বরাটি নরদানা বাংলাদেশ উচ্চ বিদ্যালয়

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

বরাটি নরদানা বাংলাদেশ উচ্চ বিদ্যালয় ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত টাংগাইল জেলাধীন মির্জাপুর থানায় অবস্থিত একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়। বরাটি স্কুলের সৃষ্টির ইতিহাসটি তুলে ধরা হলো-

শিক্ষানুরাগী মরহুম খন্দকার মোশারফ হোসেন (দুলু) মিঞা একই থানাধীন নরদানা গ্রামের মরহুম নোয়াব আলী মিঞার কাছে লৌাহজং(খাগজানা) নদীর তীর ঘেষে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের প্রস্তাব করেন। তাঁর প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে মরহুম নোয়াব আলী মিঞা তাঁর ভাইদের সাথে ব্যাপারটি নিয়ে আলোচনা করেন এবং সর্বসম্মতিক্রমে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে তারা নরদানা, বরাটি ও আশেপাশের বিভিন্ন গ্রামের মানুষকে শিক্ষিত করে তোলার জন্য, তাদের মধ্য হতে অশিক্ষার অন্ধকার দূর করে তাদের মাঝে শিক্ষার অর্নিবাণ দীপ শিখা প্রজ্জলিত করতে নরদানা ও বরাটি এই দুই গ্রামের মাঝখানে একটি বিদ্যালয় স্থাপন করবেন। যেমন কথা তেমন কাজ। ১৯৪১ সালের কোন এক শুভক্ষণে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ওসমান গণি এম. ই বিদ্যালয় নামে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়। যার প্রধান হিসেবে ওই সময় দায়িত্বভার গ্রহণ করেন মরহুম খন্দকার মোশারফ হোসেন (দুলু) মিঞা। সময় যেন অতি দ্রুত অতিবাহিত হতে থাকে। ১৯৪৩ সালের ১৯শে মে মরহুম নোয়াব আলী মিঞা, মরহুম ওসমান গণি এবং মরহুম হাতেম আলী এই তিন মহানুভব ব্যক্তি স্কুলটির নামে সর্বমোট ৭০ শতাংশ ভূমি দান করেন যার দলিল নং- ৩২৬৬। এভাবে সময় পাড় হতে থাকে। অত্র এলাকার ছেলেদের মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণের জন্য জামুর্কি যেতে হয়। এ অবস্থা পরিলক্ষিত হয় ওসমান গণি এম. ই বিদ্যালয়’র উদ্যোগতাদের মাঝে। শিক্ষার প্রতি এই জ্ঞান পিপাসু ব্যক্তিবর্গের অনুরাগ ছিল অতুলনীয়। ওসমান গণি এম. ই বিদ্যালয় স্কুলটি প্রতিষ্ঠার পর তাদের ক্ষুধা যেন আরও বেড়ে গেলো। মরহুম খন্দকার মোশারফ হোসেন (দুলু) মিঞা খাগজানা নদীর কুল ঘেষে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে মরহুম নোয়াব আলী মিঞার সাথে আলোচনা করেন। কিন্তু বললেইতো আর একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা যায় না। এর জন্য সবার আগে দরকার হয় অর্থ এবং ভূমির । ভূমির ব্যবস্থাতো হয়েছে কিন্তু অর্থদাতা খুজেঁ পাওয়া যাচ্ছিল না। সময় ১৯৪৮। অবশেষে এলাকাবাসীর সাহায্য সহযোগিতায় এবং উদ্যোক্তাদের দৃঢ় মনোবলের কারণে ১লা জানুযারী খাগজানা নদীর কুল ঘেষে বরাটি নরদানা পাকিস্তান উচ্চ বিদ্যালয় নামে একটি বিদ্যালয় তার যাত্রা শুরু করে। সদ্য প্রতিষ্ঠিত স্কুলটির প্রধান হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন বানিয়াড়া গ্রামের লেখক এবং একই সাথে যিনি শিক্ষাবিদ হিসেবে পরিচিত সেই সৈয়দ রেদওয়ানুর রহমান। তিনি তার মেধা ও অসাধারণ মানবীয় গুনাবলী দিয়ে স্কুলটিকে একটি আদর্শ এবং ব্যতিক্রমধর্মী স্কুল হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য আত্মনিয়োগ করেন। বিদ্যালয়টির অবকাঠামো বিনির্মাণে যারা অর্থ ও ভূমিদানের মাধ্যমে সহায়তা করেছেন তাদেরকে স্মরণ করার পাশাপাশি ওই সময় আরও যারা বিভিন্নভাবে এ স্কুলটি প্রতিষ্ঠার জন্য নিজের মূল্যবান সময় এবং শ্রম দিয়ে সহযোগিতা করেছেন তাদের প্রতি রইলো বিনম্র শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা। নোয়াব আলী মিঞা, মরহুম ওসমান গণি এবং মরহুম হাতেম আলী এই তিন শিক্ষা হিতৈষীর সাথে অত্র এলাকাবাসী আরও যাদের আমৃত্যু শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে তারা হলেন- মরহুম কাজী কোরবান আলী, মরহুম আঃ জলিল মল্লিক, মরহুম বাকী মল্লিক, স্বর্গীয় ডাঃ যশোদা রঞ্জন রায়, স্বর্গীয় সদানন্দ বিশ্বাস, মরহুম জসীম উদ্দীন আহম্মেদ, স্বর্গীয় বিহারী লাল কর্মকার, স্বর্গীয় সুমন্ত্রনাথ সরকার। পাশাপাশি স্কুলটির প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে যারা ম্যানেজিং কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন তাদের মধ্যে মরহুম মোঃ চিনি খান, মরহুম ডাঃ কাজী আবু মোহাম্মদ, মরহুম মীর ফজলুর রশীদ (বাচ্চু মিঞা) ও মরহুম আব্দুল হালীম মিঞা’র নাম সকলের মনের মণিকোঠায় চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। ১৯৫০ সাল। শুরু হলো মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, ঢাকা হতে বরাটি নরদানা পাকিস্তান উচ্চ বিদ্যালয়ের স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ। এক সময় স্বীকৃতি পাওয়া গেলো। শুরু হলো ম্যাট্রিকুলেশন, এস.এস.সি এবং জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষায় ছাত্র/ছাত্রীদের মেধাভিত্তিক অংশগ্রহণ। সময় ১৯৫১। এ বছর এস.এস.সি পরীক্ষায় মাত্র ১২ জন ছাত্র অংশগ্রহণ করেন এবং সে পরীক্ষায় মোট ৪ জন ছাত্র তৃতীয় বিভাগে পাশ করেন। পাশের হার ছিল ৩৩.৩০ ভাগ। ধীরে ধীরে স্কুলটিতে ছাত্র/ছাত্রীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। এ বছর স্কুলটির প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন স্বর্গীয় দুঃখীরাম রাজবংশী। তিনি প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করার বছর পাঁচেক পর স্কুলে একটি ছাত্রাবাসের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। তার এ প্রয়োজনকে অনুধাবন করে সেই সময়কার ব্যবস্থাপনা পরিষদ এবং তিনি নিজে উদ্যোগ গ্রহণ করে ১৯৫৬ সালে ছোট পরিসরে একটি ছাত্রাবাস চালু করেন। আস্তে আস্তে স্কুলটিতে ছাত্র/ছাত্রীর পরিমাণ বাড়তে থাকে, সেই সাথে বাড়তে থাকে ছাত্রাবাসের পরিধি। ধীরে ধীরে স্কুলটির নাম ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা হতে ছাত্র/ছাত্রী আসে এ স্কুলটিতে ভর্তি হতে। তৎকালীন সময়ে বাবু দুঃখীরাম রাজবংশী তার সহকারী শিক্ষকদের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং সাধনার ফলশ্র“তিতে এক সময় বরাটি নরদানা পাকিস্তান উচ্চ বিদ্যালয় হয়ে ওঠে নরদানা, বরাটি ও আশেপাশের গ্রামের মানুষের লেখাপড়া করার একমাত্র আশ্রয়স্থল। সময় ১৯৭১। শুরু হয়ে যায় স্বাধীনতা সংগ্রাম। দীর্ঘ ০৯(নয়) মাস যুদ্ধের পর আমরা পাই একটি স্বাধীন পতাকা। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর স্কুলটির নামে পরিবর্তন আসে। স্কুলটি বরাটি নরদানা পাকিস্তান উচ্চ বিদ্যালয় হতে পরিবর্তন হয়ে বরাটি নরদানা বাংলাদেশ উচ্চ বিদ্যালয় নামে যাত্রা শুরু করে। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে পূর্ণ উদ্যমে শুরু হয় স্কুলের পথচলা। বাবু দুঃখীরাম রাজবংশী ১৯৫১ সাল থেকে শুরু করে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত নিয়মিত প্রধান শিক্ষক, ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৩ পর্যন্ত চুক্তিভিত্তিক এবং ১৯৯৩-১৯৯৪ সাল পর্যন্ত রেক্টর হিসেবে তার উপর অর্পিত দায়িত্ব খুবই সফলতার সাথে পালন করেন। তার মেধা, ঐকান্তিক প্রচেষ্টা, নিরলস শ্রম এবং এলাকাবাসীর সহযোগিতায় তিনি স্কুলটিকে টাংগাইল জেলার একটি শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। দুঃখীরাম বাবু তার পরিশ্রমের ফল স্বরুপ ১৯৮৭ সালে জেলা পর্যায়ে এবং ১৯৯৩, ১৯৯৪ সালে থানা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে নির্বাচিত হন এবং ১৯৯৪ সালে টাংগাইল জেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক হিসেবে স্বর্ণপদক পান। ১৯৯৪ সালে তিনি তার দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের অবসান ঘটিয়ে অবসর গ্রহণ করেন। বাবু দুঃখীরাম রাজবংশীর অবসরের পর শিক্ষকদের মধ্য হতে জেষ্ঠ্যতার ভিত্তিতে বাবু নারায়ণ চন্দ্র রায় এর উপর ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। দায়িত্ব গ্রহণের পর তার মেধা, দূরদর্শিতা, অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব এবং গভীর চিন্তা শক্তি প্রতিটি কর্মকান্ডের সাথে সমন্বয় করে সুষ্ঠুভাবে বিদ্যালয়টিকে পরিচালনা করেন। একজন ছাত্র/ছাত্রী বৎসল ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে তিনি সকলের প্রশংসা কুড়াতে সক্ষম হন। ১৯৯৫ সালের ২রা ডিসেম্বর এ বিদ্যপিীঠটিতে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন জনাব মুহাম্মদ আব্দুল হালীম খলিফা বি,এ বি,এড। তিনি একজন দক্ষ প্রধান শিক্ষক হিসেবে পরিচিত মুখ। তার ঝুুলিতেও আছে ১৯৯০ সালে জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হওয়ার পুরুষ্কার। পরবর্তীতে অবশ্য বরাটি স্কুলের শিক্ষক হিসেবে ১৯৯৮ সালে জেলা পর্যায়ে এবং ১৯৯৯, ২০০০ সালে থানা পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক হিসেবে নির্বাচিত হন। ২০০৩ সালে তিনি তার দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের অবসান ঘটিয়ে অবসর গ্রহণ করেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষেত্রে তার যে অভিজ্ঞতা ছিল তিনি তা ব্যবহার করে বরাটি নরদানা বাংলাদেশ উচ্চ বিদ্যালয়কে অনেক উচ্চতায় আসীন করে গেছেন। ২০০৩ সালে জনাব মুহাম্মদ আব্দুল হালীম খলিফা চাকুরী হতে অবসর গ্রহণ করার পর ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন সহকারী প্রধান শিক্ষক জনাব ত. ম. খবিরুল ইসলাম বি.এ.বি.এড। তিনি একজন অভিজ্ঞ ও ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি হিসেবে সবার কাছে পরিচিত। তার মেধা, অভিজ্ঞতা এবং দক্ষ নেতৃত্বের কারণে বিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়ন আরও বেড়েছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে তার অবদান অনস্বীকার্য। ২০০৩ সালে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন কাজী মোঃ শাহজাহান আলী এম.এ.বি.এড(প্রথম শ্রেণী)। তিনি চাঁদপুর জেলা পর্যায়ে ১৯৯১ সালে এবং থানা পর্যায়ে দু’বার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক নির্বাচিত হন। তিনি মনে করেন যোগ্য ও অভিজ্ঞ শিক্ষাগুরুদের লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারলেই তার শিক্ষকতা জীবনে সার্বিক সফলতা নিশ্চিত হবে। জনাব কাজী শাহজাহান আলী ছাত্র/ছাত্রীদের ভাল ফলাফল নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের মধ্যে সৌহার্দপূণ সম্পর্ক উন্নয়নে কাজ করেছেন। ছাত্র/ছাত্রীদের শিক্ষার মানোন্নয়ন, খেলাধুলা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, চিত্তবিনোদনসহ স্কাউটিং কার্যক্রমে জেলা, বিভাগ ও জাতীয় পর্যায়ে উজ্জীবিত করার লক্ষ্যে তিনি নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা পরিষদকে সার্বিক সহযোগিতা, গঠনমুলক পরামর্শ, সুচিন্তিত দিক নির্দেশনা এবং তার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি বিদ্যালয়টিকে একটি যুগোপযোগী এবং আধুনিক বিদ্যাপীঠ হিসেবে গড়ে তুলেছেন।