প্রথম বই দুটিতে নফস্‌ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। নফস্‌ হল নিম্ন প্রবৃতি, আত্ম-প্রবঞ্চনা ও কু-অভ্যাস।
  • বই ৩ ও ৪: এই দুটি বইতে কারণ ও জ্ঞান নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এই দুটি বিষয়ের ক্ষেত্রে রুমি বাইবেলীয় ও কুরআনে বর্ণিত নবী মূসাকে চিত্রিত করেছেন।
  • বই ৫ ও ৬: শেষ বই দুটিতে একটি সার্বজনীন ধারণার কথা বলা হয়েছে, যেখানে মানুষকে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বে বিশ্বাস করতে হলে তার ঐশ্বরিক শারীরিক অস্তিত্বকে অস্বীকার করতে হবে।

প্রতিটি বইয়ে একই ধরনের বিভিন্ন বিষয়বস্তু নিয়ে আলোকপাত করা হলেও রুমি বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বইটি বর্ণনা করেছেন। রুমি তার লেখনীতে সাতটি প্রধান ভাষ্য ব্যবহার করেছেন।[১০]

  1. লেখকের ভাষ্য - তিনি একজন সুফি শিক্ষক হিসেবে আলোচনা করেছেন, যেখানে তিনি ঈশ্বরকে আপনি এবং মানবজাতিকে তুমি বলে সম্বোধন করেছেন।
  2. গল্প-কথকের ভাষ্য - বিভিন্ন উক্তির ব্যাখ্যা প্রদানে গল্প আকারে বর্ণনা করেছেন, মাঝে মাঝে কোন একটি বিষয়কে স্পষ্ট করতে শতাধিক ছত্র ব্যবহার করেছেন।
  3. সাদৃশ্যের ভাষ্য - কোন উক্তির ব্যাখ্যা প্রদানে সাদৃশ্যের ব্যবহার করেছেন।
  4. চরিত্রাবলির সংলাপ - অনেকগুলো গল্প চরিত্রাবলির মধ্যে সংলাপের মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন।
  5. নৈতিক প্রতিফলন - কুরআনহাদিস থেকে সরাসরি উক্তি গ্রহণ করেছেন।
  6. আধ্যাত্মিক কথোপকথন - সাদৃশ্য ও নৈতিক প্রতিফলনের অনুরূপ।
  7. হেঁয়ালি বা ফাঁক - রুমি কিছু ক্ষেত্রে তার পদ্যে প্রশ্ন রেখেছেন এবং লিখেছেন যে তিনি এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে পারবেন না, কারণ পাঠকেরা তা বুঝতে পারবে না।

অনুবাদ[সম্পাদনা]

ইংরেজি
  • দ্য মসনবী: বুক ওয়ান (The Masnavi: Book One) - অনুবাদ করেছেন জাওয়িদ মোজাদ্দেদি। বইটি ২০০৪ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস থেকে অক্সফোর্ড ওয়ার্ল্ডস ক্লাসিকস ধারাবাহিকের অংশ হিসেবে প্রকাশিত হয়। এটি ফার্সি সংস্করণের প্রথম ইংরেজি ভাষান্তর এবং এতে ভূমিকা ও ব্যাখ্যাধর্মী টীকা রয়েছে। বইটিকে ২০০৪ সালে আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব ইরানিয়ান স্টাডিজ থেকে ফার্সি সাহিত্যের অনন্য অনুবাদ হিসেবে লুইস রথ পুরস্কার প্রদান করা হয়।
  • বালকি, স্পিরিচুয়াল ভার্সেস (balkhi, Spiritual Verses) - মসনবী-ইয়ে মা'নবীর প্রথম বই, যা এম. এস্তেলামির ফার্সি ভাষার সংস্করণের ভাষান্তর। এতে অ্যালান উইলিয়ামস বালকির লেখনীর পাঠকদের নিকট গ্রহণযোগ্য ভূমিকা ও ব্যাখ্যাধর্মী টীকা প্রদান করেছেন। বইটি ২০০৬ সালে লন্ডননিউ ইয়র্কে পেঙ্গুইন প্রকাশনী হতে পেঙ্গুইন ক্লাসিকস ধারাবাহিকের অংশ হিসেবে প্রকাশিত হয়।
  • দ্য মসনবী: বুক টু (The Masnavi: Book Two) - অনুবাদ করেছেন জাওয়িদ মোজাদ্দেদি। বইটি ২০০৭ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস থেকে অক্সফোর্ড ওয়ার্ল্ডস ক্লাসিকস ধারাবাহিকের অংশ হিসেবে প্রকাশিত হয়। এটি বই ২-এর প্রথম কবিতা ভাষান্তর এবং এতে ভূমিকা ও ব্যাখ্যাধর্মী টীকা রয়েছে।
  • দ্য মসনবী: বুক থ্রি (The Masnavi: Book Three) - অনুবাদ করেছেন জাওয়িদ মোজাদ্দেদি। বইটি ২০১৩ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস থেকে অক্সফোর্ড ওয়ার্ল্ডস ক্লাসিকস ধারাবাহিকের অংশ হিসেবে প্রকাশিত হয়। এটি বই ২-এর প্রথম কবিতা ভাষান্তর এবং এতে ভূমিকা ও ব্যাখ্যাধর্মী টীকা রয়েছে।
রুশ
  • মসনবী বইটির রুশ অনুবাদ ২০১২ সালে রুশ স্টেট লাইব্রেরি উন্মুক্ত করে।[১১]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. জাফরি, আল্লামা মোহামাদ তাঘি, তাফসির মসনবী। এতে ৫০,০০০ ছত্র রয়েছে।
  2. জামানী, করিম, তাফসির মসনবী, মা'নবী
  3. উইলিয়ামস, পৃ. ৬।
  4. ফিং, ওয়াই. এস. (১ জানুয়ারি ২০১৮)। "Rumi's Masnavi | Washington Independent Review of Books"ওয়াশিংটন ইন্ডিপেন্ডেন্ট। সংগ্রহের তারিখ ৯ নভেম্বর ২০১৮ 
  5. চিট্টিক, পৃ. ৬।
  6. সাফাভি, সৈয়দ জি.; ওয়েটম্যান, সিমন (অক্টোবর ২০০৯)। Rumi's Mystical Design। সানি প্রেস। আইএসবিএন 978-1-4384-2795-9। সংগ্রহের তারিখ ২৬ নভেম্বর ২০১৮ 
  7. ফ্রাঙ্কলিন, লুইস (২০০০)। Rumi, Past and Present, East and West: The Life, Teachings and Poetry of Jalâl al-Din Rumi। ইংল্যান্ড: ওয়ানওয়ার্ল্ড পাবলিকেশন্স। 
  8. চিট্টিক, পৃ. ৫-৬।
  9. উইলিয়ামস, পৃ. xx-xxvi।
  10. রুমি, জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ (২০১৫)। Collected Poetical Works of Rumi (Delphi Classics) (ইংরেজি ভাষায়)। ডেলফি ক্লাসিকস। পৃষ্ঠা ১৫। সংগ্রহের তারিখ ২৬ নভেম্বর ২০১৮ 
  11. "Russian translation of Rumi's Masnavi unveiled at Moscow library"তেহরান টাইমস। ২২ ডিসেম্বর ২০১২। সংগ্রহের তারিখ ৯ নভেম্বর ২০১৮ 

গ্রন্থপঞ্জি[সম্পাদনা]

  • রুমি, জালালউদ্দিন; উইলিয়ামস, অ্যালান (২০০৬)। Spiritual Verses: the Book of the Masnavi-ye Manavi। লন্ডন: পেঙ্গুইন। 
  • রুমি, জালালউদ্দিন; চিট্টিক, উইলিয়াম সি. (১৯৮৩)। The Sufi Path of Love: the Spiritual Teachings of Rumi। অ্যালবানি: স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউ ইয়র্ক। 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]