অপটিক্যাল ফাইবার

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
একগুচ্ছ অপটিক্যাল ফাইবার। তত্ত্বীয়গতভাবে, উন্নত প্রযুক্তি যেমন DWDM ব্যবহারের ফলে তৈরি ছবির অল্প অপটিক্যাল ফাইবারগুলো সারা পৃথিবীতে বর্তমানে যত ডাটা ট্রান্সমিশন হয় তার সবগুলোর সমষ্টিগত ব্যান্ডউইডথ প্রদানে সক্ষম (~১০০ টেরাবিট প্রতি সেকেন্ডে প্রতি ফাইবারে [১] ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ২৮ আগস্ট ২০০৬ তারিখে)

অপটিক্যাল ফাইবার(ইংরেজি: Optical fiber) একধরনের পাতলা, স্বচ্ছ তন্তু বিশেষ, সাধারণত বিশুদ্ধ কাচ (সিলিকা) অথবা প্লাস্টিক দিয়ে বানানো হয়, যা আলো পরিবহনে ব্যবহৃত হয়। ফাইবার অপটিকস ফলিত বিজ্ঞান ও প্রকৌশলের সেই শাখা যা এই অপটিক্যাল ফাইবার বিষয়ে আলোচনা করে।

অপটিক্যাল ফাইবার দিয়ে লম্বা দুরত্বে অনেক কম সময়ে বিপুল পরিমাণ তথ্য পরিবহন করা যায়। অপটিক্যাল ফাইবারের আরো অনেক সুবিধার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- এই ব্যবস্থায় তথ্য পরিবহনে তথ্য ক্ষয় কম হয়, তড়িৎ-চুম্বকীয় প্রভাব থেকে মুক্ত ইত্যাদি।

অপটিক্যাল ফাইবার সাধারণত টেলিযোগাযোগের ক্ষেত্রে বহুল ব্যবহৃত হচ্ছে। এছাড়া আলোকসজ্জা, সেন্সর ও ছবি সম্পাদনার কাজেও বর্তমানে ব্যবহৃত হচ্ছে।

অপটিকাল ফাইবারগুলি সাধারণত স্বচ্ছ আবরণ দ্বারা পরিবেষ্টিত একটি নিম্ন সূচক সহ একটি কোর অন্তর্ভুক্ত করে। মোট অভ্যন্তরীণ প্রতিবিম্বের ঘটনা দ্বারা আলোককে মূল অংশে রাখা হয় যা ফাইবারকে ওয়েভগাইড হিসাবে কাজ করে [ অনেকগুলি প্রচারের পথ বা ট্রান্সভার্স মোডগুলিকে সমর্থনকারী ফাইবারগুলিকে মাল্টি-মোড ফাইবার বলা হয়, অন্যদিকে যারা একক মোডকে সমর্থন করে তাদের একক মোড ফাইবার (এসএমএফ) বলা হয়। মাল্টি-মোড ফাইবারগুলির সাধারণত একটি বৃহত্তর মূল ব্যাস থাকে এবং স্বল্প-দূরত্বের যোগাযোগ লিঙ্কগুলির জন্য এবং উচ্চতর শক্তি অবশ্যই প্রেরণ করতে হবে এমন অ্যাপ্লিকেশনগুলির জন্য ব্যবহৃত হয় একক-মোড ফাইবারগুলি বেশিরভাগ যোগাযোগের লিঙ্কগুলির জন্য 1,000 মিটার (৩,৩০০ ফুট) থেকে বেশি দীর্ঘ ব্যবহৃত হয় উদ্ধৃতি আবশ্যক

কম ক্ষতি সহ অপটিক্যাল ফাইবারগুলিতে যোগদান করতে সক্ষম হওয়া ফাইবার অপটিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ 9 এটি বৈদ্যুতিক তার বা তারের সাথে যুক্ত হওয়ার চেয়ে জটিল এবং এতে তন্তুগুলির যত্ন সহকারে ক্লিভিং, ফাইবার কোরগুলির সঠিক প্রান্তিককরণ এবং এই সারিবদ্ধ কোরগুলির সংমিশ্রণের সাথে জড়িত। স্থায়ী সংযোগের দাবি করে এমন অ্যাপ্লিকেশনগুলির জন্য একটি ফিউশন স্প্লাইস সাধারণ। এই কৌশলটিতে, একটি বৈদ্যুতিক চাপ একটির সাথে তন্তুগুলির শেষ প্রান্তে গলানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। আর একটি সাধারণ কৌশল হ'ল একটি যান্ত্রিক স্প্লাইস, যেখানে তন্তুগুলির শেষগুলি যান্ত্রিক শক্তি দ্বারা যোগাযোগে রাখা হয়। অস্থায়ী বা আধা-স্থায়ী সংযোগগুলি বিশেষায়িত অপটিক্যাল ফাইবার সংযোগকারীগুলির মাধ্যমে তৈরি হয় 10

অপটিকাল ফাইবারগুলির নকশা এবং প্রয়োগের সাথে সম্পর্কিত প্রয়োগযুক্ত বিজ্ঞান এবং প্রকৌশল ক্ষেত্রটি ফাইবার অপটিক্স হিসাবে পরিচিত। এই শব্দটি তৈরি করেছিলেন ভারতীয়-আমেরিকান পদার্থবিজ্ঞানী নরিন্দর সিং কাপ্পানি, যিনি ফাইবার অপটিক্সের জনক হিসাবে সর্বজনস্বীকৃত। [১১]

ইতিহাস[সম্পাদনা]

প্রতিসরণের মাধ্যমে আলোক প্রেরণ (যা ফাইবার অপটিক্সকে সম্ভব করে তুলেছে) এর ধারণা প্রথম আবিষ্ক্ার করেন জ্যাকিস বেবিনেট এবং ডেনিয়েল কোলাডন, ১৮৪০ সালে, প্যারিসে। ১২ বছর পরে জন টিন্ডাল লণ্ডনে এ বিষয়ে তাঁর ধারণা ব্যাখ্যা করেন। ১৮৭০ সালে টিণ্ডাল তাঁর আলোর ধর্ম সম্পর্কিত একটি বইয়ে আলোর পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলন বিষয়ে আলোকপাত করেন। আলো যখন বায়ু হতে পানিতে প্রতিসরিত হয়, তখন অভিলম্বের দিকে বেঁকে যায়, আর পানি হতে বায়ুতে প্রতিসরিত হবার সময় অভিলম্ব হতে দূরে সরে যায়। যদি আলোকরশ্মি পানি হতে প্রতিসরণের সময় ৪৮° এর বেশি কোণে আপতিত হয়, তবে আলোক রশ্মি কোনক্রমেই পানি মাধ্যম হতে প্রতিসরিত হয় না। তখন পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলন ঘটে। আপতন কোণের যে মান থেকে পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলন শুরু হয়, তাকে সংকট কোণ বলে। পানির ক্ষেত্রে সংকট কোণের মান প্রায় ৪৮°২৭', যেখানে ফ্লিন্ট কাঁচের ক্ষেত্রে এর মান ৩৮°৪১', হীরকের ক্ষেত্রে এই মান ২৩°৪২' মানের হয়।

১৯ শতকের শেষ ও ২০ শতকের শুরুর দিকে দেহাভ্যন্তরকে আলোকিত করার কাজে বাঁকানো কাঁচনলকে আলোক সঞ্চারক রূপে ব্যবহার করা হতো। বিশ শতকের শুরুর দিকে দাঁতের চিকিৎসায় মুখাভ্যান্তরভাগ আলোকিত করার কাজে সরু কাঁচনলের প্রায়োগিক ব্যবহার শুরু হয়। নলের মধ্য দিয়ে প্রতিবিম্ব প্রেরণের পদ্ধতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রথমে ব্যবহার করেন টেলিভিশন পাইওনিয়ার জন লজি বেয়ার্ড ও রেডিও নিরীক্ষক ক্ল্যারেন্স হ্যানসেল, ১৯২০ সালে। ১৯৩০ এর দশকে, হেনরিখ ল্যাম দেখান যে, কেউ আনল্যাড অপটিকাল ফাইবারগুলির একটি বান্ডিলের মাধ্যমে চিত্রগুলি সঞ্চারিত করতে পারে এবং তিনি এটি অভ্যন্তরীণ চিকিৎসা পরীক্ষার জন্য ব্যবহার করেন। তবে তাঁর কাজটি পরবির্তীতে বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিল।

অপটিকাল ফাইবারগুলি অপটিক্যাল রাসায়নিক সেন্সর এবং অপটিকাল বায়োসেন্সরগুলির উপাদান হিসাবে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় ৪৫

অপটিক্যাল ফাইবারের মূলনীতি[সম্পাদনা]

অপটিক্যাল ফাইবার একটি সিলিন্ডার আকৃতির ডাই-ইলেক্ট্রিক আলোক মাধ্যম যা এর অক্ষ বরাবর পূর্ণ আভ্যন্তরীন প্রতিফলন প্রক্রিয়ায় আলো পরিবহন করে। তন্তুটি ঘন কোর (core) ও পরিবেষ্টিত ক্ল্যাডিং (cladding) স্তরে বিভক্ত। পূর্ণ আভ্যন্তরীন প্রক্রিয়ায় আলোক সংকেত পরিবহনের পূর্বশর্ত হচ্ছে কোরের প্রতিসরাঙ্ক ক্ল্যাডিং-এর থেকে বেশি হতে হবে। ক্ল্যাডিং ও কোরের সীমানায় প্রতিসরণাঙ্কের পরিবর্তন খাড়া (abrupt) হতে পারে (স্টেপ-ইনডেক্স ফাইবার (step-index fiber) এর বেলায়), অথবা ঢালু (gradual) হতে পারে (গ্রেডেড-ইনডেক্স ফাইবার (graded-index fiber) এর বেলায়)।

ছবিতে মাল্টি-মোড অপটিক্যাল (multi-mode optical fiber) ফাইবার এ আলোর প্রবাহ দেখানো হয়েছে

বড় ব্যাসের (১০ μm থেকে বড়) তন্তুর ধর্মাবলী আলোক জ্যামিতির সাহায্যে বিশ্লেষন করা যায়। তড়িৎ-চুম্বকীয় বিশ্লেষনে এ ধরনের তন্তুকে বলে মাল্টি-মোড ফাইবার (multi-mode fiber)। স্টেপ-ইনডেক্স ফাইবারে আলোক রশ্মি তন্তুর কোর দিয়ে পূর্ণ আভ্যন্তরীন প্রতিফলনের মাধ্যমে প্রবাহিত হয়। যে সমস্ত রশ্মি কোর-ক্ল্যাডিং সীমানায় সঙ্কট কোণের চেয়ে বড় কোণে আপতিত হয় সেগুলো পরিপূর্ণভাবে প্রতিফলিত হয়। সঙ্কট কোণ, কোর ও ক্ল্যাডিং এর উপাদানের প্রতিসরাঙ্কের পার্থক্যের উপর নির্ভর করে। যে সমস্ত রশ্মি অল্প কোণে আপতিত হয় সেগুলো ক্ল্যাডিং এ প্রতিসরিত হয় যা কোরে আলোক প্রবাহের জন্য অণুপযুক্ত হয়ে যায়। এইভাবে পূর্ণ আভ্যন্তরীন প্রতিফলনের জন্য সর্বনিম্ন কোণ তন্তুর অ্যাকসেপ্টেন্স অ্যাঙ্গেল (acceptance angle) নির্ধারণ করে যা সাধারণভাবে নিউমেরিক্যাল অ্যাপারচার নামে পরিচিত। উচ্চ নিউমেরিক্যাল অ্যাপারচারের কোন তন্তু ব্যবহার করলে ট্রান্সমিটার বা প্রচারযন্ত্র এবং রিসিভার বা গ্রাহকযন্ত্র সহজে তন্তু দিয়ে আলোক সংকেত পরিবহন করতে পারে। কিন্তু কোরের কাছে বিভিন্ন কোণে আলোক রশ্মি প্রবাহিত হলে, উচ্চ নিমেরিক্যাল অ্যাপারচারের কোন তন্তুর বহু-পথে ছড়ানো (multi-path spreading), বা বিচ্যুতি (dispersion), ঘটে।

গ্রেডেড-ইনডেক্স ফাইবারের ক্ষেত্রে কোরের প্রতিসরাঙ্ক অক্ষ থেকে ক্ল্যাডিং এর দিকে ক্রমশ কমতে থাকে। এর ফলে আলো যখন ক্ল্যাডিং এর দিকে যায় তখন সরাসরি কোর-ক্ল্যাডিং তলে প্রতিফলিত না হয়ে সূক্ষ্মভাবে বেঁকে যেতে থাকে। এর ফলে বৃত্তচাপের মত আলোক পথ তৈরি হয় যার ফলে বহু পথে ছড়ানোর সমস্যা হ্রাস পায়। প্রতিসরাঙ্কের পরিবর্তন এমনভাবে করা হয় যাতে বিভিন্ন কোনে প্রবাহিত আলোকরশ্মির গতি প্রায় সমান হয়। আদর্শ প্রতিসরাঙ্কের পরিবর্তন অক্ষ থেকে দুরত্ব ও প্রতিসরাঙ্ক এর মধ্যকার অধিবৃত্তীয় সমীকরণের প্রায় কাছাকাছি।

যেসব তন্তুর ব্যাস খুব কম (আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের সামান্য ছোট) সে রকম তন্তুতে কেবল একটি আলোক রশ্মি প্রবাহিত করা যায়। এ ধরনের অপটিক্যাল ফাইবারকে বলে সিঙ্গেল-মোড অপটিক্যাল ফাইবার (Single-mode optical fiber) অথবা মনো-মোড ফাইবার। তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায় পরিবাহিত আলোক শক্তি সম্পূর্ণভাবে কোরে বিরাজ করে না, ক্যাডিং এও শক্তির (বিশেষ করে মনো-মোড এর বেলায়) উল্লেখযোগ্য অংশ পরিবাহিত হয়।

চিত্র:Singlemode-optical-fibre.png
একটি সাধারণ সিঙ্গেল-মোড অপ্টিক্যাল ফাইবার

সাধারণ সিঙ্গেল-মোড ফাইবারের কোরের ব্যাস হয় ৮ থেকে ১০ মাইক্রোমিটার। মোডের গঠন আবার ব্যবহৃত আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের উপর নির্ভর করে। মাল্টি-মোড ফাইবারের কোরের ব্যাস হয়ে থাকে ৫০µm, ৬২.৫ µm, অথবা আরো বেশি।

বিশেষ প্রয়োজনে অপটিক্যাল ফাইবারের কোরের গঠন গোলাকার না হয়ে উপবৃত্তাকার অথবা চতুস্কোনীয় হতে পারে। এর মধ্যে পড়ে পোলারাইজেশন-মেইনটেইনিং অপটিক্যাল ফাইবার (polarization-maintaining optical fiber)হুইস্পারিং গ্যালারি মোড (whispering gallery mode) দূর করার জন্য বিশেষ ফাইবার।

২ মেগাওয়াট/বর্গ সেন্টিমিটার এর অধিক আলোক তীব্রতায় কোন অপটিক্যাল ফাইবার শক বা অন্য কারণে জ্বলে গেলে ফাইবার ফিউজ (fiber fuse) ঘটে। তখন ভাঙ্গার পূর্বেই ফাইবারটি বাস্পীভূত হয়ে যায় এবং প্রবাহ বন্ধ না হয়ে ১-৩ মিটার/সেকেন্ড বেগে প্রবাহিত হতে থাকে [১],[২],[৩]

উপাদান[সম্পাদনা]

কাচের অপটিক্যাল ফাইবার সাধারণত সবসময় বালি (silica) থেকে তৈরি করা হয়। স্বল্প-তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের অবলোহিত (infrared) আলোর জন্য কখনও কখনও ফ্লুরোজিরকোনাইট (fluorozirconate), ফ্লুরোঅ্যালুমিনেট (fluoroaluminate), এবং ক্যালকোজেনাইড (chalcogenide) কাচ ব্যবহার করা হয়। অন্যান্য কাচের মত এদের প্রতিসরণাঙ্ক প্রায় ১.৫। সাধারণত কোর ও ক্ল্যাডিং এর মধ্যে প্রতিসরণাঙ্কের পার্থক্য হয় ১%।

প্লাস্টিক অপটিক্যাল ফাইবার (Plastic optical fiber) (POF) সাধারণত স্টেপ-ইনডেক্স মাল্টিমোড ফাইবারে ব্যবহৃত হয় যার কোরের ব্যাস ১ মিমি অথবা বেশি। POF এর এটেনিউয়েশন (attenuation) সাধারণত বেশি হয় (অর্থাৎ এটিতে আলোক সংকেতের শক্তি দ্রুততর কমতে থাকে), ১ ডেসিবল/মিটার বা বেশি, এবং এই উচ্চ হারের কারণে POF এর কাজের পরিধি সীমিত।

ইলেক্ট্রনিক প্রতিবন্ধকতা[সম্পাদনা]

অপটিক্যাল ফাইবার প্রতিসেকেন্ডে ২৫ টেরাবিট তথ্য আদান প্রদানে সক্ষম, কিন্তু ইলেক্ট্রনিক পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াজাতকৃত তথ্য সংকেত (signal) প্রতি সেকেন্ডে ১-১০ গিগাবিটের বেশি তথ্য তৈরি করতে পারে না। তাই অপটিক্যাল ফাইবার তার পূর্ণ ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারে না। এ সমস্যা দূর করতে হলে আলোকীয় সংকেত প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রক্রিয়া ব্যবহার করতে হবে। ধারণা করা হয়ে থাকে, যদি সকল যোগাযোগ নেটওয়ার্ক অপটিক্যাল হয়ে থাকে, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাদার্স ডে উপলক্ষে একদিনে যত টেলিফোন কল করা হয়ে থাকে, তার সবই একযোগে একটি মাত্র অপটিক্যাল ফাইবারের মধ্য দিয়ে পাঠানো সম্ভব।

অপটিক্যাল ফাইবার যোগাযোগ ব্যবস্থা[সম্পাদনা]

অপটিক্যাল ফাইবার টেলিযোগাযোগ বা কম্পিউটার নেটওয়ার্কিংয়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে কারণ এটিকে সহজে বাকানো যায় ও সাধারণ তারের মত ব্যবহার করা যায়।যদিও অপটিক্যাল ফাইবার স্বচ্ছ কাচ বা প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি হতে পারে তবে দূরবর্তী যোগাযোগের জন্য সবসময় কাচের অপটিক্যাল ফাইবার ব্যবহৃত হয়, কারণ এতে তড়িৎ-চুম্বকীয় বিকিরণ কম হয়। মাল্টি-মোড ও সিঙ্গল-মোড দুই ধরনের তন্তুই ব্যবহৃত হয়। তবে মাল্টি-মোড স্বল্প দূরত্বের (৫০০ মিটার) জন্য ও সিঙ্গল-মোড দীর্ঘ দূরত্বের লিঙ্ক (links) এর জন্য উপযোগী। যেহেতু সিঙ্গল-মোডে সূক্ষ্ম পরিমাপের প্রয়োজন বেশি সেহেতু সিঙ্গল-মোড ট্রান্সমিটার, রিসিভার, অ্যাম্পলিফায়ার ও অন্যান্য যন্ত্রাংশের দাম সাধারণত বেশি।

সাধারণত অবলোহিত রশ্মি অপটিক্যাল ফাইবার যোগাযোগে ব্যবহৃত হয়। তন্তুর শোষন (fiber absorption) ১৫৫০ ন্যানোমিটার আলোর জন্য সবচেয়ে কম এবং বিচ্যুতি (dispersion)১৩১০ ন্যানোমিটারে সবচেয়ে কম, ফলে এগুলোই তথ্য পরিবহনের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। ৮৫০ ন্যানোমিটারে একটি লোকাল মিনিমাম পাওয়া যায়, যে তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের জন্য কম খরচে ট্রান্সমিটার ও রিসিভার বানানো যায়। ফলে এই তরঙ্গদৈর্ঘ্য প্রায়শ স্বল্প দূরত্বের জন্য ব্যবহৃত হয়ে থাকে। অপটিক্যাল ফাইবার সাধারণত জোড়ায় জোড়ায় ব্যবহৃত হয়, যার প্রতিটি বিপরীত দিকে তথ্য আদান-প্রদানে ব্যবহৃত হয়।

যেহেতু কাচের প্রতিসরণাঙ্ক প্রায় ১.৫, ফাইবারে আলোর গতিবেগ প্রায় ২০০,০০০ কিমি/সেকেন্ড, বা শুন্যে আলোর গতির দুই তৃতীয়াংশ।

আধুনিক কাচের অপটিক্যাল ফাইবারের বেলায় সর্বোচ্চ দূরত্ব আলোর বিচ্যুতির (dispersion) কারণে সীমাবদ্ধ। অপটিক্যাল ফাইবারের এই বিচ্যুতি (Dispersion) বিভিন্ন কারণে হতে পারে।

যোগাযোগব্যবস্থায় অপটিক্যাল ফাইবার নাকি ইলেকট্রিক্যাল (বা তামা) তার কোনটি ব্যবহার করা হবে তা কিছু বিষয়ের উপর নির্ভর করে। যেসব ক্ষেত্রে উচ্চ ব্যান্ডউইডথ দরকার বা অধিক দূরত্বে তথ্য প্রেরণ করতে হলে সাধারণত অপটিক্যাল ফাইবার পছন্দনীয়। এর প্রধান সুবিধা হচ্ছে এতে তথ্যের ক্ষতি খুব কম হয়, ফলে অধিক দূরত্বে অ্যাম্পলিফায়ার বা রিপিটার ছাড়াই ব্যবহার করা যায়। এবং এর ডাটা-পরিবহন ক্ষমতা এতই বেশি যে এই ক্ষমতা পেতে হাজার হাজার ইলেকট্রিক্যাল লিঙ্ক লাগবে কেবল একটি অপটিক্যাল ফাইবারকে প্রতিস্থাপন করতে। ফাইবার তামার তুলনায় অনেক হালকা: ৭০০ কিমি টেলিযোগাযোগ তামার কেবলের ওজন ২০ টন। এই একই কেবল যদি ফাইবার দিয়ে বানানো হয় তাহলে লাগে কেবল ৭ কেজি কাঁচ[৪]। আরও সুবিধা হচ্ছে একাধিক ফাইবার পাশাপাশি অনেক দুরত্ব অতিক্রম করলেও ক্রসটক হয় না, যা কিনা কোন কোন ইলেকট্রিক কেবলের একটি সমস্যা।

স্বল্প দূরত্বে ও অল্প ব্যান্ডউইডথের ব্যবস্থায় তড়িৎ যোগাযোগ ব্যবহৃত হয়, কারণঃ

  • উপাদানের খরচ কম
  • ট্রান্সমিটার ও রিসিভার এর খরচ কম
  • Splicing সহজ
  • তড়িৎ শক্তি ও সংকেত একই সাথে পাঠানোর ক্ষমতা

তড়িৎ যোগাযোগের এই সুবিধার কারণে সাধারণত স্বল্প দুরত্বের ব্যবস্থায় অপটিক্যাল ফাইবার ব্যবহৃত হয় না, তবে গবেষণাগারে এসব প্রযুক্তি তৈরি করা হয়েছে।

কোন কোন ক্ষেত্রে স্বল্প দূরত্বে অথবা কম ব্যান্ডউইডথরে কোন ব্যবস্থায়ও অপটিক্যাল ফাইবার ব্যবহৃত হতে পারে, কারণঃ

  • তড়িৎ-চুম্বকীয় বাধা (ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ইন্টারফেরেন্স), আণবিক তেজস্ক্রিয়তা প্রতিরোধে অপটিক্যাল ফাইবার কার্যকর।
  • উচ্চ বৈদ্যুতিক রোধ, যার কারণে উচ্চ ভোল্টের বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির মাঝেও ব্যবহার করা যায়।
  • হালকা ওজন, যা বিশেষ করে আকাশযানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
  • কোন স্পার্ক হয় না, ফলে দাহ্য বস্তুর সাথেও ব্যবহার করা যায়।
  • কোন তড়িৎ-চুম্বকীয় বিকিরন হয় না, এবং সঙ্কেত না নষ্ট করে ট্যাপ করা কঠিন, যা নিরাপত্তা ব্যবস্থায় অতি গুরুত্বপূর্ণ।
  • তারের আকার ছোট।

সরকারি মান[সম্পাদনা]

অনেক প্রস্তুতকারক অপটিক্যাল ফাইবার তৈরি করে থাকে। এদের ফাইবারগুলো যাতে যেকোন ব্যবস্থায় ঠিকমত কাজ করতে পারে এজন্য কিছু মান তৈরি করা হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন ফাইবার সম্পর্কিত কতগুলো মান প্রকাশ করেছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যঃ

  • ITU-T G.651, "৫০/১২৫ µm মাল্টিমোড গ্রেডেড ইনডেক্স অপটিক্যাল ফাইবার কেবলের ধর্মাবলী"
  • ITU-T G.652, "সিঙ্গেল মোড অপটিক্যাল ফাইবার কেবলের ধর্মাবলী"

বিভিন্ন সংস্থা থেকে অন্যান্য মান প্রকাশিত হয়েছে, যা ফাইবারের বিভিন্ন কর্মদক্ষতা নির্দেশ করে। কয়েকটি মান হলঃ

ফাইবার অপটিক সেন্সর[সম্পাদনা]

টান, তাপমাত্রা, চাপ ও আরো অনেক উপাত্ত সংগ্রহের মাধ্যম (Sensor) হিসেবে অপ্টিক্যাল ফাইবারকে ব্যবহার করা যায়। ছোট আকৃতি এবং কম বিদ্যুৎ খরচের কারণে তড়িৎ সেন্সরের থেকে অপটিক্যাল ফাইবারের সুবিধা বেশি।

সেসিমিক সোনারের হাইড্রোফোন হিসেবে অপটিক্যাল ফাইবার ব্যবহৃত হচ্ছে। ১০০ এর বেশি সেন্সর নিয়ে হাইড্রোফোন সিস্টেম তৈরি হয়েছে। তেল শিল্পে হাইড্রোফোন সেন্সর সিস্টেম ব্যবহৃত হচ্ছে। একটি জার্মান প্রতিষ্ঠান অপটিক্যাল ফাইবার দিয়ে লেজার মাইক্রোফোনও তৈরি করেছে।

তেলকুপের তাপমাত্রা ও চাপের জন্য অপটিক্যাল ফাইবার সেন্সর তৈরি হয়েছে। এসব কাজের জন্য ফাইবার অপটিক উপযুক্ত কারণ অর্ধ-পরিবাহী সেন্সরগুলি এই তাপমাত্রা ও চাপ সহ্য করতে পারে না।

বোয়িং ৭৬৭ এর অপটিক্যাল গাইরোস্কোপ সেন্সর হিসেবেও অপটিক্যাল ফাইবার ব্যবহৃত হচ্ছে। কোন কোন গাড়িতেও আজকাল অপটিক্যাল ফাইবার ব্যবহৃত হচ্ছে।

অপটিক্যাল ফাইবারের অন্যান্য ব্যবহার[সম্পাদনা]

গঠন[সম্পাদনা]

  • ইন্টারনেট।
  • ক্যাবল ডিস।
  • শেয়ারিং।

অপটিক্যাল ফাইবার কেবলস[সম্পাদনা]

ক্যাবল বা তার মাধ্যমের একটি আদর্শ এবং শক্তিশালী উদাহরণ হলো অপটিক্যাল ফাইবার কেবল বা ফাইবার অপটিক ক্যাবল। অপটিক্যাল ফাইবার কেবল হলো অত্যন্ত সরু এক ধরনের কাচের তন্তু।

গঠন: ৩ টি স্তর থাকে। যথা:

  • ১. কোর (Core)
  • ২. ক্ল্যাডিং (Cladding)
  • ৩. জ্যাকেট (Jacket)

যেভাবে কাজ করে: পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে ইলেকট্রিকাল সিগন্যালের পরিবর্তে আলোক বা লাইট সিগন্যাল করে কাজ করে এবং ডেটা আদান-প্রদানের জন্য লেজার রশ্নি ব্যবহার করে।

শেষ সংযোগস্থান ও বিভক্তি (Termination and splicing)[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "The Risks Digest Volume 12: Issue 44"। সংগ্রহের তারিখ December 4  অজানা প্যারামিটার |accessyear= উপেক্ষা করা হয়েছে (|access-date= ব্যবহারের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে) (সাহায্য); এখানে তারিখের মান পরীক্ষা করুন: |সংগ্রহের-তারিখ= (সাহায্য)
  2. "Optics Letters"। সংগ্রহের তারিখ December 4  অজানা প্যারামিটার |accessyear= উপেক্ষা করা হয়েছে (|access-date= ব্যবহারের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে) (সাহায্য); এখানে তারিখের মান পরীক্ষা করুন: |সংগ্রহের-তারিখ= (সাহায্য)
  3. "Photonics Spectra"। ৮ জানুয়ারি ২০০৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ December 4  অজানা প্যারামিটার |accessyear= উপেক্ষা করা হয়েছে (|access-date= ব্যবহারের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে) (সাহায্য); এখানে তারিখের মান পরীক্ষা করুন: |সংগ্রহের-তারিখ= (সাহায্য)
  4. Longman Write-on Notes, Year 12 NCEA Physics Reference

গ্রন্থপঞ্জি[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]