নিতম্বের সাংস্কৃতিক ইতিহাস

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
১৫২৬ সালে অঙ্কিত একটি ছবি, শিল্পীঃ রসো ফিওরেনটিনো
একটি ইরোটিক ফটোগ্রাফি যেখানে নারীর নিতম্বের উপর আলোকপাত করা হয়েছে

নিতম্বের যৌনকরণ ইতিহাস জুড়ে ঘটেছে, বিশেষ করে স্ত্রী লিঙ্গের ক্ষেত্রে।[১]

বৈবর্তনিক তাৎপর্য্য[সম্পাদনা]

যৌনতত্ত্ববিদ আলফ্রেড কাইন্ড বলেন যে, নিতম্ব হচ্ছে প্রাইমেটদের মধ্যে যৌনতার প্রাথমিক অঙ্গ। কিছু নৃবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানী-জীববিজ্ঞানী মনে করেন যে, 'ব্রেস্ট ফেটিশিজম' বা স্তনের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত যৌন-আকর্ষণ মানুষের মধ্যে এসেছে স্তনকে কিছুটা নিতম্বের মত দেখা যায় বলে কিন্তু তারপরেও স্তনেরও শরীরের সম্মুখভাগের অঙ্গ হিসেবে যথেষ্ট যৌন-আবেদন আছে।[২]

মানব নারীদের মধ্যে সুডৌল নিতম্ব দেখা যায়, এর কারণ এস্ট্রোজেন নামক হরমোন নারীদের নিতম্বে মেদ জমিয়ে দেয়। অপরদিকে টেস্টোস্টেরন হরমোন যেটি পুরুষদের থাকে নিতম্বকে একটু সঙ্কুচিত রাখে। এইজন্যেই মানব নারীদের নিতম্বে পুরুষদের চেয়ে 'এ্যাডিপোজ টিসু' বেশি থাকে, বিশেষ করে তাদের বয়ঃসন্ধিকালীন সময়ে। বিবর্তনবাদী মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন যে, সুডৌল নিতম্ব সম্ভবত নারীদের পুরো শরীরের প্রতি পুরুষদের যৌন-আকর্ষণের অংশ হিসেবে বিবর্তিত হতে হতে এসেছে, কারণ নিতম্ব নারীদের যৌবনের এবং যৌনতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হত। নিতম্বের সুডৌলতা নারীর গর্ভধারণ এবং দুগ্ধদানের ক্ষেত্রেও তাৎপর্য্য ভূমিকা রাখত। এছাড়া নিতম্বের সুডৌল আকারের কারণে বাচ্চা জন্ম দেওয়াটাও ছিলো সহজ। মেয়েদের রজঃচক্র শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিতম্বতেও পরিবর্তন আসতে থাকে।[১]

জৈবিক নৃতাত্ত্বিক হেলেন বি. ফিশার বলেন, 'সম্ভবত পুরুষদের নারীদের নিতম্বের প্রতি আকর্ষণ এসেছে যখন তারা কুকুরদের মত করে সঙ্গম করত অর্থাৎ সঙ্গমের সময় নারীটির নিতম্ব পুরুষটির দিকে উন্মুখ হয়ে থাকত'।[৩] ববি এস. লো বলেন যে, নারীদের সুডৌল নিতম্ব সম্ভবত শক্তিশালী পুরুষদেরকে আকৃষ্ট করার জন্য বিবর্তিত হতে হতে তৈরি হয়েছিলো কিন্তু টি এম কারো বক্তব্যটিকে প্রত্যাখ্যান করে বলেন, নারীদের নিতম্বের সুডৌলতা প্রাকৃতিকভাবেই তাদের শরীরকে ঠিক রাখার জন্য তৈরি হয়েছে।[৪]

ইতিহাস[সম্পাদনা]

ভিক্টোরীয় শাসনামলের 'নিতম্বে চড়' ইরোটিকা
ভেনাস ক্যালিপিগোস, একটি গ্রীক মূর্তি (কেউ কেউ রোমান মূর্তিও মনে করেন)

নারীদের নিতম্ব মানব সভ্যতার শুরুর থেকেই একটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিশ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলো উর্বরতা এবং সৌন্দর্যতার প্রতীক হিসেবে। খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ২৪,০০০ বছর আগে 'ভেনাস অব উইলেনডর্ফ' নামের একটি নারী-মূর্তি বানানো হয় যেটাতে স্তন, উরু এবং নিতম্ব মোটা ছিলো।[১]

নারীদের নিতম্বের যৌনকামনা জাগানো সৌন্দর্যের কথা বিবেচনা করত প্রাচীন গ্রীক সভ্যতার পুরুষরাও, ঐ সময়ে 'ভেনাস ক্যালিপিগোস' নামের এক নারী-মূর্তিতে নিতম্বটাকে মূল গুরুত্ব দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিলো।[৫] চীনে মিং শাসনামলে (১৩৬৮-১৬৪৪) হঠাৎ করে কোনো নারীর নিতম্ব যদি কোনো পুরুষ দেখতে পেত তাহলে সেটাকে 'নতুন দেখা যাওয়া চাঁদ' এর সাথে তুলনা দিত।[৬] অনেক চিত্রশিল্পী নারীদের নগ্ন ছবি আঁকার ক্ষেত্রে তাদের নিতম্বকে বেশি গুরুত্ব দিতেন।[৫] আঠারো এবং উনবিংশ শতাব্দীর 'মানব চিড়িয়াখানা' (যেটাতে আদিবাসী মানুষদের নগ্ন প্রদর্শনী চলত) তে সার্তিজে বার্টম্যান (১৭৯০-১৮১৫) নামক এক মহিলার নিতম্ব নিয়ে দর্শনার্থীরা উপহাস করত।

পশ্চিমা দর্শন এবং ধ্যান-ধারণায় নারীদের নিতম্ব একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ 'কামোদ্দীপক অঙ্গ' হিসেবে আছে বহু শতাব্দী ধরে, শুধুমাত্র নারীদের নিতম্বকটাকেই বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে যৌনতার প্রতীক হিসেবে রাখা হত, কিন্তু আবার ওটি থেকে মল বের হয় বলে মাঝে মধ্যে অনেকে ঘেন্নাও করত এবং ট্যাবু বলে বিবেচনা করত। মনোবিশ্লেষক সিগমুন্ড ফ্রয়েড তত্ত্ব দিয়েছিলেন যে, মনঃযৌন বিকাশ তিনটা ধাপে হয় - মুখ স্তর, পায়ুস্তর এবং জননেন্দ্রিয় স্তর, পায়ুস্তরে নিজের এবং অপরের নিতম্বের প্রতি এক যৌন আকর্ষণ ধীরে ধীরে তৈরি হতে থাকে।[১]

নিতম্বে চড় দিয়ে যৌনতা প্রকাশ করা ভিক্টোরীয় আমলের (রাণী ভিক্টোরিয়ার শাসনকালঃ ১৮৩৭-১৯০১) একটি জনপ্রিয় বিষয় ছিলো, আলাদাভাবে এ নিয়ে আয়োজন করা হত যেখানে একজন নারী বা কিশোরী মেয়ের নিতম্ব অনাবৃত করে সেটাতে আলতো চড় মারা হত। উনবিংশ শতাব্দীতে এই সময়ে কাগুজে পর্নোগ্রাফি বা পুস্তক পর্নোগ্রাফি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলো, ঐ সকল পুস্তকে পাছায় চড় মারার ছবি খুব ভালোভাবেই দেওয়া হত।

ব্রিটিশ যৌন মনোবিজ্ঞানী হ্যাভলক এলিস (১৮৫৯-১৯৩৯) তার একটি বই 'স্টাডিস ইন দ্যা সাইকোলজি অব সেক্স' (১৯২৭ সালে প্রকাশিত) তে নিতম্বের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্টের বিবরণ দিয়েছিলেন।[১] তিনি বলেনঃ

সুতরাং আমরা বুঝতে পেরেছি যে ইউরোপ, এশিয়া এবং আফ্রিকা মহাদেশের অধিকাংশ পুরুষ নারীদের সুডৌল নিতম্বকে সৌন্দর্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করে। এই গৌণ যৌনতা যেটি গর্ভবতী হতে দরকারী নয় হচ্ছে পুরুষদের লুইচ্চামির একটি বহিঃপ্রকাশ যদিও এটি প্রাকৃতিক।

তিনি আরো বলেন,

ইউরোপীয় চিত্রশিল্পীরা তাদের চিত্রকর্মের ক্ষেত্রে সুডৌল নিতম্বসম্পন্ন নারীদেরকেই নেন, নিতম্ব পুরুষদের মত হলে নেননা, কিন্তু জাপানে চিত্রশিল্পীরা নিতম্বের ক্ষেত্রে কোনো বৈষম্য করেননা। এছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে সব পুরুষই নারীদের সুডৌল নিতম্ব চান।

এলিস আরো দাবি করেন যে কর্সেট এবং বাসল (নারীদের পোশাক) নিতম্বকে আলাদাভাবে প্রকাশ করার জন্যই তৈরি করা হয়েছে।[৭]

বর্তমান সময়ে[সম্পাদনা]

মার্কিন শিক্ষাবিদ রেই বি. ব্রাউন (১৯২২-২০০৯) নারীদের জিন্সের প্যান্ট পরিধান করার বিষয়ে বলেনঃ[৮]

আজকাল নারীরা জিন্সের প্যান্ট পরে তাদের স্তনের চেয়ে নিতম্বের আবেদন বেশি বাড়িয়ে তুলছেন।

পুরুষদের নিতম্ব[সম্পাদনা]

জার্মান ফটোগ্রাফার উইলহেল্ম ভন গ্লেডেন (১৮৫৬-১৯৩১) এর তোলা একটি নগ্ন পুরুষের ছবি

পুরুষেরা যেমন নারীদের নিতম্বের প্রতি সেই প্রাচীনকাল থেকেই আসক্ত ঠিক তেমনি আধুনিক যুগে নারীরাও পুরুষদের নিতম্ব দেখলে যৌনভাবে উত্তেজিত হন, তাছাড়া সমকামী পুরুষেরাও অপর একজন পুরুষের নিতম্ব দেখে উত্তেজিত হন।[৯][১০]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Singleton, Alena J. (২০০৮)। "Cultural History of the Buttocks"। Pitts-Taylor, Victoria। Cultural Encyclopedia of the Body। ABC-CLIO/Greenwood। আইএসবিএন 978-0-313-34145-8 
  2. Slade, Joseph W. (২০০১)। Pornography and sexual representation: a reference guide। Greenwood Press। পৃষ্ঠা 404–405। 
  3. Fisher, Helen E. (১৯৮২)। The Sex Contract: The Evolution of Human Behavior। New York: William Morrow & Company, Inc.। 
  4. Caro, T.M.; Sellen, D. W. (১৯৯০)। "The Reproductive Advantages of Fat in Women"। Ethology and Sociobiology11 (5): 1–66। doi:10.1016/0162-3095(90)90005-q 
  5. Morris, Desmond (১৯৮৫)। Bodywatching: A Field Guide to the Human Species। পৃষ্ঠা 198। 
  6. van Gulik, Robert Hans (২০০৪)। Erotic colour prints of the Ming period: with an essay on Chinese sex life from the Han to the Chʼing Dynasty, B.C. 206-A.D. 1644। পৃষ্ঠা 223। 
  7. টেমপ্লেট:Cite wikisource
  8. Browne, Ray B. (১৯৮২)। Objects of Special Devotion: Fetishes and Fetishism in Popular Culture। পৃষ্ঠা 111। 
  9. Cultural Encyclopedia of the Body, page 61.
  10. Anal Pleasure & Health: A Guide for Men, Women and Couples, Jack Morin, Jack Morin Ph. D. Down There Press, 2010.