তেনজিং নোরগে

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
তেনজিং নোরগে
Tenzing Norgay cropped.jpg
ব্যক্তিগত তথ্য
আসল নাম নামগ্যাল ওয়াংদি
প্রধান পেশা পর্বতারোহী
জন্ম মে, ১৯১৪
খুম্বু, নেপাল
মৃত্যু ৯ মে ১৯৮৬(১৯৮৬-০৫-০৯) (৭১ বছর)
দার্জিলিং, ভারত
জাতীয়তা নেপালীনেপাল
পেশাগত তথ্য
শুরুর পেশা মালবাহক
উল্লেখযোগ্য আরোহণ মাউন্ট এভারেস্ট- বিশ্বে সর্বপ্রথম আরোহণ, ১৯৫৩
বিখ্যাত জুটি এডমুন্ড হিলারী
পরিবার
দম্পতি দাওয়া ফুটি, আং লামু
সন্তান পেম পেম, নিমা, জামলিং, নরবু

তেনজিং নোরগে (১৯১৪-১৯৮৬) এভারেস্ট বিজয়ী প্রথম অভিযাত্রী। তিনি এবং এডমুন্ড হিলারী ১৯৫৩ সালের ২৯ শে মে যৌথভাবে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট জয় করেন।

পরিচ্ছেদসমূহ

প্রথম জীবন[সম্পাদনা]

নামগিয়াল ওয়াংদি ১৯১৪ খৃষ্টাব্দে নেপালের শোলোখুম্বু জেলার সা-চু গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ছিল খাংলা মিংমা এবং মাতার নাম দোকমো কিন-জোম। রংবুক মঠের এক লামা তাঁর নাম পরিবর্তন করে তেনজিং নোরগে নাম রাখেন। ছোটবেলায় তেনজিংকে স্থানীয় এক বৌদ্ধমঠে লামা হওয়ার জন্য শিক্ষিনবিশী করতে পাঠানো হয় কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই তেনজিং বাড়ি পালিয়ে আসেন। ১৩ বছর বয়সে তিনি বাড়ি থেকে কাঠমান্ডু পালিয়ে যান এবং ছয় সপ্তাহ পরে ফিরে আসেন। ১৯৩২ খৃষ্টাব্দে ১৮ বছর বয়সে অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যে তেনজিং বারো জন সঙ্গীর সাথে দার্জিলিংয়ের রওনা হন কিন্তু ভারত নেপাল সীমান্তে তাদের মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলে তেনজিংকে এক স্থানীয় নেপালী আশ্রয় দেন। সেখান থেকে তেনজিং দার্জিলিংয়ের নিকটবর্তী আলুবাড়ীতে যান ও দুধ বিক্রি শুরু করেন। এর মধ্যে হিউ রাটলেজের নেতৃত্বে ১৯৩৩ খৃষ্টাব্দের ব্রিটিশ এভারেষ্ট অভিযানে মালবাহকের কাজ পেতে ব্যর্থ হন। এর পর তিনি তাঁর বাড়ী ফিরে আসেন। কিছুদিন পরে তেনজিং আবার দার্জিলিং পালিয়ে আসেন এবং টংসুং বস্তিতে বসবাস শুরু করেন। ১৯৩৫ খৃষ্টাব্দে দাওয়া ফুটি নামে এক শেরপা মেয়েকে বিবাহ করেন। [১]

পর্বতারোহণ অভিযান[১][সম্পাদনা]

প্রথমবার মাউন্ট এভারেস্ট অভিযান[সম্পাদনা]

এরিক শিপটনের নেতৃত্বে ১৯৩৫ ব্রিটিশ মাউন্ট এভারেস্ট অভিযান তেনজিংয়ের জীবনের প্রথম পর্বতারোহণ অভিযান। এই অভিযানে তিনি মালবাহক হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। তাঁর দৈনিক মজুরি ছিল বারো আনা এবং বরফে মাল পৌঁছে দিলে মজুরী এক টাকা। এই অভিযানে তেনজিং নিচের শিবিরে প্রতিদিন ৯০ পাউন্ড মাল এবং বরফে ৫০ পাউন্ড ওজনের মাল বহন করেছিলেন এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পর্বতারোহণের কলা কৌশল শিখেছিলেন। এই দল বাইশ হাজার ফুট উঁচুতে অবস্থিত নর্থ কল অব্দি আরোহণ করে এবং তেনজিং সহ শেরপা মালবাহকেরা এই উচ্চতায় মাল পৌঁছে দেয়।

কাব্রু শৃঙ্গ অভিযান[সম্পাদনা]

১৯৩৫ খৃষ্টাব্দের বসন্ত কালে ভারতীয় ডাক বিভাগের কর্মী কুকের নেতৃত্বে চব্বিশ হাজার ফুট উচ্চতার কাব্রু শৃঙ্গ অভিযানে তেনজিং মালবাহক হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। এই অভিযানে তাঁর দায়িত্ব ছিল মূল শিবির পর্যন্ত মাল পৌঁছে দেওয়া।

দ্বিতীয়বার মাউন্ট এভারেস্ট অভিযান[সম্পাদনা]

হিউ রাটলেজের নেতৃত্বে ১৯৩৬ ব্রিটিশ মাউন্ট এভারেস্ট অভিযান তেনজিংয়ের জীবনের দ্বিতীয় মাউন্ট এভারেস্ট অভিযান। খারাপ আবহাওয়ার জন্য দলটি বহু কষ্টে নর্থ কল অব্দি আরোহণ করে ফিরে আসে।

সর্বপ্রথম বন্দরপুঞ্ছ অভিযান[সম্পাদনা]

১৯৩৭ খৃষ্টাব্দে ডন স্কুলের শিক্ষক গিবসন ও মার্টিনের সঙ্গে তেনজিং ২০,৭২০ ফুট উচ্চতার বন্দরপুঞ্ছ শৃঙ্গে অভিযান করেন। কিন্তু প্রচন্ড তুষারপাতের জন্য ১৭০০০ ফুট থেকে তাঁদের নেমে আসতে হয়।

তৃতীয়বার মাউন্ট এভারেস্ট অভিযান[সম্পাদনা]

হ্যারল্ড উইলিয়াম টিলম্যানের নেতৃত্বে ১৯৩৮ খৃষ্টাব্দের ব্রিটিশ মাউন্ট এভারেস্ট অভিযান তেনজিংয়ের জীবনের তৃতীয় মাউন্ট এভারেস্ট অভিযান। রংবুক হিমবাহে মূল শিবির তৈরী করার পর নর্থ কলকে এড়িয়ে মাউন্ট এভারেস্ট আরোহণ করার দ্বিতীয় পথ খোঁজার উদ্দেশ্যে মূল শিবির থেকে টিলম্যান, তেনজিং নোরগে, আং শেরিং, আং জিংমে লোলা গিরিবর্ত্মে পৌঁছন। কিন্তু সেখানকার আবহাওয়া খারাপ থাকায় তাঁরা মূল শিবিরে ফিরে আসেন। মূল শিবির থেকে একটা দল পূর্ব রংবুক হিমবাহ ধরে, অপর একটি দল মূল রংবুক হিমবাহ ধরে যাত্রা করে। মূল রংবুক হিমবাহ ধরে যাত্রাকারী দলের অলিভার, টিলম্যান, তেনজিং, ওয়াংদি এবং আরো দুজন শেরপা হিমানী সম্প্রপাতের কবলে পড়লেও কোনরকম ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই বেরিয়ে আস্তে সক্ষম হন। ২২,০০০ ফুট উচ্চতার নর্থ কলে চার নম্বর শিবির স্থাপন করে এরিক শিপটন, ফ্রাঙ্ক স্মাইথ, তেনজিং নোরগে, আং শেরিং, ওয়াংদি নরবু, রিনজিং, লোবসাং, লাকপা তেনজিং এবং ওলো ভুটিয়া উত্তর পূর্ব দিক দিয়ে উঠে ২৫,৮০০ ফুট উচ্চতায় পঞ্চম শিবির স্থাপন করেন। চার থেকে পাঁচ নম্বর শিবিরে আসার পথে দুজন শেরপা অসুস্থ হয়ে পড়লে নোরগে পুনরায় নেমে প্রয়োজনীয় তাঁবু ও জ্বালানী নিয়ে ঐ একই পথ ঐ দিনে আবার উঠে আসেন। পরের দিন ২৭,০০০ ফুট উচ্চতা অব্দি আরোহণ করে ষষ্ঠ শিবির স্থাপন করা হয়। এই অভিযান ব্যর্থ হলেও তেনজিং সহ যে সমস্ত শেরপারা ষষ্ঠ শিবির পর্যন্ত আরোহণ করেন, তাঁদের প্রথম টাইগার উপাধি ও পদক দেওয়া হয়।

তিরিচমির অভিযান[সম্পাদনা]

১৯৩৯ খৃষ্টাব্দে তেনজিং কানাডার পর্বতারোহী স্নিটন দম্পতির সঙ্গে হিন্দুকুশ পর্বতমালার ২৫,২৬০ ফুট উচ্চতার তিরিচমির পর্বতে অভিযান করেন, কিন্তু ভাল সরঞ্জামের অভাবে, তীব্র হাওয়া ও ঠান্ডার দাপটে ২৩,০০০ ফুট থেকে নেমে আসতে বাধ্য হন।

দ্বিতীয়বার বন্দরপুঞ্ছ অভিযান[সম্পাদনা]

১৯৪৬ খৃষ্টাব্দে ডন স্কুলের শিক্ষক গিবসন ও মার্টিনের সঙ্গে তেনজিং বন্দরপুঞ্ছ শৃঙ্গে পুনরায় অভিযান করেন। কিন্তু এবারও প্রচন্ড তুষারপাতের জন্য ১৮০০০ ফুট থেকে তাঁদের নেমে আসতে হয়।

চতুর্থবার মাউন্ট এভারেস্ট অভিযান[সম্পাদনা]

১৯৪৭ খৃষ্টাব্দে কানাডার আর্ল ডেনম্যানের উৎসাহে তিব্বত প্রবেশের অনুমতি মাউন্ট এভারেস্ট অভিযানে যোগদান করেন। সীমান্তের নজরদারী এড়িয়ে তিনজনের এই দল তিব্বতে প্রবেশ করে অপ্রচলিত পথে রংবুক হিমবাহে পৌঁছন। কিন্তু উপযুক্ত সরঞ্জামের অভাবে নর্থকল থেকে তাঁরা ফিরে আসতে বাধ্য হন।

সর্বপ্রথম কেদারনাথ শৃঙ্গ জয়[সম্পাদনা]

১৯৪৭ খৃষ্টাব্দে সুইজারল্যান্ডের আন্দ্রে রসের নেতৃত্বে একটি সুইস পর্বতারোহী দলের সঙ্গে ২২০০০ ফুট উচ্চতার কেদারনাথ পর্বতশৃঙ্গ অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু শীর্ষগামী দলের আলফ্রেড সুটার ও ওয়াংদি নরবু রজ্জুবদ্ধ অবস্থায় পা পিছলে হাজার ফুট নিচে পড়ে গেলেন। তেনজিং আঘাতপ্রাপ্ত নরবুকে উদ্ধার করে নিরাপদে হাসপাতালে পৌঁছে আবার শিবিরে ফিরে এসে শীর্ষ আরোহণ করেন। সর্বপ্রথম কেদারনাথ শীর্ষ আরোহণ তেনজিং এর জীবনের প্রথন শৃঙ্গ জয়।

সর্বপ্রথম বলবালা ও কালিন্দী শৃঙ্গ জয়[সম্পাদনা]

১৯৪৭ খৃষ্টাব্দে সুইজারল্যান্ডের আন্দ্রে রসের নেতৃত্বে কেদারনাথ জয়ের পরে ঐ একই দলের সাথে তেনজিং তিব্বত সীমান্তের বলবালা ও কালিন্দী শৃঙ্গ সর্বপ্রথম জয় করেন।

তৃতীয়বার বন্দরপুঞ্ছ অভিযান এবং সর্বপ্রথম শৃঙ্গ জয়[সম্পাদনা]

১৯৫০ খৃষ্টাব্দে ডন স্কুলের শিক্ষক গিবসনের আমন্ত্রণে তেনজিং তৃতীয়বার বন্দরপুঞ্ছ অভিযানে অংশগ্রহণ করেন এবং রয় গ্রিনউড ও শেরপা কিন চোক শেরিংকে সঙ্গে করে এই শৃঙ্গ জয় করেন।

নাঙ্গা পর্বত অভিযান[সম্পাদনা]

১৯৫০ খৃষ্টাব্দে থর্নলের নেতৃত্বে ২৬,৬৬০ ফুট উচ্চতার নাঙ্গা পর্বত অভিযানে তেনজিং অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু থর্নলে এবং ক্রেসের মৃত্যুতে এই অভিযান ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। তেনজিং বহু চেষ্টা করেও তাঁদের খুঁজে না পেয়ে ফিরে আসতে বাধ্য হন।

নন্দাদেবী অভিযান[সম্পাদনা]

১৯৫১ খৃষ্টাব্দে রোগার ডুপ্লের নেতৃত্বে ফরাসীদের নন্দাদেবী অভিযানে তেনজিং যোগদান করেন। এই দলের উদ্দেশ্য ছিল প্রথমে তাঁরা ২৫,৬০০ ফুট উচ্চতার নন্দাদেবী মূল শৃঙ্গ আরোহণ করে ২৩,০০০ ফুট উঁচুতে নন্দাদেবী মূল ও নন্দাদেবী পূর্ব শৃঙ্গ সংযোগচুতে দুই মাইল লম্বা তীক্ষ্ন শৈলশিরা ধরে এগিয়ে ২৪,৪০০ ফুট উচ্চতার নন্দাদেবী পূর্ব শৃঙ্গ আরোহণ করা। কিন্তু ডুপ্লে ও গিলবার্ট ভিগনেস নন্দাদেবী মূল শৃঙ্গ আরোহণ করতে গিয়ে নিখোঁজ হয়ে গেলে তেনজিং এবং ডুবো তাঁদের খোঁজে নন্দাদেবী পূর্ব শৃঙ্গ আরোহণ করে ফিরে আসেন।

কাং শীর্ষ অভিযান[সম্পাদনা]

১৯৫১ খৃষ্টাব্দের শরতে তেনজিং সুইজারল্যান্ডের জর্জ ফ্রের নেতৃত্বে ১৯০০০ ফুট উচ্চতার কাং পর্বত অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু আরোহণের সময় জুতোতে ক্র্যাম্পন না লাগানোয় ফ্রে পিছলে গিয়ে হাজার ফুট নিচে পড়ে গিয়ে মারা যান। তাঁকে বাঁচাতে গিয়ে তেনজিংয়ের একটা আঙুল ভেঙে যায়।

পঞ্চমবার মাউন্ট এভারেস্ট অভিযান[সম্পাদনা]

১৯৫২ খৃষ্টাব্দের বসন্তকালে তেনজিং সুইজারল্যান্ডের এডওয়ার্ড উইস-ডুনান্টের নেতৃত্বে এভারেস্ট অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। জেনেভা স্পার ধরে বরফের ধাপ কেটে সিঁড়ি বানিয়ে ও দড়ি খাটিয়ে আরোহণের চেষ্টা শুরু হয় ও সাউথ কলের মাঝামাঝি দুরত্বে মালপত্র আনা হয়। এখান থেকে তেনজিং নোরগে, রেমন্ড ল্যাম্বার্ট, লিয়ঁ ফ্লোরি, রেনে আউবার্ট ও অন্য শেরপা সদস্যরা এগিয়ে যান। ২৬শে মে সকাল দশটায় তাঁরা সাউথ কল পৌঁছন ও ষষ্ঠ শিবির স্থাপন করেন। সাউথ কল থেকে শেরপারা ক্লান্তিজনিত কারণে নেমে গেলে একদিনের খাবার, একটি তাঁবু ও চারটি অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে সাউথ কল থেকে ল্যাম্বার্ট, ফ্লোরি, আউবার্ট ও তেনজিং নোরগে শীর্ষের দিকে আরোহণ শুরু করেন। বরফের ঢাল পার হয়ে দক্ষিণ-পূর্ব শৈলশিরা ধরে উঠে প্রায় সাড়ে সাতাশ হাজার ফুট উচ্চতায় শিবির স্থাপন করা হলে ফ্লোরিআউবার্ট নেমে যান। পরের দিন ল্যাম্বার্ট ও তেনজিং ২৮,২৫০ ফুট উচ্চতা অব্দি পৌঁছে নেমে আসার সিদ্ধান্ত নেন।

ষষ্ঠবার মাউন্ট এভারেস্ট অভিযান[সম্পাদনা]

১৯৫২ খৃষ্টাব্দের শরৎকালে তেনজিং সুইজারল্যান্ডের এভারেস্ট অভিযানে অংশগ্রহণ করেন।

সপ্তমবার মাউন্ট এভারেস্ট অভিযান ও সর্বপ্রথম মাউন্ট এভারেস্ট শৃঙ্গ জয়[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. ১.০ ১.১ স্বপ্নশিখরে তেনজিং - জেমস র‍্যামসে উলম্যান, অনুবাদ - সুকুমার চক্রবর্তী, প্রকাশক - সূর্যেন্দু ভট্টাচার্য্য, ২০এ রাধানাথ বোস লেন, কলকাতা ৭০০০০৬, ISBN 978-81-909878-1-3