হ্যারি হুডিনি

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান

হ্যারি হুডিনি (ইংরেজি: Harry Houdini; ১৮৭৪ - ১৯২৬) হলেন একজন প্রখ্যাত জাদুশিল্পী।

জন্ম ও পারিবারিক পরিচিতি[সম্পাদনা]

হুডিনি ১৮৭৪ সালের ২৪ মার্চ হাঙ্গেরির বুদাপেস্ট নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম সামুয়েল ভাইস্‌; তিনি ছিলেন একজন ইহুদি সম্প্রদায়ভুক্ত হিব্রুভাষার পন্ডিত ব্যক্তিত্ব। জন্মের পর তার নাম রাখা হয় এরিখ ভাইস্ (Erich Weiss)।

জীবনী[সম্পাদনা]

এরিখের জন্মের অল্প কিছুদিন পরেই তার পুরো পরিবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক নগরীতে চলে আসে; তবে সেখানে বিশেষ কোন সুযোগ-সুবিধা না হওয়ায় তারা অল্পকালের মধ্যেই উইসকন্সিন-এর আপলটন নগরীতে চলে আসে। এখানে ১৮৮৮ সালের নভেম্বর মাসে, মাত্র ১৪ বছর বয়সে, দারিদ্রের মোকাবেলায় এরিখ্ এক নেকটাই তৈরির কারখানায় চাকুরি নেন এবং এখানে চাকুরি করার সময়ই তিনি মাজিকের প্রতি প্রবল আকর্ষণ অনুভব করেন ও ম্যাজিশিয়ান বা জাদুকর হবেন বলে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হন। এ ব্যপারে এরিখের সহযোগী হন জ্যাকভ হাইমান নামের তার একজন সহকারী মজুর। সিদ্ধান্ত অনুযায়ি তারা কাজ শুরু করেন এবং বিখ্যাত ফরাসি জাদুকর জাঁইউজিঁ রাবার্তো হুডিনির নামাণুসারে নিজেদের নাম রাখেন হুডিনি। এরিখ এবং হাইমান জুটিরনাম হল হুডিনি ব্রাদর্স; অবশ্য জ্যকভ শেষ পর্যন্ত তার সাথে থাকেননি। এরপর হুডিনিকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি। একের পর এক আশ্চর্য সব জাদুর কলাকৌশল দেখিয়ে তিনি দর্শকচিত্ত জয় করেন। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরপের দেশে দেশে তার নাম-ডাক ছড়িয়ে পরে।

এক নজরে হুডিনির জীবনের কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনাঃ

হিস্টোরি টিভিতে হুডিনি চরিত্রে অভিনয় করেন দ্য পিয়ানিস্ট খ্যাত অভিনেতা এড্রিয়েন ব্রাডি। হুডিনির জন্ম ইহুদী পরিবারে। গরীব পরিবারের সন্তান যার ভবিষ্যতও লেখা ছিলো অন্য সব জাদুকরদের মত ম্যাজিক দেখিয়ে জীবন অতিবাহিত করা। কিন্তু এই হুডিনি নিজ দক্ষতায় নিজেকে নিয়ে যান অনন্য এক উচ্চতায়। প্রচলিত ম্যাজিকের অলৌকিকতা আর আধ্যাত্বীকতার সব ঘটনাকে অস্বীকার করে তিনি বলেন যে যাদু নিজের দক্ষতা আর বিজ্ঞানের কিছু কৌশল প্রয়োগ ছাড়া আর কিছুই নয়। যখন তিনি ছিলেন তার ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ শিখরে,জনপ্রিয়তা তুঙ্গে; তখন তিনি যদি এসবের কারন হিসেবে নিজের আধ্যাত্বিক আর অলৌকিক ক্ষমতার কথা প্রকাশ করতেন তবে হয়ে যেতে পারতেন আরও বিখ্যাত,আরও ধনী। কিন্তু তিনি সবসময়ই বলতেন, এসব তিনি বিশ্বাস করেন না। তিনি অলৌকিকতা,আধ্যাত্বিকতায় বিশ্বাস করেন না। কারন তিনি এসবের প্রমান পান নি।

হুডিনি বিয়ে করেন নন ইহুদী এক যুবতীকে। যখন হুডিনিকে মেয়েটি তার মায়ের কাছে নিয়ে যায় তখন মেয়েটির মা তাকে চড় মেরে বলে,"তুই  একটা ইহুদীকে বিয়ে করেছিস!" ইহুদীদের তখনও বাঁকা চোখে দেখা হতো। হুডিনি তার উপর আবার ম্যাজিশিয়ান। 

হুডিনির মায়ের মৃত্যর পরে ঘটে যায় কিছু নাটকীয় ঘটনা। আত্মা নিয়ে কাজ করা অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী যাদুকরেরা বলে যে হুডিনিকে তারা তার মৃত মায়ের আত্মার সাথে কথা বলিয়ে দিতে পারবে। ইংল্যান্ডে নামকরা সব প্লানচ্যাটকারীদের সভা বসে যারা মৃত মানুষের আত্মাকে ডেকে নিয়ে কথা বলাতে পারে। সভা শুরু হয়।পর্দার আড়ালে গায়েবী কন্ঠে আত্মা নেমে আসে।কথা বলে ওঠে হুডিনির মায়ের আত্মা। কিন্তু হুডিনির চোখ এড়ানো তো অসম্ভব। তিনি ধরে ফেলেন যে এসব প্রতারনা। প্রতারক জাদুকরদের এসব ভেল্কিবাজি ধরা পড়ে যাওয়ায় তারা ক্ষিপ্ত হয় হুডিনির প্রতি। হুডিনি ১০ হাজার ইউরো পুরষ্কার ঘোষনা করেন-যদি কেউ তাদের এসব আত্মাকে ডেকে আনা,আধ্যাত্বিকতা,অলৌকিকতা প্রমান করতে পারে তবে তাদের দেওয়া হবে এই অর্থ পুরস্কার।  

সেই সময়ে হুডিনির শত্রু হয়ে পড়েন স্বয়ং শার্লক হোমসের স্রষ্টা স্যার আর্থার কোনান ডায়েল। ভাবতেই অবাক লাগে তার মত লোক আধ্যাত্বিকতা ও অলৌকিকতায় বিশ্বাস করতেন। এসব নিয়ে সভা সেমিনার আয়োজন করে বক্তৃতা দিতেন।তিনি হুডিনির ভক্ত ছিলেন। হুডিনির প্রতিভা আর ম্যাজিকে মুগ্ধ হয়েছিলেন। আর্থার কোনান ডায়াল হুডিনিকে বলেন যে তুমি তো অনেক ভালো জাদু দেখাও। নিশ্চয়ই কোনো আধ্যাত্বিক আলৌকিক ক্ষমতার প্রভাবে এসব দেখাও। কিন্তু হুডিনি এসব অস্বীকার করেন। বলেন এসব তার দক্ষতা ও বিজ্ঞানের কৌশল। এসবে আধ্যাত্বিকতার বিন্দুমাত্র কিছু নেই।

শিক্ষিত এবং পেশায় ডাক্তার আর্থার কোনান ডায়াল,যার হাত ধরে বেরিয়ে এসেছে অনবদ্য এক যুক্তিবাদী চরিত্র শার্লক হোমস। তার মতো লোকও বিশ্বাস করতেন এই আধ্যাত্বিকতা আর অলৌকিকতায়। বিশ্বাস করার কারনও ছিলো। এসব দিয়েই মানুষকে ধোকা দিয়ে প্রচুর অর্থ উপার্জন করতো তান্ত্রিক,যাদুকররা। স্যার আর্থার কোনান ডায়ালের স্ত্রী লেডি আর্থারকে প্রতারক আখ্যা দিয়ে এসব প্লানচ্যাট,আত্নাকে ডেকে এনে কথা শোনা এসব মিথ্যা ঘোষনা করেন হুডিনি।তৎকালীন সমাজে আর্থার পরিবারের প্রভাব প্রতিপত্তি ছিলো অনেক বেশি। তাদের বিরুদ্ধে যাওয়ায় সুশীল সমাজের অনেকেই ক্ষেপে যায় হুডিনির বিরুদ্ধে। হুডিনি চ্যালেঞ্জের টাকা হাতে নিয়ে ঘোষনা দিয়েছিলেন,কেউ এসব প্রমান করতে পারলে তাকে সাথে সাথেই দিয়ে দেবেন এই পুরস্কারের অর্থ। আজীবন তিনি লড়াই করে গেছেন কুসংস্কারের বিরুদ্ধে। মানুষের বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে প্রতারনাকারী এসব যাদুকর ও মানুষদের বিরুদ্ধে। কিন্তু এদের খুটির জোর,প্রভাব প্রতিপত্তি অনেক বেশি তা জানতেন ভালো করেই। এরই ফলশ্রুতিতে একদিন আততায়ীর হামলায় মারাত্মকভাবে আহত হয়ে কিছুদিন পর মারা যান এই কালজয়ী যাদুকর - দ্য গ্রেট হুডিনি।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]