আবদুল মতিন

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
(আব্দুল মতিন থেকে ঘুরে এসেছে)
এই নিবন্ধটি একজন ভাষাসৈনিক সম্পর্কিত। একই নামের অন্য ব্যক্তির জন্য, দেখুন আবদুল মতিন (দ্ব্যর্থতা নিরসন)
আব্দুল মতিন
AbdulMatin single.jpg
জন্ম (১৯২৬-১২-০৩)৩ ডিসেম্বর ১৯২৬
সিরাজগঞ্জ
মৃত্যু ৮ অক্টোবর ২০১৪(২০১৪-১০-০৮) (৮৭ বছর)
ঢাকা, বাংলাদেশ
জাতীয়তা বাংলাদেশী
বংশোদ্ভূত বাঙালি
নাগরিকত্ব  বাংলাদেশ
যে জন্য পরিচিত ভাষা সৈনিক
ধর্ম নাস্তিকতা
দম্পতি গুলবদন নেসা মনিকা
সন্তান মালিহা শোভন, মাতিয়া বানু শুকু
পুরস্কার একুশে পদক

আব্দুল মতিন (জন্ম: ৩ ডিসেম্বর, ১৯২৬- মৃত্যু: অক্টোবর ৮ , ২০১৪[১]) ১৯৫২ সালের বাংলা ভাষা আন্দোলনের অন্যতম ভাষা সৈনিক। ২০০১ সালে তিনি বাংলাদেশের জাতীয় এবং সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার একুশে পদক পান।[২]

শৈশব ও শিক্ষা জীবন[সম্পাদনা]

আব্দুল মতিন ১৯২৬ সালের ৩ ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জের চৌহালি উপজেলার ধুবালীয়া গ্রামে এক মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম আব্দুল জলিল এবং মায়ের নাম আমেনা খাতুন। তিনি ছিলেন তাদের প্রথম সন্তান। জন্মের পর তাঁর ডাক নাম ছিল গেদু১৯৩০ সালে গ্রামের বাড়ী যমুনা ভাঙনে ভেঙ্গে গেলে আবদুল জলিল জীবিকার সন্ধানে ভারতের দার্জিলিং এ চলে যান। সেখানে জালাপাহারের ক্যান্টনমেন্টে সুপারভাইস স্টাফ হিসেবে একটি চাকরি পেয়ে যান। ১৯৩২ সালে আব্দুল মতিন শিশু শ্রেণীতে দার্জিলিং-এর বাংলা মিডিয়াম স্কুল মহারাণী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিলেন এবং তখন সেখানেই তাঁর শিক্ষা জীবনের শুরু। ১৯৩৩ সালে আব্দুল মতিনের মাত্র ৮ বছর বয়সে তার মা অ্যাকলেমশিয়া রোগে মারা যান। মহারানী গার্লস স্কুলে ৪র্থ শ্রেণী পাশ করলে এখানে প্রাইমারি স্তরের পড়াশোনার শেষ হয়। এরপর ১৯৩৬ সালে দার্জিলিং গভর্মেন্ট হাই স্কুলে পঞ্চম শ্রেণীতে ভর্তি হন। তিনি ১৯৪৩ সালে এনট্রেন্স (মাধ্যমিক সার্টিফিকেট পরীক্ষা) পরীক্ষায় ৩য় বিভাগ নিয়ে উত্তীর্ণ হন। আব্দুল মতিন ১৯৪৩ সালে রাজশাহী গভর্মেন্ট কলেজে ইন্টারমিডিয়েট প্রথম বর্ষে ভর্তি হলেন। ২ বছর পর ১৯৪৫ সালে তিনি এইচ এস সি পরীক্ষায় তৃতীয় বিভাগ নিয়ে উত্তীর্ণ হন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে আব্দুল মতিন ব্রিটিশ আর্মির কমিশন র‌্যাঙ্কে ভর্তি পরীক্ষা দেন। দৈহিক আকৃতি, উচ্চতা, আত্মবিশ্বাস আর সাহসিকতার বলে তিনি ফোর্ট উইলিয়াম থেকে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কমিশন পান। এরপর তিনি কলকাতা থেকে ব্যাঙ্গালোর গিয়ে পৌঁছান। কিন্তু ততদিনে যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে। ফলে তিনি একটি সার্টিফিকেট নিয়ে আবার দেশে ফিরে আসেন। দেশে প্রত্যাবর্তনের পর তিনি ১৯৪৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাচেলর অব আর্টসে (পাস কোর্স) ভর্তি হলেন। ফজলুল হক হলে তাঁর সিট হয়। ১৯৪৭ সালে গ্র্যাজুয়েশন কোর্স শেষ করেন এবং পরে মাস্টার্স করেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে।[৩]

কর্মজীবন ও রাজনৈতিক জীবন[সম্পাদনা]

১৯৫২ সালে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি তোলায় আব্দুল মতিনের অবদান অন্যতম।[৩] সেবছর ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের ছাত্রসভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন তিনি। শিক্ষার্থীদের সংগঠন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন তিনি। তাঁর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই কলাভবনের জনসভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয় ১৪৪ ধারা ভঙ্গের। [৪] তাঁরই নেতৃত্বে একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে সারা বাংলার জন্য আন্দোলনের নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। ভাষা আন্দোলনের পর তিনি ছাত্র ইউনিয়ন গঠনে ভূমিকা রাখেন এবং পরে সংগঠনটির সভাপতি হন। এরপর কমিউনিস্ট আন্দোলনে সক্রিয় হন। ১৯৫৪ সালে পাবনা জেলা কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদক হন আব্দুল মতিন। মওলানা ভাসানী ন্যাপ গঠন করলে তিনি ১৯৫৭ সালে তাতে যোগ দেন।[৫] ১৯৬৮ সালে তিনি পাবনা জেলাকে ভিত্তি করে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল)-এর ভেতরে আলাউদ্দিন আহমদকে নিয়ে এক উপদল গড়ে তোলেন। পরে তিনি দেবেন শিকদার, আবুল বাশার, আলাউদ্দিন আহমদ ও নুরুল হক চৌধুরীর সহায়তায় পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি গঠন করেন। টিপু বিশ্বাস, আলাউদ্দিন আহমদ ও তাঁর নেতৃত্বে পাবনা জেলার জনগণ মুক্তিযুদ্ধে সাহসী ভূমিকা পালন করেন।[৬] চীনকে অনুসরণকারী বামপন্থি দলগুলোর নানা বিভাজনের মধ্যেও আবদুল মতিন সক্রিয় ছিলেন রাজনীতিতে। ১৯৯২ সালে তিনি বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। ২০০৬ সালে ওয়ার্কার্স পার্টি থেকে তিনি পদত্যাগ করেন। পরবর্তীকালে ২০০৯ সালে হায়দার আকবর খান রনোর নেতৃত্বে ওয়ার্কার্স পার্টি (পুনর্গঠন) গঠিত হলে আবদুল মতিন তাদের সঙ্গে যোগ দেন।[৫] পরবর্তীতে ২০১৩ সালে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি (পুনর্গঠিত) ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট লীগ ঐক্যবদ্ধ হয়ে বাংলাদেশের ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগ গঠিত হয় এবং আবদুল মতিন নবগঠিত বাংলাদেশের ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগের সাথে ঐক্যবদ্ধ হন। তিনি এই পার্টির কেন্দ্রীয় উপদেষ্টামণ্ডলীর অন্যতম সদস্য মনোনীত হন এবং আমৃত্যু তিনি এই পদে আসীন ছিলেন।[৭]

গ্রন্থপঞ্জী[সম্পাদনা]

আবদুল মতিনের প্রকাশিত গ্রন্থের ভেতরে রয়েছে,

  • ২১ ফেব্রুয়ারি ও ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গে: ঢাকা, ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯ শৈলজানা, পাবনা
  • গণ চীনের উৎপাদন ব্যবস্থা ও দায়িত্ব প্রথা: ১৯৮৫
  • ভাষা ও একুশের আন্দোলন, ঢাকা ১৯৮৬
  • ভাষা আন্দোলন কি এবং তাতে কি ছিল, নন্দন প্রকাশন, ঢাকা ফেব্রুয়ারি ১৯৮৯
  • ভাষা আন্দোলন: ইতিহাস ও তাৎপর্য: আব্দুল মতিন ও আহমদ রফিক, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী, ঢাকা ১৯৯১
  • বাঙালী জাতির উৎস সন্ধান ও ভাষা আন্দোলন, বুক পয়েন্ট ও সমাজ চেতনা পাবলিকেশন, ১৯৯৫
  • জীবন পথের বাঁকে বাঁকে; সাহিত্যিকা, ঢাকা ২০০৪।[৭]

পুরস্কার ও সম্মাননা[সম্পাদনা]

ভাষাসৈনিক আবদুল মতিনকে নানা সময় নানা পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে। সেগুলোর কয়েকটি উল্লেখ করা হলও।

  • দৈনিক জনকণ্ঠ গুণিজন ও প্রতিভা সম্মাননা ১৯৯৮ : পুরস্কারস্বরূপ ১ লক্ষ টাকা, প্রতিমাসে অনুদান ৫ হাজার টাকা,
  • প্রবাসী বাঙালীদের উদ্যোগে আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরে ২১ ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে সংবর্ধনা, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০০০,
  • একুশে পদক ২০০১,
  • বাংলা একাডেমি কর্তৃক ফেলোশিপ প্রদান, ২৮ ডিসেম্বর, ২০০১
  • বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর কর্তৃক সম্মাননা স্মারক, ২০০২,
  • ভাষা সৈনিক সম্মাননা পরিষদ, সিলেট কর্তৃক ৫০ বছর পুর্তি উপলক্ষে সংবর্ধনা প্রদান, ২০০২,
  • আহমদ শরীফ স্মারক পুরস্কার, ২০০৩,
  • জাতীয় প্রেসক্লাব কর্তৃক উন্নয়ন অর্থনীতি স্বর্ণপদক ২০০৪, ১৩ আগস্ট, ২০০৪,
  • শেরে বাংলা জাতীয় পুরস্কার, ২০০৪
  • মুক্তিযুদ্ধ গণপরিষদ কর্তৃক সম্মাননা, ১৪ মে, ২০০৫
  • দৈনিক আমাদের সময় কর্তৃক সম্মাননা, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০০৬,
  • ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ৪৪তম সমাবর্তন উপলক্ষে একাডেমিক কাউন্সিল কর্তৃক ‘ডক্টর অব ল’জ’ (সম্মানসূচক ডিগ্রি), ২০০৮,
  • ভাসানী স্মৃতি পুরস্কার, ২০০৮,
  • একুশে টিভির পক্ষ থেকে আজীবন সম্মাননা,
  • ভাষা সৈনিক চারণ সাংবাদিক সফিউদ্দিন আহম্মদ স্মারক সম্মাননা, ২০১০,
  • ঢাকার ৪০০ বছর উদযাপন উপলক্ষে ঢাকা রত্ন সম্মাননা, ২০১০,
  • মানবাধিকার ও পরিবেশ সোসাইটি (মাপসাস) কর্তৃক মাপসাস শান্তি পদক, ২০১০,
  • কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ পুরস্কার, ২০১০,
  • মহাত্মা গান্ধি পিস অ্যাওয়ার্ড, ২০১০,
  • দৈনিক কালের কণ্ঠের আজীবন সম্মানা পুরস্কার, ২০১০।[৭]

মৃত্যু[সম্পাদনা]

আব্দুল মতিন ২০১৪ সালের ৮ অক্টোবর সকাল ৯টায় ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এর আগে দীর্ঘদিন তিনি একই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।[৮] তিনি মরণোত্তর চক্ষু ও দেহদান করেন।[১]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. ১.০ ১.১ "ভাষাসৈনিক মতিন আর নেই: Reports"prothom-alo.com। ৮ অক্টোবর, ২০১৪। সংগৃহীত ৮ অক্টোবর, ২০১৪ 
  2. সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়
  3. ৩.০ ৩.১ "ভাষা মতিন ১৯২৬-২০১৪ : Reports"বাংলানিউজ ২৪ ডট কম। ৮ অক্টোবর, ২০১৪। সংগৃহীত ৮ অক্টোবর, ২০১৪ 
  4. "রাজনীতিবিদ মতিন - সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: Reports"বনিকবার্তা ডটকম। ১০ অক্টোবর, ২০১৪। সংগৃহীত ১০ অক্টোবর, ২০১৪ 
  5. ৫.০ ৫.১ "ভাষা মতিনের জীবনাবসান: Reports"বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। ৮ অক্টোবর, ২০১৪। সংগৃহীত ৮ অক্টোবর, ২০১৪ 
  6. জয়নাল আবেদীন, উপমহাদেশের জাতীয়তাবাদী ও বামধারার রাজনীতি, প্রেক্ষিত বাংলাদেশ, বাংলাপ্রকাশ, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি, ২০১৩, পৃষ্ঠা- ২২১ ও ২৪৩।
  7. ৭.০ ৭.১ ৭.২ "বাংলার চে ভাষা মতিন : একজন কমিউনিস্টের চীর বিদায়: Reports"ইস্টিশন.কম। ৮ অক্টোবর, ২০১৪। সংগৃহীত ৮ অক্টোবর, ২০১৪ 
  8. দৈনিক সমকাল

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]