আদ জাতি

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

ইসলামী ঐতিহ্যে, আদ জাতি বা আদিত্যদেরকে প্রথম আরব দেশের বাসিন্দা হিসেবে বিশ্বাস করা হয়। তারা প্রাচীন আরব বা ধ্বংসপ্রাপ্ত আরব বাসিসমূহ নামে পরিচিত। আদের মৃত্যুর পর, তার পুত্র শাদিদ এবং শেদাদ আদিত্যদের উপরে উত্তরাধিকারসূত্রে শাসন করেন। তারপর থেকে আদ শব্দটি সকলের জন্য একটি 'অ্যাড অবতীর্ণ সমষ্টিগত হয়ে ওঠে। আদ জাতির উপর আল্লাহ্‌ তাআলা হুদ (আঃ)-কে তাদের জন্য নবী করে পাঠিয়েছিলেন।

বংশ পরিচয়[সম্পাদনা]

ইসলামী ঐতিহ্য অনুযায়ী, আদ জাতি হচ্ছে নূহের পুত্র (আরবি: سام بن نوح‎‎, সাম ইবনে নূহ) সামের উত্তরাধিকারী, যিনি উত্তর-পূর্বাঞ্চল থেকে এসেছিলেন এবং আদিত্যদের পূর্বপুরুষ ছিলেন। তিনি নূহের (نوح) পুত্র সাম (سام), সামের পুত্র ইরাম (إرم), ইরামের পুত্র আওয়াদের (উজ) (عوض) ছিলেন।

‘আদ ও ছামূদ উভয় গোত্রই ইরাম-এর দু’টি শাখা। আদ সম্প্রদায়ের ১৩টি পরিবার বা গোত্র ছিল। আম্মান থেকে শুরু করে হাযারামাউত ও ইয়েমেন পর্যন্ত তাদের বসতি ছিল।[১] উল্লেখ্য যে, নূহের প্লাবনের পরে এরাই সর্বপ্রথম মূর্তিপূজা শুরু করে।

কুরআনে উল্লেখিত[সম্পাদনা]

কুরআন অনুযায়ী, ইরাম এমন একটি স্থান যেখানে নবী হুদকে (هود) তার লোকদের ইসলামের সৎ পথে পরিচালিত করার জন্য পাঠানো হয়েছিল। তারা ইসলামকে প্রত্যাখানতা করে এবং তাদের মূর্তিপূজার পথে চলতে থাকে, যার ফলে আল্লাহ তাদের শহরে একটি বড় ঝড়ের পতন ঘটান।

কুরআন, সূরা ৮৯ (আল-ফাজ্‌র), আয়াত ৬ থেকে ১৪[২]:

৬. আপনি কি লক্ষ্য করেননি, আপনার রব আদ বংশের ইরাম গোত্রের সাথে কি আচরণ করেছিলেন,
৭. যাদের দৈহিক গঠন স্তম্ভ ও খুটির ন্যায় দীর্ঘ ছিল এবং
৮. যাদের সমান শক্তি ও বলবীর্যে সারা বিশ্বের শহরসমূহে কোন লোক সৃজিত হয়নি
৯. এবং সামূদ গোত্রের সাথে, যারা উপত্যকায় পাথর কেটে গৃহ নির্মাণ করেছিল।
১০. এবং বহু কীলকের অধিপতি ফেরাউনের সাথে
১১. যারা দেশে সীমালঙ্ঘন করেছিল।
১২. অতঃপর সেখানে বিস্তর অশান্তি সৃষ্টি করেছিল।
১৩. অতঃপর আপনার পালনকর্তা তাদেরকে শাস্তির কশাঘাত করলেন।
১৪. নিশ্চই আপনার পালনকর্তা সতর্ক দৃষ্টি রাখেন।

বিবরন[সম্পাদনা]

এখানে আদ, সামূদ এবং ফেরাউন তিনটি জাতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যাদের উপরে আল্লাহ তা'আলার গজব নাযিল হয়েছিল। আদ ও সামূদ জাতিদ্বয়ের বংশতালিকা উপরের দিকে ইরামে গিয়ে এক হয়ে যায়। তারা অত্যন্ত দীর্ঘকায় জাতি ছিল ও অহংকারী ছিল।[৩] এই আদ জাতির দৈহিক গঠন ও শক্তি-সাহসে অন্য সর জাতি থেকে স্বতস্ত্র ছিল। কোরআনে তাদের স্বাতস্ত্র্য অতন্ত্য পরিস্কার ভাষায় ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেছেঃ এমন দীর্ঘকায় ও শক্তিশালী জাতি ইতিপূর্বে পৃথিবীতে সৃজিত হয়নি। এতদসত্ত্বেও কোরআনে তাদের দেহের মাপ অনাবশ্যক বিবেচনা করে উল্লেখ করেনি। ইসরাঈলী রেওয়ায়েতসমূহে তাদের দৈহিক গঠন ও শক্তি সস্পর্কে অদ্ভূত ধরনের কথাবার্তা বর্ণিত আছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও মুকাতিল (রহঃ) থেকে তাদের উচ্চতা বার হাত তথা ১৮ ফুট বর্ণিত আছে। বলাবাহুল্য, তাঁরা ইসরাঈলী রেওয়ায়েত দৃষ্টেই একথা বলেছেন।[৪]

কোন কোন তফসীরবিদ বলেনঃ ইরাম আদ তনয় শাদ্দাদ একটি বেহেশত নির্মাণ করে। এই অনুপম প্রাসাদটি বহু স্তম্ভের উপর দন্ডায়মান ছিল এবং স্বর্ণ-রৌপ্য ও মণিমুক্তা দ্বারা নির্মিত ছিল, যাতে মানুষ পরকালের বেহেশতের পরিবর্তে এ বেহেশতকে পছন্দ করে নেয়। কিন্তু এই বিরাট প্রাসাদটি নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হওয়ার পর যখন শাদ্দাদ তার সভাসদ নিয়ে এ বেহেশতে প্রবেশ করার ইচ্ছা করল, তখন আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে আযাব নাযিল হল। ফলে সাবাই ধ্বংস হয়ে গেল এবং কৃত্রিম বেহেশতও ধূলিসাৎ হয়ে গেল।[৫]

ফেরাউনকে কীলকওয়ালা বলার বিভিন্ন কারণ তফসীরবিদগণ বর্ণনা করেছেন। অন্য এক তফসীরের বর্ণিত রয়েছে যে, এই শব্দের মধ্যে তার জুলুম-নিপীড়ন ও শাস্তির বর্ণনা রয়েছে। ফেরাউন যার প্রতি কুপিত হত, তার চার হাত-পায়ে কীলক মেরে রৌদ্রে শুইয়ে তার শরীরের উপর সাপ-বিচ্ছু ছেড়ে দিত। কোন কোন তফসীরবিদ এ প্রসঙ্গে ফেরাউনের স্ত্রী আছিয়া আল্লাহ্‌র উপর ঈমান আনার ফলে ফেরাউন তাঁকে এ ধরনের শাস্তি দেয়ার দীর্ঘ কাহিনী বর্ণনা করেছেন।[৬]

আদ, সামূদ এবং ফেরাউন গোত্রের অপকীর্তির ফলে আল্লাহ্‌ তা'আলা তাদের উপর আযাব নাযিল করেছেন। আল্লাহ্‌ তা'আলা প্রতিটি লোকের প্রতিটি ক্রিয়া-কর্ম ও গতিবিধির উপর দৃষ্টি রাখছেন এবং সবাইকে তার প্রতিদান ও শাক্তি দেবেন।

আপতিত গজব[সম্পাদনা]

আদ-এর অমার্জনীয় পাপের ফলে প্রাথমিক গজব হিসাবে তিন বছর বৃষ্টিপাত বন্ধ থাকে। তাদের শস্যক্ষেত সমূহ শুষ্ক বালুকাময় মরুভূমিতে পরিণত হয়। বাগ-বাগিচা জ্বলে-পুড়ে যায়। এতেও তারা শিরক ও মূর্তিপূজা ত্যাগ করেনি। কিন্তু অবশেষে তারা বাধ্য হয়ে আল্লাহর কাছে বৃষ্টি প্রার্থনা করে। তখন আসমানে সাদা, কালো ও লাল মেঘ দেখা দেয় এবং গায়েবী আওয়ায আসে যে, "তোমরা কোনটি পছন্দ করো?" লোকেরা বলল কালো মেঘ। তখন কালো মেঘ এলো। লোকেরা তাকে স্বাগত জানিয়ে বলল, "এটি আমাদের বৃষ্টি দেবে"। জবাবে বলা হয়,

ফলে অবশেষে পরদিন ভোরে আল্লাহর চূড়ান্ত গজব নেমে আসে। সাত রাত্রি ও আট দিন ব্যাপী অনবরত ঝড়-তুফান বইতে থাকে। মেঘের বিকট গর্জন ও বজ্রাঘাতে বাড়ী-ঘর সব ধ্বসে যায়, প্রবল ঘুর্ণিঝড়ে গাছ-পালা সব উপড়ে যায়, মানুষ ও জীবজন্তু শূন্যে উত্থিত হয়ে সজোরে যমীনে পতিত হয়।[৯][১০]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. কুরতুবী, আ‘রাফ ৬৫।
  2. "৮৯) সূরা আল ফজর ( মক্কায় অবতীর্ণ ), আয়াত সংখাঃ ৩০"www.ourholyquran.com। ২০১৮-০৮-২২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১৮-০৭-৩১ 
  3. "অহঙ্কারী আদ জাতি"The Daily Sangram। সংগ্রহের তারিখ ২০১৮-০৭-৩১ 
  4. তফসীর মাআরেফুল কোরআন
  5. কুরতুবী
  6. মাযাহারী
  7. সূরা আল আহক্বাফ ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ৬ আগস্ট ২০১৭ তারিখে, আয়াত ২৪-২৫, মারেফুল কোরআন।
  8. ইবনু কাছীর, সূরা আ‘রাফ ৭১।
  9. সূরা আল ক্বামার ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ১৫ আগস্ট ২০১৭ তারিখে, আয়াত ১৮-২১, মারেফুল কোরআন।
  10. সূরা আল হাক্বক্বাহ ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ৬ আগস্ট ২০১৭ তারিখে, আয়াত ৬-৮, মারেফুল কোরআন।

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]