আসাবিয়া

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

আসাবিয়া বা আসাবিয়াত (আরবি: عصبية‎‎ আ'সাবিই'য়াত) একটি আরবি শব্দ যার অর্থ সামাজিক সংহতি বা একতা, একে গোত্রপ্রীতি, দলপ্রীতি, স্বজনপ্রীতি, পক্ষপাতিত্ব বা জাতীয়তাবাদও বলা যেতে পারে।[১]

আসাবিয়াত অগত্যা যাযাবর বা রক্তের সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে নয়; বরং, এটি ধ্রুপদী প্রজাতন্ত্রবাদের দর্শনের অনুরূপ। আধুনিক যুগে, এটি সাধারণত সংহতির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। যাইহোক, এটি প্রায়শই নেতিবাচকভাবে যুক্ত হয় কারণ এটি কখনও কখনও জাতীয়তাবাদ বা পক্ষপাতিত্বের পরামর্শ দিতে পারে, অর্থাৎ, পরিস্থিতি নির্বিশেষে নিজের গোষ্ঠীর প্রতি আনুগত্য।[২]

এই ধারণাটি প্রাক-ইসলামী যুগে পরিচিত ছিল, তবে ইবনে খালদুনের মুকাদ্দিমায় জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, যেখানে এটিকে মানব সমাজের মৌলিক বন্ধন এবং ইতিহাসের মৌলিক চালিকাশক্তি হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা যাযাবর আকারে বিশুদ্ধ।

ইবনে খালদুন যুক্তি দিয়েছিলেন যে, আসাবিয়া চক্রাকার এবং সভ্যতার উত্থান ও পতনের সাথে সরাসরি প্রাসঙ্গিক: এটি একটি সভ্যতার শুরুতে সবচেয়ে শক্তিশালী হয়, সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে হ্রাস পায় এবং তারপরে আরও একটি আকর্ষক আসাবিয়া অবশেষে একটি ভিন্ন সভ্যতা প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করার জন্য এর স্থান নেয়।[৩]

হাদিস[সম্পাদনা]

ওয়াছিলা ইবনে আসকা রা. বলেন, একদিন আমি রসুল সা.-কে জিজ্ঞেস করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আসাবিয়াত বা গোত্রপ্রীতি কি? রসুল সা. বললেন, আসাবিয়াত হলো তোমার গোত্রকে অন্যায় ব্যাপারে সাহায্য করা।

— আবু দাউদ ৫১১৯, মিশকাত ৪৬৮৬ (যঈফ)

যুবাইর ইবনে মুতইম রা. বলেন, রসুল সা. বলেছেন, যে ব্যক্তি আসাবিয়াতের বা গোত্রপ্রীতির দিকে লোকদেরকে আহ্বান করে, নিজে আসাবিয়াতের ওপর যুদ্ধ করে এবং আসাবিয়াতের ওপর মৃত্যুবরণ করে, সে ব্যক্তি আমাদের দলের নয়।

— আবু দাউদ ৫১২১, মিশকাত ৪৬৮৮ (যঈফ)

হুরায়ম ইবনু আবদুল আ'লা (রহঃ) ..... জুনদাব ইবনু আবদুল্লাহ বাজালী (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি লক্ষ্যহীন নেতৃত্বের পতাকাতলে যুদ্ধ করে, গোত্র প্রীতির দিকে আহ্বান জানায় এবং গোত্রপ্রীতির কারণেই সাহায্য করে, তার মৃত্যু জাহিলিয়াতের মৃত্যু।

— সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৪৬৮৬, (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪৬৩৯, ইসলামিক সেন্টার ৪৬৪১)

বিশর ইবন হিলাল সাওওয়াফ (রহঃ) ... আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি নেতার আনুগত্য হতে বের হয়ে যায় এবং মুসলিমদের দল ত্যাগ করে, আর এই অবস্থায় মারা যায়, তার মৃত্যু হবে জাহিলিয়াতের মৃত্যু। যে ব্যক্তি আমার উম্মতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে লিপ্ত হয়ে ভাল-মন্দ নির্বিচারে হত্যা করে এবং মুসলিমকেও ছাড়ে না; আর যার সাথে যে অঙ্গীকারাবদ্ধ, তার অঙ্গীকার রক্ষা করে না, তার সাথে আমার কোন সম্বন্ধ থাকবে না। আর যে ব্যক্তি পথভ্রষ্টতা এবং অজ্ঞতার পতাকাতলে যুদ্ধ করে, আর লোকদেরকে জাত্যাভিমানের দিকে আহ্বান করে এবং তার ক্রোধ জাত্যাভিমানের জন্যই হয়, পরে সে নিহত হয়; তার মৃত্যু জাহিলিয়াতের মৃত্যু হবে।

— নাসাঈ ৪১১৫.

উবাই ইবনু কা’ব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি নিজেকে জাহিলিয়্যাতের গৌরবে গৌরবান্বিত করে, তাকে তার পিতার (পিতৃ-পুরুষের) বস্তুর (লজ্জাস্থানের) সাথে দৃঢ়ভাবে যুক্ত করে রাখো। আর এ কথাগুলো তাকে ইঙ্গিতে নয়; বরং পরিষ্কার ভাষায় বলে দাও। (যে ব্যক্তি জাহেলিয়াতের যুগের আদব-কায়দায় তার বংশগত, দলগত, জাতিগত প্রভৃতি আত্মঅহমিকামূলক সম্পর্কের কথা বলে গর্ব করে, তাকে মানুষ হিসেবে তার উৎপত্তি ও বাস্তবতা এবং তার পূর্বপুরুষদের অবিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠানগুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে তাকে লজ্জিত করা হোক।”)[টীকা ১]

— মিশকাতুল মাসাবিহ ৪৯০২, শারহুস্ সুন্নাহ্ ৩৫৪১, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ ২৬৯, সুনানুন্ নাসায়ী আল কুবরা ৮৮৬৪, আহমাদ ২১২৩৬, মুসান্নাফ ইবনু আবূ শায়বাহ্ ৩৭১৮২

নুফায়লী (রহঃ) ..... আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রাঃ) তার পিতা থেকে বর্ণনা করেছেনঃ যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে তার কাওমের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করে তার উদাহরণ এরূপ যে, যেমন কারও উট গর্তে পড়ে গেছে, আর সে তার লেজ ধরে টানছে। (অর্থাৎ সে উটকে উদ্ধার করা যেমন সম্ভব নয়, ঐরূপ ব্যক্তিকে জাহান্নাম থেকে বাঁচানোও কঠিন।)

— আবু দাউদ (ইফা) ৫০২৯

আবূ বকর ইবন আবূ শায়বা (রহঃ) ..... আবূ মূসা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন কাওমের ভাতিজা, সে কাওমেরই অন্তর্ভুক্ত হবে।

— আবু দাউদ (ইফা) ৫০৩৪

আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মহান আল্লাহ তোমাদের জাহিলী যুগের মিথ্যা অহংকার ও পূর্বপুরুষদেরকে নিয়ে গর্ব করার প্রথাকে বিলুপ্ত করেছেন। মু’মিন হলো আল্লাহভীরু আর পাপী হলো দুর্ভাগা। তোমরা সকলে আদম সন্তান আর আদম (আ.) মাটির তৈরি। লোকেদের উচিত বিশেষ গোত্রেরভুক্ত হওয়াকে কেন্দ্র করে অহংকার না করা। এখন তো তারা জাহান্নামের কয়লায় পরিণত হয়েছে। অন্যথায় তোমরা মহান আল্লাহর নিকট ময়লার সেই কীটের চেয়ে জঘন্য হবে যে তার নাক দিয়ে ময়লা ঠেলে নিয়ে যায়।

— (আবূ দাঊদ ৫১১৬, তিরমিযী ৪২৩৩ : হাসান)

রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘অনারবদের ওপর আরব দেশের লোকের, আরব দেশের লোকের ওপর অনারবদের কোনো মর্যাদা নেই। কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের, শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণাঙ্গের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। সম্মান, মর্যাদা কেবল তাকওয়ার ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে।’

— (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ২৩৪৮৯)

বিদায় হজের সময় আইয়ামে তাশরিকের মাঝামাঝি সময়ে বিশ্বনবী (সা.) বক্তৃতা করেছিলেন। তাতে তিনি বলেছিলেন, ‘হে লোকজন! সাবধান, তোমাদের আল্লাহ একজন। কোনো অনারবের ওপর কোনো আরবের ও কোনো আরবের ওপর কোনো অনারবের, কোনো কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের ও কোনো শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণাঙ্গের কোনো ধরনের শ্রেষ্ঠত্ব নেই; আল্লাহভীতি ছাড়া। তোমাদের মধ্যে যে সবচেয়ে বেশি আল্লাহভীরু ব্যক্তি সেই আল্লাহর কাছে সর্বাধিক মর্যাদাবান। আমি কি তোমাদের পৌঁছিয়েছি এ বাণী? সাহাবিরা বললেন, হ্যাঁ অবশ্যই হে আল্লাহর রাসুল, আপনি পৌঁছিয়েছেন। তখন তিনি (সা.) বললেন, তাহলে যারা এখানে উপস্থিত আছে, তারা যেন অনুপস্থিত লোকদের কাছে এ বাণী পৌঁছে দেয়।’

— (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ৪১১)

রাসুল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহতায়ালা তোমাদের চেহারা-আকৃতি ও সম্পদ দেখেন না, বরং তিনি তোমাদের অন্তর ও কাজ-কর্ম দেখেন।’

— (মুসলিম, হাদিস : ২৫৬৪; ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৪১৪৩)

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

টীকা[সম্পাদনা]

  1. ব্যাখ্যাঃ (فَأَعِضُّوهُ بِهَنِ أَبِيهِ) যে ব্যক্তি তাঁর সেসব পিতৃপুরুষদেরকে নিয়ে গর্ব করে। যারা জাহিলিয়্যাতের যুগে মারা গেছে, তাকে বল যে, তুমি তোমার মৃত পিতৃপুরুষদের লজ্জাস্থানকে কর্তন করে মুখে তুলে নাও। অর্থাৎ তাদের ব্যাপারে গর্ব করা, আর তাদের লজ্জাস্থান কর্তন করে মুখে তুলে চিবানো একই কথা। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ) (وَلَا تُكَنُّوا) অর্থাৎ এ কথাগুলো অস্পষ্ট বা ইঙ্গিত দিয়ে নয়, বরং স্পষ্টভাবে তাদেরকে জানিয়ে দাও। যাতে করে তাদের শিক্ষা হয় যে, এটা কত জঘন্য কাজ। যাতে তারা বিরত থাকে। এও বলা হয়েছে যে, এর অর্থ হলো, যে ব্যক্তি জাহিলী যুগের নিয়ম-নীতি, কৃষ্টি-কালচার যেমন গালি দেয়া, অভিসম্পাত করা ও মানুষের মান-সম্মান নষ্ট করার মতো কাজ চালু করতে চায়। এছাড়াও নির্লজ্জতা, বেহায়াপনা, অহংকার ছড়িয়ে দিতে চায় তাকে স্মরণ করিয়ে দাও যে, তার পিতা মূর্তি পূজা করত, যিনা করত, মদ পান করত। এছাড়াও অনেক খারাপ কাজ করত। আর তাকে এ কথাগুলো স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিবে। কোন প্রকারের ইঙ্গিত করে নয়। যাতে সে মানুষের সামনে লজ্জিত হয়ে ফিরে আসে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Zuanna, Giampiero Dalla and Micheli, Giuseppe A. Strong Family and Low Fertility. 2004, p. 92
  2. Weir, Shelagh. A Tribal Order. 2007, page 191
  3. Tibi, Bassam. Arab nationalism. 1997, p. 139