ব্র্যান্ড

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
কোকা-কোলা লোগোর একটি উদাহরণ যা ব্যাপকভাবে-স্বীকৃত ট্রেডমার্ক এবং গ্লোবাল ব্র্যান্ড।

ব্র্যান্ড হচ্ছে একটি নাম, একটি টার্ম বা পরিচিতি, একটি সাইন বা নিদর্শন (স্মারকচিহ্ন), একটি সিম্বল বা প্রতীক এবং ডিজাইন বা নকশা (পরিকল্পনা) কিংবা সবগুলোর একটি সুসমন্বিত রূপ যা কোনো বিক্রেতা বা বিক্রেতা গোষ্ঠীর পণ্য ও সেবার নিজস্ব পরিচিতি গড়ে তোলে এবং প্রতিযোগীদের চেয়ে আালাদাভাবে উপস্থাপন করে। "[১] মূলত একটি ব্র্যান্ড হচ্ছে কোনো বিক্রেতার ধারাবাহিতভাবে স্বকীয় বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত পণ্য ও সেবা ক্রেতার কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি। তবে একটি সেরা ব্র্যান্ড হতে হলে অবশ্যই পণ্য বা সেবার গুণমানের নিশ্চয়তা থাকতে হবে। ব্যবসায়, বাজারজাতকরণ এবং বিপণন সংক্রান্ত কার্যাবলীতে ব্র্যান্ডের বহুল ব্যবহার লক্ষ্যনীয়।
হিসাববিজ্ঞান অনুসারে, ব্র্যান্ডকে 'অলীক সম্পত্তি' হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয় যেটি অনেকক্ষেত্রে একটি কোম্পানির উদ্বৃত্ত পত্রের খুব মূল্যবান সম্পত্তি হিসেবে স্বীকৃত। ব্র্যান্ড ভ্যালুয়েশন বা 'ব্র্যান্ড মূল্যায়ন' অত্যন্ত তাৎপর্য্যপূর্ণ ব্যবস্থাপকীয় কৌশল যার মাধ্যমে কোন ব্র্যান্ডের আর্থিক মূল্য নিরুপণ করা হয়। এটি শেয়ারহোল্ডারদের মূল্য বৃদ্ধির জন্য বিপণনসংক্রান্ত বিনিয়োগ সঠিকভাবে পরিচালনায় সাহায্য করে।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

ব্র্যান্ড শব্দটির উৎপত্তি ঘটেছে 'Brandr' শব্দটি থেকে যার অর্থ হচ্ছে 'পোড়ানো'।[২] প্রাথমিক পর্যায়ে, গবাদিপশুর মালিকগণ তাদের নিজ নিজ পশুকে অন্যান্য মালিকের পশুর চাইতে আলাদাভাবে সনাক্ত করার সুবিধার্থে খাঁজকাটা ধাতব বস্তু পুড়িয়ে তা দিয়ে পশুর শরীরে একটি মার্ক বা চিহ্ন বসিয়ে দিতেন।
প্রাচীনতম ব্র্যান্ডের উদাহরণটি খুঁজে পাওয়া যায় ভারতে বৈদিক যুগে (খৃষ্টপূর্ব ১১০০ সন- খৃষ্টপূর্ব ৫০০ সন), যেটি ছিলো 'চয়নপ্রাস' নামক একটি ভেষজ পেস্ট।[৩] ১৩শ শতাব্দীতে ইতালীয়রা কাগজের ওপর জলছাপ আঁকার মাধ্যমে ব্র্যান্ড ব্যবহার শুরু করে।[৪] প্যাকেটজাত পণ্য এবং শিল্পায়নের প্রভাবে বিপণন খাতে ব্র্যান্ডের ব্যবহার শুরু হয় ঊনিশ শতকে। এসময় বিভিন্ন গৃহস্থালি পণ্যের উৎপাদন ব্যবস্থাকে বড় বড় কেন্দ্রে স্থানান্তর করে ফেলা হয়।
'Bass & Company' নামক একটি ব্রিটিশ কোম্পানি দাবি করে তাদের লাল এবং ত্রিকোণ আকৃতির ব্র্যান্ডটিই বিশ্বের প্রথম ট্রেডমার্ক। 'Tate & Lyel'ও নিজেদের ব্র্যান্ডকে বিশ্বের প্রথম ট্রেড হিসেবে দাবি করেছে যেটি গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ড কর্তৃক স্বীকৃত।[৫]

ধারণাসমূহ[সম্পাদনা]

ব্র্যান্ডিং কৌশলকে সফল হতে হলে এবং ব্র্যান্ডের মূল্য সৃষ্টি করতে হলে ভোক্তাদেরকে অবশ্যই বোঝাতে হবে যে বিভিন্ন ধরণের ব্র্যান্ডের পণ্য ও সেবার মধ্যে যথেষ্ট পরিমাণ পার্থক্য বিদ্যমান। ব্র্যান্ডসমূহের মধ্যকার পার্থক্যটি অনেকসময় পণ্যের বিবিধ বৈশিষ্ট্য এবং উপকারিতার ওপর নির্ভর করে।[৬] জিলেট, থ্রী-এম, মার্ক, এবং অন্যান্য অনেক ব্র্যান্ড প্রতিনিয়ত উদ্ভাবণীশক্তিকে কাজে লাগিয়ে নিজ নিজ পণ্য খাতে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে। আবার অনেক প্রতিষ্ঠান পণ্য ছাড়া অন্যান্য বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রতিযোগীতায় শ্রেষ্ট্য হয়েছে। এই বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে ভোক্তার উৎসাহটি কোথায় তা বুঝতে পারা এবং পণ্যের ভেতরে সেই উৎসাহের সাথে সম্পর্কযুক্ত একটি ইমেজ সৃষ্টি করা।

ব্র্যান্ড উপাদান[সম্পাদনা]

একটি ব্র্যান্ড সাধারণত অনেকগুলো উপাদান নিয়ে গঠিত হয়। এর মধ্যে রয়েছেঃ

  • নামঃ যেই শব্দ বা শব্দগুচ্ছ দ্বারা কোম্পানি, পণ্য, সেবা ইত্যাদিকে প্রকাশ করা হয়ে থাকে।
  • লোগোঃ যেই ট্রেডমার্কটি দিয়ে ব্র্যান্ডকে চিহ্নিত করা হয়।
  • ট্যাগলাইনঃ একটি শব্দগুচ্ছ যা ব্র্যান্ডটি কি বা কিভাবে কাজ করে তা সম্পর্কে ক্রেতা বা ভোক্তাকে ধারণা প্রদান করে এবং ক্রয় করতে উৎসাহ প্রদান করে।
  • গ্রাফিক্স/অলংকরনঃ একটি মনকাড়া গ্রাফিক্স বা অলংকরণ সহজেই ব্র্যান্ডকে আকর্ষনীয় করে তুলতে পারে।
  • রঙঃ উদাহরণ- কোম্পানিগুলো প্রায়শই নিজেদের বিজ্ঞাপনে, পণ্যের মোড়কে অনন্য একটি রঙ ব্যবহার করে। গ্রামীন ফোনের নীল রঙ, বাংলালিংকের কমলা বর্ণ।
  • শব্দ/সুরঃ ব্র্যান্ডকে পরিচিত করানোর জন্য বা মনে করিয়ে দেবার জন্য অনেকসময় একটি নির্দিষ্ট সুর ও সংগীত ব্যবহৃত হয়।
  • গন্ধ
  • স্বাদ
  • কাস্টোমার রিলেশনশিপ ম্যানেজমেন্ট

ব্র্যান্ড সচেতনতা[সম্পাদনা]

ব্র্যান্ড সচেতনতা (Brand Awareness) হলো একজন ক্রেতা বা ভোক্তার পক্ষে ব্র্যান্ডটিকে মনে করতে পারার বা চিনতে পারার ক্ষমতা এবং সেই ব্র্যান্ডের নাম, লোগো, সুর প্রভৃতি দেখা বা শোনা মাত্রই মস্তিষ্কে কোন একটি বিশেষ অনুভূতির সঞ্চার ঘটা। এটি ক্রেতাকে বুঝতে সাহায্য করে যে ব্র্যান্ডটি ঠিক কোন ধরণের পণ্যের ক্যাটাগরিতে পড়ে। এর মাধ্যমে ভোক্তা এও বুঝতে পারে যে, ব্র্যান্ডটি তার কোন প্রয়োজনীয়তাটি মেটাবে এবং কি ধরণের সেবা প্রদান করবে।

ব্র্যান্ডের চলকসমূহ[সম্পাদনা]

ব্র্যান্ড নাম[সম্পাদনা]

ব্র্যান্ড নাম প্রায়শই 'ব্র্যান্ড' শব্দের বিকল্পে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যদিও 'ব্র্যান্ড নাম' হল কোন একটি ব্র্যান্ডের লিখিত বা কথ্য রূপ। ব্র্যান্ড নাম একটি ট্রেডমার্ক হিসেবেও কাজ করে, যেহেতু এটি কোন পন্য বা সেবাকে নির্দিষ্ট একজন উৎপাদনকারীর বা মালিকের স্বত্বাধীন হিসেবে পরিচিত করায়।

ব্র্যান্ড আইডেন্টিটি[সম্পাদনা]

কোন একটি ব্র্যান্ডের পরিচয় বা 'ব্র্যান্ড আইডেন্টিটি' হচ্ছে সেই ব্র্যান্ডের বাহ্যিক প্রকাশসমূহ যার মধ্যে রয়েছে- নাম, লোগো, ডিজাইন, ট্রেডমার্ক, চাকচিক্য।[৭]

ব্র্যান্ড প্যারিটি[সম্পাদনা]

একজন ক্রেতা যখন উপলব্ধি করে যে কিছু ব্র্যান্ড আসলে সমপর্যায়ের বা একই প্রকারের তখন তাকে বলা হয় ব্র্যান্ড প্যারিটি। ব্র্যান্ড প্যারিটি যখন বিদ্যমান হয়, ক্রেতারা তখন পণ্যের গুনগত মানকে প্রাধান্য দেয় না। কারণ তারা মনে করে এই পণ্যগুলো সমমানসম্পন্ন বা একই ধরণের সেবা প্রদান করবে।[৮]

ব্র্যান্ড ইক্যুইটি[সম্পাদনা]

ব্র্যান্ড ইক্যুইটি হলো একটি ব্র্যান্ডের পণ্য ও সেবাসমূহের কার্যকারিতা, পছন্দনীয়তা ও সুনামের ওপর ভিত্তিকে করে যে মূল্যটি নির্দিষ্ট করা হয়। 'ক্রেতা নির্ভর ব্র্যান্ড ইক্যুইটি' (Customer-based Brand Equity) হলো একজন ক্রেতা ব্র্যান্ডের ব্যাপারে জ্ঞান থাকার সুবাদে ওই ব্র্যান্ডের বিপণনে তার সাড়া কতখানি পরিবর্তিত হয় সেটি।[৯]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. American Marketing Association Dictionary. Retrieved 2011-06-29. The Marketing Accountability Standards Board (MASB) endorses this definition as part of its ongoing Common Language: Marketing Activities and Metrics Project.
  2. ১১.০২.২০০৬, "MarketingMagazine.co.uk"
  3. Sanskrit Epic Mahabharat, Van Parva, p. 3000, Shalok 15–22
  4. Colapinto, John (3 October 2011). "Famous Names". The New Yorker.
  5. Hibbert, Colette. "Golden celebration for 'oldest brand'". BBC News UK.
  6. Kotler, Keller, Koshy, Jha (2011). Marketing Management,13th Edition. p-251, Pearson Prentice Hall. ISBN 978-81-317-1683-0
  7. Neumeier, Marty (2004), The Dictionary of Brand. ISBN 1-884081-06-1, pp.20
  8. Paul S. Richardson, Alan S. Dick and Arun K. Jain "Extrinsic and Intrinsic Cue Effects on Perceptions of Store Brand Quality", Journal of Marketing October 1994 pp. 28-36
  9. Kotler, Keller, Koshy, Jha (2011). Marketing Management,13th Edition. p-253, Pearson Prentice Hall. ISBN 978-81-317-1683-0