বিষয়বস্তুতে চলুন

রংধনু

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
প্রাথমিক রংধনুর ভেতরের দিকে অতিরিক্ত রংধনুসহ একটি দ্বৈত রংধনু। ছবির নিচে আলোকচিত্রীর মাথার ছায়া রংধনু বৃত্তের কেন্দ্র নির্দেশ করে (এটি অ্যান্টিসোলার পয়েন্ট)।

রংধনু একটি আলোকীয় ঘটনা। এটি পানির কণার মধ্যে আলোর প্রতিসরণ, অভ্যন্তরীণ প্রতিফলনবিস্তার-এর ফলে সৃষ্টি হয়। এর ফলে আকাশে আলোর একটি ধারাবাহিক দৃশ্যমান বর্ণালী দেখা যায়।[] রংধনু সাধারণত বহুবর্ণের একটি বৃত্তাকার খণ্ড আকারে দেখা যায়।[] সূর্যের আলো থেকে সৃষ্টি হওয়া রংধনু সবসময় সূর্যের ঠিক বিপরীত দিকে আকাশে দেখা যায়। রংধনু কেবল বৃষ্টির কারণে নয়; বাতাসে থাকা বিভিন্ন ধরনের পানি থেকেও এটি তৈরি হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে কুয়াশা, জলকণা ছিটা এবং বাতাসে ভাসমান শিশির

রংধনু সম্পূর্ণ বৃত্ত আকারেও হতে পারে। তবে সাধারণত পর্যবেক্ষক মাটির উপরে আলোকিত পানিকণার দ্বারা গঠিত বৃত্তের একটি অংশ বা খণ্ডই দেখতে পান।[] এই বৃত্তের কেন্দ্র সূর্য থেকে পর্যবেক্ষকের চোখের দিকে টানা একটি সরলরেখার উপর অবস্থিত।

প্রাথমিক রংধনুতে বাইরের দিকে লাল রং এবং ভেতরের দিকে বেগুনি রং দেখা যায়। এই রংধনু তখনই তৈরি হয়, যখন আলো পানিকণার ভেতরে প্রবেশের সময় প্রতিসৃত হয়, পরে কণার পেছনের অংশে অভ্যন্তরীণভাবে প্রতিফলিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত বেরিয়ে আসার সময় আবার প্রতিসৃত হয়।

দ্বৈত রংধনুতে প্রাথমিক রংধনুর বাইরের দিকে আরেকটি রংধনু দেখা যায়। এতে রঙগুলোর বিন্যাস উল্টো হয়, অর্থাৎ লাল রং ভেতরের দিকে থাকে। এটি ঘটে, কারণ আলো পানিকণার ভেতরে থেকে বের হওয়ার আগে দুইবার অভ্যন্তরীণভাবে প্রতিফলিত হয়।

দৃশ্যমানতা

[সম্পাদনা]
একটি বর্ণিল রংধনু ও একটি ring-billed gull

বাতাসে পানিকণা উপস্থিত থাকলে এবং পর্যবেক্ষকের পেছন দিক থেকে কম উচ্চতা কোণে সূর্যালোক পড়লে রংধনু দেখা যায়। এ কারণে সাধারণত সকালে পশ্চিম আকাশে এবং সন্ধ্যার প্রথম দিকে পূর্ব আকাশে রংধনু দেখা যায়। সবচেয়ে চমকপ্রদ রংধনু তখনই দেখা যায়, যখন আকাশের অর্ধেক অংশ এখনও বৃষ্টিসহ অন্ধকার মেঘে ঢাকা থাকে এবং সূর্যের দিকে আকাশ পরিষ্কার থাকে। এতে অন্ধকার পটভূমির বিপরীতে উজ্জ্বল একটি রংধনু দৃশ্যমান হয়। এমন ভালো দৃশ্যমানতার সময় বড় কিন্তু তুলনামূলকভাবে ম্লান গৌণ রংধনুও প্রায়ই দেখা যায়। এটি প্রাথমিক রংধনুর বাইরে প্রায় ১০° দূরে অবস্থান করে এবং এর রঙের ক্রম উল্টো হয়।

ঝরনা বা ফোয়ারা কাছাকাছিও প্রায়ই রংধনুর প্রভাব দেখা যায়। এছাড়া রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে বাতাসে কৃত্রিমভাবে পানিকণা ছিটিয়েও এই প্রভাব সৃষ্টি করা যায়। খুব কম ক্ষেত্রে প্রবল চাঁদের আলোয় চন্দ্রধনু বা রাতের রংধনু দেখা যেতে পারে। মানুষের দৃষ্টিগ্রহণ ক্ষমতা কম আলোতে রঙের প্রতি দুর্বল হওয়ায় চন্দ্রধনুকে প্রায়ই সাদা বলে মনে হয়।[]

একটি ছবিতে রংধনুর সম্পূর্ণ অর্ধবৃত্ত ধারণ করা কঠিন। কারণ এর জন্য ৮৪° দৃষ্টিকোণ প্রয়োজন। একটি ৩৫ মিমি ক্যামেরির ক্ষেত্রে এর জন্য ১৯ মিমি বা তার কম ফোকাল দৈর্ঘ্যের ওয়াইড-অ্যাঙ্গেল লেন্স দরকার হয়। বর্তমানে একাধিক ছবিকে সফটওয়্যারের মাধ্যমে জোড়া লাগিয়ে একটি প্যানোরামা তৈরি করা যায়। ফলে পরপর তোলা একাধিক ছবির সাহায্যে সম্পূর্ণ বৃত্ত এবং এমনকি গৌণ রংধনুর ছবিও তুলনামূলকভাবে সহজে তৈরি করা সম্ভব।

ভূপৃষ্ঠের অনেক উপরে, যেমন বিমানে থাকা অবস্থায়, কখনও কখনও রংধনুকে সম্পূর্ণ বৃত্ত আকারে দেখা যায়। এই ঘটনাকে কখনও কখনও গ্লোরি নামক আলোকীয় ঘটনার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়। তবে গ্লোরি সাধারণত অনেক ছোট হয় এবং মাত্র ৫–২০° এলাকা জুড়ে বিস্তৃত থাকে।

প্রাথমিক রংধনুর ভেতরের আকাশ বাইরের আকাশের তুলনায় বেশি উজ্জ্বল দেখায়। এর কারণ হলো, প্রতিটি বৃষ্টিকণা গোলাকার এবং এটি আকাশে একটি সম্পূর্ণ বৃত্তাকার চাকতির ওপর আলো ছড়িয়ে দেয়। এই চাকতির ব্যাসার্ধ আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের ওপর নির্ভর করে; লাল আলো নীল আলোর তুলনায় বড় কোণে ছড়িয়ে পড়ে। চাকতির অধিকাংশ অংশে সব তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো একে অপরের ওপর পড়ে সাদা আলো তৈরি করে, যা আকাশকে উজ্জ্বল করে তোলে। প্রান্তের দিকে ছড়ানোর কোণ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের ওপর নির্ভর করায় সেখানে রংধনুর সৃষ্টি হয়।[]

প্রাথমিক রংধনুর খণ্ডের আলো প্রায় ৯৬% ধ্রুবিত থাকে এবং এটি খণ্ডের স্পর্শকীয় দিকে অভিমুখী হয়।[] গৌণ রংধনুর আলো প্রায় ৯০% ধ্রুবিত।

বর্ণালী বা রংধনুতে রঙের সংখ্যা

[সম্পাদনা]

মানুষের চোখে দৃশ্যমান রঙগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি উল্লেখিত ও স্মরণীয় ক্রমটি হলো আইজ্যাক নিউটন নির্ধারিত সাতটি রং: লাল, কমলা, হলুদ, সবুজ, নীল, ইন্ডিগো ও বেগুনি।[][] এই রঙগুলোর ক্রমটি মনে রাখার জন্য বাংলা স্মরণসূত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয় বেনীআসহকলা। আধুনিক ব্যাখ্যায় প্রায়ই রংধনুকে লাল, কমলা, হলুদ, সবুজ, সায়ান, নীল ও বেগুনি, এই সাতটি রঙে ভাগ করা হয়।[] তবে প্রধান রঙগুলোর এই স্পষ্ট বিভাজন মানুষের দৃষ্টিগত উপলব্ধির ফল, এবং প্রকৃতপক্ষে কতগুলো রংকে “প্রধান” বলা হবে, তা অনেকটাই ইচ্ছাধীন।

নিউটন নিজেই স্বীকার করেছিলেন যে রঙের সূক্ষ্ম পার্থক্য নির্ণয়ে তাঁর দৃষ্টি খুব সংবেদনশীল ছিল না।[১০] তিনি প্রথমে (১৬৭২ সালে) বর্ণালীকে পাঁচটি প্রধান রঙে ভাগ করেছিলেন: লাল, হলুদ, সবুজ, নীলবেগুনি। পরে তিনি কমলাইন্ডিগো যোগ করেন এবং সঙ্গীতের স্বরের সংখ্যার সঙ্গে সাদৃশ্য টেনে মোট সাতটি প্রধান রঙ নির্ধারণ করেন।[][][১১] নিউটন এই সাতটি রং বেছে নিয়েছিলেন প্রাচীন গ্রিক গ্রিক সোফিস্টদের ধারণা থেকে প্রভাবিত হয়ে। তাঁদের মতে, রং, সঙ্গীতের স্বর, সৌরজগতের পরিচিত বস্তু এবং সপ্তাহের দিনের মধ্যে একটি পারস্পরিক সম্পর্ক রয়েছে।[১২][১৩] পরবর্তীকালের গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন যে নিউটনের সময়ে যে রংকে “নীল” বলা হতো, আজ সেটিকে সাধারণত সায়ান বলা হয়; আর নিউটনের “ইন্ডিগো” বর্তমান পরিভাষায় নীল নামে পরিচিত।[১৪][১৫][১৬]

নিউটনের প্রাথমিক রং লাল হলুদ সবুজ নীল বেগুনি
নিউটনের পরবর্তী রং লাল কমলা হলুদ সবুজ নীল ইন্ডিগো বেগুনি
আধুনিক ব্যাখ্যা লাল কমলা হলুদ সবুজ সায়ান নীল বেগুনি

রংধনুর রঙের বিন্যাস বর্ণালীর মতো নয় এবং এতে রংগুলো তুলনামূলকভাবে কম সম্পৃক্ত। রংধনুতে তথাকথিত ‘‘স্পেকট্রাল স্মিয়ারিং’’ ঘটে, কারণ নির্দিষ্ট কোনো তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো একক কোণের পরিবর্তে বিভিন্ন কোণে বেরিয়ে আসে।[১৭] তাছাড়া সূর্যের চাকতির ব্যাস (০.৫°) রংধনুর প্রস্থের (২°) তুলনায় উপেক্ষণীয় নয়। ফলে একটি রংধনু মূলত একটি বিন্দু উৎস থেকে প্রাপ্ত খণ্ডের ঝাপসা রূপ। এ কারণে রংধনুতে দৃশ্যমান রঙের সংখ্যা বর্ণালীর রঙের সংখ্যার সঙ্গে সব সময় মেলে না। বিশেষত পানিকণার আকার খুব বড় বা খুব ছোট হলে এই পার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়। তাই রংধনুর রঙের সংখ্যা পরিবর্তনশীল। তবে যদি ভুলভাবে ‘‘রংধনু’’ শব্দটি ‘‘বর্ণালী’’ অর্থে ব্যবহার করা হয়, সেক্ষেত্রে বর্ণালীর প্রধান রঙের সংখ্যাই প্রযোজ্য হয়।

এছাড়া রংধনুতে লালের বাইরে ও বেগুনির বাইরেও যথাক্রমে নিকটবর্তী অবলোহিত এবং অতিবেগুনি অঞ্চলের ব্যান্ড থাকে। তবে এগুলো মানুষের চোখে দৃশ্যমান নয়। দৃশ্যমান বর্ণালীর কাছাকাছি তরঙ্গদৈর্ঘ্যগুলোই কেবল রংধনুতে অন্তর্ভুক্ত বলে ধরা হয়, কারণ এই তরঙ্গদৈর্ঘ্যে পানি ও বাতাস ক্রমশ অস্বচ্ছ হয়ে আলো ছড়িয়ে দেয়। অতিবেগুনি ব্যান্ড কখনও কখনও সাদা-কালো ফিল্ম ব্যবহৃত ক্যামেরায় ধরা পড়তে পারে।[১৮]

রংধনুতে সবাই কি সাতটি রংই দেখে—এই প্রশ্নটি ভাষাগত আপেক্ষিকতা ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। কিছু গবেষণায় বলা হয়েছে যে রংধনু উপলব্ধির ক্ষেত্রে একটি সার্বজনীনতা রয়েছে।[১৯][২০] তবে সাম্প্রতিক গবেষণা ইঙ্গিত দেয় যে মানুষ কতগুলো পৃথক রং দেখে এবং সেগুলোকে কী নামে ডাকে, তা অনেকটাই নির্ভর করে সে যে ভাষা ব্যবহার করে তার ওপর। যেসব ভাষায় রঙের জন্য কম শব্দ রয়েছে, সেসব ভাষাভাষীরা রংধনুতে তুলনামূলকভাবে কম সংখ্যক পৃথক রঙের ব্যান্ড দেখতে পান।[২১]

ব্যাখ্যা

[সম্পাদনা]
আলোকরশ্মি এক দিক থেকে (সাধারণত সূর্য থেকে সরলরেখায়) একটি বৃষ্টিকণায় প্রবেশ করে, কণার পেছনের অংশে প্রতিফলিত হয় এবং কণা থেকে বেরিয়ে আসার সময় ছড়িয়ে পড়ে। রংধনু থেকে বেরিয়ে আসা আলো বিস্তৃত কোণে ছড়ায়, যার সর্বাধিক তীব্রতা ৪০.৮৯–৪২° কোণে দেখা যায়। (দ্রষ্টব্য: প্রতিটি তিনটি পৃষ্ঠে আলোর ২% থেকে ১০০% পর্যন্ত প্রতিফলিত হতে পারে, যা আপতন কোণের ওপর নির্ভরশীল। এই চিত্রে কেবল রংধনু সৃষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত আলোর পথ দেখানো হয়েছে।)
বিস্তারের কারণে বৃষ্টিকণায় প্রবেশের সময় সাদা আলো বিভিন্ন রঙে বিভক্ত হয়; এতে লাল আলো নীল আলোর তুলনায় কম মাত্রায় প্রতিসৃত হয়।

সূর্যালোক যখন একটি বৃষ্টিকণার সঙ্গে সংঘর্ষে আসে, তখন আলোর একাংশ প্রতিফলিত হয় এবং বাকি অংশ কণার ভেতরে প্রবেশ করে। কণার পৃষ্ঠে আলো প্রতিসরণ ঘটে। এরপর এই আলো কণার পেছনের অংশে পৌঁছালে তার কিছু অংশ সেখানে প্রতিফলিত হয়। অভ্যন্তরীণভাবে প্রতিফলিত এই আলো আবার পৃষ্ঠে পৌঁছালে এর একাংশ পুনরায় প্রতিফলিত হয় এবং একাংশ কণা থেকে বেরিয়ে আসে। (যে আলো কণার গায়ে প্রতিফলিত হয়, পেছন দিক দিয়ে বেরিয়ে যায়, অথবা দ্বিতীয়বার পৃষ্ঠে পৌঁছানোর পর কণার ভেতরে ঘুরতে থাকে—সেগুলো প্রাথমিক রংধনু গঠনে ভূমিকা রাখে না।) সার্বিকভাবে, আগত আলোর একটি অংশ ০° থেকে ৪২° কোণের মধ্যে ফিরে আসে, যার মধ্যে প্রায় ৪২° কোণে আলোর তীব্রতা সর্বাধিক হয়।[২২] এই কোণটি বৃষ্টিকণার আকারের ওপর নির্ভরশীল নয়, তবে এর প্রতিসরণাঙ্ক-এর ওপর নির্ভর করে। সমুদ্রের পানির প্রতিসরণাঙ্ক বৃষ্টির পানির তুলনায় বেশি হওয়ায় সমুদ্রের জলকণায় সৃষ্ট “রংধনু”-এর ব্যাসার্ধ প্রকৃত রংধনুর তুলনায় ছোট হয়। এই পার্থক্য খালি চোখেই দেখা যায়, কারণ এই ধনুগুলোর অবস্থানে সামান্য অমিল থাকে।[২৩]

প্রায় ৪২° কোণে ফেরত আসা আলোর তীব্রতা সর্বাধিক হওয়ার কারণ হলো, এটি একটি বাঁকবিন্দু। বৃষ্টিকণার একেবারে প্রান্তে আপতিত আলো ৪২°-এর কম কোণে ফিরে আসে, আবার কেন্দ্রের কাছাকাছি আপতিত আলোও ৪২°-এর কম কোণে ফিরে আসে। কেবল একটি বৃত্তাকার বলয় রয়েছে, যেখান থেকে আলো প্রায় ৪২° কোণেই ফিরে আসে। যদি সূর্য সমান্তরাল ও একরঙা রশ্মি নির্গতকারী কোনো লেজার হতো, তবে হস্তক্ষেপের প্রভাব উপেক্ষা করলে এই কোণে রংধনুর উজ্জ্বলতা অসীমের দিকে ধাবিত হতো। কিন্তু সূর্যের উজ্জ্বলতা সীমিত এবং এর সব রশ্মি সমান্তরাল নয় (সূর্য আকাশের প্রায় অর্ধ ডিগ্রি জুড়ে বিস্তৃত), তাই উজ্জ্বলতা অসীমে পৌঁছায় না। আরও একটি বিষয় হলো, আলো কতটা প্রতিসৃত হবে তা তার তরঙ্গদৈর্ঘ্য বা রঙের ওপর নির্ভর করে। এই প্রভাবকে বিস্তার বলা হয়। নীল আলো (ক্ষুদ্রতর তরঙ্গদৈর্ঘ্য) লাল আলোর তুলনায় বেশি কোণে প্রতিসৃত হয়। তবে কণার পেছন দিক থেকে প্রতিফলনের কারণে নীল আলো কণা থেকে বেরিয়ে আসে আগত সাদা আলোর তুলনায় লাল আলোর চেয়ে ছোট কোণে। এ কারণেই প্রাথমিক রংধনুর খণ্ডের ভেতরের দিকে নীল এবং বাইরের দিকে লাল রং দেখা যায়। এর ফলে রংধনুর বিভিন্ন অংশে ভিন্ন ভিন্ন রং দেখা যায় এবং একই সঙ্গে উজ্জ্বলতাও কিছুটা কমে যায়। (যদি কোনো তরলের কণায় বিস্তার না থাকত, তবে সেই কণায় গঠিত “রংধনু” সাদা হতো, তবে সাধারণ রংধনুর চেয়ে বেশি উজ্জ্বল হতো।)

বৃষ্টিকণার পেছনের অংশে আলো সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলন ভোগ করে না এবং অধিকাংশ আলো পেছন দিক দিয়ে বেরিয়ে যায়। তবে পেছন দিক দিয়ে বেরিয়ে আসা আলো পর্যবেক্ষক ও সূর্যের মাঝখানে কোনো রংধনু তৈরি করে না। এর কারণ হলো, এই আলো থেকে নির্গত বর্ণালীর কোনো নির্দিষ্ট সর্বাধিক তীব্রতার কোণ নেই, যেমনটি দৃশ্যমান রংধনুগুলোর ক্ষেত্রে থাকে। ফলে রংগুলো একত্রে মিশে যায় এবং পৃথক রংধনু তৈরি হয় না।[২৪]

রংধনু কোনো নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করে না। প্রকৃতপক্ষে অসংখ্য রংধনু বিদ্যমান থাকে, তবে নির্দিষ্ট একজন পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিকোণ থেকে কেবল একটি রংধনুই দেখা যায়। সূর্যালোকে আলোকিত সব বৃষ্টিকণাই আলোকে একইভাবে প্রতিসরণ ও প্রতিফলন করে, কিন্তু কেবল কিছু নির্দিষ্ট কণার আলোই পর্যবেক্ষকের চোখে পৌঁছায়। এই আলোই ঐ পর্যবেক্ষকের জন্য রংধনু গঠন করে। সূর্যের রশ্মি, পর্যবেক্ষকের মাথা এবং গোলাকার পানিকণাগুলো নিয়ে গঠিত পুরো ব্যবস্থাটি সূর্যের রশ্মির সমান্তরাল এবং পর্যবেক্ষকের মাথার মধ্য দিয়ে অতিক্রান্ত একটি অক্ষের চারপাশে অক্ষীয় সমমিতি প্রদর্শন করে। রংধনু বাঁকা দেখায়, কারণ যেসব বৃষ্টিকণার ক্ষেত্রে পর্যবেক্ষক, কণা ও সূর্যের মধ্যকার কোণ সঠিক হয়, সেগুলো পর্যবেক্ষককে শীর্ষে রেখে সূর্যের দিকে নির্দেশিত একটি শঙ্কুর ওপর অবস্থান করে। এই শঙ্কুর ভিত্তি পর্যবেক্ষকের মাথা ও তার ছায়ার মধ্যকার রেখা থেকে ৪০–৪২° কোণে একটি বৃত্ত গঠন করে। তবে পর্যবেক্ষক যদি যথেষ্ট উচ্চতায় না থাকেন, তাহলে এই বৃত্তের অন্তত ৫০% অংশ দিগন্তের নিচে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, বিমানে থাকলে সম্পূর্ণ বৃত্তটি দেখা সম্ভব হতে পারে।[২৫][২৬] বিকল্পভাবে, উপযুক্ত অবস্থান থেকে ফোয়ারা বা জলপ্রপাতের জলকণায়ও সম্পূর্ণ বৃত্তাকার রংধনু দেখা যেতে পারে।[২৭] বিপরীতভাবে, নিম্ন অক্ষাংশে মধ্যাহ্নের কাছাকাছি সময়ে (বিশেষত যখন সূর্যের উচ্চতা ৪২°-এর বেশি হয়) আকাশে রংধনু দেখা যায় না।[২৮][২৯][৩০][ভালো উৎস প্রয়োজন]

গাণিতিক উপপাদ্য

[সম্পাদনা]
কোণগুলোর সংজ্ঞা

নিচের পদ্ধতিতে রংধনু যে কোণ জুড়ে দেখা যায়, তা নির্ণয় করা যায়।[৩১]

একটি গোলাকার বৃষ্টিকণার ক্ষেত্রে, রংধনুর দৃশ্যমান কোণকে 2φ এবং অভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের কোণকে 2β ধরা যাক। তখন বৃষ্টিকণার পৃষ্ঠের লম্বের সঙ্গে সূর্যের রশ্মির আপতন কোণ হবে 2βφ। যেহেতু প্রতিসরণের কোণ β, তাই স্নেলের সূত্র অনুযায়ী

sin(2β φ) = n sin β,

যেখানে n = 1.333 হলো পানির প্রতিসরণাঙ্ক (সবুজ আলোর জন্য)। এখান থেকে φ নির্ণয় করলে পাওয়া যায়

φ = 2β − arcsin(n sin β)

রংধনু সেই অবস্থানে সৃষ্টি হয়, যেখানে কোণ φ-এর মান β-এর সাপেক্ষে একটি চরম মান গ্রহণ করে। অর্থাৎ, / = 0। এই শর্ত থেকে β নির্ণয় করলে পাওয়া যায় এই মানটি আগের সমীকরণে φ-এর স্থলে বসালে রংধনুর ব্যাসার্ধীয় কোণ হিসেবে 2φmax ≈ 42° পাওয়া যায়।

লাল আলোর ক্ষেত্রে (তরঙ্গদৈর্ঘ্য ৭৫০ ন্যানোমিটার, n = 1.330, যা পানির বিস্তার সম্পর্ক থেকে নেওয়া), ব্যাসার্ধীয় কোণ প্রায় ৪২.৫°। নীল আলোর ক্ষেত্রে (তরঙ্গদৈর্ঘ্য ৩৫০ ন্যানোমিটার, n = 1.343), এই কোণ প্রায় ৪০.৬°।

আরও দেখুন

[সম্পাদনা]
  1. Tony Buick (২০১০)। The Rainbow Sky: An Exploration of Colors in the Solar System and Beyond। Springer Science & Business Media। পৃ. ২০০। আইএসবিএন ৯৭৮১৪৪১৯১০৫৩০। ২২ জুন ২০২৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২৮ মে ২০২৩
  2. "Rainbow"National Geographic। ২০ মে ২০২৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২০ মে ২০২৩
  3. Masters, Jeff (১৪ এপ্রিল ২০০৫)। "The 360-degree Rainbow"Weather Underground। The Weather Company। ২৯ জানুয়ারি ২০১৫ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
  4. Walklet, Keith S. (২০০৬)। "Lunar Rainbows – When to View and How to Photograph a "Moonbow""। The Ansel Adams Gallery। ২৫ মে ২০০৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৭ জুন ২০০৭
  5. "Why is the inside of a rainbow brighter than the outside sky?"। WeatherQuesting। ২৮ মে ২০১৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৯ আগস্ট ২০১৩
  6. "Rainbow – A polarized arch?"। Polarization.com। ৯ সেপ্টেম্বর ২০১৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৯ আগস্ট ২০১৩
  7. 1 2 Isaac Newton, Optice: Sive de Reflexionibus, Refractionibus, Inflexionibus & Coloribus Lucis Libri Tres, Propositio II, Experimentum VII, edition 1740
  8. Waldman, Gary (১৯৮৩)। Introduction to Light: The Physics of Light, Vision, and Color (2002 revised সংস্করণ)। Mineola, New York: Dover Publications। পৃ. ১৯৩। আইএসবিএন ৯৭৮-০৪৮৬৪২১১৮৬
  9. "Understand the science of appearance of different colors of the rainbow"Encyclopædia Britannica। ২০১৪। ১০ আগস্ট ২০২০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৬ আগস্ট ২০২০
  10. Gage, John (১৯৯৪)। Color and Meaning। University of California Press। পৃ. ১৪০। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৫২০-২২৬১১-১
  11. Allchin, Douglas। "Newton's Colors"SHiPS Resource Center। ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৬ অক্টোবর ২০১০
  12. Hutchison, Niels (২০০৪)। "Music For Measure: On the 300th Anniversary of Newton's Opticks"Colour Music। ১৮ জানুয়ারি ২০১৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২০ অক্টোবর ২০২৩
  13. Newton, Isaac (১৭০৪)। Opticks
  14. Evans, Ralph M. (১৯৭৪)। The perception of color। New York: Wiley-Interscience। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৪৭১-২৪৭৮৫-২
  15. McLaren, K. (মার্চ ২০০৭)। "Newton's indigo"। Color Research & Application১০ (4): ২২৫–২২৯। ডিওআই:10.1002/col.5080100411
  16. Waldman, Gary (২০০২)। Introduction to light : the physics of light, vision, and color। Mineola: Dover Publications। পৃ. ১৯৩আইএসবিএন ৯৭৮-০-৪৮৬-৪২১১৮-৬
  17. Cowley, Les। "Primary rainbow colours"Atmospheric Optics। সংগ্রহের তারিখ ৪ অক্টোবর ২০২৫
  18. "UCSB Science Line"। ১ জুন ২০২৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১ জুন ২০২৩
  19. Rosch Heider, Eleanor (১৯৭২)। "Universals in color naming and memory"। Journal of Experimental Psychology৯৩ (1): ১০–২০। ডিওআই:10.1037/h0032606
  20. Dawkins, Richard (২০০৫)। The ancestor's tale: a pilgrimage to the dawn of evolution
  21. Roberson, Debi; Davies, Ian; Davidoff, Jules (সেপ্টেম্বর ২০০০)। "Color categories are not universal: Replications and new evidence from a stone-age culture"Journal of Experimental Psychology: General১২৯ (3): ৩৬৯–৩৯৮। ডিওআই:10.1037/0096-3445.129.3.369
  22. "About Rainbows"। Eo.ucar.edu। ১৮ আগস্ট ২০১৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৯ আগস্ট ২০১৩
  23. Cowley, Les। "Sea Water Rainbow"Atmospheric Optics। সংগ্রহের তারিখ ৪ অক্টোবর ২০২৫
  24. Cowley, Les। "Zero order glow"Atmospheric Optics। সংগ্রহের তারিখ ৪ অক্টোবর ২০২৫
  25. "Why are rainbows curved as semicircles?"Ask the van। The Board of Trustees at the University of Illinois। ৭ নভেম্বর ২০১৪। ২ অক্টোবর ২০১৫ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৩ এপ্রিল ২০১৫
  26. "How to see a whole circle rainbow – EarthSky.org"। ৪ অক্টোবর ২০১৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
  27. "USATODAY.com – Look down on the rainbow"। ১২ অক্টোবর ২০১৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৩০ অক্টোবর ২০১৩
  28. "Science of rainbows explains much, steals the magic not at all"Triton। সংগ্রহের তারিখ ২৮ অক্টোবর ২০২৪
  29. "Rainbows"Met Office। সংগ্রহের তারিখ ২৮ অক্টোবর ২০২৪
  30. "Does latitude affect the frequency of "double rainbows"?"। সংগ্রহের তারিখ ২৮ অক্টোবর ২০২৪
  31. Anon (২৯ মার্চ ২০০৪)। "Solution, Week 81, Rainbows" (পিডিএফ)। Harvard University Department of Physics। ৮ অক্টোবর ২০১৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত (পিডিএফ)। সংগ্রহের তারিখ ১৩ জুন ২০১৬

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ

[সম্পাদনা]
  1. নিউটন বর্ণালীতে সাতটি রঙের নাম দেন: লাল, কমলা, হলুদ, সবুজ, নীল, ইন্ডিগো ও বেগুনি। বর্তমানে সাধারণভাবে ছয়টি প্রধান বিভাজনের কথা বলা হয় এবং ইন্ডিগো বাদ দেওয়া হয়। নিউটনের লেখাগুলো সতর্কভাবে পড়লে বোঝা যায়, তিনি যে রংটিকে ইন্ডিগো বলেছেন, সেটিকে আজ আমরা সাধারণত নীল বলি; আর তাঁর নীল রংটি আজকের পরিভাষায় নীল-সবুজ বা সায়ান হিসেবে পরিচিত।[]
  2. লাতিন উদ্ধৃতি
উদ্ধৃতি ত্রুটি: "lower-alpha" নামক গ্রুপের জন্য <ref> ট্যাগ রয়েছে, কিন্তু এর জন্য কোন সঙ্গতিপূর্ণ <references group="lower-alpha"/> ট্যাগ পাওয়া যায়নি