পাক্কা বাড়ি

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

পাক্কা বাড়ি হলো বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত প্রাচীন পুরাকীর্তি।[১] ৬ কক্ষের দ্বিতল এই বাড়িটি কয়েক শত বছর আগে নির্মিত বলে মনে করা হয়। উপজেলা সদর থেকে প্রায় তিন কিমি দূরে চর এককরিয়া ইউনিয়নের পূর্ব ইয়ারব্যাগ গ্রামে ঘন জঙ্গলের ভিতর অবস্থিত পাকা দালানটি বা লোক মুখে প্রচলিত পাক্কা বাড়ি হিসেবে, যা মেহেন্দিগঞ্জ-হিজলা-মুলাদী-ভোলা অঞ্চলের অন্যতম পুরনো নিদর্শন।[২]

অবকাঠামো[সম্পাদনা]

পাক্কা বাড়ি দোতলা, এতে ৬টি কক্ষ রয়েছে। একে ঘিরে চারপাশে রয়েছে প্রাচীর, সামনে বড়ো দিঘি, দোতলায় ওঠার সিঁড়ির নিচে কূপ, সিঁড়ি কোঠা লাগোয়া দেয়ালে ৬ ইঞ্চি ব্যাসার্ধ গোলাকার ফুকা (যা দিয়ে হয়ত আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার হোত) ভিতরে প্রবেশ গেট, সামনে পুকুর থাকা সত্ত্বেও দোতলায় চৌবাচ্চা, স্থানীয়রা যাকে বলে ‘জল পুকুর’ ইত্যাদি দেখে এটি একটি দুর্গ বলে মনে হয়।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

ঘন বাগানের ভিতর অবস্থিত অন্ধকারাচ্ছন্ন এই ভবনটাকে স্থানীয়রা অন্ধকার কূপ এবং অন্ধকার কূটও বলে থাকে। পুরনো ভবনটার ভিতরে পুরোপুরিই অন্ধকার। এই পাক্কা বাড়িটা সম্পর্কে স্থানীয়দের ভিতর প্রচলিত আছে নানান রকম মুখরোচক গল্প। গল্পগুলো এরকম যে, এক সময় এখানে সাপ মানুষ হতে পারতো। তখন এক সাপের রাজা মানুষের রূপ ধারণ করে এই প্রাসাদটি নির্মাণ করে। যে কারণে সিঁড়ির গোড়ায় বড়ো বড়ো গর্ত। পরে এক সময় সাপেরা ওই গর্তের মধ্যে চলে যায়। তবে বর্তমানে গর্তটার মুখে মাটি দিয়ে ভরাট করে রাখা আছে। তাদের ধারণা গর্তের মধ্যে কেউ পড়ে গেলে কিছু দিন পর রক্ত ও বিষ মাখা মৃতদেহ পাশের দিঘিতে (এই বাড়িরই অংশবিশেষ) ভেসে উঠতো। আবার কেউ কেউ মনে করেন এই প্রাসাদটি মাটির নিচ থেকে অলৌকিকভাবে উঠেছে যে কারণে বাড়িটার বর্তমান অধিবাসীরাও ভাগবাটোয়ারার সময় প্রাসাদটাকে আলাদাভাবে যৌথ সম্পত্তি হিসেবে রাখে। তবে বাড়িটার চারপাশের প্রাচীর ভেঙে দেয় তারা। এই প্রাসাদ নিয়ে স্থানীয়দের ভিতর প্রচলিত আছে আরো অনেক গল্প। এই অঞ্চলটি এককালে সম্রাট আকবরের প্রথম দিককার সেনাপতি শাহবাজ খানের সুবেদার আমলে (আনুমানিক ১৫৮৩-৮৫) শাহবাজপুর নামকরণ করা হয়। প্রথম দিকে এই দ্বীপটি ছিল পর্তুগিজ, মগ ও আরাকান জলদস্যুদের অভয়ারণ‍্য। মেহেন্দিগঞ্জ-হিজলা-মুলাদী-বাবুগঞ্জ-বাকেরগঞ্জ-ভোলা-মনপুরা-হাতিয়া-সন্দ্বীপ প্রভৃতি স্থানে লুন্ঠন, নারী নির্যাতন, দাস বিক্রয়সহ নির্মম অত্যাচার চালাতেন এই অঞ্চলের সাধারণ জনগণের ওপর। তাছাড়া পর্তুগিজরা ছিল ক্যাথিলিক খ্রিস্টান। এই অঞ্চলের মানুষের ভিতর তখন অধিকাংশই ছিল হিন্দু ধর্মাবলম্বী এবং বাকিরা ছিল মুসলমান। পর্তুগিজ জলদস্যুরা তাদের ধর্মীয় অনুভূতির ওপরও নানানভাবে আঘাত হানে। অতঃপর সম্রাট আকবরের সেনাপতি শাহবাজ খান পর্তুগিজ ও মগ আরাকান জলদস্যুদের কবল থেকে সাধারণ বিরাট সেনাবাহিনী ও স্থানীয় যুবকদের নিয়ে পর্তুগিজ-মগ ও আরাকান জলদস্যুদের ওপর আক্রমণ করে এবং তাদেরকে উত্তর শাহবাজপুর (বর্তমান ভোলা জেলা) থেকে বিতাড়িত করেন। ১৫৮৫ সালে তিনি চলে যান। পরে শাহবাজ খানের স্মৃতি বিজড়িত স্থান হিসেবে মেঘনা-তেঁতুলিয়া-ইলিশা-মাছকাটা কালবদরের মাঝখানের নদী কন্যা দ্বীপটির নাম শাহবাজপুর নামে পরিচয়। পরে ইলিশা নদীর উত্তর অংশ (মেহেন্দিগঞ্জ-হিজলা-মুলাদী) নিয়ে গঠিত হয় উত্তর শাহবাজপুর। শাহবাজ খান চলে যাওয়ার বেশ কিছুকাল পর আবার শুরু হয় আরাকান ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের অত্যাচার এবং সম্রাট আওরঙ্গজেবের সময়ে মুঘল সেনাপতি আগা মেহেদীকে পাঠান শাহবাজপুর। আগা মেহেদী ও তার বাহিনী উত্তর শাহবাজপুর (বর্তমান মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা, ভোলা জেলার রামদাশপুর ইউনিয়নের যে কোনো স্থানে) আস্তানা করেন এবং স্থানীয়দের সহযোগিতায় পর্তুগিজ ও আরাকানদের এই অঞ্চল থেকে বিতাড়িত করেন। পরে আগা মেহেদী নামে উত্তর শাহবাজপুরের একাংশের নাম করা হয় মেহেদীগঞ্জ যার বিবর্তিতরূপ মেহেন্দিগঞ্জ। আগা মেহেদী চলে যাওয়ার কিছুকাল পর আবার শুরু হয় পর্তুগিজ এবং আরাকনদের উৎপাত — এবার তিনি ফিরে এসে এ অঞ্চল থেকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করেন। পরে তিনি সুবেদার হিসেবে এই এলাকায় থেকে যান এবং সংগ্রাম কেল্লা থেকে একটু দূরে সরে উলানিয়া নামক স্থানে তার উত্তরসূরিরা স্থানীয়ভাবে বাসস্থান নির্মাণ করেন ও বসবাস শুরু করেন। যা এখন উলানিয়া জমিদার বাড়ি নামে পরিচিত। সেনাপতি শাহবাজ খানের ঘাঁটি মনপুরা এবং আঘা মেহেদী স্থায়ী ঘাঁটি নির্মাণ করেছেন বলে জানা যায়নি। পরবর্তী মুঘল সুবেদার শেখ মোহাম্মদ হানিফের সংগ্রাম কেল্লা রামদাসপুরে ও বাসস্থান উলানিয়াতে শনাক্ত করা যায়। যেহেতু এই অঞ্চলটা পুর্তগীজ জলদস্যুদের অবস্থান ছিল। বিশেষ করে শাহবাজ খাঁর পর আগা মেহেদী এবং তারপর শেখ মোহাম্মদ হানিফ যেহেতু উত্তর শাহবাজপুর (বর্তমান মেহেন্দিগঞ্জ) অবস্থান নেয় তাতে অনুমান করা যায় পর্তুগিজ এবং আরাকানদের মূল আস্তানা এই অঞ্চলে ছিল। এই পাকা বাড়িটা পুরোপুরি জনপদ থেকে বিচ্ছিন্ন এবং এর আশেপাশে এমন কোনো মন্দিরও নেই যাকে কোনো হিন্দু রাজবাড়ি বলা যায়। উনিশ শতকের আগে সাধারণত হিন্দু রাজবাড়িতে অথবা মুসলমান রাজবাড়ির কাছাকাছিতে মন্দির অথবা মসজিদের স্মৃতির অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এ বাড়িটিতে এর কোনোটির সন্ধান মেলেনি। তাছাড়া মেহেন্দিগঞ্জের সবচেয়ে পুরাতন এবং সবচেয়ে বেশি সুপারির বাগান এই বাড়িটার চারপাশে এবং ওই এলাকাতে রয়েছে আনারস গাছের ঘন ঝোপঝাড়। এতে অনুমান করা হয় বাড়িটা পর্তুগিজদেরই ছিল এবং এটাই ছিল পর্তুগিজ জলদস্যুদের মূল আস্তানা। এই পুরাকীর্তিটি (পাক্কা বাড়ি) ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনুধাবন করে পুরাতত্ত্ব বিভাগ এর দায়িত্ব নেয়।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. কন্ঠস্বর, বাংলার (২০২১-০৬-২৭)। "ধ্বংসের পথে মেহেন্দিগঞ্জের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সাক্ষী 'পাক্কা বাড়ি'"বাংলার কন্ঠস্বর । BanglarKonthosor.Com (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৬-২৯ 
  2. "ধ্বংসের পথে বরিশালের ঐতিহ্যবাহী 'পাক্কা বাড়ি'"দৈনিক জনকন্ঠ (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ জুন ২৭, ২০২১