ট্রপোবিরতি

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

ট্রপোবিরতি হলো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে অবস্থিত ট্রপোমণ্ডলস্ট্রাটোমণ্ডলের মধ্যবর্তী সীমানা নির্ধারক অঞ্চল। এটি একটি তাপগতীয় গ্রেডিয়েন্ট স্ট্র্যাটিফিকেশন স্তর যা ট্রপোমণ্ডলের সমাপ্তি নির্দেশ করে। বিষুবীয় অঞ্চলে এটি ভূমি থেকে গড়ে ১৭ কি.মি. (১১ মাইল) এবং মেরু অঞ্চলে প্রায় ৯ কি.মি. (৫.৬ মাইল) উপরে অবস্থান করে।

সংজ্ঞা[সম্পাদনা]

বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন স্তরের চিত্র (আনুপাতিক দূরত্ব বিবেচ্য নয়)। ট্রপোবিরতি অঞ্চল ট্রপোমণ্ডল ও স্ট্রাটোমণ্ডলের মাঝখানে অবস্থিত।
ট্রপোবিরতি মেরু অঞ্চল অপেক্ষা বিষুবীয় অঞ্চলে বেশি উচ্চতায় অবস্থান করে

ট্রপোমণ্ডলে যত উপরের দিকে যাওয়া যায় বায়ুর তাপমাত্রা ততই হ্রাস পায়। বায়ুমণ্ডলের উপরের দিকে উচ্চতার সাথে তাপমাত্রার এই পরিবর্তনকে ল্যাপস রেট বলে। ট্রপোবিরতি অঞ্চলে উচ্চতার সাথে বায়ুর এই শীতল হওয়ার প্রক্রিয়া থেমে যায় এবং বায়ু প্রায় সম্পূর্ণ শুষ্ক হয়ে পড়ে। অর্থাৎ, ট্রপোবিরতি হলো সেই অঞ্চল যেখানে ট্রপোমণ্ডলের ধনাত্মক (+) ল্যাপস রেট ক্রমশ স্ট্রাটোমণ্ডলের ঋণাত্মক (-) ল্যাপস রেটে পরিবর্তিত হয়। ট্রপোবিরতি সম্পর্কে বিশ্ব আবহাওয়া সংক্রান্ত সংস্থার সংজ্ঞার অনুবাদ নিম্নরূপ:

ট্রপোবিরতি হলো ট্রপোমণ্ডল ও স্ট্রাটোমণ্ডলের মধ্যবর্তী সীমানা যেখানে ল্যাপস রেটের আকস্মিক পরিবর্তন ঘটে। ল্যাপস রেট ২° সেলসিয়াস/কি.মি. বা তার চেয়ে কম হারে হ্রাস পায় এমন সর্বনিম্ন স্তর হিসেবে একে সংজ্ঞায়িত করা হয়, তবে শর্ত থাকে যে, এই স্তর এবং এর উপরের ২ কি.মি. এর মধ্যে সকল স্তরের গড় ল্যাপস রেট ২° সেলসিয়াস/কি.মি. এর মধ্যে থাকতে হবে।[১]

উপরের সংজ্ঞানুসারে ট্রপোবিরতি প্রথম ক্রমের বিরতি তল হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ, তাপমাত্রা উচ্চতার অপেক্ষক হিসেবে বায়ুমণ্ডলে নিরবচ্ছিন্নভাবে ক্রমশ পরিবর্তিত হয়, কিন্তু তাপমাত্রার গ্রেডিয়েন্ট একই থাকে।[২]

অবস্থান[সম্পাদনা]

পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের সবচেয়ে নিচের স্তর হলো ট্রপোমণ্ডল। এটি গ্রহের সীমানা স্তরের ঠিক উপর থেকে শুরু হয়েছে। ট্রপোমণ্ডলেই আবহাওয়া সংক্রান্ত যাবতীয় ঘটনা সংঘটিত হয়। মেরু অঞ্চলে ট্রপোমণ্ডলের উচ্চতা ভূ-পৃষ্ঠ থেকে ৯ কিলোমিটার (৫.৬ মাইল বা ৩০,০০০ ফুট) এবং বিষুবীয় অঞ্চলে তা প্রায় ১৭ কিলোমিটার (১১ মাইল বা ৫৬,০০০ ফুট) উপর পর্যন্ত বিস্তৃত।[৩][৪] যুক্তরাষ্ট্র আদর্শ বায়ুমন্ডল সংস্থার তথ্যানুসারে, উৎক্রমের (ইনভার্সন) অনুপস্থিতিতে এবং আর্দ্রতা উপেক্ষা করে, ট্রপোমণ্ডলে তাপমাত্রার গড় ল্যাপস রেট ৬.৫° সেলসিয়াস/কিলোমিটার।[৫] ট্রপোমণ্ডল ও স্ট্রাটোমণ্ডলে তাপমাত্রার ল্যাপস রেট নির্ণয় ট্রপোবিরতির অবস্থান নির্ণয়ে খুবই সাহায্য করে। এর কারণ- স্ট্রাটোমণ্ডলে উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে সাথে বায়ুর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় ও ঋণাত্মক ল্যাপস রেট দেখা যায়, যা ট্রপোমণ্ডলের বিপরীত। ট্রপোবিরতি সর্বনিম্ন সেই স্তরের সাথে উপরিপাতিত হয় যেখানে ল্যাপস রেট একটি নির্দিষ্ট সীমার নিচে থাকে।

ট্রপোবিরতির সাথে যেহেতু এর নিচের বায়ুমন্ডলের গড় তাপমাত্রার সম্পর্ক রয়েছে, তাই মেরু ও বিষুবীয় অঞ্চলে এর উচ্চতার পার্থক্য দেখা যায়। মেরু অঞ্চলে ট্রপোবিরতি সবচেয়ে নিচে এবং বিষুবীয় অঞ্চলে সবচেয়ে উঁচুতে অবস্থান করে। বিষুবীয় অঞ্চল থেকে ১৭ কিলোমিটার উপরে ট্রপোমণ্ডলের তাপমাত্রা ক্রমশ কমতে কমতে বায়ুমণ্ডলের অন্যতম শীতল স্তরে পরিণত হয়। বিভিন্ন স্থানে ট্রপোবিরতির উচ্চতার ভিন্নতার কারণে মেরু অঞ্চলে একে মেরু ট্রপোবিরতি এবং বিষুবীয় অঞ্চলে বিষুবীয় ট্রপোবিরতি বলা হয়।

ট্রপোমণ্ডল-স্ট্রাটোমণ্ডল স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় যদি ল্যাপস রেট সংরক্ষণশীল রাশি হিসেবে আচরণ না করে, সেক্ষেত্রে গতিশীল ট্রপোবিরতি নামক একটি বিকল্প সংজ্ঞা দেওয়া হয়।[৬] এটির ব্যাখ্যায় বিভব উদ্রেকতা (পটেনশিয়াল ভর্টিসিটি) বিষয়টির অবতারণা করা হয়। বিভব উদ্রেকতা হলো আইসেনট্রপিক ঘনত্ব ও পরম উদ্রেকতা (অ্যাবসলিউট ভর্টিসিটি) রাশিদ্বয়ের গুণফল। এখানে, আইসেনট্রপিক ঘনত্ব হলো বিভব তাপমাত্রাকে উল্লম্ব স্থানাঙ্ক হিসেবে ব্যবহার করলে যে ঘনত্ব পাওয়া যায় সেটি। তবে শর্ত হলো, ট্রপোমণ্ডল ও স্ট্রাটোমণ্ডল থেকে বিভব উদ্রেকতার প্রাপ্ত মানে যথেষ্ট পার্থক্য থাকতে হবে।[৭] গতিশীল ট্রপোবিরতি তলকে উল্লম্ব তাপমাত্রা গ্রেডিয়েন্টের পরিবর্তে বিভব উদ্রেকতা একক (পিভিইউ)[nb ১] দ্বারা প্রকাশ করা হয়। পরম উদ্রেকতা উত্তর হেমিমণ্ডলে ধনাত্মক আর দক্ষিণ হেমিমণ্ডলে ঋণাত্মক ধরা হলে, সীমাস্থ মান বিষুবীয় অঞ্চলের উত্তরে ধনাত্মক ও দক্ষিণে ঋণাত্মক ধরতে হবে।[৯] তাত্ত্বিকভাবে, বৈশ্বিক ট্রপোবিরতিকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করতে হলে, ধনাত্মক ও ঋণাত্মক সীমা থেকে প্রাপ্ত তলের সাথে বিষুবীয় অঞ্চলের তলের সামঞ্জস্য থাকা দরকার। এর জন্য আরেক ধরনের তল বা ক্ষেত্র ব্যবহার করা হয়, যেমন- ধ্রুবক বিভব তাপমাত্রা। তা সত্ত্বেও বিষুবীয় অক্ষাংশে গতিশীল ট্রপোবিরতি অকার্যকর, কারণ এখানে আইসেনট্রপগুলো প্রায় উল্লম্বিক।[৮] উত্তর হেমিমণ্ডলের ট্রপোবিরতির জন্য বিশ্ব আবহাওয়া সংক্রান্ত সংস্থা (ডব্লিউএমও) এর নির্ধারিত মান ১.৬ পিভিইউ।[৮]:১৫২ তবে প্রচলিতভাবে এর মান কিছুটা বেশি (২-৩.৫ পিভিইউ) হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।[১০]

রাসায়নিক যৌগের উপস্থিতি ও সংযুক্তির ভিত্তিতেও ট্রপোবিরতিকে সংজ্ঞায়িত করা যায়।[১১] উদাহরণস্বরূপ, নিম্ন স্ট্রাটোমণ্ডলে ট্রপোমণ্ডলের উপরের স্তর অপেক্ষা ওজোনের ঘনত্ব বেশি, কিন্তু জলীয় বাষ্পের পরিমাণ কম। এর মাধ্যমে দুই স্তরকে পৃথক করে ট্রপোবিরতি অঞ্চল চিহ্নিত করা যায়।

ঘটনাবলি[সম্পাদনা]

ট্রপোমণ্ডল কঠিন পদার্থের তৈরি কোনো সীমানা নয়। ফলে তীব্র বজ্রপাত, বিশেষত ক্রান্তীয় অঞ্চলের বজ্রপাতের আবেশ ট্রপোমণ্ডল ছাড়িয়ে নিম্ন স্ট্রাটোমণ্ডলের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারে। সেখানে এটি সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য (ঘণ্টা ক্রমের বা তারও কম) নিম্ন কম্পাঙ্কের উল্লম্বিক পর্যায়বৃত্ত গতির সম্মুখীন হয়।[১২] এধরনের গতি নিম্ন-কম্পাঙ্কের বায়ুমণ্ডলীয় মহাকর্ষ তরঙ্গ সৃষ্টি করতে পারে যা বায়ুমণ্ডল ও সমুদ্র উভয় জায়গার প্রবাহকে প্রভাবিত করতে পারে।

অধিকাংশ বাণিজ্যিক বিমান উড্ডয়নকালে ক্রুজ দশায় স্ট্রাটোমণ্ডলের নিম্নাংশ দিয়ে অর্থাৎ ট্রপোবিরতির ঠিক উপর দিয়ে যাতায়াত করে। ট্রপোবিরতি অঞ্চলে সাধারণত মেঘ থাকে না, একইভাবে বিরূপ আবহাওয়াও এখানে পরিলক্ষিত হয় না।[১৩]

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

দ্রষ্টব্য[সম্পাদনা]

  1. 1 PVU = 10-6 K m2 kg-1 s-1[৮]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. International Meteorological Vocabulary (2nd সংস্করণ)। Geneva: Secretariat of the World Meteorological Organization। ১৯৯২। পৃষ্ঠা 636। আইএসবিএন 978-92-63-02182-3 
  2. Panchev 1985, পৃ. 129।
  3. Hoinka, K. P. (১৯৯৯)। "Temperature, Humidity, and Wind at the Global Tropopause"। Monthly Weather Review127 (10): 2248–2265। ডিওআই:10.1175/1520-0493(1999)127<2248:THAWAT>2.0.CO;2অবাধে প্রবেশযোগ্যবিবকোড:1999MWRv..127.2248H 
  4. Gettelman, A.; Salby, M. L.; Sassi, F. (২০০২)। "Distribution and influence of convection in the tropical tropopause region"। Journal of Geophysical Research107 (D10): ACL 6–1–ACL 6–12। ডিওআই:10.1029/2001JD001048বিবকোড:2002JGRD..107.4080Gসাইট সিয়ারX 10.1.1.469.189অবাধে প্রবেশযোগ্য 
  5. Petty 2008, পৃ. 112।
  6. Andrews, Holton এবং Leovy 1987, পৃ. 371।
  7. Hoskins, B. J.; McIntyre, M. E.; Robertson, A. W. (১৯৮৫)। "On the use and significance of isentropic potential vorticity maps"। Quarterly Journal of the Royal Meteorological Society111 (470): 877–946। ডিওআই:10.1002/qj.49711147002বিবকোড:1985QJRMS.111..877H 
  8. উদ্ধৃতি ত্রুটি: <ref> ট্যাগ বৈধ নয়; Tuck নামের সূত্রটির জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি
  9. উদ্ধৃতি ত্রুটি: <ref> ট্যাগ বৈধ নয়; Hoinka নামের সূত্রটির জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি
  10. উদ্ধৃতি ত্রুটি: <ref> ট্যাগ বৈধ নয়; Zängl&Hoinka নামের সূত্রটির জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি
  11. উদ্ধৃতি ত্রুটি: <ref> ট্যাগ বৈধ নয়; Pan নামের সূত্রটির জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি
  12. Shenk, W. E. (১৯৭৪)। "Cloud top height variability of strong convective cells"। Journal of Applied Meteorology13 (8): 918 – 922। ডিওআই:10.1175/1520-0450(1974)013<0917:cthvos>2.0.co;2অবাধে প্রবেশযোগ্যবিবকোড:1974JApMe..13..917S 
  13. Petty 2008, পৃ. 21।

গ্রন্থপঞ্জি[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]