ভোটদান যন্ত্র

ভোটদান যন্ত্র হলো ভোট নিবন্ধনের কাজে ব্যবহৃত এক ধরনের যন্ত্র। প্রথম দিকের ভোটদান যন্ত্রগুলো যান্ত্রিক হলেও বর্তমানে ইলেকট্রনিক ভোটদান যন্ত্রের ব্যবহার ক্রমশ বাড়ছে। ঐতিহ্যগতভাবে, ভোটদানের যান্ত্রিক কৌশলের ওপর ভিত্তি করে এই যন্ত্রের সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়। এছাড়া, ভোট গণনার (সারণিবদ্ধ করার) স্থান বা ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করেও এগুলোকে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়।
ভোটদান যন্ত্রগুলোর ব্যবহারযোগ্যতা, নিরাপত্তা, দক্ষতা ও নির্ভুলতার ক্ষেত্রে ভিন্নতা দেখা যায়। কিছু ব্যবস্থা সব ধরনের ভোটারের জন্য কম-বেশি উপযোগী হলেও, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বা প্রতিবন্ধী ভোটারদের জন্য তা ব্যবহারের অনুপযোগী হতে পারে। এছাড়া, এগুলো নির্বাচন পর্যবেক্ষণে জনগণের সক্ষমতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রাথমিক ইতিহাস
[সম্পাদনা]১৮৩৮ সালে চার্টিস্টদের পক্ষ থেকে প্রথম ভোটদান যন্ত্র ব্যবহারের একটি বড় প্রস্তাব আসে।[১] তাদের 'পিপলস চার্টার'-এ যেসব মৌলিক সংস্কারের দাবি জানানো হয়েছিল, তার মধ্যে সর্বজনীন ভোটাধিকার এবং গোপন ব্যালটের মাধ্যমে ভোটদান অন্যতম ছিল। এর ফলে নির্বাচন পরিচালনায় বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রয়োজন দেখা দেয়। দায়িত্বশীল সংস্কারক হিসেবে চার্টিস্টরা কেবল সংস্কারের দাবিই করেননি, বরং তা কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে তার রূপরেখাও তৈরি করেছিলেন। এর 'তফসিল এ'-তে ভোটকেন্দ্র পরিচালনার বিবরণ এবং 'তফসিল বি'-তে ভোটকেন্দ্রে ভোটদান যন্ত্র ব্যবহারের নিয়মাবলি বর্ণনা করা হয়েছিল।[২][৩]
বাথ শহরের ১৯ ইয়র্ক স্ট্রিটে প্রদর্শিত চার্টিস্ট ভোটদান যন্ত্রে প্রতিটি ভোটারকে একটি নির্বাচনে একটি করে ভোট দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হতো। এটি তৎকালীন ব্রিটিশ সংসদীয় নির্বাচনের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। ভোটাররা তাদের পছন্দের প্রার্থীর নাম সংবলিত যন্ত্রের ওপরের নির্দিষ্ট ছিদ্র দিয়ে একটি পিতলের (ব্রাস) বল ফেলে ভোট দিতেন। প্রতিটি ভোটারকে কেবল একটি বল দেওয়া হতো, ফলে তারা একবারের বেশি ভোট দিতে পারতেন না। বলটি যন্ত্রের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর একটি ক্লকওয়ার্ক কাউন্টারকে (গণনাকারী যন্ত্র) এক ধাপ এগিয়ে দিত। এরপর বলটি বাইরে বেরিয়ে আসত এবং পরবর্তী ভোটারের ব্যবহারের জন্য সেটি সংগ্রহ করা হতো।
১৮৭৫ সালে কেন্টের হেনরি স্প্রেট একটি ভোটদান যন্ত্রের জন্য মার্কিন পেটেন্ট (কৃতিস্বত্ব) লাভ করেন। এই যন্ত্রে ব্যালট পেপারের পরিবর্তে বোতামের সারি ব্যবহার করা হতো এবং ভোটাররা বোতাম চেপে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারতেন। স্প্রেটের এই যন্ত্রটি মূলত সাধারণ ব্রিটিশ নির্বাচনের উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছিল। ১৮৮১ সালে শিকাগোর অ্যান্থনি বেরানেক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ নির্বাচনে ব্যবহারের উপযোগী প্রথম ভোটদান যন্ত্রের পেটেন্ট পান। বেরানেকের যন্ত্রটিতে ভোটারদের সামনে পুশ-বোতামের একটি তালিকা থাকত, যেখানে প্রতিটি পদের জন্য একটি করে সারি এবং প্রতিটি দলের জন্য একটি করে কলাম নির্ধারিত ছিল। প্রতিটি সারির পেছনে থাকা ইন্টারলক ব্যবস্থার কারণে ভোটাররা একই পদে একাধিক প্রার্থীকে ভোট দিতে পারতেন না। ভোটার বুথ থেকে বের হওয়ার সময় দরজার সাথে যুক্ত একটি ইন্টারলক স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরবর্তী ভোটারের জন্য যন্ত্রটিকে পুনরায় সেট করে দিত।
১৯০৭ সালে ইতালীয় উদ্ভাবক বোগিয়ানো 'সিফোগ্রাফ' (Syphograph) নামক একটি যন্ত্রের পেটেন্ট লাভ করেন।
১৯৩৬ সালের জুলাই মাসের মধ্যে আইবিএম (IBM) একক স্থানান্তরযোগ্য ভোট (Single Transferable Vote) পদ্ধতির জন্য ভোটদান ও ব্যালট সারণিবদ্ধকরণের প্রক্রিয়াটিকে যান্ত্রিক রূপ দেয়। এতে বেশ কয়েকটি ডায়াল ব্যবহার করে ভোটাররা একটি পাঞ্চ কার্ডে রেকর্ড করা বিশটি স্থানের মধ্যে নিজেদের পছন্দ নির্ধারণ করতে পারতেন। এতে রাইট-ইন (পছন্দের প্রার্থীর নাম লিখে ভোট দেওয়ার) সুযোগও ছিল। যন্ত্রটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যাতে ভোটাররা কোনো ক্রম (র্যাঙ্কিং) বাদ দিতে না পারেন কিংবা একাধিক প্রার্থীকে একই ক্রম দিয়ে ব্যালট নষ্ট করতে না পারেন। একটি আদর্শ পাঞ্চ-কার্ড গণনা যন্ত্রের সাহায্যে প্রতি মিনিটে ৪০০টি করে ব্যালট সারণিবদ্ধ বা গণনা করা যেত।
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ Douglas W. Jones, Early Requirements for Mechanical Voting Systems, First International Workshop on Requirements Engineering for E-voting Systems, Aug. 31, 2009, Atlanta. (author's copy).
- ↑ The People's Charter with the Address to the Radical Reformers of Great Britain and Ireland and a Brief Sketch of its Origin Elt and Fox, London, 1848; obverse of title page.
- ↑ The People's Charter 1839 Edition, in the radicalism collection of the University of Aberdeen.