পাক্কা বাড়ি

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
Jump to navigation Jump to search

পাক্কা বাড়ি হলো বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত প্রাচীন পুরাকীর্তি। ৬ কক্ষের দ্বিতল এই বাড়িটি কয়েক শত বছর আগে নির্মিত বলে মনে করা হয়। উপজেলা সদর থেকে প্রায় তিন কি.মি. দূরে চর এককরিয়া ইউনিয়নের পূর্ব ইয়ারব্যাগ গ্রামে ঘন জঙ্গলের ভেতর অবস্থিত পাকা দালানটি বা লোক মুখে প্রচলিত পাক্কা বাড়ি হিসেবে, যা মেহেন্দিগঞ্জ-হিজলা-মুলাদী-ভোলা অঞ্চলের অন্যতম পুরনো নিদর্শন।

অবকাঠামো[সম্পাদনা]

পাক্কা বাড়ি দোতলা, এতে ৬টি কক্ষ রয়েছে। একে ঘিরে চারপাশে রয়েছে প্রাচীর, সামনে বড় দীঘি, দোতলায় ওঠার সিঁড়ির নিচে কূপ, সিঁড়ি কোঠা লাগোয়া দেয়ালে ৬ ইঞ্চি ব্যাসার্ধ গোলাকার ফুকা (যা দিয়ে হয়ত আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার হত) ভিতরে প্রবেশ গেট, সামনে পুকুর থাকা সত্ত্বেও দোতলায় চৌবাচ্চা, স্থানীয়রা যাকে বলে ‘জল পুকুর’ ইত্যাদি দেখে এটি একটি দুর্গ বলে মনে হয়।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

ঘন বাগানের ভেতর অবস্থিত অন্ধকারাচ্ছন্ন এই ভবনটাকে স্থানীয়রা অন্ধকার কুপ এবং অন্দকার কুটও বলে থাকে। পুরনো ভবনটার ভেতরে পুরোপুরিই অন্ধকার। এই পাক্কা বাড়িটা সম্পর্কে স্থানীয়দের ভেতর প্রচলিত আছে নানান রকম মুখরোচক গল্প। গল্পগুলো এরকম যে, এক সময় এখানে সাপ মানুষ হতে পারতো। তখন এক সাপের রাজা মানুষের রূপ ধারণ করে এই প্রাসাদটি নির্মাণ করে। যে কারণে সিঁড়ির গোড়ায় বড় বড় গর্ত। পরে এক সময় সাপেরা ঐ গর্তের মধ্যে চলে যায়। তবে বর্তমানে গর্তটার মুখে মাটি দিয়ে ভরাট করে রাখা আছে। তাদের ধারণা গর্তের মধ্যে কেউ পড়ে গেলে কিছু দিন পর রক্ত ও বিষ মাখা মৃতদেহ পাশের দীঘিতে (এই বাড়িরই অংশ বিশেষ) ভেসে উঠতো। আবার কেউ কেউ মনে করেন এই প্রাসাদটি মাটির নিচ থেকে অলৌকিকভাবে উঠেছে যে কারণে বাড়িটার বর্তমান অধিবাসীরাও ভাগবাটারার সময় প্রাসাদটাকে আলাদাভাবে যৌথ সম্পত্তি হিসেবে রাখে। তবে বাড়িটার চারপাশের প্রাচীর ভেঙ্গে দেয় তারা। এই প্রাসাদ নিয়ে স্থানীয়দের ভেতর প্রচলিত আছে আরো অনেক গল্প। এই অঞ্চলটি এককালে সম্রাট আকবরের প্রথম দিককার সেনাপতি শাহবাজ খানের সুবেদার আমলে (আনুমানিক ১৫৮৩-৮৫) শাহবাজপুর নামকরণ করা হয়। প্রথম দিকে এই দ্বীপটি ছিল পুর্তগীজ, মগ ও আরাকান জলদস্যুদের অভয় অরণ্য। মেহেন্দিগঞ্জ-হিজলা-মুলাদী-বাবুগঞ্জ-বাকেরগঞ্জ-ভোলা-মনপুরা-হাতিয়া-সন্দ্বীপ প্রভৃতি স্থানে লুন্ঠন, নারী নির্যাতন, দাস বিক্রয়সহ নির্মম অত্যাচার চালাতেন এই অঞ্চলের সাধারণ জনগণের উপর। তাছাড়া পুর্তগীজরা ছিল ক্যাথিলিক খ্রিস্টান। এই অঞ্চলের মানুষের ভেতর তখন অধিকাংশই ছিল হিন্দু ধর্মাবলম্বী এবং বাকিরা ছিল মুসলমান। পুর্তগীজ জলদস্যুরা তাদের ধর্মীয় অনুভূতির উপরও নানানভাবে আঘাত হানে। অতঃপর সম্রাট আকবরের সেনাপতি শাহবাজ খান পুর্তগীজ ও মগ আরাকান জলদস্যুদের কবল থেকে সাধারণ বিরাট সেনাবাহিনী ও স্থানীয় যুবকদের নিয়ে পুর্তগীজ-মগ ও আরাকান জলদস্যুদের উপর আক্রমণ করে এবং তাদেরকে উত্তর শাহবাজপুর (বর্তমান ভোলা জেলা) থেকে বিতাড়িত করেন। ১৫৮৫ সালে তিনি চলে যান। পরে শাহবাজ খানের স্মৃতি বিজড়িত স্থান হিসাবে মেঘনা-তেঁতুলিয়া-ইলিশা-মাছকাটা কালবদরের মাঝ খানের নদী কন্যা দ্বীপটির নাম শাহবাজপুর নামে পরিচয়। পরে ইলিশা নদীর উত্তর অংশ (মেহেন্দিগঞ্জ-হিজলা-মুলাদী) নিয়ে গঠিত হয় উত্তর শাহবাজপুর। শাহবাজ খান চলে যাওয়ার বেশ কিছু কাল পর আবার শুরু হয় আরাকান ও পুর্তগীজ জলদস্যুদের অত্যাচার এবং সম্রাট আওরঙ্গজেবের সময়ে মুঘল সেনাপতি আগা মেহেদীকে পাঠান শাহবাজপুর। আগা মেহেদী ও তার বাহিনী উত্তর শাহবাজপুর (বর্তমান মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা, ভোল জেলার রামদাশপুর ইউনিয়নের যে কোন স্থানে) আস্তানা করেন এবং স্থানীয়দের সহযোগিতায় পুর্তগীজ ও আরাকানদের এই অঞ্চল থেকে বিতাড়িত করেন। পরে আঘা মেহেদী নামে উত্তর শাহবাজপুরের একাংশের নাম করা হয় মেহেদীগঞ্জ যার বিবর্তিতরূপ মেহেন্দিগঞ্জ। আগা মেহেদী চলে যাওয়ার কিছুকাল পর আবার শুরু হয় পুর্তগীজ এবং আরাকনদের উৎপাত— এবার তিনি ফিরে এসে এ অঞ্চল থেকে পুরোপুরি নিশ্চহ্ন করেন। পরে তিনি সুবেদার হিসেবে এই এলাকায় থেকে যান এবং সংগ্রাম কেল্লা থেকে একটু দূরে সরে উলানিয়া নামক স্থানে তার উত্তরসুরীরা স্থানীয়ভাবে বাসস্থান নির্মাণ করেন ও বসবাস শুরু করেন। যা এখন উলানিয়া জমিদার বাড়ি নামে পরিচিত। সেনাপতি শাহবাজ খাঁর ঘাটি মনপুরা এবং আঘা মেহেদী স্থায়ী ঘাটি নির্মাণ করেছেন বলে জানা যায় নি। পরবর্তী মুঘল সুবেদার শেখ মোহাম্মদ হানিফের সংগ্রাম কেল্লা রামদাসপুরে ও বাসস্থান উলানিয়াতে সনাক্ত করা যায়। যেহেতু এই অঞ্চলটা পুর্তগীজ জলদস্যুদের অবস্থান ছিল। বিশেষ করে শাহবাজ খাঁর পর আগা মেহেদী এবং তারপর শেখ মোহাম্মদ হানিফ যেহেতু উত্তর শাহবাজ পুর (বর্তমান মেহেন্দিগঞ্জ) অবস্থান নেয় তাতে অনুমান করা যায় পুর্তগীজ এবং আরাকানদের মূল আস্তানা এই অঞ্চলে ছিল। এই পাকা বাড়িটা পুরোপুরি জনপদ থেকে বিচ্ছিন্ন এবং এর আশে পাশে এমন কোন মন্দিরও নেই যাকে কোন হিন্দু রাজা বাড়ি বলা যায়। উনিশ শতকের আগে সাধারণত হিন্দু রাজ বাড়িতে অথবা মুসলমান রাজ বাড়ির কাছাকছিতে মন্দির অথবা মসজিদের স্মৃতির অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এ বাড়িটিতে এর কোনটির সন্ধান মেলে নি। তাছাড়া মেহেন্দিগঞ্জের সবচেয়ে পুরাতন এবং সবচেয়ে বেশি সুপারির বাগান এই বাড়িটার চারপাশে এবং ঐ এলাকাতে রয়েছে আনারস গাছের ঘন ঝোপঝাড়। এতে অনুমান করা হয় বাড়িটা পুর্তগীজদেরই ছিল এবং এটাই ছিল পুর্তগীজ জলদস্যুদের মূল আস্তানা। এই পুরাকীর্তিটি (পাক্কাবাড়ি) ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনুধাবন করে পুরাতত্ব বিভাগ এর দায়িত্ব নেয়।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

সাহিত্য পত্র "সকাল "

নজমুল হোসেন আকাশ আতিকুর রহমান হিমু