শায়েস্তা খাঁ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

শায়েস্তা খাঁ মোগল আমলের এক জন বিখ্যাত সুবাদার বা প্রাদেশিক শাসক ছিলেন। তার খ্যাতি মূলত বাংলার সুবাদার হিসাবে। দু'দফায় সর্বমোট ২২ বছর তিনি বাংলা শাসন করেন। প্রথমে ১৬৬৪ থেকে ১৬৭৮ সাল এবং দ্বিতীয় বার ১৬৮০ থেকে ১৬৮৮ সাল। তার শাসনামলে ঢাকায় ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয় এবং এই প্রদেশে মুঘল শাসনের শ্রেষ্ঠ সময় অতিবাহিত হয়।

প্রারম্ভিক জীবন[সম্পাদনা]

মির্জা আবু তালিবের পূর্বপুরুষ ইরান থেকে আগত এবং মুঘল রয়াল পরিবারের সাথেও তার সম্পর্ক ছিল। মির্জার বাবা আসাফ খান এবং দাদা মির্জা গিয়াস বেগ ইতিমাদুদ্দৌলা দু’জনেই মুঘল সাম্রাজ্যের ওয়াজির বা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বাদশাহ শাহজাহান মির্জাকে শায়েস্তা খাঁ উপাধিতে ভূষিত করেন। এর কারণ ছিল মুঘল দরবারে তার পরিবারের অবদান ও স্বীকৃতি। শায়েস্তা খাঁ মুঘল সেনাবাহিনী ও দরবারে অনুশীলন গ্রহণ করেন এবং চাকরি করেন। ফলশ্রুতিতে তিনি ক্রশশ পদোন্নতি লাভ করতে থাকেন এবং একাধিক প্রদেশের গভর্নর হন। এছাড়াও তিনি একজন সফল সেনাপতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। গোলকন্দার সম্রাটের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় তিনি যুবরাজ আওরঙ্গজেবের সাথে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। সাম্রাজ্যে অধিষ্ঠিত হবার পর সম্রাট আওরঙ্গজেব তাকে আরো পদোন্নতি দান করে আমির-উল-উমারা বা নোবেলদের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন। আওরঙ্গজেবের আপন ভাই দারা শিকোর বিরুদ্ধে কর্মসূচীর অংশ হিসেবে তিনি তাকে এ পদবি দান করেন। ১৬৬৩ খ্রিস্টাব্দে মীর জুমলার মৃত্যুর পর শায়েস্তা খাঁ বাংলার সুবাদার পদে নিযুক্ত হন।

শিবাজীর সাথে সম্মুখযুদ্ধ[সম্পাদনা]

১৬৬০ খ্রিস্টাব্দে ডেক্কনের শিবাজীকে পরাস্ত করার জন্য শায়েস্তা খাঁকে নিযুক্ত করেন আওরঙ্গজেব। শায়েস্তা খাঁ পুনেতে তাবু স্থাপন করেন এবং কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টিত মহলে প্রবেশ করেন। পুনে শহরে কোন মারাঠা ব্যক্তির প্রবেশাধিকার ছিল না। একদিন একটি বিবাহ অনুষ্ঠানের জন্য উৎসব পালনের উদ্দেশ্যে বিশেষ অনুমতি গ্রহণ করে শিবাজী এবং তার বাহিনী বরপক্ষ সেজে পুনেতে প্রবেশ করে। রক্ষীদের হত্যা করার পর দেওয়াল ভেঙ্গে তারা ঘরে প্রবেশ করে। শিবাজী নিজেই শায়েস্তা খাঁর মুখোমুখি হন এবং শিবাজীর তরবারির আঘাতে তার বৃদ্ধাঙ্গুলসহ তিনটি আঙ্গুল কেঁটে যায় এবং এর পরিণামে তার সংজ্ঞা হারিয়ে যায়। শায়েস্তা খাঁকে পরবর্তীতে উদ্ধার করে একটি নিরাপদ স্থানে পৌছে দেন তার অধীনস্থ কর্মীরা। পুনের ঘটনায় বিক্ষুব্ধ হয়ে আওরঙ্গজেব শায়েস্তা খাঁকে দুরবর্তী স্থান বাংলায় প্রেরণ করেন।

আরকানদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ[সম্পাদনা]

বাংলায় আগমনের ফলে শায়েস্তা খাঁকে দুর পাহাড়ী বিদ্রোহী উপজাতীয়দের দমন করতে দেখা যায়। শায়েস্তা খা আরাকান রাজাকে প্রচণ্ড হুমকি হিসেবে গণ্য করেছিলেন কেননা তারা সেনা ও নৌ শক্তিতে সমৃদ্ধ ছিল। তিনি তত্ক্ষণাত মুঘল নৌ-বাহিনীর উন্নয়ন শুরু করেন। এক বছরে নৌ-বহরের সংখ্যা প্রায় ৩০০ পৌছে। তিনি ডাচ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি ও সেই সাথে পর্তুগালের সমর্থন অর্জনের জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালান। ডাচ্ সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় শায়েস্তা খাঁ আরাকানদের দখলে থাকা সন্দ্বীপ আক্রমণে মুঘলদের নেতৃত্ব দেন। আরাকান ও পর্তুগিজদের মধ্যস্থ দ্বন্দ্বের ফলশ্রুতিতে শায়েস্তা খাঁ এক উল্লেখযোগ্য সুবিধা লাভ করেন। ১৬৬৫ এর ডিসেম্বরে শায়েস্তা খাঁ এক গুরুত্বপূর্ণ সেনা প্রচারনা চালু করেন চট্টগ্রামের বিরুদ্ধে, চট্টগ্রাম তখন ছিল আরাকানদের রাজধানী। সেখানে সাগরে এবং পরবর্তীতে কর্ণফুলীতে প্রচণ্ড নৌ-যুদ্ধ হয়, যাতে পর্তুগিজদের সহায়তায় মুঘলরা জয় লাভ করে। যুদ্ধে হেরে গিয়ে আরাকানী নৌবাহিনীর কিছু সৈন্য পালিয়ে যায় এবং কিছু দূর্গে আশ্রয় গ্রহণ করে। কিন্তু দূর্গটি ১৬৬৬ সালের ২৬শে জানুয়ারি শায়েস্তা খাঁ দখল করেন। সেই সাথে কুচবিহারকামপূরায় মুঘল সাম্রাজ্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন।

বাংলার গভর্নর[সম্পাদনা]

আরাকানদের বিরুদ্ধে জয়ের পর তিনি কয়েক হাজার কৃষকদের মুক্তি দানের নির্দেশ দেন। গভর্নর হিসেবে তিনি ইউরোপ, দক্ষিণ পূর্ব এশিয় ও ভারতের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করেন। তিনি ইউরোপীয়দের সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে তার অবস্থান সুসংহত করেন।

কীর্তি[সম্পাদনা]

শায়েস্তা খাঁ নির্মিত সাত গম্বুজ মসজিদ (১৮১৪)

শেষ সময়ে শায়েস্তা খাঁ ঢাকা ছেড়ে দিল্লিতে ফিরে যান। যাবার আগে তিনি ঢাকাকে স্থানীয় বাণিজ্য, রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে যান। তাঁর কল্যাণে ঢাকা একটি ছোট দাপ্তরিক কেন্দ্র থেকে বৃহত্ ও উন্নত শহরে পরিণত হয়। শায়েস্তা খাঁ মসজিদটি তার তৈরি একটি সুবৃহত্ কীর্তি যা তার প্রাসাদ সমতলে তৈরি করা হয়েছিল। বাংলা ও মুঘল স্থাপত্য কীর্তির মিশ্রণে তৈরি এই ঐতিহাসিক পুরাকীর্তিটি বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক সংরক্ষিত হয়েছে।

শায়েস্তা খাঁ নির্মিত স্থাপত্য[সম্পাদনা]

ঢাকার লালবাগে শায়স্তা খাঁর সদর দপ্তর ছিল। পুরনো ঢাকার বিভিন্ন স্থানে তার নির্মিত স্থাপত্য তার স্থাপত্যপ্রীতির পরিচায়ক।


তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  • Sir Jadunath Sarkar, History of Bengal, II (Dhaka, 1948)
  • Abdul Karim, History of Bengal, Mughal Period, I, (Rajshahi, 1992)
  • Duff, Grant, History of the Marhattas Oxford University Press, (London)

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]