আমাশয়

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

আমাশয় (ইং: Dysentery) একটি অতিসাধারণ ব্যাধি যা মানব অন্ত্রে সংক্রমণের মাধ্যমে ঘটে থাকে। সাধারণত এন্টামিবা হিস্টোলাইটিকা (Entamoeba histolytica) কিংবা সিগেলা (Shigella) গণভুক্ত ব্যাকটেরিয়া মানবদেহের পরিপাক তন্ত্রে সংক্রমণ করে। অন্ত্রের সংশ্লিষ্ট অংশে প্রদাহের সৃষ্টি হয়, পেট ব্যথা করে এবং শ্লেষ্মা ও রক্তসহ পাতলা পায়খানা হতে থাকে।[১] আমাশয় হলে পেট কামড়ানোসহ মলের সঙ্গে পিচ্ছিল আম অথবা শ্লেষ্মাযুক্ত রক্ত যায়।[২]

প্রকারভেদ[সম্পাদনা]

আমাশয় দু ধরনের হয়ে থাকে। যথা এমিবিক আমাশয় এবং বেসিলারি আমাশয়। এদের সক্রমণের কারণ ভিন্ন, রোগের লক্ষণ ভিন্ন এবং চিকিৎসাও ভিন্ন৷

অ্যামিবিক আমাশয়[সম্পাদনা]

অ্যামিবা ঘটিত আমাশয় (ইংঃ Amoebic dysentery, Amoebiasis)বড় ছেলে-মেয়েদের হয়ে থাকে কিন্তু ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে এর প্রবণতা অত্যন্ত কম৷ পরিপাকতন্ত্রের বৃহদান্ত্রে এন্টামিবা হিস্টোলাইটিকা নামক পরজীবীর সংক্রামণের ফলে হয়৷

সংক্রমণের পদ্ধতি[সম্পাদনা]

এন্টামিবা হিস্টোলাইটিকা নামীয় পরজীবীটি নিজের চারদিকে এক ধরণের আবরণ গঠন করে মাটিতে ও পানিতে বিচরণ করে৷ সাধারণতঃ দূষিত পানি এবং অপরিচ্ছন্ন খাবার গ্রহণের মাধ্যমে এই এন্টামিবা হিস্টোলাইটিকা মানুষের পেটের মধ্যে ঢুকে পড়ে এবং বৃহদান্ত্রের সিকামের কাছাকাছি জায়গায় গিয়ে এর বাইরের আবরণটি খুলে ফেলে৷ এরপর পরজীবীটি বৃহদান্ত্রের গায়ে যে শ্লেষ্মাঝিল্লি আছে তা আকড়ে ধরে বাসা বাঁধে। পরজীবীটির দেহ থেকে এক প্রকার ক্ষতিকারক রস নিঃসরণ হয় যা অন্ত্রে গাত্রের শ্লেষ্মাঝিল্লিকে ভেঙে দেয়। আর এই ভেঙ্গে যাওয়া শ্লেষ্মাঝিল্লিতে এ্যমিবার আক্রমণে ক্ষতের সৃষ্টি হয়৷ শ্লেষ্মাঝিল্লির ঝরে পড়া অংশ মলের সঙ্গে নিঃসৃত হয় যাকে “আম” বলে আখ্যায়িত করা হয়। তলপেটে সাধারণত ডানপাশে চিনচিনে ব্যথা হয়৷ তলপেটের ডান পাশে সিকাম থাকে যা পরজীবীটির আক্রমণের মূল লক্ষ্য।[৩]

রোগের লক্ষণ[সম্পাদনা]

রোগীর বারবার পাতলা পায়খানা হতে থাকে। মলের সঙ্গে মিউকাস (শ্লেষ্মাঝিল্লি) বা আাম বেশি থাকে। রক্ত থাকলেও কম৷ সাধারণত ডানদিকের তলপেটে ব্যথা হয়৷

চিকিৎসা[সম্পাদনা]

যে কোন প্রকারের আমাশয়ে প্রথম করণীয় হলো খাওয়ার স্যালাইন গ্রহণ করা। অধিকন্তু রোগীকে প্রচুর বিশ্রাম নিতে হবে৷ ডিহাইড্রেশান প্রতিরোধের স্বার্থে প্রচুর পরিমাণে তরল ও পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে৷ ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ট্যাবলেট মেট্রোনিডাজল (৪০০ মি.গ্রা.) ১টা দিনে ৩ বার করে ৫ দিন (পূর্ণ বয়স্কদের ক্ষেত্রে) খেতে হবে৷ ডাক্তার ওজন অনুযায়ী শিশুদের চিকিৎসা দেবেন।

বেসিলারি আমাশয়[সম্পাদনা]

বেসিলারি আমাশয় (ইংঃ Bacillary dysentery, Shigellosis) সিগেলা নামক ব্যাকটেরিয়া দ্বারা অন্ত্রের সংক্রমণের কারণে হয়৷ এ রোগটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক হারে দেখা যায় এবং বহু লোকের মৃত্যুর জন্য এই রোগ দায়ী৷ বেসিলারি ডিসেন্ট্রি বা আমাশয়ের আর এক নাম শিগেলোসিস৷ শিগেলা নামে এক প্রকার ব্যাকটেরিয়ার সংক্রামণের ফলে এই রোগটি হয়৷ সিগেলার চারটি প্রজাতির মধ্যে Shigella flexneri-এর মাধ্যমে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে আমাশয় ছড়ায়। এটি সবচেয়ে বেশী ছড়ায় জীবাণুবাহী আধোয়া হাত দিয়ে। জীবণুবাহী মাছি ও খাবারের মাধ্যমেও ছড়ায়। মলের সঙ্গে রক্ত বেশি যায় বলে এটিকে এক সময় রক্ত আমাশয় বলা হতো৷[৩]

সংক্রমণের পদ্ধতি[সম্পাদনা]

২ থেকে ৫ বছরের শিশুরা এ রোগে বেশী আক্রান্ত হয়৷ এ রোগের প্রধান উৎস হলো রোগীর মল৷ মাছির মাধ্যমে রোগজীবাণু খাদ্য ও পানীয়তে সঞ্চারিত হয়৷ এ সকল দূষিত খাদ্য ও পানীয় পান করার ফলে রোগের সংক্রামণ হয়৷ শিগেলা জীবাণুটি মানুষের পেটে ঢুকে পাকস্থলী অতিক্রম করে চলে যায় ক্ষুদ্রান্ত্রে৷ সেখানে জীবাণুটি বংশবৃদ্ধি করে এবং বৃহদান্ত্রে ঘায়ের সৃষ্টি করে৷ ঝিল্লি ফুলে উঠে ও লাল হয়ে যায়৷ ঝিল্লিতে পুঁজের আবরণ পড়ে এবং ক্ষতের সৃষ্টি হয়৷ সামান্য আঘাতেই এই ক্ষত থেকে রক্তক্ষরণ হয়৷ তাই মলের সঙ্গে রক্ত যায়৷

রোগের লক্ষণ[সম্পাদনা]

হঠাৎ করে ঘন ঘন পাতলা পায়খানা শুরু হয় এবং চিকিৎসা নিতে দেরী হলে দিনে ১০ বারের বেশি মলত্যাগ করতে হয়। আক্রান্ত রোগীর পেটে ব্যথা করতে থাকে। রোগীর শরীরে খিঁচুনি হতে পারে৷ রোগীর গায়ের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। জ্বর হয় ১০২-১০৩ ডিগ্রি ফারেনহিট পর্যন্ত উঠে যেতে পারে। অনেকবার মলত্যাগের কারণে শরীরে ফলে পানিস্বল্পতা ও ইলেকট্রোলাইট ঘাটতি দেখা দেয়। শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে।

চিকিৎসা[সম্পাদনা]

প্রথমেই বারবার মলত্যাগ বন্ধ করতে হবে। তাছাড়া যে কোন প্রকারের আমাশয়ে প্রথম করণীয় হলো খাওয়ার স্যালাইন গ্রহণ করা। অধিকন্তু রোগীকে প্রথমতঃ বিশ্রাম নিতে হবে। ডিহাইড্রেশন ঠেকানোর জন্য প্রতিবার পাতলা পায়খানার পর খাওয়ার স্যালাইন গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে প্রচুর পরিমাণ তরল খাবার যেমন ভাল ঠাণ্ডা পানি, চিনির সরবত, ডাবের পানি, ফলের রৎস ইত্যাদি খেতে হবে৷ অতিরিক্ত পাতলা পায়খানা হলে নিকটবর্তী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ঔষধ খেতে হবে৷ সিগেলা প্রজাতির আমাশয়ে ডাক্তারের পরামর্শমত এন্টিবায়োটিক ব্যবহারে রোগ পুরোপুরি ভালো হয়ে যায়।

দীর্ঘস্থায়ী আমাশয়[সম্পাদনা]

অ্যামিবিক আমাশয় এবং বেসিলারি আমাশয় স্বল্পমেয়াদী উভয়ই স্বল্পমেয়াদী আমাশয়। সাধারণভাবে “স্বল্পমেয়াদী আমাশয়” বলতে এক সপ্তাহের কম সময় ধরে আমাশয় থাকা। স্বল্পমেয়াদী আমাশয় অল্প সময়ের চিকিৎসায় সম্পূর্ণ সেরে যায়। দীর্ঘস্থায়ী আমাশয় বা ক্রণিক ডিসেন্ট্রি ভাল করার জন অনেক দিনের চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। দীর্ঘদিনের আমাশয় বিভিন্ন জটিলতার জন্ম দেয়। দীর্ঘস্থায়ী আমাশয়’র ক্ষেত্রে মলধার সর্বদায় ফাঁক হয়ে থাকে, হারিস গোন্ডল বের হয়।[৪]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. আমাশয়
  2. রোগের নাম আমাশয়
  3. স্বাস্থ্যবিভাগ[স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
  4. পেটের পীড়া আমাশয় - অধ্যাপক মবিন খান