২০০৩-এর ইরাক আক্রমণ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণ ছিল ইরাক যুদ্ধের প্রাথমিক অবস্থা। এই আক্রমণ শুরু হয় ১৯ মার্চ, ২০০৩ এ যা এক মাস ব্যাপী চলেছিল। এর মাঝে ২১ দিন সর্বাত্মক যুদ্ধ হয়েছিল , যার এক দিকে ছিল ইরাক বাহিনী ও অন্যদিকে ছিল যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও পোল্যান্ড এর সম্মিলিত বাহিনী। এই যুদ্ধ প্রাথমিক ভাবে শেষ হয় ১ মে, ২০০৩। এদিন তৎকালীন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ যুদ্ধ সমাপ্তি ঘোষণা করেন। এর পরে গঠিত হয়, কোয়ালিশন প্রভিশনাল অথোরিটি (Coalition Provisional Authority বা সংক্ষেপে CPA). যা সক্রিয় ছিল জানুয়ারী ২০০৫ এ পরবর্তী ইরাকী পার্লামেন্ট নির্বাচন পর্যন্ত। যুক্তরাষ্ট্র সেনাবাহিনী ২০১১ পর্যন্ত ইরাক এ অবস্থান করেছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনী প্রাথমিক অবস্থায় ১,৭৭,১৯৪ জন এর বাহিনী প্রেরণ করে যা ১৯ মার্চ ২০০৩ হতে ১ মে ২০০৩ পর্যন্ত বজায় ছিল। সৈন্যদের মাঝে ১,৩৩,০০০ জন ছিল যুক্তরাষ্ট্র থেকে, ৪৫,০০০ জন ছিল যুক্তরাজ্য থেকে, ২০০০ জন ছিল অস্ট্রেলিয়া থেকে এবং ১৯৪ জন ছিল পোল্যান্ড থেকে। পরবর্তীতে আরো ৩৬ টা দেশ এই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করেছিল। আক্রমণের প্রাক প্রস্তুতি হিসেবে ১৮ ই ফেব্রুয়ারি তে যুক্তরাষ্ট্র হতে ১ লাখ সৈন্য কুয়েতেে এসে পৌছায়। যৌথ বাহিনী ইরাকী কুর্দিস্থানের পেশমার্গা'দের থেকে সহযোগিতা প্রাপ্ত হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ও যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের ভাষ্যনুযায়ী, তাদের লক্ষ্য "ইরাকে গণবিধ্বংসী অস্ত্রের মজুদ ধবংস করা, সাদ্দামের সন্ত্রাসের প্রতি সহযোগিতা শেষ করা, এবং ইরাকী জনগণকে মুক্ত করা।" অন্যদের ভাষ্যনুযায়ী ইরাক আক্রমণ ছিল ১১ সেপ্টেম্বর-এ যুক্তরষ্ট্রের উপর সন্ত্রাসী আক্রমণের প্রতিশোধ। ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী আক্রমণের দরুণ যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থানে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। ব্লেয়ারের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরাকের নিজেদের সম্ভাব্য নিউক্লিয়ার, রাসায়নিক ও জৈব অস্ত্র ধ্বংসের অনীহাই ছিল এ যুদ্ধ শুরু হওয়ার মূল অনুঘটক।

২০০৩ সালের জানুয়ারি মাসের সিবিস পোল অনুযায়ী, ৬৪% আমেরিকান ইরাকের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ কে অনুমোদন করেছন, ৬৩% চেয়েছিলেন বুশ যাতে যুদ্ধে না জড়িয়ে কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় সমাধান খোজার চেষ্টা করেন এবং ৬২% মনে করতেন এই যুদ্ধের দরুণ যুক্তরাষ্ট্রের উপর সন্ত্রাসী আক্রমণের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে। ইরাকের উপর এই আক্রমণ যুক্তরাষ্ট্রের অনেক দীর্ঘদিন এর মিত্র দের দ্বারা বিরোধিতার সম্মুখীন হয়, যার ভিতর উল্লেখযোগ্য ছিলঃ ফ্রান্স, কানাডা, জার্মান এবং নিউজিল্যান্ড। বিরোধিতাকারী দেশসমূহের যুক্তি ছিল UNMOVIC এর ১২ ফেব্রুয়ারি ২০০৩ এর রিপোর্ট অনুযায়ী ইরাকে এমন কোন গণবিধ্বংসী অস্ত্র পাওয়া যায় নি যার দরুণ এখানে আক্রমণ যুক্তিযুক্ত হবে। আক্রমণ পরবর্তী সময়ে ইরাকে শত শত রাসায়নিক অস্ত্র পাওয়া যায় যা মূলত ১৯৯১ এর উপসাগরীয় যুদ্ধের আগে প্রস্তুতকৃত, যার বেশ কিছু সাদ্দাম হোসেনের শাসন কাল এর আগেই প্রস্তুত করা হয়েছিল এবং বেশিরভাগই অকেজো অবস্থায় ছিল। প্রায় ৫০০০ এর মতন রাসায়নিক অস্ত্রের বিভিন্ন অংশ পাওয়া যায় যা ১৯৯১ এর আগেই তৈরি করা হয়েছিল এবং অনেক আগে থেকেই পরিত্যক্ত ছিল। এই পরিত্যক্ত অস্ত্র উদ্ধার ও ইরাকের উপর আক্রমণ কে যৌক্তিক প্রমাণ করে না।

যুদ্ধ শুরুর ১ মাস আগে ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০০৩ এ বিশ্বব্যাপী ইরাক যুদ্ধের বিপক্ষে প্রতিবাদ সংঘটিত হয়। এর মাঝে রোমে ত্রিশ লক্ষাধিক লোক এর অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ উল্লেখযোগ্য ছিল। গিনেস বুক অফ রেকর্ড অনুযায়ী এই বিক্ষোভ ই ছিল যুদ্ধের বিপক্ষে সংঘটিত সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ। French academic Dominique Reynié এর হিসেব অনুযায়ী ২০০৩ সালের ৩ জানুয়ারি হতে ১২ ই এপ্রিল পর্যন্ত, বিশ্বের নানান প্রান্তের সর্বমোট ৩ কোটি ৬০ লক্ষ লোক সম্ভাব্য ইরাক এর উপর আক্রমণের প্রতিবাদ স্বরূপ সর্বমোট ৩০০০ বিক্ষোভে অংশগ্রহণ করে।

এই আক্রমণ শুরু হয়েছিল ২০ মার্চ ২০০৩ এ বাগদাদের প্রেসিডেনশিয়াল প্যালেস এর উপর বিমান আক্রমণ এর মাধ্যমে। পরবর্তী দিনে, যৌথ বাহিনী ইরাক-কুয়েত সীমান্ত হত বসরায় আক্রমণ সূচনা করে। একই সময়ে পারস্য উপসাগরে অবস্থিত নেভাল বেজ হতে সাড়াশি আক্রমণ পরিচালিত হয় বসরা ও সংলগ্ন অঞ্চলের তেল খনি রক্ষার জন্য। অন্যদিকে নিয়মিত বাহিনী ইরাকে দক্ষিণ অঞ্চল দখলে মনোযোগী হয়। এর ভিতর উল্লেখযোগ্য ছিল ২৩ মার্চ এ অনুষ্ঠিত নাসিরিয়াহ যুদ্ধ। উপুর্যপুরি বিমান আক্রমণের মাধ্যমে ইরাকী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নষ্ট করে দেয়া হয় যার দরুণ ইরাকী বাহিনী কোন উল্লেখযোগ্য প্রতিরোধ গড়তে সক্ষম হয়নি। ২৬ মার্চ এ ১৭৩তম এয়ারবোর্ন ব্রিগেড উত্তরাঞ্চলীয় কিরকুক শহরের সন্নিকটে অবতরণ করে। যেখানে তারা কুর্দি বিদ্রোহী দের সাথে যুক্ত হয়ে ইরাকী বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে ও উত্তরাঞ্চল কে করতলগত করে।

বাহিনীর মূল অংশ ইরাকের কেন্দ্রস্থল অভিমুখী অভিযান বজায় রাখে। অভিযান চলাকালীন ইরাকি বাহিনী কর্তৃক খুব সামান্য বাধার সম্মুখীন হয়। বেশিরভাগ ইরাকি বাহিনী খুব দ্রুত পরাজিত হয় এবং ৯ এপ্রিল এর ভিতর বাগদাদ দখল সম্পন্ন হয়। এছাড়াও ইরাকের অন্য অঞ্চলে ও অভিযান বজায় ছিল, যেমন ১০ এপ্রিল কিরকুক দখলে আসে। তিরকিত (সাদ্দাম হোসেনের জন্মভূমি) ১৫ এপ্রিল দখলে আসে। যৌথ বাহিনীর দখল সম্পন্নের দরুণ সাদ্দাম হোসেন সহ সিনিয়র নেতৃবৃন্দ লুকিয়ে থাকা শুরু করেন। ১ মে তে জর্জ ডব্লিউ বুশ আক্রমণের সমাপ্তি ঘোষণা করেন ও ইরাকে সেনা দখলদারিত্বের সূচনা হয়।