বিষয়বস্তুতে চলুন

সুশাসন

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
কাল্পনিক সুশাসনের চিত্র

আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংক্রান্ত আলোচনায় সুশাসন (Good governance গুড গভার্নেন্স) বলতে এমন একটি প্রক্রিয়াকে বোঝায়, যার মাধ্যমে জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে রাষ্ট্রীয় কার্যাদি পরিচালনা ও সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনা করে এবং শোষণ ও দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশে আইনের শাসন সমুন্নত রেখে মানবাধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টি তদারকি করে। শাসন হল "সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং কোন্‌ প্রক্রিয়াতে সিদ্ধান্তগুলি বাস্তবায়িত হয় (বা হয় না)", সেই ব্যাপারটিকে বোঝায়।[] এই প্রেক্ষিতে শাসন কথাটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, জাতীয়, আন্তর্জাতিক বা স্থানীয় শাসনের পাশাপাশি[] সমাজের অন্যান্য খাতগুলির মধ্যকার আন্তঃক্রিয়ার সাথেও সম্পর্কিত হতে পারে।

সুশাসনের ধারণাটি মূলত একটি আদর্শ মানদণ্ড হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যার মাধ্যমে অকার্যকর অর্থনীতি বা রাজনৈতিক কাঠামোর সাথে টেকসই ও সফল অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক কাঠামোর তুলনা করা হয়।[] সুশাসন ধারণাটির কেন্দ্রে রয়েছে সমাজের কোনো বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত গোষ্ঠীর পরিবর্তে সাধারণ জনগণের চাহিদা পূরণে সরকার ও প্রশাসনিক সংস্থাগুলোর দায়বদ্ধতা। যেহেতু উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপে কেন্দ্রীভূত এবং উদারপন্থী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলিকে প্রায়শই "সবচেয়ে সফল" হিসেবে বর্ণনা করা হয়, তাই সুশাসনের আদর্শ বা মানদণ্ডগুলিতে প্রায়শই ঐসব রাষ্ট্রের সাথে অন্যান্য রাষ্ট্রগুলিকে মাপা হয়।[] সাহায্য প্রদানকারী সংস্থা এবং উন্নত দেশের কর্তৃপক্ষগুলি প্রায়শই "সুশাসন" কথাটি দিয়ে কিছু নির্দিষ্ট অবশ্যপালনীয় কাজের উপর জোর দেন যা ঐ সংস্থার কার্যক্রমের সাথে খাপ খায়, তাই "সুশাসন" বলতে ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ভিন্ন ভিন্ন জিনিস বোঝাতে পারে।[][] সুশাসনের বিপরীত ধারণাটি হল কুশাসন (bad governance)।[]

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সুশাসন

[সম্পাদনা]

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘সুশাসন’ একটি ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ, যার কোনো একক বা সর্বজনীন সংজ্ঞা খুঁজে পাওয়া কঠিন। ফ্রান্সিস ফুকুয়ামার (২০১৩) মতে, রাষ্ট্রের সক্ষমতা এবং আমলাতন্ত্রের স্বাধীনতা—এই দুটি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে শাসনের মান (উত্তম না কি অধম) নির্ধারিত হয়।[] এই দুটি উপাদান একে অপরের পরিপূরক; রাষ্ট্র যখন কর আদায়ের মতো কাজে অধিক সক্ষম হয়, তখন আমলাতন্ত্রকে বেশি স্বায়ত্তশাসন দেওয়া উচিত, কারণ দক্ষ আমলারা অধিক দিকনির্দেশনা ছাড়াই নিজ দায়িত্ব পালন করতে পারেন। পক্ষান্তরে, কম সক্ষম রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে আমলাদের স্বাধীনতা কমিয়ে নিয়ন্ত্রণের পরিধি বাড়ানো প্রয়োজন।

সুশাসনের অপর একটি দৃষ্টিভঙ্গি ফলাফল বা অর্জনের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়। নাগরিকদের কাঙ্ক্ষিত সেবা বা ‘ডেলিভারেবলস’ প্রদানের মাধ্যমেই সুশাসনকে সবচেয়ে ভালোভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব। এর মধ্যে রয়েছে নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা, বিশুদ্ধ পানি, চুক্তির বাস্তবায়ন, সম্পদের সুরক্ষা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং ভোটাধিকার ও ন্যায্য মজুরি নিশ্চিতকরণ। মূলত জনকল্যাণমূলক সেবা বা ‘পাবলিক গুডস’ প্রদানের উদ্দেশ্যেই সরকার পরিচালিত হয়।[]

একইভাবে, দক্ষ জনসেবা নিশ্চিতকরণ, দরিদ্র ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অধিকতর অংশগ্রহণ, সরকারের ওপর জনগণের নিয়ন্ত্রণ বা ‘চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্স’ ব্যবস্থার নিশ্চয়তা, নাগরিক ও সম্পদের নিরাপত্তায় আইনি কাঠামো প্রয়োগ এবং একটি স্বাধীন বিচার বিভাগীয় ব্যবস্থার অস্তিত্বকে সুশাসনের মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা যায়।

লসন (২০১১) রথস্টেইনের ‘দ্য কোয়ালিটি অফ গভর্নমেন্ট’ গ্রন্থের পর্যালোচনায় উল্লেখ করেছেন যে, লেখক সুশাসনকে ‘নিরপেক্ষতা’র (impartiality) সাথে সম্পর্কিত করেছেন।[] এর অর্থ হলো, আমলারা ব্যক্তিগত স্বার্থের পরিবর্তে জনস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে দায়িত্ব পালন করবেন। তবে লসন এই মতের সাথে কিছুটা ভিন্নমত পোষণ করেন; তিনি মনে করেন, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগের ক্ষেত্রে অনেক সময় ‘অর্থনৈতিক উদারতাবাদ’ (economic liberalism) উপেক্ষা করা হয়, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মেগ রিথমায়ারের মতে, একদলীয় শাসনব্যবস্থার দক্ষতা আকর্ষণীয় মনে হতে পারে, তবে নেতাদের উচিত দেশের ক্ষমতার কাঠামো এবং ‘নৈতিক অর্থনীতি’ (moral economy) সম্পর্কে গভীর ধারণা রাখা। তাঁর গ্রন্থ ‘প্রিকারিয়াস টাইস: বিজনেস অ্যান্ড দ্য স্টেট ইন অথরিটারিয়ান এশিয়া’-তে তিনি এশিয়ার পুঁজিপতি ও একনায়কদের মধ্যকার সূক্ষ্ম সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেছেন। বো রথস্টেইন এবং জান টিওরেলের মতে, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতাই হলো সুশাসনের প্রধান বৈশিষ্ট্য।

সংস্কার ও মানদণ্ড

[সম্পাদনা]

সুশাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তিনটি প্রধান প্রতিষ্ঠানের সংস্কার করা যেতে পারে: রাষ্ট্র, বেসরকারি খাত এবং নাগরিক সমাজ (civil society)। তবে ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা ও চাহিদা সেই দেশের সমাজের অগ্রাধিকারের ওপর ভিত্তি করে ভিন্ন হতে পারে। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উদ্যোগ শাসনের বিভিন্ন ধরনের সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করে। প্রতিটি সংস্কার আন্দোলন তাদের নিজস্ব প্রয়োজন ও লক্ষ্য অনুযায়ী সুশাসনের মানদণ্ড নির্ধারণ করে থাকে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিভিন্ন প্রভাবশালী সংস্থার সুশাসন সংক্রান্ত মানদণ্ডের উদাহরণ নিচে দেওয়া হলো:

জাতিসংঘ

[সম্পাদনা]

সুশাসনের প্রসারে জাতিসংঘ ক্রমবর্ধমান ভূমিকা পালন করছে। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের মতে, "সুশাসন হলো মানবাধিকার ও আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধা নিশ্চিত করা; গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা এবং সরকারি প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।" এটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জাতিসংঘ আটটি মূলনীতি অনুসরণ করে:

১. অংশগ্রহণ (Participation): বৈধ মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান বা প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের নিজস্ব মতামত প্রকাশের সুযোগ থাকতে হবে।

২. আইনের শাসন (Rule of Law): আইনি কাঠামো নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগ করতে হবে, বিশেষ করে মানবাধিকার আইনের ক্ষেত্রে।

৩. ঐকমত্য-ভিত্তিক (Consensus Oriented): একটি সম্প্রদায়ের সর্বোত্তম স্বার্থ রক্ষার জন্য বিভিন্ন ধরনের স্বার্থের মধ্যে মধ্যস্থতা করে একটি ব্যাপক ঐকমত্যে পৌঁছানো।

৪. সাম্য ও অন্তর্ভুক্তি (Equity and Inclusiveness): জনগণের নিজেদের কল্যাণ সাধন বা বজায় রাখার সমান সুযোগ থাকতে হবে।

৫. কার্যকারিতা ও দক্ষতা (Effectiveness and Efficiency): প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়াগুলো সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে সমাজের চাহিদা পূরণে সক্ষম ফলাফল তৈরি করবে।

৬. জবাবদিহিতা (Accountability): সরকারি প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি খাত এবং নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলোকে জনগণ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের (stakeholders) কাছে দায়বদ্ধ থাকতে হবে।

৭. স্বচ্ছতা (Transparency): তথ্য জনগণের জন্য উন্মুক্ত হতে হবে এবং তা সহজবোধ্য ও পর্যবেক্ষণযোগ্য হতে হবে। ৮. সাড়াদান (Responsiveness): প্রতিষ্ঠান ও প্রক্রিয়াগুলোকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সকল অংশীজনের সেবা নিশ্চিত করতে হবে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল

[সম্পাদনা]

নিউ হ্যাম্পশায়ারের ব্রেটন উডসে আয়োজিত জাতিসংঘের এক সম্মেলনে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯৬ সালে সংস্থাটি ঘোষণা করে যে, "আইনের শাসন নিশ্চিতকরণ, সরকারি খাতের দক্ষতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি এবং দুর্নীতি দমনসহ সুশাসনের সকল দিক সুসংহত করা একটি সমৃদ্ধ অর্থনীতির অপরিহার্য উপাদান।"

আইএমএফ-এর অভিমত অনুযায়ী, অর্থনীতির অকার্যকর শাসনব্যবস্থা—তা সে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ হোক বা অপর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণ—দুর্নীতির জন্ম দেয়। আইএমএফ-এর কাছ থেকে ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে সদস্য দেশগুলোকে সংস্থাটি কর্তৃক নির্ধারিত সুনির্দিষ্ট সুশাসন নীতিমালা অনুসরণ করতে হয়।

বিশ্বব্যাংক (World Bank)

[সম্পাদনা]

বিশ্বব্যাংক ১৯৯২ সালে প্রকাশিত "গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট" (Governance and Development) শীর্ষক প্রতিবেদনে সুশাসনের ধারণাটি প্রবর্তন করে। এই দলিল অনুযায়ী, সুশাসন হলো সঠিক অর্থনৈতিক নীতিমালার একটি অপরিহার্য পরিপূরক এবং এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি ও বজায় রাখার মূল চাবিকাঠি, যা শক্তিশালী ও সাম্যভিত্তিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করে। বিশ্বব্যাংকের মতে, সুশাসন মূলত চারটি উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত: সরকারি খাত ব্যবস্থাপনায় সক্ষমতা ও দক্ষতা, জবাবদিহিতা, উন্নয়নের জন্য আইনি কাঠামো এবং তথ্য ও স্বচ্ছতা।

বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত ‘ওয়ার্ল্ডওয়াইড গভর্নেন্স ইন্ডিকেটরস’ (Worldwide Governance Indicators) কর্মসূচির মাধ্যমে বিশ্বের ২০০টিরও বেশি দেশের শাসনের মান পরিমাপ করা হয়। এই পরিমাপে শাসনের ছয়টি মাত্রাকে বিবেচনা করা হয়, যথা—বাক-স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সহিংসতার অনুপস্থিতি, সরকারের কার্যকারিতা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার মান, আইনের শাসন এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ। ১৯৯৬ সাল থেকে সংস্থাটি বিভিন্ন দেশের শাসনব্যবস্থার ওপর এই গবেষণা পরিচালনা করে আসছে।

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. 1 2 "What is Good Governance". UNESCAP, 2009. Accessed April 6, 2021.
  2. 1 2 Khan 16
  3. Agere, Sam (২০০০)। Promoting good governance। Commonwealth Secretariat। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৮৫০৯২-৬২৯-৩
  4. Poluha, Eva; Rosendahl, Mona (২০০২)। Contesting 'good' governance:crosscultural perspectives on representation, accountability and public space। Routledge। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৭০০৭-১৪৯৪-০
  5. Richard Rose; Caryn Peiffer (৫ জুলাই ২০১৮)। Bad Governance and Corruption। Springer। পৃ. ৫–। আইএসবিএন ৯৭৮-৩-৩১৯-৯২৮৪৬-৩
  6. Fukuyama, Francis (জানুয়ারি ২০১৩)। "What Is Governance?"। Center for Global Development। Working paper ৩১৪।
  7. Rotberg, Robert (জুলাই ২০১৪)। "Good Governance Means Performance and Results"। Governance২৭ (3): ৫১১–৫১৮। ডিওআই:10.1111/gove.12084
  8. Lawson, Robert (২০১২)। "Book Review of Bo Rothstein: The Quality of Government: Corruption, Social Trust, and Inequality in International Perspective."। Public Choice১৫০ (3–4): ৭৯৩–৭৯৫। ডিওআই:10.1007/s11127-011-9903-yএস২সিআইডি 153403374