পরিপক্বতা (মনোবৈজ্ঞানিক)

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

পারিপার্শ্বিকতার প্রতি যথাযথভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার ক্ষমতাকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় পরিপক্বতা বলে। এই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার ক্ষমতা সাধারণত প্রজ্ঞানির্ভর হয়ে থাকে, এটি মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি নয়। [১] যথাযথ সময় ও স্থান সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকা এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট বিচার করে উপযুক্ত আচরণ ও প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে জানাও পরিপক্বতার অংশ। [২] প্রাপ্তবয়স্ক মানসিকতার ক্রমবিকাশ এবং পরিপক্বতা সংক্রান্ত মতবাদগুলোতে জীবনের উদ্দেশ্য থাকাকে পরিপক্বতার অংশ বলা হয়েছে; যেখানে জোর দিয়ে বলা হয় যে, জীবনের অভিপ্রায় সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখা, অকপটতা এবং উদ্দেশ্যময়তা-এসবই পরিপক্বতার অংশ এবং এই সব বিষয়গুলোই “জীবন অর্থবহ” এমন ধারণার জন্ম দেয়। [৩]

অন্যের অভিভাবকত্ব থেকে সরে আসা এবং প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ হিসেবে অবেক্ষণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রবণতা বিচার করে পরিপক্বতাকে প্রভেদ করা হয়। পরিপক্বতার আইনী, সামাজিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক, লৈঙ্গিক, আবেগ-নির্ভর এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সংজ্ঞা রয়েছে। এখানে উল্লেখিত প্রতিটি ক্ষেত্রই আসলে সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল নির্ভর স্বাধীনতাবোধ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, তবে সামাজিক মূল্যবোধের প্রেক্ষিতে এটি বদলাতে পারে। আইনী এবং সামাজিক-দুই ক্ষেত্রেই মনস্তাত্ত্বিক পরিপক্বতার প্রায়োগিক ধারণা রয়েছে। অন্যদিকে রাজনৈতিক সক্রিয়তা এবং বৈজ্ঞানিক প্রমাণাদি; এই দু’টো বিষয়ের মাধ্যমে যৌথভাবে পরিপক্বতার সংজ্ঞাকে আরও সুসংহত করার প্রয়াস চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এই সব বিষয়গুলোকে মাপকাঠি হিসেবে ধরলে অপরিপক্বতা এবং পরিপক্বতা আসলে পরস্পর প্রাসঙ্গিক। 

আমেরিকান মনস্তত্ত্ববিদ জেরোম বার্নার একটি ধারণার প্রস্তাব করেছিলেন যে, অপরিপক্বতার সময়কাল আসলে এক ধরনের পরীক্ষামূলক কর্মকান্ডের সময়, যেটির কোন মারাত্বক প্রভাব নেই। এই সময়ে একটি নবীন প্রাণী তার মায়ের সংস্পর্শে এবং তত্ত্বাবধানে থেকে আশেপাশের অভিজ্ঞ প্রাণীদের কর্মকান্ড পর্যবেক্ষণ করে অনেক কিছুই শিখতে পারে। [৪] প্রতীক এবং সাধনী ব্যবহার করে মানুষের মধ্যে নতুনত্বের জন্ম দেওয়া যায়। কাজেই কারো সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতাগুলো ব্যাপক অনুসন্ধানের মাধ্যমে খুঁজে বের করে সংশোধন করার প্রকৃত প্রক্রিয়াটি হলো পুণঃ পুণঃ অনুকরণ প্রক্রিয়া; যেটাকে বলা হয় “অনুশীলিত, নিখুঁত এবং প্রয়োগ ক্ষেত্রে ভিন্ন”। মানসিক ক্রমবিকাশ বিশেষজ্ঞরা এমন ধারণা দেন যে, কগনিটিভ অপরিপক্বতার ফলে শিশুদের মনে তাদের অনুন্নত মেটা-কগনিশন এবং মূল্যবোধের বিপরীতে একটি রক্ষণশীল বাঁধার অভিযোজিত অভিপ্রায় গড়ে ওঠে, যার ফলে ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে তারা। [৫] ২১ শতাব্দীতে নবীনদের স্কুল এবং খেলাধূলোর সময়কাল আস্তে আস্তে বাড়ছে বলে আমাদের পৃথিবী ও প্রযুক্তিতে জটিলতা বাড়ছে; কারণ এর ফলে শিশুদের কাছ থেকে নানা ধরনের দক্ষতা এবং সামর্থ্য প্রত্যাশা করে জটিল ঘুরপ্যাঁচ এবং অপ্রয়োজনীয় সব পূর্বশর্ত তৈরি করা হয়েছে সমাজে। কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন রকম চাহিদা এবং বয়স্কদের কাছ থেকে অতিরিক্ত প্রত্যাশার কারণে কৈশোর বয়সে মানুষের ব্যবহার এবং আবেগজনিত সমস্যা বৃদ্ধি পেতে পারে। 

আবেগীয়-সামাজিক এবং কগনিটিভ নির্দেশক[সম্পাদনা]

যদিও মনস্তাত্ত্বিক পরিপক্বতা একজন মানুষের নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের সামর্থ্যের উপর নির্ভর করে, তবে তা শুধুমাত্র তার কগনিশন নয়, বরং ব্যক্তির সারাজীবনের আবেগীয়, সামাজিক এবং নৈতিক ক্রমবিকাশের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। পরিপক্বতার নির্দেশকগুলো চেনার জন্য বিভিন্ন রকমের অবকাঠামো দাড় করানো হয়েছে বিভিন্ন তত্ত্বে। এরিকসন প্রদত্ত মানসিক ক্রমবিকাশের ধাপগুলোতে পরিপক্বতার উন্নয়নের ধাপগুলো বর্ণনা করা হয়েছে। এই কাঠামোর প্রতিটি ধাপে একটু একটু করে মানুষের পরিপক্বতা বৃদ্ধি পায় এবং কোন না কোন মানসিক দ্বন্দ্বকে বর্ণনা করা হয় ধাপগুলোতে। [৬][৭] “ব্যক্তিত্ব” ধাপটিতে প্রধানত আত্ম-অনুসন্ধান এবং বিভ্রান্তি সংক্রান্ত বিষয়গুলোকে বর্ণনা করা হয়। তবে একই সঙ্গে যৌনতা সহ অন্যান্য ব্যক্তিত্বগুলোকে আবিষ্কার করাও এই ধাপের মধ্যে পড়ে। কিশোর-কিশোরীরা মূল্যবোধ এবং ব্যক্তিত্বময়তার একটি জটিল বুনট পাড়ি দিয়ে “তারা যে মানুষে পরিণত হতে যাচ্ছে” এবং “সমাজ যে মানুষ প্রত্যাশা করছে” এই দু’টো বিষয় উপলব্ধি করতে শেখে। [৮] তবে এরিকসন জোর দিয়ে বলেননি যে এই ধাপগুলো সার্বজনীনভাবে পূর্বনির্ধারিত বিন্দুতে শুরু এবং শেষ হয়, বরং তিনি নির্দিষ্ট ধাপের উপর জোর দিয়েছেন; যেমন বলেছেন যে, “ব্যক্তিত্ব” পর্যায়টি কৈশোর থেকে বয়ঃপ্রাপ্ত অবস্থায়ও চলমান থাকতে পারে, যতদিন না পর্যন্ত এই সব অন্তর্দ্বন্দ্বের মীমাংসা হচ্ছে। [৯][১০] পিয়াজেট প্রদত্ত কগনিটিভ বিকাশের মতবাদ বলছে, যখন একজন মানুষ বিভিন্ন প্রতীক ব্যবহার করে যৌক্তিকভাবে চিন্তা করতে পারে তখন পরিপক্বতার আনুষ্ঠানিক-প্রক্রিয়াগত ধাপগুলো একটি সুসম অবস্থায় পৌঁছায়। এই সুসম অবস্থা অর্জিত হয় যখন সে বস্তুগত চিন্তা, অর্থাৎ তাৎক্ষণিক এবং সুনির্দিষ্ট চিন্তা কিংবা বিমূর্ত চিন্তা অথবা সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিফলন থেকে লব্ধ চিন্তা থেকে সরে আসতে পারে। [১১] এই মতবাদগুলো কৈশোর অবস্থার মানসিক বিকাশের কিছু অবকাঠামো দাড় করিয়েছে এবং বয়ঃপ্রাপ্তির পরবর্তীকালীন কগনিশনসূচক সীমাবদ্ধতাগুলো সম্পর্কে আলোকপাত করেছে।

যদিও শিশুরা সচারচর পরিপক্বতা লাভ করে থাকে একটি পর্যায়ে গিয়ে, তবে গবেষোনায় দেখা গেছে যে শিশুদেরও নিজস্ব ব্যক্তিসত্ত্বা এবং বিচার-বিবেচনা সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণা থাকে। যেমন, আমেরিকার প্রাথমিক স্কুলশিক্ষার্থীদের উপর একটি গবেষণা করে দেখা গেছে যে তারা তাদের পোষাক, চুলের ধরন, বন্ধু-বান্ধব, শখ এবং মাধ্যম নির্বাচন ইত্যাদি বিষয়ে বাবা মায়ের কর্তৃত্বের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখে। [১২]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Talukdar, Dr. Rita Rani; Das, Ms. Joysree (আগস্ট ২০১৩)। "A Study on Emotional Maturity Among Arranged Marriage Couples" (PDF)International Journal of Humanities and Social Science Invention2 (8): 16। 
  2. Wechsler, David (১ মার্চ ১৯৫০)। "Intellectual Development and Psychological Maturity"। Child Development21 (1): 45। doi:10.2307/1126418জেস্টোর 1126418 
  3. Adler, Nancy (নভেম্বর ১৯৯৭)। "Purpose in Life"Psychosocial workgroup। MacArthur। সংগ্রহের তারিখ ২০১১-১১-০৩ 
  4. Bruner, Jerome S. (১ জানুয়ারি ১৯৭২)। "Nature and uses of immaturity."। American Psychologist27 (8): 687–708। doi:10.1037/h0033144 
  5. Bjorklund, DF (সেপ্টেম্বর ১৯৯৭)। "The role of immaturity in human development."। Psychological Bulletin122 (2): 153–69। doi:10.1037/0033-2909.122.2.153PMID 9283298 
  6. Erik H. Erikson (১৯৬৮)। Identity: Youth and Crisis। W. W. Norton। আইএসবিএন 978-0-393-31144-0। সংগ্রহের তারিখ ৯ জুন ২০১৩ 
  7. Kemph, John P. (১ মার্চ ১৯৬৯)। "Erik H. Erikson. Identity, youth and crisis. New York: W. W. Norton Company, 1968"। Behavioral Science14 (2): 154–159। doi:10.1002/bs.3830140209 
  8. J. Eugene Wright (১ অক্টোবর ১৯৮২)। Erikson, identity and religion। Seabury Press। আইএসবিএন 978-0-8164-2362-0। সংগ্রহের তারিখ ৯ জুন ২০১৩ 
  9. Francis L. Gross (১ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৭)। Introducing Erik Erikson: an invitation to his thinking। University Press of America। আইএসবিএন 978-0-8191-5789-8। সংগ্রহের তারিখ ৯ জুন ২০১৩ 
  10. Roweton, William E. (১ এপ্রিল ১৯৮৮)। "Gross, F. L., Jr. (1987). Introducing Erik Erikson: An invitation to his thinking. Lanham, MD: University Press of America. 148 pp., $23.50 (hard cover), $10.75 (paper)"। Psychology in the Schools25 (2): 209–210। doi:10.1002/1520-6807(198804)25:2<209::AID-PITS2310250218>3.0.CO;2-B 
  11. Herbert Ginsburg; Sylvia Opper (১৯৮৮)। Piaget's Theory of Intellectual Development। Prentice-Hall। আইএসবিএন 978-0-13-675166-3। সংগ্রহের তারিখ ৯ জুন ২০১৩ 
  12. Nucci, Larry (২১ মার্চ ১৯৮১)। "Conceptions of Personal Issues: A Domain Distinct from Moral or Societal Concepts"। Child Development52 (1): 114–21। doi:10.2307/1129220