পাপুয়া নিউগিনির ইতিহাস

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
নিউগিনির অবস্থান সংক্রান্ত মানচিত্র।
চিত্রটির ডান অর্ধাংশে বিসমার্ক দ্বীপপুঞ্জ-এর সহিত বর্তমানকালের পাপুয়া নিউগিনি দৃশ্যমান; যেখানে চিত্রবহির্ভূত অংশে (দূরবর্তী-পূর্বে) রয়েছে বুগ্যানভিল

পাপুয়া নিউ গিনিতে সুদীর্ঘ সেই ৬০,০০০ বছরের পুরোনো প্রাগৈতিহাসিক কালের নজির পরিলক্ষিত হয়, যে সময়  আদি-মানুষেরা প্রথম অস্ট্রেলিয়া মহাদেশে বসবাসের জন্য যাত্রা করে। সতেরো শতকের প্রথম দিকে ইউরোপীয় নাবিকদের নিকট পাপুয়া নিউ গিনি দৃষ্টিগোচর হলে লৈখিক রূপে এই অঞ্চলের ইতিহাস সংরক্ষণের সূচনা হয়।

প্রত্নতত্ত্ব[সম্পাদনা]

পুরাতাত্ত্বিক প্রমাণস্বরূপ বিভিন্ন নিদর্শন ইঙ্গিত দেয় যে, আদি-মানুষেরা সম্ভবত ৬০,০০০ বছর আগে এই অঞ্চলে এসে উপনীত হয়।[১][২] তবে এই বিষয়টি এখনো বিতর্কিত। তারা সম্ভবত কোনো এক বরফ যুগে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া হতে সাগর পথে এই অঞ্চলের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান, যখন কিনা সমুদ্র-পৃষ্ঠের উচ্চতা এবং এক দ্বীপ হতে অন্য পার্শ্ববর্তী দ্বীপের দূরত্ব বর্তমান সময়ের তুলনায় কম ছিল। যদিও প্রথম যারা এসেছিলেন তারা ছিলেন শিকারী এবং সংগ্রাহক। প্রাথমিক প্রমাণ অনুযায়ী জানা যায় যে প্রথম আগমনকারীর জঙ্গলের পরিবেশ থেকে খাদ্য সংগ্রহের উত্তম ব্যবস্থা করেছিলেন। মিশর এবং মেসোপটেমিয়ায় যে সময়ে কৃষিকার্যের উন্নয়ন সাধন হচ্ছিলো, ঠিক সেই একই সময়ে এই অঞ্চলের কুক জলাভূমিতে নব্যপ্রস্তর যুগে প্রচলিত বাগান ব্যাবস্থার নিদর্শন খুঁজে পাওয়া যায়। বর্তমান সময়ে এই ভূখণ্ডের প্রধান খাবারের তালিকায় মিষ্টি আলু এবং শূকরের মাংস প্রচলিত থাকলেও এগুলো আদিকালে প্রচলিত ছিল না; এগুলোর আগমন ঘটেছে বেশ পরে। কিন্তু উপকূল-জীবিদের খাদ্য তালিকায় মাছ প্রধান খাবার হিসেবে আজও বজায় রয়েছে। সাপ্রতিক কালের প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা থেকে জানা যায় যে, সম্ভবত ৫০,০০০ বছর আগে এই ভূখণ্ডের আদি-বাসিন্দারা নিজেদের কেবলমাত্র গরম আবহাওয়ার উপকূলীয়-অঞ্চলে সীমাবদ্ধ না রেখে ভূপৃষ্ঠ থেকে ২,০০০ মিটার উচ্চতায় গিয়ে বসবাস করতে শুরু করেন।[৩]

ইউরোপীয় সংস্পর্শ[সম্পাদনা]

ইউরোপীয়রা যখন প্রথম এই ভূখণ্ডে আসলো, তখন পাপুয়া নিউ গিনি এবং এর পার্শবর্তী দ্বীপসমূহের বাসিন্দারা উৎপাদনক্ষম উর্বর কৃষিব্যবস্থার অধিকারী ছিলেন; যদিও বা তারা সরঞ্জাম বলতে কেবল হাড়, কাঠ এবং পাথরের তৈরী নামমাত্র সরল যন্ত্রপাতির ব্যবহার জানতো সেসময়ে। নিজেদের অভ্যন্তরীণ বসতির পাশাপাশি উপকূলবর্তী স্থানসমূহে তারা মৃৎপাত্র, স্থানীয় খাবার, খোলসের তৈরী গয়না, বন থেকে আহরিত সামগ্রী এবং কাঠের তৈরী বিভিন্ন জিনিস বিনিময়ের মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্য করতো।

পাপুয়া নিউ গিনি প্রথম দর্শন করা ইউরোপীয়দের মধ্যে যাদের সম্পর্কে জানা যায় তার সম্ভবত ছিলেন পর্তুগিজ এবং স্পেনীয় অভিযাত্রী-নাবিক দলের সদস্যরা; যারা ১৬-শ শতকে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের উপর দিয়ে পাল তুলে চলা বিভিন্ন জাহাজে কর্মরত ছিলেন। ১৫২৬-১৫২৭ সালের কোনো এক সময়ে পর্তুগিজ অভিযাত্রী জর্জ দ্য মেনেজেস দুর্ঘটনাবশত এই দ্বীপসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশটির মূল ভূখণ্ডে এসে উপনীত হন এবং একটি মালয় শব্দ দ্বারা এর নামকরণ করেন পাপুয়া যার অর্থ ছিল মেলানেশীয় মানুষদের কোঁকড়া চুলের ধরন। পরবর্তীতে ১৫৪৫ সালে স্পেনের নাগরিক ইন্নিগো ওরিৎস্ দে রেতেস্ আফ্রিকান গিনি উপকূলের মানুষদের সাথে এই ভূখণ্ডের বাসিন্দাদের মধ্যে ব্যাপক মিল খুঁজে পান বিধায় এই অঞ্চলকে উল্লেখ করতে নিউ গিনি নামটির প্রয়োগ করেন।

এই ভূখণ্ডের উপকূলীয় অঞ্চল এরপরেও ইউরোপীয় অভিযাত্রীরা পরিদর্শন করা সত্ত্বেও ১৮৭০ সালে রুশ নৃতত্ত্ববিদ নিকোলাই মিকলুখো-মাকলাই-এর পর পর বেশ কয়েকবার অভিযানের আগ পর্যন্ত এই অঞ্চলের বাসিন্দাদের সম্পর্কে খুব কম তথ্যই জানা সম্ভব হয়েছিল। তিঁনি এই ভূখণ্ডের স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে বেশ কয়েক বছর জীবনযাপন করে তাদের জীবনযাপনের রীতিনীতি সহজ-সরল বোধগম্য ভাষায় ব্যাখ্যা করেন।

কুইন্সল্যান্ডে উত্তোলিত ব্রিটিশ পতাকা, ১৮৮৩ সাল

পাপুয়া অঞ্চল[সম্পাদনা]

১৮৮৩ সালে কুইন্সল্যান্ড উপনিবেশ পূর্ব-নিউ গিনির দক্ষিণাংশে উপনিবেশ বর্ধিত করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু ব্রিটিশ সরকার তার অনুমোদন দেয় নি। পরবর্তীতে জার্মানি এ ভূখণ্ডের উত্তরাংশে বসতি স্থাপন শুরু করলে ব্রিটিশ সরকার নিউ গিনির দক্ষিণাংশীয় উপকূল এবং এর সংলগ্ন দ্বীপসমূহে ১৮৮৪ সালে একটি ব্রিটিশ আশ্রিত-রাজ্যের দাবি করে। ব্রিটিশ নিউ গিনি নামের আশ্রিত রাজ্যটি ১৮৮৮ সালের ৪ সেপ্টেম্বর সরাসরি বর্ধিত করা হয়। দখলকৃত অঞ্চলটি ১৯০২ সালে কমনওয়েলথ অব অস্ট্রেলিয়া কতৃপক্ষের তত্বাবধানে ন্যস্ত করা হয়। ব্রিটিশ নিউ গিনি ১৯০৫ সালের পাপুয়া চুক্তির অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্দিষ্ট পাপুয়া ভূখণ্ড হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং এর ফলে আনুষ্ঠানিক অস্ট্রেলীয় প্রশাসন আরম্ভ হলেও ১৯৭৫ সালে স্বাধীনতা লাভের আগ পর্যন্ত পাপুয়া নিউ গিনি ব্রিটিশ ধখলের অধীনে ছিল।[৪]

পাপুয়া অঞ্চলে খুবই সংক্ষিপ্ত পরিসরে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড প্রচলিত ছিল। ১৯৪১ সালে জাপানি সাম্রাজ্য কর্তৃক আক্রমণের আগ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়া এই অঞ্চল স্বতন্ত্রভাবে শাসন করেছিল, কিন্তু আক্রমণের পর থেকে জন-প্রশাসন ব্যবস্থা স্থগিত করা হয়। পাপুয়া অস্ট্রেলীয় সামরিক বাহিনী কর্তৃক পোর্ট-মোর্সবি থেকে শাসিত হতো এবং এখানে জেনারেল ডগলাস ম্যাক-আর্থার সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য তার সদর-দপ্তর স্থাপন করেছিলেন।

জার্মানির নিয়ন্ত্রণাধীন থাকাকালে নিউ-গিনির পতাকা

জার্মান নিউ গিনি[সম্পাদনা]

১৮৮৪ সালে মিয়োকোতে উত্তোলনরত জার্মান পতাকা

ইউরোপে নারিকেল তেলের চাহিদা বৃদ্ধি পেলে, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্য পরিচালনাকারী ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবচে বড় প্রতিষ্ঠান হ্যামবুর্গের গোডফ্রয় নিউ গিনি দ্বীপপুঞ্জে নারিকেলের কোপরার বিনিময়ে বাণিজ্য আরম্ভ করে। ১৮৮৪ সালে জার্মান সাম্রাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে এই ভূখণ্ডের উত্তর-পূর্ব চতুর্ভাগের দখল নেয় এবং এই ভূখণ্ড শাসনের উদ্দেশ্যে গঠিত তালিকাভুক্ত বৈধ ব্যবসায়িক কোম্পানি জার্মান নিউ গিনি কোম্পানির নিকট এর শাসনভার অর্পণ করে। ১৮৮৫ সালের মে মাসে জার্মান সাম্রাজ্যবাদী সরকার কর্তৃক প্রদত্ত দলিল অনুযায়ী এই কোম্পানি নিউ গিনি ভূখণ্ডে এবং সংলগ্ন অন্যান্য অদখলিকৃত ভূমির উপর সার্বভৌম অধিকার প্রয়োগ এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে সরাসরি মধ্যস্থতা করার বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী হয়।
জার্মান সরকারের সংরক্ষন নীতির দরুন বিদেশী শাসকগোষ্ঠীর সাথে সম্পর্ক ক্ষীণ করে রাখা হয়। জার্মান সরকার কর্তৃক সার্বিক সুযোগ-সুবিধা অর্জনের লক্ষ্যে নিউ গিনি কোম্পানি স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সরাসরি অর্থের যোগান দিতে থাকে; পরবর্তীতে তারা সেই লক্ষ্য অর্জনে রীতিমতো সক্ষম হয়েছিল। ১৮৯৯ সালে জার্মান সাম্রাজ্যবাদী সরকার সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করায়ত্ত করার পর থেকে এই ভূখণ্ড জার্মান নিউ গিনি নামে পরিচিতি লাভ করে। নিউ গিনি মূলত ব্যবসা-বাণিজ্যের একটি কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। হাজার হাজর স্থানীয় বাসিন্দাদেরকে সস্তা মজুর হিসেবে কোকো এবং নারিকেলের আবাদভূমিতে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। ১৮৯৯ সালে বার্লিনের নিউ গিনি কোম্পানির  নিকট জার্মান সরকার এই উপনিবেশের নিয়ন্ত্রন করায়ত্ত করে। খ্রিষ্টান ধর্মপ্রচারকারীদের হাত ধরে এই ভূখণ্ডে আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার প্রচলন হয়। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের দামামা বেজে উঠলে অস্ট্রেলিয়া এই জার্মান কলোনী দখল করে নেয়। সেসময় চাষাবাদের ক্ষেত্রগুলো যুদ্ধে নিয়োজিত অস্ট্রেলীয় সুদক্ষ বাহিনীর উপর অর্পণ করা হয় এবং পরবর্তীতে ১৯২১ সালে লীগ অব নেশন্স অস্ট্রেলিয়ার নিকট নিউ গিনির ন্যাসরক্ষা অর্পণ করে।[৫]

নিউ গিনি অঞ্চল[সম্পাদনা]

১৯২০ সালে জার্মান শাসিত সাবেক নিউ গিনি অঞ্চল নিয়ন্ত্রণের জন্য অস্ট্রেলিয়া জাতিপুঞ্জ কর্তৃক আদেশ লাভ করে। এই আদেশবলে ১৯৪১ সালের ডিসেম্বর মাসে জাপান কর্তৃক আক্রমণের আগ পর্যন্ত নিউ গিনি অস্ট্রেলিয়ার মাধ্যমে শাসিত হয়ে আসছিলো, কিন্তু জাপানি আক্রমণের দরুন এই অঞ্চলে অস্ট্রেলীয় জন-প্রশাসন ব্যবস্থা ভঙ্গুর হয়ে পরে। পরবর্তীতে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের শেষের দিকে অস্ট্রেলীয় এবং মার্কিন বাহিনীর দ্বারা পুনর্দখলের আগ পর্যন্ত নব্য-ব্রিটেন এবং বুগ্যানভিল দ্বীপপুঞ্জ সহ নিউ গিনির অধিকাংশ অঞ্চল জাপানি বাহিনীর দখলে ছিল।

নিউ গিনি অঞ্চলে অনুসন্ধান অভিযান[সম্পাদনা]

আকমানা অভিযান (১৯২৯-১৯৩০)[সম্পাদনা]

পাপুয়া-নিউ গিনি অঞ্চলে বিভিন্ন অভিযান ছিল একটি চলমান প্রক্রিয়া। সাম্প্রতিক সময়ের আগে নিউ গিনিতে কোনো সুপরিকল্পিত অভিযান পরিচালিত হয় নি; কারণ অধিকাংশ অভিযানই খনি খনন, মজুর সংগ্রহ, ধর্মপ্রচার থেকে শুরু করে রোমাঞ্চ লাভের উদ্দেশ্যে সহ আরো বিভিন্ন  উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও পরিকল্পনা ছাড়াই পরিচালিত হতো। আর যারাও বা অভিযানে যেতেন তাদের সিংহভাগই ছিলেন শ্রমিকদের নিয়োগকর্তা, কোনো ইতিহাস বা কাহিনী সংগ্রাহক ছিলেন না। যার ফলে অভিযানে তাদের অনুসন্ধানের পাশাপাশি অনুসন্ধানের জ্ঞান গতিশীল হয়নি।[৬]

কিন্তু এর অন্যতম ব্যতিক্রম ছিল আকমানা স্বর্ণ সন্ধানী কোম্পানির ক্ষেত্রানুসন্ধানী দলের নথিপত্র; কোম্পানিটি ১৯২৯ সালের সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর সময়কাল থেকে ১৯৩০ সালের জুন মাসের শেষদিক পর্যন্ত দু-দুইবার অনুসন্ধানী অভিযান পরিচালনা করে।[৭] তাদের অনুসন্ধানী দল ৩৮ফিট দীর্ঘ বান্যান্ডাহ-তে (এক জাতীয় বজরা) চড়ে মাদাং থেকে উপকূল রেখা বরাবর উত্তরে সেপিক নদীর মোহনা পর্যন্ত যাত্রা করে সেখান থেকে মরিনবার্গ এবং মইম অবধি যাত্রা করেন।এরপর সেখান থেকে কারোসামেরী নদী ধরে কারাওয়াড্ডি নদী হয়ে আরাবুন্দিও নদী এবং ইয়েমাসে এসে তাদের অনুসন্ধানী দল পৌঁছায়। দুর্গম অঞ্চল হওয়ায় অবশেষে তাদের মজুত এবং সরঞ্জামাদি ইয়েমাস থেকে আরাবুন্দিও নদীর উৎস অভিমুখে অবস্থিত ভিত্তি-তাঁবু পর্যন্ত পানসি ও ডিঙিতে বহন করে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি মূলত কাঁধে বহন করে পায়ে হেঁটে নিয়ে যাওয়াটা আবশ্যক হয়ে পরে।

প্রথম অভিযানের সময় আকমানা খনিজ-মজুদ অনুসন্ধানী দল আরাবুন্দিও নদীর মোহনা ও এর সংলগ্ন এলাকার তলদেশে খনিজ-মজুদের খোঁজ করে এবং পরবর্তীতে কারাওয়াড্ডি নদীর উৎস থেকে নমুনা সংগ্রহের জন্য নিউ গিনির কেন্দ্রীয় পর্বতমালার পার্শবর্তী শাখাজুড়ে জরিপ পরিচালনা করে। এরপর আরাবুন্দিও নদীতে ফিরে এসে তারা কেন্দ্রীয় পর্বতমালার অন্য একটি শাখায় জিমি এবং বায়ের নদীর সাথে ইউয়াট নদীর সঙ্গমস্থলে জরিপ পরিচালনা করার জন্য অগ্রসর হন কিন্তু এখানেও তারা পর্যাপ্ত পরিমান স্বর্ণ খুঁজে পান নি। ১৯২৯ এর শেষের দিকে মাদাং ফিরে আসার পর তাদের দলের কয়েকজন আকমানা স্বর্ণ অনুসন্ধানী কোম্পানির নিকট হতে দিক-নির্দেশনা পাওয়ার জন্য সিডনি-তে ফিরে আসেন।

১৯৩০ সালের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে দ্বিতীয় অভিযান শুরু হয় এবং অনুসন্ধানী দল অনতিবিলম্বে কেন্দ্রীয় পর্বতমালার পাদদেশের ভিত্তি-তাঁবু এবং জিমি এবং বায়ের নদীর সাথে ইউয়াট নদীর সঙ্গমস্থলে পর্বতমালার নির্দিষ্ট অংশে প্রত্যাবর্তন করে। তারা বায়ের নদী ধরে দক্ষিণে মারামুনি এবং তারুয়া নদীর সাথে এর সঙ্গমস্থল অভিমুখে অনুসন্ধান পরিচালনা করেন, যেখানে তারা আকমানা জংশন নামে ডাল-পালা ও কঞ্চির দ্বারা ঘেরাও করা একটি সম্মুখবর্তী তাঁবু স্থাপন করেন। এই তাঁবু থেকে তারা মারামুনি নদী হয়ে এর বিভিন্ন শাখা নদীতে অনুসন্ধানে বের হন, কিন্তু এবার তারা পর্যাপ্ত পরিমান স্বর্ণ খুঁজে পান নি। সবশেষে দলটি ওয়াইপাই এর দিকে প্রবাহমান তারুয়া নদীর একটি শাখার দক্ষিণে অনুসন্ধান চালায় কিন্তু এবারও তারা সাফল্যের দেখা পান নি এবং খনি প্রকৌশলী সিল-এর পরামর্শ অনুযায়ী এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে উপযুক্ত যুক্তি ও প্রমাণ ব্যতিত অদূর ভবিষ্যতে আর কোনো অভিযান পরিচালনা করার কোনো মানেই হয় না। দক্ষিণের জলবিভাজিকায় অবস্থিত বিভিন্ন দুর্গম অঞ্চলে তারা আর অগ্রসর হন নি, যেখান দিয়ে গমন করে শুরুর দিকের অভিযাত্রী এবং স্বর্ণ অনুসন্ধানীরা ওয়াবাগহাগান পর্বত শ্রেণী ভ্রমণ করেছিলেন।

প্রথম অভিযান পরিচালনা করার পর স্যাম ফ্রিম্যান প্রত্যাবর্তন না করলে রেগ বেইজলি  অনুসন্ধানের আশায় সুযোগের অপেক্ষায় প্রস্তুত ছিলেন দ্বিতীয় অভিযানের নেতৃত্ব প্রদানে  এবং তার সাথে খনি প্রকৌশলি পন্টি সিল, স্বর্ণ অনুসন্ধানী বিল ম্যাক-গ্রেগর, পরিবহন ও মজুত সমন্বয়কারী এমি শেফার্ড সহ ছিলেন আরো অনেক স্বর্ণ অনুসন্ধানী। প্রথম বিশ্ব যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে তাদের সবাই বিদেশে মূলত মিশরলেভান্ট-এ দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং এর আগেও তারা নিউ গিনি-তে বসবাস করেছিলেন। ১৯২৬ সালে ওরমিল্ডাহ-এর সাথে ফ্রিম্যান মরিনবার্গ সংলগ্ন এলাকায় তেল-উত্তোলন কাজে নিয়োজিত ছিলেন; শেফার্ড ছিলেন ডঃ ওয়েড এবং র. জ. ভিন্টারের সাথে বোগিয়ানুবিও থেকে রামু অঞ্চল পর্যন্ত এবং সেপিক নদী হতে কুবকা হয়ে অম্বুন্ত পর্যন্ত তাদের ভূতাত্ত্বিক জরিপ কার্যে। বেইজলি সেপিক নদীর নিম্নতর অংশে মাটাহাওভার-এর সাথে তেল উত্তোলনের জন্য খনন কার্যে নিয়োজিত ছিলেন আর ম্যাক-গ্রেগর সেপিক নদীতে শ্রমিক নিয়োগ দেওয়ার পাশাপাশি ভি-ওয়াক এর তৃণভূমিতে অনুসন্ধানে গিয়েছিলেন। বেইজলিও স্বর্ণ লাভের উদ্দেশ্যে আরাবুন্দিও নদীতে অনুসন্ধান করেন।
স্বর্ণ অনুসন্ধানী দল স্থানীয় বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সংস্পর্শে আসে, যাদেরকে অনুসন্ধানী দলটি তৃণভূমির লোক, মুন্ডু শিকারী, পিগমি, উপকেশী লোক, কানাকাস এবং পুমানি সহ আরো বিভিন্ন নামে অভিহিত করেছিল। স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে এই যোগাযোগ সম্ভব হয়েছিল উপকেশীয় লোকদের ড্ৰাই-বো/ড্রিবু নামক নেতা বা মুখপাত্রের মাধ্যমে যিনি ছিলেন গোষ্ঠীর সব সদস্যের মধ্যে সবচেয়ে বুদ্ধিমান ব্যক্তি এবং তার শুভাকাংখী মনোভাবের সহিত তার শান্তশিষ্ট কর্তৃত্ব বহিরাগতদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ পারস্পরিক সহযোগিতা করেছিল আরো সহজতর। "আমরা এই ভূখণ্ডে শান্তিপূর্ণভাবে প্রবেশ করেছি এবং এর পাশাপাশি অবাধ বাণিয্য ও উত্তম ব্যবহারের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছি। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে আমাদের আগ্রহের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল স্বর্ণ এবং বিভিন্ন নদী ও সেগুলোর শাখা-প্রশাখার যতদূর সম্ভব স্বর্ণের অনুসন্ধান করেছি; যদিও তেমন মূল্যবান কোনো কিছু খুঁজে না পাওয়ার দরুন সবশেষে ফলাফলে আমাদের সার্বিক কঠোর পরিশ্রমের কোনো প্রতিফলন ঘটে নি। বহু বছর পর বেশ কয়েকটি দলের খবর পাওয়া যায়, যারা এই অঞ্চলে বেশ ভালোভাবেই লাভের দেখা পেয়েছিলো কিন্তু সেসবের কোনো উল্লেখ্য নজির পাওয়া নয় নি। তাই এসব বিষয়ের সাপেক্ষ্যে বিবেচনা করলে মনে হয় আমরা খুব বেশি কিছু অর্জন করতে পারি নি"।[৮]

এই অঞ্চলের বিভিন্ন স্থান থেকে আকমানা অনুসন্ধানী দলের সদস্যরা যে পরচুলাগুলো সংগ্রহ করেছিল, সেগুলো তারা বিভিন্ন জাদুঘরে দান করে দেন। বেইজলি এবং শেফার্ডের হাত হয়ে সেগুলোর মধ্যে দুটি যায় অস্ট্রেলীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষের নিকট। অস্ট্রেলীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষের সমসাময়িক নথি হতে জানা যায় যে প্রথম অভিযান থেকে সিডনিতে বেইজলির দ্রুত প্রত্যাবর্তনের পর বেইজলির সংগ্রহকৃত পরচুলাটি-কে "নিউ-গিনির কেদ্রীয় পর্বতমালার ইউয়াট নদীর মূল প্রবাহ সংলঙ্গ এলাকা থেকে সংগ্রহ করা মানুষের চুল দ্বারা তৈরী টুপি" বলে ব্যাখ্যা করে নথি ভুক্ত করা হয়। অন্য আরেকটি পরচুলা শেফার্ড তার বাবা কার্শবম এর নিকট প্রদর্শন করেন, যিনি পরচুলাটিকে জার্মানি প্রেরণের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। অস্ট্রেলীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত পরচুলাগুলোকে জিমি টেইলরের হ্যাগেন-সেপিক অভিযানকালে সংগৃহিত উচ্চ-ভূমি থেকে আ পরচুলের সাথে গুলিয়ে ফেলা হয় এবং ভুলবশত জিমি টেইলরের নাম সংযুক্ত করে  প্রদর্শন করা হয়। সিল ক্যানবেরায় অবস্থিত জাতীয় জাদুঘরে ১৯৩০ সালে আরো দুটি পরচুলা প্রদর্শন করেন।[৯]

দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ[সম্পাদনা]

প্রশান্ত মহাসাগরীয় যুদ্ধ আরম্ভ হওয়ার কিছু পরেই জাপানি বাহিনী কর্তৃক নিউ গিনি দ্বীপপুঞ্জ দখলকৃত হয়। তৎকালীন সময়ে ডাচ নিউ-গিনি নামে পরিচিত পশ্চিম পাপুয়ার অধিকাংশ অঞ্চল নিউ-গিনির বিস্তীর্ণ একটি অংশ হিসেবে দখলীকৃত থাকলেও উত্তরে অবস্থিত প্রায় অনতিক্রম্য ওয়েন স্ট্যানলি পর্বত শ্রেণী এবং দক্ষিণের সুবিস্তীর্ণ ভূখণ্ডের কৃপায় পাপুয়া সংরক্ষিত ছিল।

১৯৪২ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বর সময়কালে মিল্নে উপসাগরের যুদ্ধ-এ অস্ট্রেলিয়ার সৈন্য মোতায়েন করাটা ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-এ জাপানি সাম্রাজ্যবাদী বাহিনী-এর বিরুদ্ধে করা প্রথম সেনা মোতায়েন

১৯৪২ সালে নিউ-গিনি অঞ্চলে নব্য-ব্রিটেন এবং নব্য-আয়ারল্যান্ডের জন্য সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নিউ-গিনি সংঘাতের সূচনা হয়। ২২-২৩ জানুয়ারিতে অঞ্চলটির রাজধানী রাবাউলে  অচলাবস্থা দেখা দেয় এবং নিউ-গিনির মূল ভূখণ্ডে জাপানি বাহিনীর অবতরণের পর থেকে একটি বড় ঘাঁটি স্থাপিত হয় এবং সেখান থেকে তারা পোর্ট-মোর্সবি এবং অস্ট্রেলিয়ার দিকে অগ্রসর হয়।[১০] কোরাল সাগরের যুদ্ধে সমুদ্র পথ ধরে পোর্ট-মোর্সবি দখলের প্রাথমিক চেষ্টায় মার্কিন নৌবাহিনী কর্তৃক বাঁধা প্রাপ্ত হলে জাপানি বাহিনী কোকোডা ট্রেইল ধরে মূল ভূখণ্ড দখলের জন্য অগ্রসর হয়। তরুণ-অল্পপ্রশিক্ষিত সৈন্য সম্বলিত একটি  অস্ট্রেলীয় সংরক্ষিত বাহিনী ১৯৪২ সালের জুলাই মাস থেকে ওয়েন স্ট্যানলি পর্বত শ্রেণী ডিঙিয়ে কোকোডা ট্রেইল ধরে পোর্ট-মোর্সবির দিকে ধাবিত হওয়া অদম্য জাপানি পশ্চাদ্ভাগরক্ষী বাহিনীর সাথে যুদ্ধ পরিচালনা করে। অস্ট্রেলীয়দের কাছে কোঁকড়া চুলো স্বর্গদূত নামে পরিচিতি স্থানীয় পাপুয়ান বাসিন্দারা আহত অস্ট্রেলীয় বাহিনীকে কোকোডা ট্রেইল ধরে নিম্নে অগ্রসর হতে সাহায্য-সহযোগিতা করে। সৈন্যবাহিনীটি গুরুতরভাবে জরাজীর্ণ ও দেউলিয়া হয়ে যায় এবং পরবর্তীতে আগস্টের শেষের দিকে ভূমধ্যসাগরীয় যুদ্ধের ময়দান ফেরত দ্বিতীয় অস্ট্রেলীয় সাম্রাজ্যবাদী বাহিনীর নিয়মিত সৈন্যবাহিনী কর্তৃক উদ্ধারপ্রাপ্ত হয়।

১৯৪২ সালে আধৃত জাপানি পতাকা হাতে নিউ-গিনির স্বেচ্ছাসেবী রাইফেল বাহিনী

জাপানি বাহিনী পিছু হটে যায়। জঘন্য বুনা-গোনা যুদ্ধের সূত্র ধরে অস্ট্রেলীয় এবং মার্কিন বাহিনী নিউ-গিনির বুনা, সানান্যান্ডা এবং গোনায় অবস্থানরত জাপানি বেলামুখী বাহিনীর উপর আক্রমণ করে। ক্রান্তীয় বিভিন্ন রোগ, বন্ধুর ভূমি-প্রকৃতি এবং সুগঠিত জাপানি বাহিনীর মুখে পরেও মিত্রশক্তি চড়া মূল্য দিয়ে কোনো মতে বিজয় ছিনিয়ে নিতে সক্ষম হয়।[১১]

১৯৪২ সালের ২৫শে ডিসেম্বর বুনা-র নিকট কর্তব্যরত যোদ্ধা রাফায়েল ঐম্বারির দ্বারা সহযোগিতাপ্রাপ্ত অস্ট্রেলিয়ার একজন প্রাতিজনিক সৈন্য জর্জ "ডিক" উইটটিংটন

১৯৪২ সালের সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে জাপানি নৌবাহিনী পাপুয়ার উত্তর প্রান্তে মিল্নে উপসাগরবর্তী অস্ট্রেলীয় রাজকীয় বিমান বাহিনীর একটি কৌশলগত ঘাঁটিতে আক্রমণ করে বসে। জাপানি বাহিনী অস্ট্রেলীয় সেনাবাহিনী দ্বারা প্রত্যাহত হয়, এবং মিল্নে উপসাগরের যুদ্ধটিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানি বাহিনীর সরাসরি পরাজয়ের যুদ্ধ হিসেবে আজ স্মরণ করা হয়।[১২] ১৯৪৩-৪৪ সালে পাপুয়া ও নিউ-গিনি আক্রমণ ছিল অস্ট্রেলীয় সৈন্যবাহিনীর সংঘটিত সবচেয়ে বড় ধরনের কোনো সামরিক সক্রিয়তা। এই যুদ্ধে প্রধান সেনাপতি ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সেনাপতি ডগলাস ম্যাক-আর্থার, যেখানে পরিকল্পনায় অস্ট্রেলিয়ার সেনাপতি থমাস ব্লেমি সরাসরি ভূমিকা রেখেছিলেন এবং অন্যান্য কর্মকর্তাদের দ্বারা নিউ-গিনি বাহিনীর সদর দপ্তর হতে সকল কর্মকান্ড হতো। ১৯৪৫ সালে জাপানি বাহিনীর আত্মসমর্পনের আগ পর্যন্ত নিউ-গিনিতে অস্ট্রেলীয় বাহিনী এবং এই ভূখণ্ডে অবস্থানরত জাপানি সেনাবাহিনীর অষ্টাদশ শাখার সৈন্যদলের মধ্যে জঘন্য যুদ্ধ চলমান। থাকে।[১৩]

প্রশান্ত-মহাসাগরীয় যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে নিউ-গিনির সংঘাত খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। এই সংঘাতে সবমিলিয়ে কম করে হলেও প্রায় ২,০০,০০০ জাপানি সৈন্য, নাবিক এবং পাইলট মৃত্যু বরণ করেছিলেন, যেখানে এর বিপরীতে অস্ট্রেলীয় বাহিনীর মাত্র ৭,০০০ এবং মার্কিন বাহিনীরও মাত্র ৭,০০০ সেনা মৃত্যু বরণ করেছিলেন।

পরের সপ্তাহে পাপুয়া নিউ-গিনিতে অনুষ্ঠিতব্য প্রশান্ত-মহাসাগরীয় দেশ সমূহের একটি সম্মেলনে আগত নেতৃবৃন্দের নিরাপত্তা প্রদানের লক্ষ্যে অস্ট্রেলীয় নৌ-বাহিনীর একটি বিশেষ বহর পাপুয়া নিউ-গিনি এসে পৌঁছায়, যা পাপুয়া নিউ-গিনিকে প্রতিবেশী দেশ অস্ট্রেলিয়ার সাথে নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মধ্যকার সম্পর্ক্যের উন্নতির পূর্বাভাস দেয়।

পাপুয়া এবং নিউ গিনি অঞ্চল[সম্পাদনা]

১৯৪৫ সালে জাপানি বাহিনীর আত্মসমর্পনের মাধ্যমে পাপুয়া অঞ্চলের পাশাপাশি নিউ গিনি অঞ্চলের জন-প্রশাসন ব্যবস্থা পুনর্জীবন ফিরে পায় পাপুয়া নিউ গিনির শর্তাধীন শাসন চুক্তি (১৯৪৫-১৯৪৬) অনুযায়ী পাপুয়া এবং নিউ গিনি অঞ্চলকে প্রশাসনিক সুবিধার্থে একত্রীকরণ করে একটি যুক্তরাষ্ট্রে পরিণত করা হয়। ১৯৪৯ সালের পাপুয়া ও নিউ গিনি চুক্তিবলে নিউ গিনি-কে আন্তর্জাতিক ন্যাসরক্ষা নীতির অধীন অর্পণ করার অনুমোদন  দেয়া হয় এবং পাপুয়া নিউ-গিনি নাম প্রতিপাদন করে প্রশাসনিক যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিত করা হয়। উক্ত চুক্তিবলে পাপুয়া নিউ-গিনি একটি বিধানসভা, একটি বিচার বিভাগ, একটি জন-প্রশাসন বিভাগ এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার অধিকারী হয়, যেখানে স্যার ডোনাল্ড ক্লিল্যান্ড মুখ্য-প্রশাসক পদে নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৬৭ সালে অবসরের আগ পর্যন্ত এই পদে স্বতন্ত্রভাবে বহাল ছিলেন, সবশেষে ১৯৭৫ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি পোর্ট-মোর্সবি-তে বসবাসরত ছিলেন।[১৪] ১৯৬৩ সালে পাপুয়া ও নিউ গিনির বিধানসভা এর সংসদ দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয় এবং ১৯৬৪ সালের ফেব্রুয়ারী মাসের ১৫ তারিখের নির্বাচনের পর, জুন মাসের ৮ তারিখে অভিষিক্ত হয়। ১৯৭২ সালে দেশের নাম পরিবর্তন করে পাপুয়া নিউ-গিনি রাখা হয়। বিশ্ব ব্যাংকের নিকট পাপুয়া নিউ-গিনির অঞ্চলের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রসঙ্গে জরিপ চালনার জন্য মিশন প্রেরণের বিষয়ে অস্ট্রেলীয় সরকারের আমন্ত্রনের মধ্য দিয়ে পাপুয়া নিউ-গিনি প্রসঙ্গে ব্যাপক ভাবে অস্ট্রেলীয় সরকারের কূটনীতিক নীতির পরিবর্তন সূচনা হয়। ১৯৬৪ সালে মিশনটির পাপুয়া নিউ-গিনি অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নামের প্রকাশিত প্রতিবেদনটির বদৌলতে এই অঞ্চলে বিশেষ একটি অর্থনৈতিক কাঠামো গঠিত হয়, যার উপর ভিত্তি করে পরবর্তী সময়ের বিভিন্ন অর্থনৈতিক নীতি প্রবর্তিত হয় এমনকি তা স্বাধীনতার পর অবধিও প্রচলিত ছিল।

স্বাধীনতা[সম্পাদনা]

১৯৭২ সালের নির্বাচনের ফলে মুখ্যমন্ত্রী মাইকেল সোমারের নেতৃত্বে একটি মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। তিনি স্বায়ত্ত-শাসিত একটি সরকার গঠন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন; এমনকি তিনি স্বাধীনতা অর্জনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ১৯৭৩ সালের ১লা ডিসেম্বর পাপুয়া নিউ-গিনি স্বায়ত্ত-শাসিত একটি রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং ১৯৭৫ সালের ১৬ই সেপ্টেম্বর স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৭৫ সালের ১০ই অক্টোবর নিরাপত্তা পরিষদের ৩৭৫-তম সঙ্কল্পগ্রহন এবং সাধারণ সভার ৩৩৬৮ সঙ্কল্পগ্রহণের মধ্য দিয়ে দেশটি জাতিসংঘের সদস্য পদ লাভ করে। ১৯৭৭ সালের জাতীয় নির্বাচনে পাঙ্গু দলের নেতৃত্বাধীন জোটের প্রধান হিসেবে মাইকেল সোমার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ১৯৮০ সালের আস্থা-অর্জন মূলক একটি বিশেষ নির্বাচনে হেরে গেলে মাইকেল সোমারের গঠিত মন্ত্রিসভার দ্বারা পরিচালিত সরকার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত স্যার জুলিয়াস চ্যানের মন্ত্রিসভা দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়। ১৯৮২ সালের নির্বাচনে পাঙ্গু দলের একাধিকত্ব বৃদ্ধি পেলে দেশটির সংসদ সোমারে-কে আবারো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত করে। ১৯৮৫ সালের নভেম্বরে মাইকেল সোমারের সরকার আরো একটি আস্থা-অর্জন মূলক নির্বাচনে হেরে গেলে সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থনে পাঁচ দলীয় জোটের প্রধান পাইয়াস উইংতি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৮৭ সালের গুপ্ত নির্বাচনে উইংতির নেতৃত্বাধীন জোট বিজয়ী হয়েছিল। ১৯৮৮ সালের জুলাই মাসের একটি আস্থা-অর্জন মূলক নির্বাচনে উইংতি -কে টপকে রাব্বি নামালিউ জয়ী হলে তার নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়, যিনি কিনা নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ পূর্বে পাঙ্গু দলের প্রধান হিসেবে মাইকেল সোমারের পদে স্থলাভিষিক্ত হন।

ভাগ্যের এমন রদবদল আর একের পর এক প্রধানমন্ত্রীদের ক্ষমতা গ্রহণের পালাক্রম পাপুয়া নিউ-গিনির জাতীয় রাজনীতির ধারাকে বৈশিষ্টমন্ডিত করে তোলে। দেশটির জাতীয় নেতৃত্বে রাজনৈতিক দলের আধিক্য, জোট সরকার এবং দলসমূহের নীতি ও কর্মকান্ডের পরিবর্তন এ সবই দেশটির রাজনৈতিক অগ্রগতি অস্থিতিশীলতা করে তোলে।

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনের অভিপ্রায়ে গঠিত বিধানসভার অধীনে নবনির্বাচিত সরকার তাদের কার্যকালের প্রথম ১৮ মাস আস্থা-অর্জনের ক্ষেত্রে দায়মুক্ত থাকে।

বুগ্যানভিল দ্বীপে নয় বছর দীর্ঘ একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহে প্রায় ২০,০০০ মানুষ প্রাণ হারান। বিদ্রোহের সূচনা হয় ১৯৮৯ সালের প্রারম্ভিক সময়ে, ১৯৯৭ সালে সাময়িক যুদ্ধ বিরতির মাধ্যমে সক্রিয় সহিংসতার অবসান হয় এবং ১৯৯৮ সালে একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ২০০১ সালের আগস্ট মাসে তৎকালীন সরকার এবং সাবেক-বিদ্রোহীদের মধ্যে একটি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। জাতিসংঘের একটি পর্যবেক্ষক দলের সহিত একটি আঞ্চলিক শান্তিরক্ষী বাহিনী সরকার এবং প্রাদেশিক নেতাদের উপর সার্বিক পর্যবেক্ষণে নিয়োজিত থাকে, যারা কিনা অন্তর্বর্তীকালীন একটি জন-প্রশাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার পাশাপাশি সকল অস্ত্রের পূর্ণাঙ্গ আত্মসমর্পণ আদায় থেকে শুরু করে প্রাদেশিক সরকারের একটি নির্বাচন ও স্বাধীনতা লাভের জন্য গণভোট আয়োজনের উদ্দেশ্যে কাজ করে যাচ্ছিলেন।

সরকার এবং বিদ্রোহীরা একটি শান্তি-চুক্তিতে মধ্যস্থতা করার মধ্য দিয়ে বুগ্যানভিলে একটি স্বায়ত্ত-শাসিত বিভাগ ও প্রদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০৫ সালে স্বায়ত্ত-শাসিত বুগ্যানভিলে যোসেফ কাবুই প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন, জিনি ২০০৮ সালের মৃত্যুবরণের আগ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে যান। তার মৃত্যুর পর ভারপ্রাপ্ত-প্রেসিডেন্ট হিসেবে সেসময়ে দায়িত্বপালনকারী সহকারী প্রেসিডেন্ট জন তাবিনামান এর নির্দেশনায় অবশিষ্ট মেয়াদের জন্য একটি নির্বাচন সংঘটিত হয়। ঐ নির্বাচনে জেমস তানিস জয়ী হলে পরবর্তীতে ২০১০ সালের নির্বাচনে বিজয়ী জন মমিসের শপথগ্রহণের আগ পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করেন। চলমান থাকা শান্তি-নিষ্পত্তির অংশ হিসেবে বুগ্যানভিলে ২০২০ সালের মাঝামাঝি সময়ের আগে কোনো এক সময় স্বাধীনতার গণভোট আয়োজন করার পরিকল্পনা করা হয় যার প্রস্তুতি ২০১৫ সালে চলমান ছিল।[১৫][১৬]

বহুসংখ্যক চীনা নাগরিক পাপুয়া নিউ-গিনিতে কাজ করার পাশাপাশি বসবাসও করেছেন, যার ফলস্বরূপ চীনা নাগরিক অধ্যুষিত কিছু সম্প্রদায় এখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তারা ইউরোপীয় অভিযানের পূর্বেই এই দ্বীপপুঞ্জে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিলেন। ২০০৯ সালের মে মাসে চীনা-বিরোধী দাঙ্গার দামামা বেঁজে উঠেছিল যেখানে হাজার হাজার মানুষ সক্রিয় ছিল। প্রাথমিক সংঘাত শুরু হয় চীনা একটি কোম্পানির নির্মাণাধীন নিকেল কারখানায় পাপুয়া নিউ-গিনির অধিবাসীদের সাথে চীনাদের মারামারির মধ্য দিয়ে। বহুসংখ্যক ছোট ব্যবসায় চীনাদের আধিপত্য এবং তাদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রন প্রসঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে অসন্তোষ দাঙ্গার সূচনা করে। চীনারা বহুকাল যাবৎ পাপুয়া নিউ-গিনিতে বণিক হিসেবে বসবাস করে আসছে।[১৭][১৮] একই বছরে পাপুয়া নিউ-গিনি বেশ-কয়েকটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয় দেশ সমূহের কাছে আসিয়ানে নিজেদের পূর্ণ সদস্য-পদ অর্জনের জন্য প্রস্তাব দাখিল করে। পশ্চিম পাপুয়ায় ইন্দোনেশিয়ার কর্তৃত্ব সমর্থন করার ফলে ইন্দোনেশিয়াও পাপুয়া নিউ-গিনির এই প্রস্তাব সমর্থন করে। তবে, খ্রিষ্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ ফিলিপাইন এবং বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ থাইল্যান্ড, ভিয়েতনামকম্বোডিয়া দেশটির এল-জি-বি-টি বিরোধী নীতি প্রসঙ্গে অসন্তোষ প্রকাশ করে বলে যে, সম-অনুকূল দেশ পূর্ব-তিমুরে আসিয়ানে সদস্যপদ লাভের উত্তম সম্ভাবনা রয়েছে।[১৯][২০]

২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারী থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত সময় পাপুয়া নিউ-গিনিতে বেশ কয়েকটি ভূমিকম্প পরপর আঘাত হানে, যার ফলে ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি সাধিত হয়। ওশেনিয়ার বিভিন্ন দেশ সহ অস্ট্রেলিয়া, ফিলিপাইন, পূর্ব-তিমুর এবং আরো কিছু দেশ পাপুয়া নিউ-গিনিতে তাৎক্ষণিক সহায়তা প্রদান করে।[২১][২২]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "Wayback Machine" (PDF)web.archive.org। ২০১৩-১১-০৩। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০৭-১৮ 
  2. Redd, Alan J.; Stoneking, Mark (১৯৯৯-০৯-০১)। "Peopling of Sahul: mtDNA Variation in Aboriginal Australian and Papua New Guinean Populations"The American Journal of Human Genetics65 (3): 808–828। doi:10.1086/302533আইএসএসএন 0002-9297 
  3. "Early humans lived in PNG highlands 50,000 years ago"Reuters (ইংরেজি ভাষায়)। ২০১০-০৯-৩০। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০৭-১৮ 
  4. John Waiko. Short History of Papua New Guinea (1993)
  5. John Dademo Waiko, Papua New Guinea: A History of Our Times (2003)
  6. "Stuart Inder"Wikipedia (ইংরেজি ভাষায়)। ২০১৯-০১-২৬। 
  7. Ernest Alfred Shepherd, 'Akmana: A new name in the continuing story of New Guinea exploration' "Pacific Islands Monthly" April 1971 pp. 41–9
  8. Ernest Alfred Shepherd, "Akmana: A new name in the continuing story of New Guinea exploration" Pacific Islands Monthly April 1971 p. 49
  9. Ernest Alfred Shepherd, "Akmana: A new name in the continuing story of New Guinea exploration" Pacific Islands Monthly April 1971 p.49
  10. "Remembering the war in New Guinea - Rabaul"ajrp.awm.gov.au। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০৭-২০ 
  11. http://www.awm.gov.au/units/event_340.asp
  12. http://www.awm.gov.au/units/event_345.asp
  13. http://www.awm.gov.au/wartime/23/new-guinea-offensive/
  14. H. N. Nelson, 'Cleland, Sir Donald Mackinnon (1901–1975)', Australian Dictionary of Biography, Volume 13, Melbourne University Press, 1993, pp 440–441.
  15. Lasslett, Kristian (২০১৫-০৫-২০)। "Australia's interest in Bougainville's independence is far from locals' wishes | Kristian Lasslett"The Guardian (ইংরেজি ভাষায়)। আইএসএসএন 0261-3077। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০৭-২০ 
  16. "Bougainville makes first preparations for referendum"RNZ (ইংরেজি ভাষায়)। ২০১৫-০৪-১৬। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০৭-২০ 
  17. http://www.theaustralian.com.au/archive/news/looters-shot-dead-amid-chaos-of-papua-new-guineas-anti-chinese-riots/story-e6frg6no-1225715006615
  18. http://www.economist.com/node/14207132
  19. http://www.gmanetwork.com/news/story/154860/news/nation/papua-new-guinea-asks-rp-support-for-asean-membership-bid
  20. https://web.archive.org/web/20160307210721/http://www.bt.com.bn/news-asia/2015/08/05/papua-new-guinea-keen-join-asean
  21. https://www.theguardian.com/world/2018/apr/05/papua-new-guinea-earthquake-un-pulls-out-aid-workers-from-violence-hit-region
  22. https://www.theguardian.com/world/2018/mar/08/papua-new-guinea-earthquake-anger-grows-among-forgotten-victims

আরও পড়ুন[সম্পাদনা]

  • Anderson, Warwick, The Collector of Lost Souls. Turning Kuru Scientists into Whitemen (2008)
  • Biskup, Peter, B. Jinks and H. Nelson. A Short History of New Guinea (1970)
  • Connell, John. Papua New Guinea: The Struggle for Development (1997) online
  • Gash, Noel. A pictorial history of New Guinea (1975)
  • Golson, Jack. 50,000 years of New Guinea history (1966)
  • Griffin, James. Papua New Guinea: A political history (1979)
  • Knauft, Bruce M. South Coast New Guinea Cultures: History, Comparison, Dialectic (1993) excerpt and text search
  • McCosker, Anne. Masked Eden: A History of the Australians in New Guinea (1998)
  • Waiko. John. Short History of Papua New Guinea (1993)
  • Waiko, John Dademo. Papua New Guinea: A History of Our Times (2003)
  • Zimmer-Tamakoshi, Laura, ed. Modern Papua New Guinea (1998) online

প্রাথমিক সূত্র[সম্পাদনা]

  • Jinks, Brian, ed. Readings in New Guinea history (1973)
  • Malinowski, Bronislaw. Argonauts of the Western Pacific: An Account of Native Enterprise and Adventure in the Archipelagoes of Melanesian New Guinea (2002) famous anthropological account of the Trobriand Islanders; based on field work in 1910s online
  • Visser, Leontine, ed. Governing New Guinea: An Oral History of Papuan Administrators, 1950-1990 (2012)
  • Whitaker, J.L. et al. eds. Documents and readings in New Guinea history: Pre-history to 1889 (1975)

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]