রামধনু

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
রামধনু


রামধনু বা ইন্দ্রধনু বা রংধনু হল একটি দৃশ্যমান ধনুরাকৃতি আলোর রেখা যা বায়ুমণ্ডলে অবস্থিত জলকণায় সূর্যালোকের প্রতিফলন এবং প্রতিসরণের ফলে ঘটিত হয়। সাধারণত বৃষ্টির পর আকাশে সূর্যের বিপরীত দিকে রামধনু দেখা যায়। রামধনু তে সাতটি রঙের সমাহার দেখা যায়। দেখতে ধনুকের মতো বাঁকা হওয়ায় এটির নাম রামধনু।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

রামধনুর বৰ্ণালী ও তার উপস্থিতির কারণের প্রথম বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেন বিখ্যাত গ্রীক দাৰ্শনিক ও বৈজ্ঞানিক অ্যারিস্টটল। তিনি বোঝালেন যে আকাশের মেঘে সূৰ্যের আলোর একটি বিশেষ কোণে প্রতিফলনের ফলেই  এই ‘রামধনু রশ্মি’র জন্ম। যেহেতু আকাশের কয়েকটি ‘বিশেষ’ দিক থেকে আলো বিক্ষিপ্ত (scattered) হয়ে আমাদের চোখে এসে পড়ার ফলে এই রামধনু তৈরি হচ্ছে, এতে রামধনুর অর্ধবৃত্তাকার (বা বৃত্তাকার) হওয়ার ব্যাখ্যাও মিললো। ব্যাপারটা এইরকম: রামধনু রশ্মিগুলি একটি বিশেষ কোণে বিক্ষিপ্ত হওয়ার ফলে তারা সবাই মিলে আকাশে একটি আলোর শঙ্কু(আসলে প্রত্যেক রঙের জন্য এক-একটি শঙ্কু) তৈরি ‍করে যার লম্ব প্রস্থচ্ছেদ (perpendicular cross-section) একটি বৃও হয়। আমাদের দেখা রামধনু তাহলে আসলে সেই আলোকশঙ্কুর লম্ব প্রস্থচ্ছেদ!

অ্যারিস্টটলের এই ব্যাখ্যার প্রায় ১৭ শতাব্দী পর ১৩০৪ সালে এক জাৰ্মান সন্ন্যাসী Theodoric of Freiberg এই তত্ত্ব বৰ্জন করলেন ও একটি নতুন যুক্তি দিলেন।যুক্তিটি এইরকম, মেঘে উপস্থিত  জলবিন্দুরাশির সম্মিলিত প্রতিফলনের দরকার নেই, একটি জলকণাই রামধনুর জন্ম দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট! শুধু তত্ত্ব খাড়া করেই থেমে থাকলেন না সন্ন্যাসী, বাস্তবে তা আদৌ খাটে কিনা দেখার জন্য কাঁচের গোলকে জল ভৰ্তি করে তাতে আলোকরশ্মির যাতায়াতের পথও চিহ্নিত করলেন তিনি (‍ কাঁচের গোলকে কেন বুঝলে কি? ওটা একটা বিবৰ্ধিত জলবিন্দুর কাজ করবে বলে!)। কিন্তু দুঃখের বিষয়,  তাঁর এই কাজের কথা সকলের অগোচর রইল এবং প্রায় তিন শতাব্দী পর ডেকাৰ্ট (Descartes) একই পদ্ধতি প্রয়োগ করে নিয়মগুলি পুনরাবিষ্কার করলেন। থিওডোরিক ও ডেকা্ৰ্ট উভয়েই দেখালেন যে জলবিন্দুর অভ্যন্তরে আলোর প্রতিফলনের জন্যই রামধনুর জন্ম হচ্ছে; একবার আভ্যন্তরীন প্রতিফলন হয়ে আলো বেরোলে প্রাথমিক রামধনু আর দু’বার  আভ্যন্তরীন প্রতিফলন হয়ে এলে মাধ্যমিক রামধনু! যেহেতু প্রত্যেক প্রতিফলনের মুহূ্ৰ্তে জলবিন্দু কিছুটা আলো শোষণ (absorption) করে ফেলে, তাই মাধ্যমিকের ঔজ্জ্বল্য প্রাথমিকের তুলনায় সৰ্বদাই কম হয়। ডেকা্ৰ্ট এও দেখলেন যে রামধনুর কৌণিক পরিসীমার (angular range) মধ্যে যেকোন এক দিশা বরাবর কেবলমাত্র একটি রঙই দেখা যায়, যার থেকে তিনি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছলেন যে রামধনুর প্রত্যেকটি রঙের জন্য আলাদা আলাদা জলবিন্দুরাশির অবদান রয়েছে।

ব্যাখ্যা[সম্পাদনা]

বৃষ্টির কণা বা জলীয় বাষ্প-মিশ্রিত বাতাসের মধ্য দিয়ে সূর্যের আলো যাবার সময় আলোর প্রতিসরণের কারণে বর্ণালীর সৃষ্টি হয়। এই বর্ণালীতে আলো সাতটি রঙে ভাগ হয়ে যায়। এই সাতটি রঙ হচ্ছে বেগুনী (violet), নীল (blue), আকাশী (indigo), সবুজ (green), হলুদ (yellow), কমলা (orange) ও লাল (red); বাংলাতে এই রংগুলোকে তাদের আদ্যক্ষর নিয়ে সংক্ষেপে বলা হয়: বেনীআসহকলা আর ইংরেজিতে VIBGYOR।

রামধনুর প্রাথমিক বিশ্লেষণ প্রতিফলন এবং প্রতিসরণ -এই দুই নীতির উপর ভিত্তি করেই শুরু হয়েছিল। এখন বিশ্লেষণের সুবিধার জন্য ধরে নেওয়া যাক যে আকাশে ভাসমান জলবিন্দুরা গোলাকৃতি।

এখন শুধু যেটা বিবেচ্য সেটা হল গোলকের কেন্দ্রবিন্দু থেকে আলোকরশ্মির লম্ব দুরত্ব।এই দুরত্বকে বিজ্ঞানের পরিভাষায় বলা হয় ইমপ্যাক্ট প্যারামিটার (impact parameter)। যদি আলোকরশ্মি সরাসরি গোলকের কেন্দ্রবিন্দু ভেদ করে, তাহলে তার ইমপ্যাক্ট প্যারামিটার শূন্য। আর যদি তা গোলকটিকে স্পর্শ করে বেরিয়ে যায় তাহলে তার ইমপ্যাক্ট প্যারামিটার-এর মান গোলকের ব্যাসার্ধের সমান (এটি ইমপ্যাক্ট প্যারামিটার-এর সর্বোচ্চ মানও বটে)।

Impact Parameter of Rainbow.jpg

যে সূর্যরশ্মি জলকণার উপর এসে পড়ছে, তাদের ইমপ্যাক্ট প্যারামিটার-এর মান শূন্য থেকে জলকণার ব্যাসার্ধের মাঝে যা খুশি হওয়া সম্ভব। আর তাহলে, বিক্ষিপ্ত রশ্মিদের বিক্ষেপ কোণও শূন্য ও ১৮০° র মাঝে যে কোন মান  নিতে পারে। তাহলে আকাশের একটা বিশেষ কোণেই শুধু রামধনু দেখতে পাওয়া যাবে কেন? থিওডোরিক এটা ভেবে দেখেননি। এই প্রশ্নের উত্তর প্রথম মেলে ডেকার্টের কাছে।

পাশের ছবিটি দেখ – খুব সহজ জ্যামিতি লাগিয়ে আমরা বিক্ষেপ কোণ বা স্ক্যাটারিং অ্যাঙ্গেল (scattering angle), δ-র মান বের করার একটা সমীকরণ লিখেছি। এই সমীকরণ অনুযায়ী আপতন আর প্রতিসরণ কোণের মান জানলেই বিক্ষেপ কোণের মান জানা যাবে।

পাশের ছবি অনুযায়ী ইমপ্যাক্ট প্যারামিটারের মান পাল্টালে, অর্থাৎ আলোক রশ্মি জলকণার বিভিন্ন জায়গায় এসে ধাক্কা মারলে, আপতন কোণ বা i-এর মান বদলাব‍ে (সমীকরণ ছবিতে দেওয়া হয়েছে)। ফলে প্রতিসরণ কোণ বা r-এর মানেরও পরিবর্তন হবে। অর্থাৎ ইমপ্যাক্ট প্যারামিটার বদলালে বিক্ষেপ কোণ বদলাবে। যেমন, আপতিত আলোকরশ্মির ইমপ্যাক্ট প্যারামিটার শূন্য হলে বিক্ষেপ কোণের মান হবে ১৮০°, অর্থাৎ বিক্ষিপ্ত আলোকরশ্মি প্রতিফলিত হয়ে সোজা যেদিক থেকে এসেছিল সেদিকেই ফিরে যাবে।

প্রাথমিক রামধনু রশ্মির ক্ষেত্রে দেখা গেল যে ইমপ্যাক্ট প্যারামিটার বাড়ানোর সাথে সাথে বিক্ষেপ কোণের মান প্রথমে কমতে থাকে, কিন্তু একটা সময় পর সেটা আবার বাড়তে শুরু করে! অর্থাৎ বিক্ষেপ কোণের একটি সর্বনিম্ন মান রয়েছে; হিসেব করে দেখা গেল যে এই সর্বনিম্ন মানটি হল ১৩৮°। ইমপ্যাক্ট প্যারামিটার জলবিন্দুর ব্যাসার্ধের ৭/৮ ভাগ হলে বিক্ষেপ কোণের মান এই দাঁড়ায়।

এই বিক্ষেপ কোণের মান বিভিন্ন রঙের জন্য সত্যিই আলাদা। আর সেখানেই তো রামধনুর সৃষ্টি-রহস্য! বুঝতে যাতে আর একটু সুবিধা হয় তার জন্য নিচে একটি টেবিলে আপতন কোণ i-এর বিভিন্ন মানের জন্য বিক্ষেপ কোণের মান দেখিয়ে দেওয়া হল, শুধু বেগুনি রঙের আলোর জন্য। জলের জন্য বেগুনি রঙের প্রতিসরাঙ্ক 1.340।

i r δ ( = 180° + 2i - 4r )
180°
20° 14.8° 160.8°
30° 22° 152°
50° 35° 140°
60° 40.4° 138.4°
80° 47.4° 150.4°
90° 48.4° 166.4°
কিভাবে প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক রামধনু সৃষ্টি হচ্ছে

ছকটিতে দেখা যাচ্ছে, i = 60°-র জন্য δ-র মান সর্বনিম্ন।

লাল রঙের জন্য বিক্ষেপ কোণ δ-র সর্বনিম্ন মান বেগুনির তুলনায় সামান্য কম, কারণ লাল রঙের জন্য জলের প্রতিসরাঙ্ক বেগুনির তুলনায় কম (1.331)। অর্থাৎ বেগুনির প্রতিসরণ লালের তুলনায় বেশি।

মাধ্যমিক রামধনুর ক্ষেত্রে কিন্তু ব্যাপারটা হয় ঠিক উল্টো! ইমপ্যাক্ট প্যারামিটার বাড়ার সাথে-সাথে বিক্ষেপ কোণ প্রথমে বাড়ে এবং ১৩০° অতিক্রম করার পর কমতে শুরু করে। এক্ষেত্রে ১৩০° হল বিক্ষেপ কোণের সর্বোচ্চ মান।

ইমপ্যাক্ট প্যারামিটার-এর সঙ্গে বিক্ষেপ কোণের পরিবর্তনের হার সব চাইতে কম বিক্ষেপ কোণের সর্বনিম্ন মানের জন্য। অতএব, জলকণার উপর বিভিন্ন আপতন কোণে পতিত অনেক রশ্মি ওই একই বিক্ষেপ কোণে ফিরে গিয়ে দর্শকের চোখে ধরা দেবে! তাই ১৩৭.৬° বিক্ষেপ কোণে লাল রঙের আলোর জটলা হবে, ১৩৮.৮° বিক্ষেপ কোণে হবে বেগুনির জটলা। ভিন্ন রঙের আলোর ভিন্ন বিক্ষেপ কোণে এই জটলাটাই হচ্ছে আমাদের রামধনু!

যেহেতু জলকণা থেকে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসা আলো রামধনু তৈরি করছে, তাহলে কেন রামধনু সূর্যের বিপরীত দিকে দেখা যায়? উপরের ছবিগুলির দিকে আরেকবার ভাল করে তাকালে বুঝবে যে সূর্যের আলোর দিকের সাথে মোটামুটি ৪২ ডিগ্রী কোণে প্রাথমিক রামধনু দেখা যায় – লাল থাকে উপরে, বেগুনি নিচে। মাধ্যমিক রামধনুর ক্ষেত্রে কিন্তু উলটো – বেগুনি উপরে, লাল নিচে!

১৩০‍‍‍° ও ১৩৮°-র মাঝে কোন রামধনু (প্রাথমিক ও মাধ্যমিক) রশ্মির বিক্ষেপ কোণ নেই! অর্থাৎ, ওই কোণটুকুর মধ্যকার আকাশে কোনো বিক্ষিপ্ত আলো এসে পৌঁছবে না। এটাই আলেকজান্ডারের ডার্ক ব্যান্ড!

বিতর্ক[১][২][সম্পাদনা]

পশ্চিমবঙ্গে ২০১৬ শিক্ষাবর্ষে সপ্তম শ্রেণির পরিবেশ ও বিজ্ঞান বইয়ের ‘বর্ণালী’ অধ্যায়ের হাতেকলমে অংশটিতে রামধনুকে রংধনু লেখা হয়েছে। রামধনুর অন্যতম রং হিসাবে লেখা রয়েছে ‘আসমানি’। স্কুল বইয়ের সিলেবাস ধর্মনিরপেক্ষ করতে গিয়ে বিতর্ককে সম্পূর্ণ অন্য মাত্রা দিয়েছেন সিলেবাস প্রণেতারা। প্রচলিত ‘রামধনু’ শব্দটিতে দশরথ পুত্রের নাম জড়িত। সেই রাজা রাম হিন্দুদের পূজ্য। এনিয়ে তোলপাড় হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়াও।

তবে, সিলেবাস কমিটির চেয়ারম্যান অভীক মজুমদারের বক্তব্য, রংধনুর সঙ্গে রামের কোনও সম্পর্ক নেই। আধুনিক লেখকরা সেটিকে রংধনু হিসাবেই উল্লেখ করেন। এমনকী, মহাশ্বেতা দেবীও রংধনু লিখেছেন বলে তাঁর যুক্তি। তিনি এও জানান, প্রথম শ্রেণির কিছু বইতেও রংধনু লেখা হয়েছে। কয়েক বছর ধরেই তা রয়েছে।

কিন্তু এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ ভিন্নমত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার অধ্যাপক তথা গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য অচিন্ত্য বিশ্বাস। তিনি বলেন, অভীক আমার ছাত্র। কেন এটা বলেছে জানি না। কিন্তু এর মধ্যে এক ধরনের কৌশল রয়েছে। আমি এটাকে ভাষা-সন্ত্রাস হিসাবেই দেখছি। পাকিস্তান সরকারের নির্দেশে মহম্মদ শহিদুল্লার নেতৃত্বাধীন একটি কমিটি এ ধরনের বেশ কিছু সুপারিশ করেছিল। তারা আহ্নিক-এর বদলে উজুর শব্দটি আনে। আত্মাকে পালটে করে দেয় ‘রূহ্’। কিন্তু সেসব বানানবিধি এ রাজ্যেও চালু করার যুক্তি কোথায়? আমার এক ছাত্র প্রশ্ন করছিলেন, এবার কি রামছাগলকেও রংছাগল বলা হবে? রামের ভাঙা হরধনুর সঙ্গে মিল রয়েছে বলে ‘ধনু’ শব্দটিকেও না পালটে দেয় এরা।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলার অধ্যাপক শেখ রফিকুল হোসেনের কোথায়, "বাংলাদেশে যদি রামধনু বদলে রংধনু করা হয়ে থাকে, তাহলে সেটা হয়তো রামকে সরিয়ে ইসলামী-করণের চেষ্টা থেকেই হয়েছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে আমাদের ভোকাবুলারিতে রামধনুটাই প্রচলিত, রংধনু একেবারেই অপরিচিত। কাজেই এই রংধনু চালু করার চেষ্টা হলে বিতর্ক তো হবেই, আর হঠাৎ করে এটা বদলানোর প্রয়োজনও আমরা দেখি না।"

রাজ্য সরকারের সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে এই উদ্যোগকে তোষণ হিসাবেই দেখছেন নেটিজেন থেকে শুরু করে শিক্ষাবিদদের একটা বড় অংশই।

যুগ্ম রামধনু ও অন্তর্বর্তী গাঢ় অঞ্চল

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]