অপ্রকৃত বাস্তবতা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
(ভার্চুয়াল রিয়ালিটি থেকে পুনর্নির্দেশিত)
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
মার্কিন নৌ সেনা VR parachute trainer নামক অপ্রকৃত বাস্তবতাভিত্তিক একটি প্যারাশ্যুট প্রশিক্ষণ যন্ত্র ব্যবহার করছেন

অপ্রকৃত বাস্তবতা বা অসৎ বাস্তবতা (ইংরেজি: Virtual Reality(VR), ভার্চুয়াল রিয়ালিটি) হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে বাস্তব নয়, কিন্তু বাস্তবের ধারণা সৃষ্টি করতে সক্ষম এমন কল্পনানির্ভর বিষয় অনুভব করার ত্রিমাত্রিক অবস্থা উপস্থাপন। এটি এক ধরনের কম্পিউটার-নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা যাতে প্রতিমা নির্মাণ (Modelling) ও ছদ্মায়ন (Simulation) পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে মানুষ কৃত্রিম ত্রিমাত্রিক ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য পরিবেশের সাথে সংযোগ স্থাপন করতে পারে বা উপলব্ধি করতে পারে। অপ্রকৃত বাস্তবতাতে ছদ্মায়িত পরিবেশ হুবহু বাস্তব পৃথিবীর মত হতে পারে। এক্ষেত্রে অনেক সময় অপ্রকৃত বাস্তবতা থেকে বাস্তব অভিজ্ঞতা পাওয়া যায়। আবার অনেক সময় ছদ্মায়িত পরিবেশ বাস্তব থেকে আলাদা হতে পারে। যেমন: অপ্রকৃত বাস্তবতানির্ভর কম্পিউটার খেলাসমূহ।[১][২]

অপ্রকৃত বাস্তুবতা প্রযুক্তির বাজার ইতিমধ্যে একটি শত কোটি মার্কিন ডলারের বাজার হয়ে উঠেছে।[৩]

কর্ম পদ্ধতি[সম্পাদনা]

অপ্রকৃত বাস্তবতাতে ব্যবহারকারী সম্পূর্ণরূপে একটি কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে নিমজ্জিত হয়ে যায়। তথ্য আদান-প্রদানকারী বিভিন্ন ধরনের ডিভাইস বা যান্ত্রিক উপকরণ সংবলিত চশমা, মস্তকাবরক, হাতমোজা, বিশেষ পোষাক বা সুট, ইত্যাদি পরিধান করার মাধ্যমে ব্যবহারকারী অপ্রকৃত বাস্তবতাতে বাস্তবকে উপলব্ধি করতে পারে। একটি "সাধারণ" অপ্রকৃত বাস্তবতাতে একজন ব্যবহারকারী স্টেরিওস্কোপিক (Stereoscopic) বা ত্রিমাত্রিক চিত্র-প্রক্ষেপণ পর্দা (screen) সংবলিত একটি শিরোস্ত্রাণ (helmet) পরে এবং তার মধ্যে দিয়ে বাস্তব থেকে ছদ্মায়িত প্রাণবন্ত (অ্যানিমেটেড) ছবি দেখে। দূর-অবস্থিতি (Telepresence) বা কৃত্রিম ত্রিমাত্রিক জগতে উপস্থিত থাকার ভ্রমণ একটি গতি নিয়ন্ত্রণকারী তথ্য সংবেদক (সেন্সর) দ্বারা প্রভাবিত করা হয়। গতি নিয়ন্ত্রণকারী সংবেদকের মাধ্যমে পর্দাতে প্রদর্শিত ছবির গতিকে অপ্রকৃত বাস্তবতা ব্যবহারকারীর গতির সাথে মেলানো হয়। যখন অপ্রকৃত বাস্তবতা ব্যবহারকারীর গতির পরিবর্তন হয় তখন পর্দাতে প্রদর্শিত দৃশ্যের গতিও পরিবর্তিত হয়। এভাবে অপ্রকৃত বাস্তবতা ব্যবহারকারী কৃত্রিম ত্রিমাত্রিক জগতের সাথে মিশে যায় এবং সেই জগতের একটি অংশে পরিণত হয়। আবার বল-প্রত্যুত্তর (force-feedback) সম্বলিত উপাত্ত হাতমোজা (data gloves) পরিধান করলে তা স্পর্শের অনুভূতি প্রদান করে এবং এসময় ব্যবহারকারী নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী অপ্রকৃত বাস্তবতার পরিবেশের কোনো বস্তু তুলতে বা ধরতেও তা ব্যবহার করতে পারে।

প্রাত্যহিক জীবনে অপ্রকৃত বাস্তবতার প্রভাব[সম্পাদনা]

বর্তমান জীবনে যদিও অপ্রকৃত বাস্তবতা কেবলমাত্র বিকশিত হতে শুরু করেছে, ধারণা করা হচ্ছে যে আগামী প্রাত্যহিক জীবনে এটি প্রচণ্ড প্রভাব ফেলবে। ভবিষ্যতে যখন অপ্রকৃত বাস্তবতা অনেক বেশি সহজলভ্য হয়ে যাবে তখন তা বিনোদন থেকে শুরু করে যোগাযোগ পর্যন্ত প্রায় সকল ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলবে। বিভিন্ন পেশা ও গবেষণায় অপ্রকৃত বাস্তবতার প্রয়োগের ফলে সমাজে এর ইতিবাচক ও নেতিবাচক এবং উভয় ধরনের প্রভাব পড়বে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ইতিবাচক দিক[সম্পাদনা]

  • চিকিৎসাক্ষেত্রে অপ্রকৃত বাস্তবতা প্রয়োগ করে বিভিন্ন ধরনের ভুল ও ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব। যেমন- ছদ্মায়িত শল্যচিকিৎসার (Simulated Surgery সিম্যুলেটেড সার্জারি) মাধ্যমে নতুন ডাক্তার ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব। আবার ছদ্মায়িত রোগীর উপর নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগ করাও সম্ভব।
  • সামরিক বাহিনীতে অনেক বছর যাবৎ সামরিক প্রশিক্ষণে উড্ডয়ন ছদ্মায়ক (Flight Simulator ফ্লাইট সিমুলেটর) ব্যবহৃত হয়ে আসছে। অপ্রকৃত বাস্তবতা ব্যবহার করে প্রচলিত উড্ডয়ন ছদ্মায়কগুলির আরও উন্নতি সাধন করা সম্ভব। এছাড়াও অপ্রকৃত বাস্তবতার মাধ্যমে ছদ্মায়িত যুদ্ধ (Simulated War) দ্বারা সৈন্যদের অনেক বেশি বাস্তব ও উন্নত প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব।
  • ব্যবসা বাণিজ্যেও অপ্রকৃত বাস্তবতা ব্যবহার করে তথ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও সহজ করা সম্ভব। অপ্রকৃত বাস্তবতা ব্যবহারকারী নথি দেরাজ (File Cabinet ফাইল ক্যাবিনেট) দিয়ে কম্পিউটার ডেস্কটপে তথ্য খুঁজতে হবে না। ব্যবহারকারী নিজেই নথির দেরাজ খুলতে পারবে এবং নিজের হাতে নথিগুলো সাজাতে পারবে।

নেতিবাচক দিক[সম্পাদনা]

ইতিবাচক প্রভাবের পাশাপাশি অপ্রকৃত বাস্তবতার কিছু নেতিবাচক প্রভাবও রয়েছে। অপ্রকৃত বাস্তবতার সরঞ্জামের চড়া দাম ও জটিলতা হচ্ছে বর্তমানে বিজ্ঞানীদের প্রধান দুটি সমস্যা। যেমন- কখনও কখনও মস্তকাবরকের গতি ব্যবহারকারীর স্বাভাবিক গতির সাথে সামঞ্জস্য রক্ষা করতে পারে না।

  • বর্তমান সমাজের মনুষ্যত্বহীনতা (Dehumanization) বিষয়টি হচ্ছে অপ্রকৃত বাস্তবতার আরও একটি নেতিবাচক দিক। পৃথিবীতে আমাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে আমাদেরকে মনুষ্যত্ব ধরে রাখতে হবে এবং একই সাথে খেয়াল রাখতে হবে যেন আমরা প্রযুক্তি দ্বারা চালিত না হই। কিন্তু বিজ্ঞানীদের ধারণা অনুযায়ী যদি অপ্রকৃত বাস্তবতা বিস্তৃতি লাভ করতে থাকে তাহলে মানুষের পারস্পারিক ক্রিয়া উল্লেখ্যযোগ্য হারে হ্রাস পাবে। কারণ মানুষ তখন অপ্রকৃত বাস্তবতা বাস্তব জীবনের চেয়েও অনেক ভাল এবং মনের মত সঙ্গী পাবে। আর মানুষ যদি এভাবে চশমা goggles আর হাতমোজাকে gloves মানুষ ও সমাজের বিকল্প হিসেবে বেছে নেয় তাহলে মানব সমাজ বিলুপ্ত হতে আর বেশি সময় লাগবে না।
  • অপ্রকৃত বাস্তবতার মাধ্যমে মানুষ তার কল্পনার রাজ্যে ইচ্ছেমত বিচরণ করতে পারে। ফলে দেখা যাবে মানুষের বেশিরভাগ সময় কাটবে তার কল্পনার জগতে এবং খুব কম সময় বাস্তব জগতে। কিন্তু এভাবে মানুষ যদি কল্পনা ও বাস্তবের মধ্যে পার্থক্য করতে না পারে তাহলে এই পৃথিবী চরম অনিশ্চয়তার সম্মুখীন হবে।
  • এছাড়াও গবেষণায় দেখা গেছে যে অপ্রকৃত বাস্তবতা মানুষের স্বাস্থের জন্যও হানিকর। এটি মানুষের দৃষ্টিশক্তিশ্রবণশক্তির ক্ষতিসাধন করে।

ধারণা[সম্পাদনা]

মাইকেল হাইম তার বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য মেটাফিজিক্‌স অফ ভার্চুয়াল রিয়ালিটি (The Metaphysics of Virtual Reality, "অপ্রকৃত বাস্তবতার অধিবিদ্যা") গ্রন্থে সাতটি ভিন্ন ধারণার কথা নির্দিষ্ট করেছেন ৷ যেমন :-

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি by- প্রকৌশলী মুজিবুর রহমান (পৃষ্ঠা ২১ ও ২২)
  2. উচ্চ মাধ্যমিক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বই by প্রকাশ কুমার দাস ও প্রকৌ. মোঃ মেহেদী হাসান (পৃষ্ঠা-৩৩)
  3. "মোটরগাড়ি শিল্পের ভার্চুয়াল বাস্তবতা"Toptal 
  4. তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি by আব্দুল মান্নান মন্ডল ও অনুপম হালদার (পৃষ্ঠা-১৪ )

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

বহিঃ ভিডিও
Virtual Reality, Computer Chronicles (1992)