কদম রসুল

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

কদম রসুল বলতে নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর কথিত পায়ের ছাপ কে বোঝায়।[১]

উৎপত্তি সম্পর্কিত প্রচলিত ইতিহাস[সম্পাদনা]

কদম রসুল

প্রচলিত আছে যে, মুহাম্মদ (সাঃ) মিরাজের রাত্রে বোরাকে উঠবার পূর্বে পাথরে তার পায়ের কিছু ছাপ অঙ্কিত হয়। পরবর্তীতে সাহাবিগণ পদ চিহ্নিত পাথর গুলো সংরক্ষণ করেন বলে অনেকে দাবি করেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত পাথরটি বর্তমানে জেরুজালেমে সংরক্ষিত আছে। এছাড়া ইস্তাম্বুল,কায়রো এবং দামেস্কে অনুরূপ পাথর সংরক্ষিত আছে।[২] ষোল শতকের শেষদিকে মাসুম খাঁ কাবুলি নামে একজন সম্ভ্রান্ত রাজা ছিলেন। ইনি ঈসা খাঁর বন্ধু ছিলেন। তিনি ১৫৮০ খ্রিস্টাব্দে আরব বণিকদের নিকট থেকে বহু অর্থের বিনিময়ে এই মহা মূল্যবান পাথরটি কিনে নেন। এবং এ স্থানে এটি প্রতিষ্ঠা করেন। সুবাদার ইসলাম খান, শাহজাহান সহ আরো অনেক আমির-ওমরা এ স্থান দর্শন করেন। সুলতান শুজা এই দরগার জন্য ৮০ বিঘা জমি দান করেন। সে সময় এখানে কীরকম ইমারত ছিল তা জানা যায় না। এর পরে ঈসা খাঁর প্রপৌত্র দেওয়ান মনয়ার খান এখানে একটি ইমারত তৈরি করেন। কিন্তু সেই ইমারতও কালের গর্ভে বিলিন হয়ে যায়। এর পরে গোলাম নবীর তৃতীয় পুত্র গোলাম মোহাম্মাদ ১৮১৪ খ্রিস্টাব্দে পশ্চিমদিকের দোতলা তোরণটি নির্মাণ করেন।

সত্যতা[সম্পাদনা]

প্রথাগত মুসলিমরা এটি স্বীকার করেন না। তাছাড়া বিভিন্ন জায়গায় সংরক্ষিত পদ চিহ্ন গুলি বিভিন্ন আকারের। যেখানে একজন মানুষের পায়ের ছাপ একই হওয়ার কথা।[৩] কদম রসুল প্রচলিত অর্থে খন্ডের উপরে নবী করিম হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)এর পায়ের ছাপ, তবে এই কদম রসুল ধারণার উৎপত্তি মূলত ভারতীয় উপমহাদেশ। নাসিরুদ্দিন হোসেন শাহ গৌড়ে প্রথম কদম রসুল ও সংলগ্ন স্থাপত্য কাঠামো নির্মাণ করলেও এর ব্যাপক জনপ্রিয়তা দেখা যায় মুঘল আমলে। সমগ্র ভারতবর্ষে কদম রসুলের সংখ্যা ১৪ টি। বাংলাদেশের নারায়নগঞ্জে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে আর একটা মজমপুর গ্রামে, চট্টগ্রামে দুইটা কদম রসুল আছে। কদম রসুলকে হযরত মুহাম্মদের পায়ের ছাপ হিসাবে দাবী করা হলেও মূল ইসলাম ধর্মে এর কোন স্বীকৃতি কিন্তু নেই। এই কারণে ইসলাম ধর্মের উৎপত্তিস্থাল মধ্যপ্রাচ্যে এ ধরণের কোন নিদর্শন সংরক্ষিত হয়নি এবং ধর্মীয় ভাবেও চর্চিত হয়না। প্রশ্ন জাগে তাহলে কেন কিভাবে এবং কি প্রয়োজনে এই কদম রসুলের উৎপত্তি হলো, তাও শুধু ভারতবর্ষে, যেখানে ইসলাম ধর্ম প্রচার পেয়েছে নবী করিম এর পরলোক গমনের কয়েকশ বছর পরে? ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলাম ধর্মের আগমন শুরু হয় প্রথমে বনিকদের সাথে আসা সুফী সাধকদের মাধ্যমে, পরে আফগান, তুর্কী, পার্সীয় আর মুঘল শাসকদের নেতৃত্ব আর কর্তিত্বে। আমরা জানি ভারতের ধর্মীয় সংস্কৃতির প্রাণ জুড়ে রয়েছে মূর্তি বা বস্তুগত পুজিত নিদর্শন। পাহাড়, নদী, গাছ, সাপ ইত্যাদির বস্তুগত ও মানব আকৃতিতে পুজার চর্চার রীতি প্রচলিত ছিল ভারতবর্ষে বহু আদিকাল থেকে। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মমত জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মের উৎপত্তি ভারতে প্রায় সমসাময়িক সময়ে। বৌদ্ধ ধর্মের প্রারম্ভিক যুগে এখানে মূর্তি ভিত্তিক কোন ধর্মীয় আচার ছিল না, কেবল বৌদ্ধ দর্শন চর্চা আর নির্বান লাভই দিল অনুসারীদের প্রধান ব্রত। তবে গৌতম বুদ্ধের মহাপ্রায়নের পরে বেশিদিন আর এই ভাবগত চর্চা প্রচলিত থাকেনি, সেই মূর্তিরূপের উপসানা শুরু হয়ে যায়। যারই একটা পর্যায়ে "বুদ্ধের পদচিন্থের" উপাসনা শুরু হয়। বৌদ্ধ উপকথা অনুযায়ী গৌতম বুদ্ধ তার জীবদ্দশায় শ্রীলংকায় ভ্রমনের সময়ে "শ্রী পদ" নামের একটা পাহাড়ে তাঁর পায়ের ছাপ রেখে গিয়েছিলেন। যদিও হিন্দু ধর্মাবলম্বী গন এই পায়ের ছাপকে শিবের আর মুসলিমরা এটা নবী আদম এর বলে বিশ্বাস করে। পবিত্র আরাধ্য হিসাবে পদ চিন্থের উপাসনা এই রীতি উপমহাদেশে প্রচলন ছিল বহু যুগ আগে থেকেই। পরবর্তি কালে হিন্দু ধর্মেও তা সংক্রমিত হয়, যে কারণে লক্ষীর পা, বা বিষ্ণুপদের উপসনা, ও একে ঘিরে অনেক মন্দিরও গড়ে উঠতে দেখা যায়। পরবর্তীতে সনাতন ও বুদ্ধ অনুসারীরা ইসলামের প্রতি অনুরক্ত হন। যদিও ইসলামের প্রাত্যহিক করনীয় হলো নামাজ, সমগ্র ইসলাম ধর্মে মূর্তির কোন স্থান নেই, এটা শেরক। কিন্তু এ ধরনের ধর্মীয় চর্চা এই এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের মনছবিতে যে মূর্তি উপাসনার অভ্যস্ততা ছিল সেটা হয়তো পূরন করতে পারছিল না , সেই প্রেক্ষিতেই হয়তো এক সময়ে ভারতবর্ষের কদম রসুলের উদ্ভব হয়। মনোবাসনা পূরণ করতে মানুষজন এই কদম রসুলে বিভিন্ন মানত রাখতে শুরু করে।

কদম রসুল দরগাহ[সম্পাদনা]

কদম রসুল দরগাহ

নারায়ণগঞ্জ জেলার বন্দর উপজেলার নবীগঞ্জে কদম রসুল দরগাহ অবস্থিত। কদম শব্দের অর্থ পা এবং রাসুল শব্দের অর্থ আল্লাহ্‌ প্রেরিত রাসুল। কদম রসুল দরগায় মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)এর কদম মোবারক এর চিহ্ন সংবলিত একটি পাথর আছে এবং এ জন্যই দরগাহ এর নামকরণ করা হয়েছে কদম রসুল দরগাহ। ৭শ শতকে রচিত "বাহির-স্থানই গায়েবী" নামক গ্রন্থে লেখক মির্জা নাথান নবীগঞ্জের এই পাথরটির কথা উল্লেখ করেছেন। মূল দরগাহের ভেতরে একটি ধাতব পাত্রে গোলাপ জলে পাথরটি ডোবানো অবস্থায় থাকে। পাথরটি অবশ্য এখন আর পূর্বের অকাট আকৃতিতে নেই। সংরক্ষনের সময়ে পাথরটি কেটে অনেকটা পদাকৃতি করা হয়েছে। দরগাহের আশেপাশে অনেকগুলো কবর ও মাজার শরীফ আছে। ৭শ শতকেয়েবী" নামক গ্রন্থে লেখক মির্জা নাথান নবীগঞ্জের এই পাথরটির কথা উল্লেখ করেছেন।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Perween Hasan. "The Footprint of the Prophet আর্কাইভকৃত ১৩ জুন ২০০৬ ওয়েব্যাক মেশিনে.." Muqarnas. Vol. 10. Leiden: E.J. Brill. 1993, 335-343.
  2. Anthony Welch. "The Shrine of the Holy Footprint in Delhi আর্কাইভকৃত ১৩ জুন ২০০৬ ওয়েব্যাক মেশিনে.." Muqarnas. Vol. 14. Leiden: E.J. Brill. 1993, 166-178.
  3. আ.কা.ম. জাকারিয়া"ISBN 984-09-0262-8 আর্কাইভকৃত ১৩ জুন ২০০৬ ওয়েব্যাক মেশিনে.." বাংলাদেশের প্রাচীন কীর্তি. Vol. ০২. বাংলাদেশ শিশু একাডেমী, ১৯৯৪, ১২৪-১২৬.