বাংলা হরফ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

বাংলা হরফ বলতে বাংলা লিপিতে লেখা বা মুদ্রিত বিষয়বস্তু তথা টেক্সটে লিখনের যেসব দৃশ্যমান মৌলিক উপাদানগুলি বিদ্যমান, তাদেরকে বোঝায়। বাংলা হরফের মধ্যে বাংলা লিপির স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণগুলি ছাড়াও আরও আছে বিভিন্ন সংখ্যাচিহ্ন, যতিচিহ্ন, বন্ধনী, গাণিতিক অপারেশনের চিহ্নাদি, বিশেষ নির্দেশক চিহ্ন, তারাচিহ্ন, ইত্যাদি। বাংলা টেক্সটে ব্যবহৃত এগুলির প্রতিটিই একেকটি বাংলা হরফ। মুদ্রণশিল্পের আবির্ভাবের আগে হরফগুলি হাতে লেখা হত। মুদ্রণশিল্পের আবির্ভাবের পরে এগুলি ছাপাখানাতে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে ছাপা হওয়া শুরু হয়। টাইপরাইটারের আবির্ভাবের পর এগুলি ছাপাখানার বাইরে ব্যক্তিগত ব্যবহারকারীরাও ছাপাতে শুরু করেন। টাইপরাইটার বা ছাপাখানায় মুদ্রিত বাংলা হরফকে বাংলা মুদ্রাক্ষর বলা হয়। বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এসে ডেস্কটপ কম্পিউটারভিত্তিক প্রকাশনাতে ডিজিটাল উপায়ে বাংলা হরফ ছাপানোর প্রযুক্তি ব্যবহার করা শুরু হয়।

বাংলা হরফের ইতিহাস[সম্পাদনা]

প্রাক-মুদ্রণ যুগে বাংলা হরফ[সম্পাদনা]

ছাপাখানা আসার আগে বাংলা হাতে লেখা হত। স্বাভাবিকভাবেই তখন বাংলা হরফের কোন সার্বজনীন রূপ ছিল না। তা স্বত্ত্বেও সে সময় বাংলা লিপি লেখার কিছু ন্যূনতম নিয়মকানুন গড়ে উঠেছিল। পুরাতন বাংলা পুঁথি-পত্র ও দলিল-দস্তাবেজে এগুলির উদাহরণ মেলে। এগুলির উপর ভিত্তি করেই বাংলা ছাপাখানার প্রাথমিক যুগের হরফগুলি প্রস্তুত করা হয়। তাই এগুলির ঐতিহাসিক গুরুত্ব আছে।

এসময় বাংলা হরফগুলির উপর মাত্রা অর্থাৎ একটি আনুভূমিক রেখা দেয়া হত। অর্থাৎ ছাপাখানা আসার আগেই বাংলাতে দেবনাগরী হরফের মত মাত্রা দেবার প্রচলন ছিল। কিন্তু ওড়িয়া, গুজরাতি, ইত্যাদি ভারতীয় লিপিতে মাত্রা ছিল না। বাংলা হরফে মাত্রার পরিমাণ দেবনাগরী হরফের তুলনায় অনেক কম। খ, শ, ণ, প, ইত্যাদি বাংলা হরফে মাত্রার পরিমাণ খুব কম। দেখা গেছে প্রাক-মুদ্রণ যুগে কোন্‌ বাংলা হরফে কী রকম মাত্রা হবে, সেই নিয়মনীতিগুলিই আজও বাংলা হরফে প্রচলিত। বাংলা হরফের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ের কিছু স্বতন্ত্র জ্যামিতিক বৈশিষ্ট্য এই প্রাক-মুদ্রণ যুগেই নির্দিষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এগুলির মধ্যে নিচেরগুলি উল্লেখযোগ্য

  • অনুভূমিক মাত্রা এবং বিভিন্ন হরফে এর পরিমাণ
  • বেশির ভাগ বাংলা হরফে ব্যবহৃত উল্লম্ব রেখাকৃতি অংশটি।
  • ক, ঝ, ধ, ব, র ইত্যদি হরফে ব্যবহৃত ত্রিভুজাকৃতি রূপটি। একই ত্রিভুজটির খানিকটা বিকৃত রূপ খ, ঘ, থ, ফ, য, ষ, ইত্যাদিতে দেখতে পাওয়া যায়।
  • লেখার দিকের সাথে অর্ধ-সমকোণে অঙ্কিত বিভিন্ন রেখাংশ বিভিন্ন হরফে দেখতে পাওয়া যায়। ই, ছ, হ, ইত্যাদির নিচের অংশে, এবং গ, প, শ, ইত্যাদিতে উল্লম্ব রেখার সাথে সংযুক্ত অবস্থায় এরকম রেখাংশ দেখতে পাওয়া যায়।

উপরের সবগুলিই বাংলা হরফকে নিজস্ব জ্যামিতিক বৈশিষ্ট্য প্রদান করেছে এবং অন্যান্য লিপি থেকে আলাদা করেছে।

এসময়কার বাংলা হরফে আরও কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল, যেগুলি বর্তমান বাংলা হরফে অনুপস্থিত। যেমন -

  • র হরফটিকে ব-এর পেটে দাগ কেটে দেখানো যেত। অর্থাৎ পেট-কাটা ব দিয়ে এটি নির্দেশ করা হত। বর্তমানে এটি অসমীয়া লিপিতে প্রচলিত হলেও বাংলায় আর প্রচলিত নেই।
  • বর্তমান বাংলা বেশ কিছু হরফের নিচে ফুটকি বা বিন্দু দেয়া হয়। এই ফুটকিগুলি এই যুগে প্রচলিত ছিল না। র-কে পেটকাটা ব দিয়ে নির্দেশ করা হয়। য়-এর নিচে কোন বিন্দু ছিল না; এটি শব্দে অবস্থানভেদে ভিন্ন ভাবে উচ্চারিত হত। আবার ড় এবং ঢ়-এরও কোন অস্তিত্ব ছিল না। ড এবং ঢ শব্দের মাঝে বসলে ড় এবং ঢ়-এর মতো উচ্চারিত হত।
  • ত+উ ব্যঞ্জন-স্বর সমবায়টি "ত্ত" দিয়ে প্রকাশ করা হত। আজও কোন কোন আধুনিক বাংলা যুক্তাক্ষরে, যেমন স+ত+উ = স্তু (যেমন- বস্তু) এবং ন+ত+উ = ন্তু (যেমন- কিন্তু) --- এই দুইটি যুক্তাক্ষরের ত+উ অংশে এর ফসিল দেখতে পাওয়া যায়।

এ সময় বাংলা ছাপা বইও বের হয়েছে। এগুলিতে বইয়ের একটি পাতা প্রথমে হাতে লেখা হত। তারপর সেই পুরো পাতার একটি প্রতিলিপি কাঠে বা ধাতুতে খোদাই করে নেওয়া হত। শেষে এই কাঠ বা ধাতুর ফলকে কালি লাগিয়ে একই পাতার অনেক কপি ছাপানো হত। একই লোকের হাতের লেখাতে যে বৈচিত্র্য থাকতে পারে, সেগুলি এই ছাপায় শুধরানো যেত না।

বাংলা মুদ্রণের প্রথম অর্ধশতাব্দী[সম্পাদনা]

১৭৭৮ সালে নাথানিয়েল ব্রাসি হালেদের লেখা A Grammar of the Bengal Language প্রকাশনার মাধ্যমে বাংলা মুদ্রণশিল্পের জন্ম হয়। বইটি ইংরেজি ভাষাতে লেখা হলেও এতে বাংলা বর্ণপরিচয় ও বাংলা লেখার নিদর্শন সবই বাংলা মুদ্রাক্ষরে ছাপা হয়। এই মুদ্রণে প্রথমবারের মত "বিচল হরফ" (movable type) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। এই কৌশলে প্রতিটি হরফের জন্য আলাদা একটি ব্লক থাকে, যে ব্লকটিকে ইচ্ছামত নড়ানো ও বসানো যায়। জার্মানির ইয়োহানেস গুটেনবের্গ ছিলেন এই প্রযুক্তির উদ্ভাবক। বাংলা মুদ্রণে হালেদের বইতে চার্লস উইলকিন্স এবং তার সহকারী পঞ্চানন কর্মকার এই প্রযুক্তি প্রথমবারের মত প্রয়োগ করেন। ধাতুর ব্লকে ঢালাই করা একই আকৃতি একই হরফের জন্য একাধিক পাতাতে ব্যবহার করা যায় বলে বাংলা ছাপা হরফে একটা স্থায়ী, বৈষম্যহীন রূপ এসেছিল। তবে এই প্রথম দিককার হরফগুলি খুব সুদৃশ্য ও পরিণত ছিল না। ইংরেজির তুলনায় বাংলা হরফের আকার ছিল বেশ বড়। ইউরোপে এর প্রায় তিনশ' বছর আগেই বিচল হরফে ছাপার প্রযুক্তি শুরু হয়ে গেলেও বাংলাতে এটি ছিল একেবারেই নতুন একটি ঘটনা। চার্লস উইলকিন্স ও তার সহকারী পঞ্চানন কর্মকার সম্ভবত এ বিষয়ে অভিজ্ঞ কারিগর ছিলেন না।

১৮০০ সালে শ্রীরামপুরে ব্যাপটিস্ট মিশন প্রেস প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানে উইলিয়াম কেরি ও উইলিয়াম ওয়ার্ড ছিলেন ছাপখান বিশেষজ্ঞ। তারা সেখানে পঞ্চানন কর্মকারের চাকরির ব্যবস্থা করেন। এদের মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলা হরফের চেহারার উন্নতি হতে থাকে। ১৯শ শতকের তৃতীয় দশকেই বাংলা ছাপার চেহারা অনেকখানি পাল্টে যায়। ১৮৩১ সালে ভিনসেন্ট ফিগিন্স সম্ভবত প্রথম বাণিজ্যিকভাবে বিক্রির জন্য বাংলা হরফ তৈরি করেছিলেন।

এসময়কার বাংলা হরফের বৈশিষ্ট্যগুলি এরকম:

  • অনুস্বরের নিচের দাগটি ছিল না। ছিল কেবল গোল চিহ্নটি।
  • ব্যঞ্জনের খাড়া দাগের সাথে য-ফলা মিলে বাঁকিয়ে কমলার কোয়ার মত একটা চেহারা ছিল। এগুলি আজও কখনো কখনো দেখতে পাওয়া যায়। আধুনিক কম্পিউটারের লিখন ফন্টে স্য-তে এর দেখা মেলে।
  • "তু" যুক্তাক্ষরটি বর্তমান চেহারা পায়। অর্থাৎ ত-এর নিচে ু বসিয়ে।
  • স্থ (স+থ) যুক্তবর্ণটি হালেদের সময়ে, অর্থাৎ ১৮শ শতকে স-এর নিচে পরিষ্কার থ লিখে দেখানো হয়েছিল, কিন্তু পরবর্তীতে এটি স-এর নিচে ছোট হ-এর মত অক্ষর বসিয়ে নির্দেশ করা হয়। ফলে যুক্তাক্ষরটি অস্বচ্ছ রূপ ধারণ করে। এখনও এই অস্বচ্ছ রূপটিই ব্যবহার করা হয়। এরকম আরও বহু যুক্তাক্ষরের অস্বচ্ছ রূপ ১৯শ শতকের শুরুর এই পর্বে নির্দিষ্ট হয়ে যায়।
  • র বর্ণটি হরফটি হালেদের সময়ে পেট কাটা ব এবং ব-এর নিচে ফুটকি উভয় রূপেই বিদ্যমান ছিল। কিন্তু ১৮শ শতকের মাঝামাঝিতে এই পর্বের শেষে এসে বর্তমান ফুটকিযুক্ত রূপটিই সর্বত্র চালু হয়ে যায়।

বিদ্যাসাগরীয় পর্ব[সম্পাদনা]

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ১৮৪৭ খ্রিষ্টাব্দে সংস্কৃত কলেজের অধ্যাপনা ছেড়ে দিয়ে জীবিকা অর্জনের জন্য একটি ছাপাখানা খোলেন। বিদ্যাসাগর বাংলা বর্ণমালা সংস্কারের জন্য অনেকগুলি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এগুলি হল এরকম:

  • সংস্কৃতের "অন্তঃস্থ য়" বর্ণটি বাংলায় "য" হরফ দিয়ে লেখা হত, কিন্তু শব্দে অবস্থানভেদে এর উচ্চারণ বর্তমান বর্গীয় জ কিংবা অন্তঃস্থ য়-এর মতো উচ্চারিত হত। বিদ্যাসাগর বর্গীয় জ উচ্চারণের ক্ষেত্রে য বর্ণটি ব্যবহার এবং অন্তঃস্থ য় উচ্চারণের ক্ষেত্রে য-এর নিচে ফুটকি দিয়ে নতুন "য়" বর্ণটি ব্যবহারের প্রস্তাব করেছিলেন।
  • একইভাবে ড ও ঢ-এর নিচে ফুটকি দিয়ে বিদ্যাসাগর ড় ও ঢ় হরফ দুইটির প্রচলন করেছিলেন।
  • বিদ্যাসাগর বাংলা ভাষায় অব্যবহৃত দীর্ঘ-ৠ ও দীর্ঘ-ৡ বর্ণ দুইটি বর্জন করেছিলেন। তবে কেবল "৯" বর্ণটিরও বাংলায় প্রচলন ছিল না, কিন্তু বিদ্যসাগর এ নিয়ে কিছু বলেননি।
  • এছাড়া সংস্কৃত স্বরবর্ণমালার অন্তর্গত অনুস্বার (ং), বিসর্গ (ঃ), এবং চন্দ্রবিন্দু (ঁ) যেহেতু প্রকৃতপক্ষে ব্যঞ্জনবর্ণ সেহেতু বিদ্যাসাগর এই বর্ণগুলিকে ব্যঞ্জনবর্ণমালার অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। কিন্তু ব্যঞ্জনবর্ণ হলেও যেহেতু এগুলি স্বতন্ত্র বর্ণ নয়, অযোগবাহ বর্ণ সেহেতু কোন বাংলা অভিধানেই বিদ্যাসাগরপ্রণীত বর্ণক্রমটি গৃহীত হয়নি।

বিদ্যাসাগর ণ-ন এবং শ-ষ-স-এর মধ্যে উচ্চারণের সমতা সম্ভবত লক্ষ্য করলেও এর কোন সংস্কার করেন নি। সংস্কৃত ভাষায় ব্যবহৃত হরফ সরাসরি নকল না করে বাংলা ভাষার উচ্চারণ অনুযায়ী বাংলা হরফ নেবার বৈপ্লবিক উদ্যোগ বিদ্যাসাগরই প্রথম নিয়েছিলেন।

বিদ্যাসাগর বাংলা হরফের স্বচ্ছতা ও সমতা বিধানের জন্যও বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিলেন:

  • তিনি য-ফলাকে ব্যাঞ্জনের সাথে যুক্ত করে কমলার কোয়ার মতো না লিখে আলাদা করে লেখার ধারা চালু করেন। ফলে সর্বত্র য-ফলার আকার একই রূপ পেল।
  • বিদ্যাসাগরের আগে ঋ-কার ব্যঞ্জনের তলে বিভিন্ন রূপে বসত। বিদ্যসাগরই প্রথম ব্যঞ্জনের নিচে পরিষ্কারভাবে ৃ চিহ্নটি বসিয়ে লেখা চালু করেন। একইভাবে হ্রস্ব-উ কারের জন্য ু লেখা চালু করেন।

কিন্তু বিদ্যাসাগরের সংস্কারগুলি সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না। অনেকগুলি অস্বচ্ছ যুক্তব্যঞ্জনের চিহ্ন অস্বচ্ছই থেকে গিয়েছিল। যেমন - তু ত-এর নিচে উ-কার দিয়ে লেখা হলেও ন্তু, স্তু যুক্তাক্ষরগুলিতে পুরনো অস্বচ্ছ রূপটিই থেকে গেল।

ইংরেজি বিচল হরফগুলি একটি ডালায় দুই খোপে নির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী সাজানো থাকত। কিন্তু বাংলায় এ নিয়ে তেমন কোন চিন্তা হয় নি। বিদ্যাসাগরই প্রথম বাংলা হরফের জন্য ডালার একটি নকশা এবং কোন হরফের পর কোন হরফ বসবে তার নিয়ম স্থির করে দেন। তার এই নকশাই ক্রমে সমস্ত বিচল হরফ ব্যবহারকারী বাংলা ছাপাখানাতে গৃহীত হয়। বাংলা মুদ্রণশিল্পে প্রতিষ্ঠিত হয় সমতা।

বিদ্যাসাগর বাংলা মুদ্রণশিল্পকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিলেন। মূলত তার বেঁধে দেয়া নিয়মনীতি অনুসারেই পরবর্তী একশো বছর, বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ পর্যন্ত বাংলা হরফ মুদ্রিত হয়।

সময়ের সাথে বিদ্যাসাগরীয় হরফের সামান্য কিছু পরিমার্জনের চেষ্টাও করা হয়েছে। বিদ্যাসাগর নিজে বর্ণপরিচয়-এর ৬০তম সংস্করণ থেকে শব্দের শেষে অন্তর্নিহিত ও উচ্চারণযুক্ত ব্যঞ্জন, যেমন- "বিগত", "কত" শব্দের শেষের ত-টা, যেন ৎ-এর মত উচ্চারণ না হয়, সেজন্য এগুলির উপর তারাচিহ্ন দেয়া প্রবর্তন করেন। বিংশ শতাব্দীতে অনেক লেখক একই কাজে ঊর্ধ্বকমা (') ব্যবহার করেছেন, যেমন- একশ', ইত্যাদি। তবে এই সংস্কারটি সর্বজনগৃহীত হয়নি।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিদ্যাসাগরী হরফের দুই ধরনের এ-কার (মাত্রাছাড়া ও মাত্রাসহ) দুইটি ভিন্ন কাজে লাগানোর চেষ্টা করেন। তিনি শব্দের শুরুর মাত্রাযুক্র এ-কার দিয়ে "অ্যা" ধ্বনি বুঝিয়ে ছাপানো শুরু করেন। তবে বিশ্বভারতী ছাড়া অন্য বেশির ভাগ প্রকাশকই এই রীতিটি গ্রহণ করেনি।

লাইনোটাইপ পর্ব[সম্পাদনা]

ইউরোপে ১৯শ শতকের শেষ দিকে লাইনোটাইপ মেশিনে ছাপানোর চল হয়। ১৯৩০-এর দশকে বাংলা হরফও লাইনো মেশিনে ছাপানোর চিন্তাভাবনা শুরু হয়। লাইনোটাইপ মেশিনে ছাপানোর অনেক সুবিধা থাকলেও এর একটি অসুবিধা ছিল এতে আড়াইশো-র মত চিহ্ন রাখার ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু বিদ্যাসাগরীয় পদ্ধতিতে হরফের সংখ্যা ছিল বিশাল। "করণ টাইপ" নামের এক পদ্ধতিতে এর সংখ্যা কমলেও তার পরেও সব মিলিয়ে প্রায় ৬০০-র মত হরফের ব্লক প্রয়োজন হত। আনন্দবাজার প্রকাশনা সংস্থার সুরেশচন্দ্র মজুমদার রাজশেখর বসুর পরামর্শে বাংলা হরফের বিরাট আকারের সংস্কার সাধন করেন। তিনি স্বরবর্ণের কার-চিহ্নগুলি সকল ক্ষেত্রে একই আকারের রাখার ব্যবস্থা করলেন এবং এগুলি ব্যঞ্জন বা যুক্তব্যঞ্জনের নিচে বা উপরে না বসিয়ে সামান্য ডানে বা বামে সরিয়ে আলাদা অক্ষর হিসেবে ছাপার ব্যবস্থা করলেন। এছাড়াও তিনি অনেক যুক্তব্যঞ্জনের একই উপাদান ব্যঞ্জনাক্ষরের সাধারণ আদল আলাদা করে সেটির হরফ বানালেন, ফলে যুক্তব্যঞ্জন ছাপানোতেও হরফের সংখ্যার অনেক সাশ্রয় হল। শেষ পর্যন্ত সুরেশচন্দ্র বাংলা হরফের সংখ্যাকে চাবির ডালায় ১২৪টি এবং বিবিধ আরও ৫০টিতে নামিয়ে আনতে পেরেছিলেন। [১]

অফসেট মুদ্রণ ও লাইনোটাইপ বেঙ্গলি[সম্পাদনা]

লাইনোটাইপ বেঙ্গলি নামের মুদ্রাক্ষর-ছাঁদে মুদ্রিত আনন্দবাজার পত্রিকা

১৯৭০-এর দশকে পশ্চিমা বিশ্বে অফসেট লিথোগ্রাফি প্রক্রিয়ায় মুদ্রণ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, এবং এর সূত্র ধরে ফটোটাইপসেটিং নামক হরফ বসানোর প্রক্রিয়াটি ব্যবহৃত হতে শুরু করে। এই প্রক্রিয়াতে ফটোটাইপসেটার নামের একটি যন্ত্রের মাধ্যমে আলোকচিত্র-কাগজে হরফের সারি ছাপানো হয়, যা পরবর্তীতে অফসেট মুদ্রণ প্রক্রিয়াতে ব্যবহার করা হয়।

১৯৭০-এর দশকে শেষের দিকে আনন্দবাজার পত্রিকা যুক্তরাজ্যে অবস্থিত লাইনোটাইপ-পল লিমিটেড নামের সংস্থাকে ফটোটাইপসেটিং প্রক্রিয়াতে ব্যবহারের জন্য একটি নতুন বাংলা মুদ্রাক্ষর-ছাঁদ (typeface) তৈরি করার অর্ডার দেয়। লাইনোটাইপ-পল লিমিটেডের অ-লাতিন লিখনপদ্ধতিসমূহের মুদ্রাক্ষরশৈলী (Non-Latin typography) বিভাগের প্রধান ফিওনা রস, লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অফ ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ থেকে আগত ডক্টর তারাপদ মুখোপাধ্যায় এবং মুদ্রাক্ষর-নকশাবিদ টিম হলোওয়েকে নিয়ে গঠিত দল ১৯৭৮ সালে এই নতুন মুদ্রাক্ষর-ছাঁদ তৈরিতে হাত দেন। এই লক্ষ্যে ফিওনা রস ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত ইন্ডিয়া অফিস সংরক্ষণশালা থেকে বহু বাংলা পাণ্ডূলিপি সংগ্রহ করে সেগুলি বিশ্লেষণ করেন; তারাপদ মুখোপাধ্যায় এ কাজে তার পরামর্শদাতা ছিলেন। রসের বিশ্লেষণের উপর ভিত্তি করে নকশাবিদ হলোওয়ে নতুন ছাঁদটি নকশা করেন। এই ছাঁদটি ছিল সম্পূর্ণ নতুন। লাইনোটাইপ বা অন্য কোন কোম্পানির দ্বারা অতীতে ব্যবহৃত কোন হট মেটাল বা তপ্তধাতু হরফের ছাঁদকেই এই নকশাতে মডেল হিসেবে গ্রহণ করা হয়নি। ছাঁদটির নাম দেওয়া হয় লাইনোটাইপ বেঙ্গলি (Linotype Bengali)।

মুদ্রাক্ষরশৈলীর দৃষ্টিকোণ থেকে লাইনোটাইপ বেঙ্গলি প্রতিভাবান নকশাবিদ টিম হলোওয়ের এক অনবদ্য মৌলিক সৃষ্টি। ফিওনা রসের গবেষণার উপর ভিত্তি করে হলোওয়ে তার প্রতিটি বাংলা হরফের নকশায় যেসব সমতাবিধায়ক মূলনীতি (principle), ফিচার (feature) ও জেশ্চার (gesture) ব্যবহার করেছেন, তা একেবারেই মৌলিক।

বর্তমানে বাংলাদেশপশ্চিমবঙ্গে বাংলা ছাপা অক্ষরের সুদর্শন যে রূপটি সংবাদপত্র, বইপত্র, বিজ্ঞাপন, সাইনবোর্ড, গণমাধ্যম, মাল্টিমিডিয়াসহ সর্বত্র দেখতে পাওয়া যায়, তা আসলে ৭০-এর দশকে সৃষ্ট এই লাইনোটাইপ বেঙ্গলিরই কোনও না কোন রূপ।

ছাঁদটি শুরুতে লাইনোটাইপ সিআরট্রনিক মেশিনের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। তবে আনন্দবাজার পত্রিকা ১৯৮১ সাল থেকে যখন লাইনোটাইপ বেঙ্গলি মুদ্রাক্ষর-ছাঁদে তাদের পত্রিকা প্রকাশ করা শুরু করে, তখন তারা লাইনোট্রন ২০২ নামের মেশিন ব্যবহার করেছিল। ছাঁদটি বাংলাভাষী অঞ্চলে এবিপি টাইপফেস তথা আনন্দবাজার পত্রিকা টাইপফেস নামে পরিচিতি লাভ করে। তখন থেকে আজ অবধি আনন্দবাজার পত্রিকা এবং আনন্দবাজার গ্রুপের সমস্ত প্রকাশনা এই লাইনোটাইপ বেঙ্গলি মুদ্রাক্ষর-ছাঁদেই ছাপা হয়ে আসছে। এমনকি অধুনা পত্রিকাটির অনলাইন সংস্করণেও বিটস্ট্রিম ফন্ট প্লেয়ার নামের ফন্ট-রেন্ডারিং প্রোগ্রামে লাইনোটাইপ বেঙ্গলিকে তিনটি ফন্ট ফাইলে রেখে ব্যবহার করা হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি কর্তৃক বাংলা হরফের সংস্কারসাধন[সম্পাদনা]

নিবন্ধের এই অংশটি অসম্পূর্ণ। আপনি চাইলে এই অংশটিকে সমৃদ্ধ করতে পারেন

ইউনিকোড বাংলা[সম্পাদনা]

১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে ইউনিকোড স্ট্যান্ডার্ডে বাংলা লিপিকে যোগ করা হয়। ইউনিকোডে বাংলা লিপির অবস্থান U+0980 থেকে U+09FF পর্যন্ত।

বাংলা[১][২]
অফিসিয়াল ইউনিকোড কনসোর্টিয়াম কোড চার্ট (PDF)
  0 1 2 3 4 5 6 7 8 9 A B C D E F
U+098x
U+099x
U+09Ax
U+09Bx ি
U+09Cx
U+09Dx
U+09Ex
U+09Fx
টীকা
১.^ ইউনিকোড সংস্করণ ১১.০ অনুসারে
২.^ ধূসর এলাকা অনির্ধারিত জায়গা ইঙ্গিত করে।

বাংলা মুদ্রিত হরফের জ্যামিতিক গড়ন[সম্পাদনা]

প্রতিটি মুদ্রিত বাংলা হরফ একটি অদৃশ্য চতুর্ভুজের মধ্যে বসানো থাকে। হরফের এই অদৃশ্য নকশাতে অনুভূমিক বরাবর প্রসারিত বেশ কিছু রেখা বাংলা হরফের জ্যামিতিক বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করেছে।

মাত্রা বরাবর যে রেখাটি চলে গেছে, যা থেকে বেশিরভাগ হরফ ঝুলে থাকে বলে মনে হয়, তাকে মাত্রারেখা (headline) বলে। বেশির ভাগ হরফের নিচ যেখানে ঠেকে যায়, সেই বরাবর কল্পিত অনুভূমিক রেখাটিকে ভূমিরেখা (baseline) বলে। রোমান হরফগুলির মূল অংশ সর্বদা একটি অদৃশ্য ভূমিরেখার উপর দাঁড়িয়ে থাকে। অন্যদিকে বাংলা হরফগুলি মাত্রা নামের একটি দৃশ্যমান রেখা থেকে নিচে ঝুলে থাকে। ফিওনা রস তাই বাংলা হরফের ভূমিরেখাকে Notional baseline তথা "ধারণাগত ভূমিরেখা" আখ্যা দিয়েছেন। মাত্রারেখা থেকে ভূমিরেখার ব্যবধানকে হরফের মূল উচ্চতা (base height) বলে।

মাত্রারেখার কিছু উপরে আরেকটি অনুভূমিক রেখা কল্পনা করা যায়, যাতে ই-কার, ঈ-কার, ঐ-কার, রেফ ইত্যাদির মাথা গিয়ে ছুঁয়েছে; এটিকে শিরোরেখা (topline) বলে। একইভাবে ভূমিরেখার খানিকটা নিচে আরেকটি অনুভূমিক রেখা কল্পনা করা যায়, যেখানে উ-কার, ঊ-কার, ঋ-কার, ইত্যাদির নিচের প্রান্ত গিয়ে ঠেকেছে; একে পাদরেখা (dropline) বলে। পাদরেখা থেকে শিরোরেখার ব্যবধানকে হরফের উচ্চতা (letter height) হিসেবে ধরা যায়।

মাত্রারেখার খানিকটা নিচে আরেকটি রেখা কল্পনা করা যায়, যেখানে বহু হরফের অংশবিশেষ দিক পরিবর্তন করে; একে মধ্যরেখা (meanline) বলে।

প্রতিটি হরফ যে অদৃশ্য চতুর্ভুজাকৃতি স্থানে বসে, তার দু'পাশে খানিকটা খালি জায়গা থাকে, একে পার্শ্বস্থান (Sidebearing) বলে। দুপাশের পার্শ্বস্থান বাদ দিলে হরফের মূল প্রস্থ পাওয়া যায়। আর পাশাপাশি দুইটি হরফের প্রতিটির পার্শ্বস্থান যোগ করলে পাওয়া যায় ঐ দুই হরফের মধ্যে ফাঁক।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Ross পৃষ্ঠা ১৩৮

গ্রন্থ ও রচনাপঞ্জি[সম্পাদনা]

বাংলা[সম্পাদনা]

  • পলাশ বরন পাল। বাংলা হরফের পাঁচ পর্ব। স্বপন চক্রবর্তী সম্পাদিত মুদ্রণের সংস্কৃতি ও বাংলা বই গ্রন্থে। অবভাস। কলকাতা। ২০০৭।
  • পলাশ বরন পাল। ধ্বনিমালা বর্ণমালা। প্যাপিরাস। কলকাতা। ২০০১।
  • চিত্তরঞ্জন বন্দোপাধ্যায়। দুই শতকের বাংলা মুদ্রণ ও প্রকাশন। আনন্দ পাবলিশার্স। কলকাতা। ১৯৮১।
  • অতুল সুর। বাংলা মুদ্রণের দুশো বছর। জিজ্ঞাসা। কলকাতা। ১৯৮৬।
  • শ্রীপান্থ। যখন ছাপাখানা এল। পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি। কলকাতা। ১৯৯৬।

ইংরেজি[সম্পাদনা]

  • Ross, Fiona. The Printed Bengali Character and Its Evolution (1999). London. Curzon.