দিনাজপুর রাজবাড়ি

স্থানাঙ্ক: ২৫°৩৮′৪৬.৭৮″ উত্তর ৮৮°৩৯′১৯.৬৬″ পূর্ব / ২৫.৬৪৬৩২৭৮° উত্তর ৮৮.৬৫৫৪৬১১° পূর্ব / 25.6463278; 88.6554611
উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
দিনাজপুর রাজবাড়ি
Dinajpur Rajbari (4).jpg
দিনাজপুর রাজবাড়ির প্রবেশদ্বার
স্থানাঙ্ক২৫°৩৮′৪৬.৭৮″ উত্তর ৮৮°৩৯′১৯.৬৬″ পূর্ব / ২৫.৬৪৬৩২৭৮° উত্তর ৮৮.৬৫৫৪৬১১° পূর্ব / 25.6463278; 88.6554611
অবস্থানদিনাজপুর, রংপুর বিভাগ, বাংলাদেশ
সম্পূর্ণতা তারিখ১৫ শতক

দিনাজপুর রাজবাড়ি বাংলাদেশের রংপুর বিভাগের দিনাজপুর জেলার সদর উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থিত। 'রাজবাটী' গ্রামের সন্নিকটে এই স্থানটি “রাজ বাটিকা” নামে বিশেষভাবে পরিচিত। উল্লেখ্য যে, প্রাচীন এই রাজ বাড়িটির নামেই গ্রামের নামকরণ হয়েছে। এটি দিনাজপুর কেন্দ্রীয় বাসটার্মিনাল এর দক্ষিনে অবস্থিত।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

দিনাজপুর রাজবাড়ি ও রাজ্য রাজা দিনরাজ ঘোষ স্থাপন করেন। কিন্তু অনেকের মতামত পঞ্চদশ শতকের প্রথমার্ধে ইলিয়াস শাহীর শাসনামলে সুপরিচিত “রাজা গণেশ” এই বাড়ির স্থপতি। রাজা দিনরাজ ঘোষ গৌড়েশ্বর গণেশনারায়ণের (১৪১৪-১৪১৮ খ্রি:) অন্যতম রাজকর্মচারী। তিনি ছিলেন উত্তর রাঢ়ের কুলীন কায়স্থ । রাজা দিনরাজের নাম থেকেই রাজ্যের নাম হয় 'দিনরাজপুর', যা বারেন্দ্র বঙ্গীয় উপভাষায় পরিবর্তিত হয়ে হয় দিনাজপুর । গৌড় সংলগ্ন সনাতনী রাজ্য দিনাজপুর পাঠান, মুঘল ও নবাবদের বহু যুদ্ধে পরাস্ত করে চিরকাল এসেছে ।[১] সপ্তদশ শতাব্দীর শেষের দিকে শ্রীমন্ত দত্ত চৌধুরী দিনাজপুরের জমিদার হন। কিন্তু শ্রীমন্ত দত্ত চৌধুরীর ছেলের অকাল মৃত্যুর হওয়াতে, তার ভাগ্নে “সুখদেব ঘোষ” তার সম্পত্তির উত্তরাধিকার হন।[২]

দিনাজপুরের যুদ্ধ (১৭২২ খ্রি:)[সম্পাদনা]

দিনাজপুরের মহারাজা প্রাণনাথ রায়'র শাসনকালে রাজ্যের ক্ষমতা প্রভূত বৃদ্ধি পায় । মুঘল সাম্রাজ্যের অন্তর্দ্বন্দ্ব'র সুযোগে তিনি তার প্রতিবেশী মুঘল অধিকৃত অঞ্চলের জমিদার ও তালুকদারদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ করে নিজের রাজ্যের পরিধি বাড়িয়ে নিয়েছিলেন ।  তাঁর চল্লিশ বছরের শাসনকালে দিনাজপুর রাজ্য বাংলার প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।

নবাব মুর্শিদকুলী খাঁর পর মুর্শিদাবাদের নবাব রূপে মসনদে বসেন শুজাউদ্দীন মুহম্মদ খাঁ । ১৭৩৩ খ্রিস্টাব্দে বিহার প্রদেশ বাংলা নবাবি'র সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। এই সময় শুজাউদ্দীন ঢাকায় এবং বিহার ও উড়িষ্যা শাসনের জন্য আরও দুইজন নায়েব নাজিম নিযুক্ত করেছিলেন। এদিকে ১৭২২ খ্রিস্টাব্দে দিনাজপুরের রাজা প্রাণনাথ মারা গেলে তাঁর উত্তরাধিকারী রাজা রামনাথ রায় রাজসিংহাসনে বসেন । ক্ষমতায় এসে রাজা রামনাথ পতিরাম, পত্নীতলা ও গঙ্গারামপুর অঞ্চল অধিকার করেন । এরপর তিনি গৌড়ের পথে মালদহের চাঁচল, খরবা ও গাজোল পরগনা অধিকার করতে থাকেন । সামগ্রিকভাবে তাঁর রাজ্যের আয়তন ও সামরিক ক্ষমতা প্রভূত বৃদ্ধি পায় ।

রাজা রামনাথের বিরাট ক্ষমতা ও ঐশ্বর্য দেখে নবাব সুজাউদ্দিন অত্যন্ত শঙ্কিত হয়ে পড়েন । তিনি রংপুরের নব নিযুক্ত মুঘল ফৌজদার সৈয়দ মহম্মদ খাঁ কে দিনাজপুর আক্রমণ ও দখলের আদেশ দেন । সৈয়দ মহম্মদ খাঁ'ও রামনাথ এর ক্ষমতার প্রতি ঈর্ষান্বিত ও ক্ষুব্ধ ছিল ।  কথিত যে, সৈয়দ মহম্মদ খাঁ এক বিশাল সেনাবাহিনী সঙ্গে নিয়ে দিনাজপুর শহরে নিকটবর্তী রাজবাড়ি আক্রমণ ও লুঠ করতে এগিয়ে আসেন। অমিত ক্ষমতাশালী রাজা রামনাথও এক বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে  এগিয়ে চললেন সৈয়দ মহম্মদ খাঁ ও তার নবাবি সৈন্যবাহিনীর সাথে যুদ্ধ করতে। দুপক্ষের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয় । দিনাজপুর সৈন্যবাহিনী'র পরাক্রমে নবাবী সেনা কার্যত ধূলিসাৎ হয়ে যায় । সৈয়দ মহম্মদ খাঁ পরাজিত হয়ে শেষ পর্যন্ত রাজা রামনাথের হাতে বন্দী হলেন।

অবশেষে মুর্শিদাবাদের নবাব সুজাউদ্দিন খান, রাজা রামনাথ রায়'র সাথে সন্ধি করেন এবং নবাবের অনুরোধে পরে পরাজিত সৈয়দ মহম্মদ খাঁকে রামনাথ মুক্তি দিয়েছিলেন।[৩]

বর্গী আক্রমণ প্রতিরোধ[সম্পাদনা]

রাজা রামনাথ (১৭২২-৬০) প্রায় বিয়াল্লিশ বৎসর দিনাজপুরের মহারাজ হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এই সুদীর্ঘ সময়ে তিনি বাংলার রাজনৈতিক পরিবর্তন সহ বহু ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তার সময় বাংলায় অত্যাচারী বর্গী আক্রমণ ঘটে । বর্গীদের ভয়ে লোকেরা ভাগীরথীর পূর্বদিকে পালিয়ে যেতে লাগল। ১৭৪২ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৭৫১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রতিবছর বর্গীরা বাংলায় এসে গ্রাম ও নগর আক্রমণ করে লুণ্ঠন, ধর্ষণ, অত্যাচার ও উৎপীড়ন করেছিল বাংলার মানুষের উপরে।

বরেন্দ্রভূমিতে বর্গী আক্রমণ সফলভাবে প্রতিহত করেন দিনাজপুরের রাজা রামনাথ রায় । তিনি রাজ্যের সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রতিরক্ষার জন্য রাজা ১০টি কামান নিযুক্ত করেছিলেন বলে কথিত। দিনাজপুরের পরাক্রমে অত্যাচারী বর্গীরা মুর্শিদাবাদ পার করে ঢুকতে পারেনি, ফলে বর্গীরা দিনাজপুর, মালদহ, রাজশাহী, রংপুরে তেমন কোনও তৎপরতা চালাতে পারেনি ও এসব অঞ্চল বর্গী অত্যাচারের বীভৎসতা থেকে রক্ষা পায় । [৪]

গঠনশৈলী[সম্পাদনা]

আসলে বর্তমানে দিনাজপুর রাজবাড়ি বলতে এর অবশিষ্টাংশকে বুঝায়। এর বেশিরভাগ অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। শুধু গুটিকয়েক স্থাপনা এখন বিদ্যমান। রাজবাড়ির প্রবেশ পথে পশ্চিমমুখী একটি মিনার আকৃতির বিশাল তৌরণ আছে। রাজবাড়ির সীমানার মধ্যে তৌরণের কিছু দূরে বামদিকে একটি উজ্জ্বল রঙ করা কৃষ্ণ মন্দির এবং ডানদিকে রাজবাড়ির বহিঃমহলের কিছু ধ্বংসাবশেষ আছে। রাজবাড়ির সীমানার ভেতরে আরকটি তৌরণ আছে, যার মাধ্যমে রাজবাড়ির প্রধান বর্গাকার অংশে প্রবেশ করা হয়। রাজবাড়ির প্রধান অংশের পূর্বদিকে আরেকটি সমতল ছাদবিশিষ্ট মন্দির আছে। যার মধ্যে অনেক হিন্দু দেবতার প্রতিমা বিদ্যমান।

রাজবাড়ি প্রধানত তিনটি মহল বা ব্লকের সমন্বয়ে গঠিত, যথাক্রমেঃ আয়না মহল, রাণি মহল ও ঠাকুরবাটি মহল। এর পাশাপাশি আরো কিছু অপ্রধান কিছু স্থাপনা আছে। যা জমিদার পরিবারের বিভিন্ন রাজা ও উত্তরাধিকার কর্তৃক বিভিন্ন সময়ে প্রতিষ্ঠিত। এই রাজবাড়ির সীমানায় আরো কিছু মন্দির, বিশ্রামাগার, দাতব্য চিকিৎসালয়, পানির ট্যাঙ্ক ও আমলাদের বাসস্থান স্থাপিত হয়। দিনাজপুর রাজবাড়ির ভূমির মোট আয়তন ১৬.৪১ একর যার মধ্যে পূর্ব ও পশ্চিম দিকে ২ বৃহৎ পানির চৌবাচ্চা/ট্যাঙ্ক, মঠ, বাগান, কাঁচারী ঘর, টেনিস কোর্ট ও কুমারের বাড়ি অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া রাজবাড়ির মুল অংশে দুইটি পুকুর রয়েছে, যার একটি রানিপুকুর নামে পরিচিত। এবং রাজবাড়ির পিছনে আরো দুইটি বিশালাকৃতির পুকুর (পদ্মপুকুর ও সুখসাগর) রয়েছে। রাজবাড়ির 'হিরাবাগান'নামে একটি মাঠ রয়েছে। বর্তমানে রাজবাড়িটিকে দুইটি অংশে ভাগ করা হয়েছে। সামনের অংশ অর্থাৎ মন্দির অংশে প্রতিবছর ধর্মীয় ভাবভঙ্গীমায় কান্তজিওঁ ও দুর্গাপুজা করা হয়। এই অংশটি 'রাজদেবত্তর এস্টেট' নামে মন্দির কমিটির দ্বারা সংরক্ষণ করা হয়েছে। অপর অংশটি অর্থ্যাৎ আয়নামহল ও রানিমহল ধ্বংসপ্রায় অবস্থায় রয়েছে যেখানে প্রাচীন স্থাপত্যশৈলী ও কারুকার্য এখনও দেখা যায়। লোহার তৈরী কলাম ও বীম গুলো চুরি হয়ে গিয়েছে। পুরো জায়গাটি বৃহদাকার আম,জাম,লিচু,কাঠাল ও অন্যান্য জংলী গাছ দ্বারা আবৃত। পাশেই বাংলাদেশ সরকার পরিচালিত সরকারি এতিমখানা 'শিশুপরিবার' রয়েছে। ইতঃপূর্বে মহান জাতীয় সংসদের মাননীয় হুইপ জনাব ইকবালুর রহিমের পৃষ্ঠপোষকতায় শিশুপরিবারের জন্য একটি অত্যাধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন চারতলা ইমারত ও একটি বৃদ্ধাশ্রম নির্মান করা হয়েছে। রানিপুকুরের পাশে একটি পুরোনো দ্বিতল বিল্ডিং শিশুপরিবারের শিক্ষক-কর্মচারীদের কোয়ার্টার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

এই বিশাল রাজবাড়িটি একটি আকর্ষণীয় ঐতিহাসিক ঐতিহ্য। যা প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা ও টুরিজম স্পট হতে পারে। কিন্তু এটি বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ কর্তৃক কর্তৃক স্বীকৃত নয়। তাই এই বিশাল স্থাপনাটি অযত্নে অবহেলায় ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। জনগণ সাধারণত এই স্থানে আবর্জনা ফেলায় এর বিদ্যামান অংশও ধ্বংসপ্রায়। অবিলম্বে স্থাপনাটি সংরক্ষণ না করা হলে এটি কালের গর্ভে বিলিন হয়ে যাবে।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "দিনাজপুর জেলার ইতিহাস" - ধনঞ্জয় রায় ।
  2. "সংরক্ষণাগারভুক্ত অনুলিপি"। ৮ জানুয়ারি ২০১৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ৫ জানুয়ারি ২০১৪ 
  3. "দিনাজপুর জেলার ইতিহাস" - ধনঞ্জয় রায় ।
  4. "দিনাজপুর জেলার ইতিহাস" - ধনঞ্জয় রায় ।

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]