পিয়ানো

পিয়ানো একপ্রকার বাদ্যযন্ত্র। পিয়ানো হলো একটি বাদ্যযন্ত্র যা একগুচ্ছ চাবির (Keyboard) সাহায্যে বাজানো হয়। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে পরিচিত ও জনপ্রিয় বাদ্যযন্ত্রগুলোর মধ্যে একটি। ধ্রুপদ সংগীত, জ্যাজ সংগীত, একক বাদন (Solo), দলগত বাদন (Ensemble Music), চেম্বার মিউজিক (Chamber Music), অনুষঙ্গ (Accompaniment) হিসেবে তথা সংগীতের সকল ঘরানায় এই যন্ত্রটির ব্যাপক ব্যবহার করা হয়ে থাকে। সংগীতায়োজনে ও গান তুলতেও পিয়ানো ব্যবহার করা হয় যদিও এটি বহনযোগ্য নয় এবং খুবই ব্যয়বহুল, তবুও এর বহুমুখী ব্যবহার ও সর্বব্যাপিত্ব একে পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় বাদ্যযন্ত্রে পরিণত করেছে।
পিয়ানোর কোনো চাবি চাপলে তা একটি তুলার তৈরি আস্তরণ আচ্ছাদিত হাতুড়ির সাহায্যে স্টিলের তৈরি নির্দিষ্ট তারকে আঘাত করে। হাতুড়ীগুলো ফিরে আসে এবং আঘাত করার ফলে তারগুলো তাদের অনুনাদী কম্পাঙ্কে অনুরণিত হতে থাকে। এই অনুরণন বিশেষ ব্রীজের মাধ্যমে শব্দসৃষ্টিকারক তলে পরিচালিত হলে বাতাসে শব্দশক্তি ছড়িয়ে পড়ে। অন্যথায় শব্দটি তারের কম্পনের ফলে সৃষ্ট শব্দের চেয়ে জোরালো হতো না। যখন চাবি ছেড়ে দেয়া হয় তখন একটি ড্যাম্পার তারের কম্পন থামিয়ে দেয়। পিয়ানোর কিবোর্ড ও তাতে মধ্যম C এর অবস্থানের ছবি দেখার জন্য "Piano Key Frequencies" অনচ্ছেদটি দেখুন। "Hornbostel-Sachs" এর বাদ্যযন্ত্রের শ্রেণিবিন্যাসের নিয়ম অনুসারে পিয়ানো হলো কর্ডোফোন জাতীয় বাদ্যযন্ত্র।
পিয়ানো শব্দটি ইতালীয় শব্দ “Pianoforte” এর সংক্ষিপ্ত রূপ। সংগীতের পরিভাষায় “Piano” অর্থ “নিঃস্তব্ধতা (Quiet)” এবং “Forte” অর্থ “শব্দময়তা (Loud)।” ” আসলে পিয়ানোর চাবিতে স্পর্শ করলেই এটি শব্দ সৃষ্টি করে এবং ছেড়ে দেওয়ার সাথে সাথে নিঃস্তব্ধ হয়ে যায় বলে যন্ত্রটির এরূপ নামকরণ করা হয়েছে।[১][২]
ইতিহাস
[সম্পাদনা]প্রাচীণ প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের সময় পিয়ানোর জন্ম হয়। হ্যামারড ডালকিমার হলো প্রথমদিকের তারের তৈরি স্বরযন্ত্র যাতে তারকে আঘাত করে অনুরণিত করা হত। মধ্যযুগে চাবিচালিত ডালকিমার জাতীয় বাদ্যযন্ত্র তৈরি করার একাধিক চেষ্টা করা হয়েছিল। ১৭’শ শতকের দিকে চাবিচালিত ক্লাভিকর্ড (Clavichord) ও হার্পসিকর্ড (Harpsichord) বেশ পরিচিত ছিল। ক্লাভিকর্ডের তারগুলোকে বিভিন্নভাবে আগাত করা হতো, অপরদিকে হার্পসিকর্ডের তারগুলোকে পাখির পালক দিয়ে বাজানো হত। হার্পসিকর্ডের বিশেষ কৌশল নিয়ে শতবর্ষের গবেষণার পর খাঁচা, সাউন্ডবোর্ড, ব্রিজ এবং কিবোর্ড তৈরির এতেসবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতিটি উদ্ভাবিত হয়েছিল।
আধুনিক পিয়ানো আবিষ্কারের কৃতিত্ব দেয়া যেতে পারে ইতালির পাদুয়া (Padua, Italy) এর বার্তোলোমেয়ো ক্রিস্টোফারি (Bartolomeo Cristofori) (১৬৫৫-১৭৩১) কে, যাকে তাসকানি এর গ্রান্ড প্রিন্স (Grand Prince of Tuscany), তৃতীয় ফার্দিনান্দ দ্য’ মেডিসি (Ferdinando de’ Medici) বাদ্যযন্ত্র রক্ষক (Keeper of Instruments) হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। ক্রিস্টোফারি ছিলেন একজন হার্পসিকর্ড বিশেষজ্ঞ ও তারযুক্ত বাদ্যযন্ত্র সম্পর্কে অভিজ্ঞ একজন ব্যক্তি। তবে এটা জানা যায়নি যে কবে প্রথম ক্রিস্টোফারি তার প্রথম পিয়ানোটি তৈরি করেছিলেন। মেডিসি পরিবারের ইতিহাস থেকে জানা যায় তাদের পরিবারে ১৭০০ সাল থেকে একটি পিয়ানো ছিল। অপর একটি সূত্র হতে জানা যায় ১৬৯৮ সাল থেকে মেডিসি পরিবারে একটি পিয়ানো ছিল। তবে, তিনটি ক্রিস্টোফেরি পিয়ানো আজও টিকে আছে যেগুলো ১৭২০ সালে তৈরি করা হয়েছিল।[৩][৪]
সময়রেখা
[সম্পাদনা]১৭০০ সাল:
ক্রিস্টোফোরি প্রথম সত্যিকারের পিয়ানো আবিষ্কার করেছিলেন ইতালীয় যন্ত্রনির্মাতা বার্তোলোমিও ক্রিস্টোফোরি ফ্লোরেন্সে “গ্রাভিচেমবালো কোল পিয়ানো এ ফোর্তে” নির্মাণ করেন, যা ছিল মৃদু ও উচ্চস্বর উভয় ধরনের আবহ সৃষ্টিতে সক্ষম একটি কিবোর্ড যন্ত্র এবং যা আধুনিক পিয়ানোর ভিত্তি স্থাপন করেছিল।
১৮২৫ সাল:
ফেল্ট হ্যামার পিয়ানোর সুর বদলে দিয়েছে ইংরেজ নির্মাতা অঁরি পেপ পিয়ানোর হাতুড়ির জন্য চামড়ার পরিবর্তে সংকুচিত ফেল্টের আবরণ চালু করেন, যা পিয়ানোকে আরও শক্তিশালী ও সুরেলা একটি সুর প্রদান করে, যা বড় কনসার্ট হল এবং রোমান্টিক যুগের সঙ্গীতের জন্য উপযুক্ত।
১৮২০-এর দশক–১৮৪০-এর দশক
ঢালাই লোহার ফ্রেম কনসার্ট গ্র্যান্ড পিয়ানোকে সক্ষম করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের নির্মাতারা সম্পূর্ণ ঢালাই লোহার ফ্রেম ব্যবহার শুরু করেন, যা তারের টান ও আওয়াজ ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দেয় এবং আরও অনেক বড় ও মজবুত কনসার্ট গ্র্যান্ড পিয়ানো নির্মাণের সুযোগ করে দেয়। ১৮৫৯ সাল:
স্টেইনওয়ে ওভারস্ট্রং স্কেলের পেটেন্ট করেছিলেন। স্টাইনওয়ে অ্যান্ড সন্স একটি ক্রস-স্ট্রিংগিং (ওভারস্ট্রং) ডিজাইনের পেটেন্ট করেছিল, যা ট্রেবল অংশের উপর বেস স্ট্রিংগুলোকে ছড়িয়ে দেয়, ফলে সুরের সমৃদ্ধি বাড়ে এবং আধুনিক গ্র্যান্ড পিয়ানোর শব্দকে সুস্পষ্ট করতে সাহায্য করে।
১৮৭৬ সাল:
প্লেয়ার পিয়ানো স্বয়ংক্রিয় সঙ্গীতের পূর্বাভাস দিয়েছিল ছিদ্রযুক্ত কাগজের রোল ব্যবহার করে প্রথম কার্যকরী প্লেয়ার পিয়ানো কৌশল ফিলাডেলফিয়ার সেন্টেনিয়াল এক্সপোজিশনে প্রদর্শন করা হয়েছিল, যা কিবোর্ডে কোনো মানুষ ছাড়াই পিয়ানোকে সঙ্গীত পরিবেশনের সুযোগ করে দেয়।
১৯৩৮ সাল: হ্যামন্ড নোভাকর্ড ইলেকট্রনিক কিবোর্ডের পথপ্রদর্শক ছিলেন। লরেন্স হ্যামন্ডের নোভাকর্ড, যা প্রথম বাণিজ্যিক পলিফোনিক ইলেকট্রনিক কিবোর্ড হিসেবে ব্যাপকভাবে বিবেচিত, দেখায় যে কীভাবে পিয়ানো-শৈলীর কিবোর্ড সম্পূর্ণরূপে ইলেকট্রনিক শব্দ উৎস নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
১৯৮৩ সাল: বিশ্বজুড়ে MIDI স্ট্যান্ডার্ড সংযুক্ত ডিজিটাল পিয়ানো MIDI (Musical Instrument Digital Interface) স্ট্যান্ডার্ডের প্রবর্তনের ফলে ডিজিটাল পিয়ানো এবং সিন্থেসাইজারগুলো কম্পিউটার ও অন্যান্য বাদ্যযন্ত্রের সাথে যোগাযোগ করতে সক্ষম হয়, যা পিয়ানোবাদকদের রেকর্ডিং, সুর রচনা এবং পরিবেশনের পদ্ধতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসে।[৫]
আরও দেখুন
[সম্পাদনা]তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ "dictionary /piano"। merriam webster। সংগ্রহের তারিখ ২৯ মার্চ ২০২৬।
- ↑ https://www.britannica.com/art/piano।
{{ওয়েব উদ্ধৃতি}}:|title=অনুপস্থিত বা খালি (সাহায্য) - ↑ "musical instrument guide /piano"। yamaha. তুষার কান্তি ষন্নিগ্রহী কর্তৃক সংগৃহীত। সংগ্রহের তারিখ ২৯ মার্চ ২০২৬।
- ↑ "wiki/musical instruments/keyboard /piano"। ipassio। সংগ্রহের তারিখ ২৯ মার্চ ২০২৬।
- ↑ "en/world piano day"। jorquerapianos। সংগ্রহের তারিখ ২৯ মার্চ ২০২৬।