নাৎসি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

১৯৩৩ থেকে ১৯৪৫-এ নাৎসি জার্মানিতে সহস্রাধিক কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প পরিচালনা করা হতো। জার্মানির মূল ভূখণ্ড এবং জার্মান অধিকৃত অন্যান্য ইউরোপীয় অঞ্চলে এই কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পগুলো অবস্থিত ছিল।

১৯৩৩ সালে অ্যাডলফ হিটলার জার্মান চ্যান্সেলর নির্বাচিত হবার পর প্রথম কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পগুলো প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৩৪ সালে "দীর্ঘ ছুরির রাত্রি"(হিটলারের নির্দেশে সংঘটিত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড) সংঘটনের পর শ্যুৎসস্টাফেলন (এসএস) বাহিনীর তত্ত্বাবধানে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পগুলো প্রতিষ্ঠা করা হয়। শুরুতে অধিকাংশ সদস্যই ছিল জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য। পরবর্তীতে "স্বভাবগত অপরাধী", "সমাজবিরোধী" এবং "ইহুদি"দের এ ক্যাম্পে বন্দি করা হতে থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে বন্দির সংখ্যা ব্যাপকভাবে বাড়তে থাকে। ২য় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তি বিজয়ী হলে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের বন্দিদের মুক্ত করা হয়। তবে ইতোমধ্যে লাখ লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করেছিল।

এক হাজারেরও বেশি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল এবং ১.৬৫ মিলিয়ন মানুষ সেখানে বন্দি হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছিল।

পটভূমি[সম্পাদনা]

ধারণা করা হয়, দ্বিতীয় বোর যুদ্ধের সময় ব্রিটিশরা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের উদ্ভব ঘটায়। তবে ঐতিহাসিক ড্যান স্টোন এর মতে, ফিলিপাইন ও কিউবায়ও কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের প্রচলন ছিল। ড্যানের মতে, এটি উপনিবেশবাদী চিন্তাধারার একটি যুক্তিসংগত বিস্তার।[১] তবে দক্ষিণ আফ্রিকায় ব্রিটিশ পরিচালিত কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে নাৎসিদের ক্যাম্পের মত পদ্ধতিগত গণহত্যার প্রচলন ছিল না। নাৎসি ক্যাম্পে মৃত্যুহার ছিল ৪৫%, যা ব্রিটিশ ক্যাম্পে মৃত্যুহারের দ্বিগুণ। [১]

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অনেক সৈন্যকেই যুদ্ধবন্দি করে রাখা হয়। যে সকল স্থানে তাদের বন্দি রাখা হয়, সেই স্থানগুলোর অনেকগুলোতেই নাৎসি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প প্রতিষ্ঠা করা হয়। জার্মানিতে অনেক বন্দিকেই প্রয়োজনীয় আহার্য থেকে বঞ্চিত করে বিপজ্জনক পরিবেশে রাখা হয়, যা ১৯০৭ সালের হেগ সম্মেলন চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন ছিল। আর্মেনীয় গণহত্যার সময় আর্মেনীয়দের সিরিয়ার মরুভূমিতে নির্বাসিত করার আগে দুর্বিষহ পরিবেশে আটকে রাখা এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে অনেক পূর্ব ইউরোপীয় ইহুদি জার্মানিতে ফিরলে তাদের "অবাঞ্ছিত বিদেশি" হিসাবে আখ্যায়িত করে আটকে রাখা হয়। জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স। ও বেলজিয়ামে অনেক সন্দেহভাজন নাগরিকদের নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে বাধ্যতামূলক শ্রমে নিয়োজিত করা হয়। [১]

ইতিহাস[সম্পাদনা]

১৯২৯ সালের মহামন্দার ফলে জার্মানিতে ভাইমার প্রজাতন্ত্র অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। ১৯৩০ সালে নির্বাচিত সরকারের পতন ঘটে। পল ভন হিন্ডেনবুর্গ ভাইমার সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী একের পর এক চ্যান্সেলর নিয়োগ দিতে থাকেন। পূর্বসূরি ফ্রানজ ভন পাপেনের সাথে সমঝোতা করে হিটলার ক্ষমতায় আসীন হতে সক্ষম হন।[২]

মূলত নাৎসিবিরোধীদের অবদমনের লক্ষ্যেই কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের উৎপত্তি। ১৯৩৩ সালের রাইখস্ট্যাগ অগ্নিকাণ্ডকে অজুহাত বানিয়ে হাজার হাজার মানুষকে নাৎসি সরকার গ্রেফতার করে। "রাইখস্ট্যাগে অগ্নিকাণ্ড সম্পর্কিত অধ্যাদেশ" জারি করে সকল প্রকার ব্যক্তিস্বাধীনতা বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। ৩ মার্চ থুরিঙ্গিয়া রাজ্যের নোহরায় একটি বিদ্যালয়ে সর্বপ্রথম কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প প্রতিষ্ঠা করা হয়। [২] ৫ই মার্চের নির্বাচনের পরে আটকের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে থাকে। স্থানীয় পুলিশ, শ্যুৎস্টাফেলন প্রভৃতি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পগুলো পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে।

"সুরক্ষা দেবার জন্য নিরাপদ হেফাজতে নেওয়া",কিংবা "রাষ্ট্রদ্রোহী আচরণ প্রতিহতকরণ"- এ সকল ভিত্তিতে মানুষদের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে ধরে নিয়ে যাওয়া হতো। খবরের কাগজগুলো এ সময় বিশাল প্রতিবেদন রচনা করত এবং ঐ প্রতিবেদনে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের বন্দিদের তীব্র ভর্ৎসনা করত।[৩] আশি শতাংশ বন্দি ছিল কমিউনিস্ট ও দশ শতাংশ বন্দি সোশ্যাল ডেমোক্রেট পার্টির সদস্য ছিল। মার্টিন শুমাখারের মতে, ভাইমার যুগের ২৪১ জন সাংসদকে বন্দি করে রাখা হয়। [২] ১৯৩৩ সালে "খ্রিস্টীয় দায়মুক্তি" নামক বহুল প্রচারিত একটি সাধারণ ক্ষমার মাধ্যমে অনেকেই মুক্তি পান।[৪]

১৯৩৪-১৯৩৭[সম্পাদনা]

১৯৩৩ সালের ২৬শে জুন হেনরিক হিমলার থিওডোর আইকে-কে দাচাউ কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের দ্বিতীয় সেনাধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দেন। ক্যাম্পটি অন্যান্য ক্যাম্পের জন্য রোল মডেল হয়ে উঠে। অবাধ্য কয়েদিদের জন্য চাবুকাঘাতসহ অনেক কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা রেখে তিনি একটি পেনাল কোড প্রণয়ন করেন। [২] ১৯৩৪ সালে লাইখটেনবুর্গ ক্যাম্পের নিয়ন্ত্রণ হিমলারের নির্দেশে শ্যুৎস্টাফেলন থেকে প্রুশীয় প্রশাসনের হাতে চলে যায়। ১৯৩৪ এর ডিসেম্বরে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প পরিদর্শন দপ্তর (আইকেএল) প্রতিষ্ঠা করা হয়, যার প্রথম প্রধান ছিলেন থিওডোর আইকে। এর অধীনে সকল ক্যাম্পের ভার ন্যস্ত করা হয়।

১৯৩৩ সালের খ্রিষ্টীয় দায়মুক্তি হিমলারকে ক্রুদ্ধ করে। তিনি একে নাৎসি সরকারের সবচেয়ে বড় ভুল হিসাবে বর্ণনা করেন। তিনি কমিউনিস্ট, সামাজিক গণতন্ত্রী, ফ্রিম্যাসন, ইহুদি - এ শ্রেণির মানুষকে অধঃপতিত বলে গণ্য করতেন। হিটলার হিমলারের চিন্তাধারার সঙ্গে সহমত হয়ে ১৯৩৬ সালে তাকে পুলিশপ্রধান নিযুক্ত করেন।[৪]

১৯৩৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ছয়টি এসএস ক্যাম্পের মধ্যে শুধূ্ দুইটিই ১৯৩৮ সালে সক্রিয় ছিল। পুরনো ক্যাম্পগুলোর জায়গায় আইকে নতুন ক্যাম্প প্রতিষ্ঠা করেন। ক্যাম্পগুলোতে বন্দিদের কনসেন্ট্রেশন ইউনিফর্ম ও ব্যাজ পরিধান করতে হতো। এগুলো তারকাঁটা,গার্ড টাওয়ার ও ব্যারাকবেষ্টিত ছিল। বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত তরুণদের এর নিরাপত্তারক্ষী হিসাবে নিযুক্ত করা হত।

১৯৩৭-১৯৩৯[সম্পাদনা]

তথাকথিত "স্বভাবগত অপরাধী" এবং "সমাজবিরোধী"দের গ্রেফতার করার ফলে ১৯৩৮ সাল নাগাদ বন্দির সংখ্যা তিন গুণ বেড়ে ২৪০০০-এ দাঁড়ায়। এদের মধ্যে অধিকাংশ বন্দিই ছিল ছিঁচকে চোর বা ছোটখাটো অপরাধী।[৪] ১৯৩৮ সালের জুনে ১০,০০০ বেকার, মানসিক প্রতিবন্ধী এবং গৃহহীনকে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে আটকে রাখা হয়।

নতুন বন্দিদের আবাসনের জন্য ফ্লোসেনবুর্গ, মাউথাউসেন এবং র‍্যাভেনসবুর্গ এলাকায় তিনটি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়, এদের মধ্যে র‍্যাভেন্সবুর্গ প্রথম নারী কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প। মহামন্দা নিরসনের ফলে বেকারত্বের হার অনেকটাই কমে যায়। তাই কর্মে অনিচ্ছুক ব্যক্তিদের গ্রেফতার করে কর্মরতদের দিয়ে কঠোর পরিশ্রম করানো হত। কুখ্যাত নাৎসিবাদী স্থপতি আলবার্ট স্পির সর্বত্র নাৎসি সৌধ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। এজন্য ক্যাম্পের বন্দিদের শ্রমিক হিসেবে ব্যবহার করা হতো।[৪]

১৯৩৮ সালে চেকোস্লোভাকিয়া এবং অস্ট্রিয়া দখল করার পর চেক এবং অস্ট্রিয়ানদের গণহারে গ্রেফতার করে ক্যাম্পে পাঠানো হয়। ইহুদীদের অন্তরীণ হওয়ার হার ক্রমেই বৃদ্ধি পায়। ক্রিস্টালনাখট গণহত্যার পরে হাজার হাজার ইহুদিকে গ্রেফতার করে ক্যাম্পে পাঠানো হয়। নির্যাতন,খুন, লুণ্ঠনের শিকার হয়ে অনেকেই মৃত্যুবরণ করে।এসময় অবশ্য ইহুদি হত্যা নয়, বরং তাদের বিদেশ গমনে বাধ্য করাই ছিল ইহুদি নির্যাতনের মুখ্য উদ্দেশ্য।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ[সম্পাদনা]

১৯৩৯ সালে বন্দিদের পোলিশ ইউনিফর্মে সজ্জিত করে পোল্যান্ড সীমান্তে পাঠিয়ে গণহারে হত্যা করে জার্মানি মিথ্যা নাটক মঞ্চস্থ করে, যাতে সে পোল্যান্ড আক্রমণ করতে পারে।

১৯৪১ সালে পাঁচটি নতুন ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। ঐ বছর এসএস বাহিনীর হাইকমান্ডের নির্দেশ মোতাবেক অসুস্থ এবং কাজ করতে অক্ষম, এমন বন্দিদের 'অপারেশন ১৪এফ১৩' এর মাধ্যমে হত্যা করা হয়। সোভিয়েত যুদ্ধবন্দিদের 'অপারেশন ১৪এফ১৪" এর মাধ্যমে নির্বিচারে খুন করে জার্মান বাহিনীর সদস্যরা। ১৯৪২ এর ভেতরে আউশভিটজ ক্যাম্পে বিষাক্ত জিকলন-বি গ্যাস প্রয়োগের ফলে ৪২,০০০ সোভিয়েত মৃত্যুবরণ করেন।[৪]

পরিসংখ্যান[সম্পাদনা]

ওয়াখসম্যানের মতে,২৭টি প্রধান ক্যাম্প এবং ১১০০টি স্যাটেলাইট ক্যাম্পে বন্দিদের আটকে রাখা হয়েছিল।

ইতিহাসবিদ অ্যাডাম টুজের হিসাব অনুযায়ী,১.৬৩ মিলিয়ন নিবন্ধিত বন্দির মধ্যে ১.১ মিলিয়ন কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে মারা যায়। আউশভিটজ গ্যাস প্রকোষ্ঠে আরো ১ মিলিয়ন বন্দিকে বিষাক্ত গ্যাস প্রয়োগে হত্যা করা হয়। এই ক্যাম্পগুলোতে সর্বমোট ২ থেকে ২.৮ মিলিয়ন মানুষ প্রাণ হারান।[৫]

মুক্তি[সম্পাদনা]

১৯৪৪-১৯৪৫ সালের ভেতরে মিত্রশক্তি নাৎসি সাম্রাজ্যের অনেক কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প বন্ধ করে দেয়।

১৯৪৪ সালে সোভিয়েতরা সর্বপ্রথম মাজদানেক কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প আবিষ্কার করে। এছাড়াও আরো অনেক ক্যাম্প তারা আবিষ্কার ও মুক্ত করে। তবে এগুলোর অধিকাংশ বন্দিকে জার্মানরা আগেই সরিয়ে ফেলে।

অনেক বন্দিই জার্মান উৎপীড়ন এবং অপুষ্টির কারণে মুক্তি পাওয়ার বছরখানেকের মধ্যেই মৃত্যুবরণ করে।[৬]

পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ[সম্পাদনা]

পশ্চিম জার্মান সরকারের "উইদারগুতমাচুং" নীতির আলোকে অনেক বন্দিকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়, অন্যদিকে অনেক অপরাধীকে শাস্তির সম্মুখীন করা হয়। [৭]

কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের অনেক বন্দিই তাঁদের অভিজ্ঞতা বই আকারে প্রকাশ করেন। এদের মধ্যে ১৯৪৭ সালে প্রিমো লেভি তাঁর অভিজ্ঞতা "ইফ দিস ওয়াজ এ ম্যান" গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করে সাড়া জাগাতে সক্ষম হন।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Stone, Dan। Concentration camps: a very short discussion 
  2. White, E Roberts। Introduction to the early camps 
  3. Fings, Carola। The public face of the camps 
  4. Weichsmann, Nikolaus। A History of the Nazi Concentration Camps 
  5. Orth, Karin। The Concentration Camp Personnel 
  6. Blatman, Daniel। The Death marches: final phase of the Nazi Genocide 
  7. Marcuse, Harold। The Afterlife of the camps