নাজিম হিকমত

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
Jump to navigation Jump to search
নাজিম হিকমত
জন্ম ১৫ জানুয়ারি, ১৯০২
তুরস্ক
মৃত্যু ৩ জুন, ১৯৬৩ (৬১ বছর)
সোভিয়েত ইউনিয়ন
পেশা কবিনাট্যকার
জাতীয়তা তুর্কি
উল্লেখযোগ্য পুরস্কার নোবেল শান্তি পুরস্কার

একজন কবি জেলে যেতে পারেন? অবশ্যই পারেন। কিন্তু কেমন হয় যদি তাঁর জীবনের বেশিরভাগটাই কাটে জেলখানার পাঁচিলের ভেতর অত্যাচারে? কেমন হয় যদি তাঁর জেলে যাওয়া কোন ফৌজদারি বা দেওয়ানি অপরাধের জন্য নয়, বরং মানুষের কথা, অধিকারের কথা, সাম্যের কথা বলার অপরাধে(!) তাঁকে বার বার অবরুদ্ধ করে রাখে, তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামে একটি সমগ্র রাষ্ট্রযন্ত্র? তিনি কী দমে যাবেন? হারিয়ে ফেলবেন তাঁর কলম, লিখবেন না আর কবিতা? নাকি শত অত্যাচারেও বার ববার জেগে উঠবেন ফিনিক্স পাখির মতো। নির্ভীক উচ্চারণে বলে উঠবেন, "নাজিমের নীল চোখে ওরা বৃথাই খুঁজে ফিরবে ভয়।" নাজিম হিকমাত। মানুষকে যিনি ভাবতেন পাখির মত সরল।

পাবলো নেরুদা বলেছিলেন,

"সদ্য মুক্তি পাওয়া

বন্দীদের একজন নাজিম হিকমত

তার কবিতার মতো

লাল রং সোনার সুতায়

বোনা জামা উপহার দিয়েছে আমায়। "

নাজিমের কথা বলতে গেলেই অবধারিত ভাবে যে নামটি আসে তা হলো মুস্তফা কামাল পাশা। প্রথমে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সঙ্গী পরবর্তীতে প্রধানতম শ্রেণিশত্রুতে পরিণত হওয়া এই অত্যাচারী নায়ক মূলত প্রতিনিধিত্ব করছিলেন তার নিজের শ্রেণিরই। নাজিম তাই কলম ধরেছিলেন এই শ্রেণি বিভক্ত সমাজের বিরুদ্ধে।তুরস্কের স্বাধীনতা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ার পর, একটা সময়ে, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব পরবর্তী সোভিয়েত ইউনিয়ন স্বচক্ষে দেখবার ইচ্ছায় তিনি জর্জিয়ায় গিয়েছিলেন, সেখান থেকে মস্কো। সেখানকার কম্যুনিস্ট ইউনিভার্সিটিতে পড়ালেখা করার সময় তিনি পরিচিত হন মার্ক্স লেনিন তথা সর্বহারার মহান মতবাদের সঙ্গে। উনিশশো চব্বিশে তুরস্ক স্বাধীন হবার তিনি দেশে ফিরে আসেন দু'চোখ ভর্তি স্বপ্ন নিয়ে। শোষণ, নিপীড়ন, বৈষম্যহীন এক পৃথিবী গড়ার কাজে লেগে পড়েন ফিরেই। ধীরেধীরে বড় করে তুলছেন তার সবচেয়ে সুন্দর শিশুকে। কিন্তু যে রাষ্ট্র গণমানুষের নয়, যে রাষ্ট্রের স্বাধীনতা লাভে কেবল মাত্র শোষকের পরিবর্তন হয়েছে, এ শিশুর বেড়ে ওঠা তার জন্য হুমকির, তার জন্য ভীতিকর। কারণ সে জানে,ঘুমন্ত নিপীড়িত মানুষ একবার জেগে উঠলে সে আর পালাতে পারবে না। আর কোন মুখোশ তাকে বাঁচাতে পারবে না। তাইতো তারা গ্রেফতার করতে চায় নাজিম হিকমাত কে। তিনি চলে যান রাশিয়ায়। উনিশশো আটাশে তাঁকে সাধারণ ক্ষমা করলে দেশে ফিরেন তিনি। ততদিনে অবশ্য শাসকগোষ্ঠী নিষিদ্ধ করেছে তুরষ্কের কম্যুনিস্ট পার্টিকে। ছড়িয়ে দিয়েছে গুপ্তচর। চলছে প্রচন্ড ধরপাকড়। কী তীব্র তাদের ভয়। এজন্যই সম্ভবত ম্যাক্সিম গোর্কি লিখেছিলেন, " আমাদের উজ্জীবিত আত্মাকে মারতে পারবে না ওরা।" থেমে থাকেন নি নাজিম। হয়ে ওঠেন লাঞ্ছিত নিপীড়িতের কন্ঠস্বর। তুরস্ক সরকার তাই তাঁকে পরবর্তী দশ বছরের মধ্যে পাঁচ বছরের বেশি সময় জেলে রাখে। উনিশশো আটত্রিশ সালে সেনাবাহিনীতে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের অনুপ্রেরণা যোগানোর অপরাধে(!) তাঁকে জেলে পাঠানো হয় আটাশ বছরের জন্য। একবার ভাবুন, কী পরিমান শোষক রাষ্ট্র হলে জনতার ন্যায্য দাবি প্রচারের দায়ে একজন কবির উপর নামিয়ে আনে অত্যাচারের স্টিমরোলার। এইদফায় জেলখানার কাটানো সময় গুলোতে তিনি সম্ভবত রচনা করেছিলেন তাঁর মহত্বম স্মৃষ্টিগুলো। মানুষের দুঃখ, আশা তাঁর কবিতায় কৃষ্ণচুড়ার মতো লাল। জেলখানার চিঠি ঘিরেছিলো চৌদ্দ শিকের প্রতিটা গরাদ।

'মানুষের মুন্ডুটা তো বোঁটার ফুল নয়,ইচ্ছে করলেই ছিঁড়ে নেবে ।'

কি সহজ অথচ দুঃসাহসী উচ্চারণ। কী অপরিসীম বিশ্বাস মানুষের প্রতি।

তিনি বলেছিলেন, "দুঃসময় থেকে সুসময়ে মানুষ পৌঁছে দেবে মানুষকে"

উনিশশো উনপঞ্চাশ সালে তাঁর মুক্তির জন্য আন্তর্জাতিক কমিটি গঠন করেন পাবলো নেরুদা, পল রবসন এবং জ্যা পল সার্ত্রে। উনিশ শো পঞ্চাশে পাবলো নেরুদার সাথে যৌথ ভাবে তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার অর্জন করেন। তিনি অনশন শুরু করলেন। তুরস্কের গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসলে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়। কিন্তু গণতন্ত্র আর স্বৈরতন্ত্র কেবল নামেরই পরিবর্তন। যদি না সে সরকার হয় মানুষের, যদি না সে সরকার হয় জনতার। দু'বার হত্যাচেস্টার পর তিনি আবার চলে যান সোভিয়েত ইউনিয়নে। এসময় তুরস্ক সরকার তাঁর নাগরিকত্ব বাতিল করে। উনিশশো তেষট্টি সালের তেশরা জুন মস্কোয় মারা যান বিংশ শতকের অন্যতম প্রধান কবি নাজিম হিকমত। পৃথিবীকে যিনি দেখতে চেয়েছিলেন সবথেকে সুন্দর সমুদ্রের মতো।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]