সৈয়দ জিয়াউল হক

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
(ছৈয়দ জিয়াউল হক থেকে পুনর্নির্দেশিত)
Jump to navigation Jump to search
সৈয়দ জিয়াউল হক এর রওজা

সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভান্ডারী ছিলেন (ইংরেজি: Sayed Ziaul Haq) (১৯২৮-১৯৮৮) মাইজভান্ডারী তরীকার[১][২] একজন প্রখ্যাত সুফি সাধক[৩] তিনি বিশ্ব অলী,[৪] শাহেনশাহ, জিয়া বাবা [৪][৫] এবং শাহেনশাহ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভান্ডারী কাদ্দাছা ছিরহুল আজিজ নামে বহুল পরিচিত।[৫]

জন্ম[সম্পাদনা]

তিনি ১০ পৌষ ১৩৩৫ বঙ্গাব্ধ, ২৫ ডিসেম্বর ১৯২৮ খৃষ্টাব্ধ, ১২ রজব ১৩৪৭ হিজরী চট্টগ্রাম জেলার অন্তর্গত ফটিকছড়ি থানার মাইজভান্ডার দরবার শরীফ নামক স্থানে জন্ম গ্রহণ করেন। জন্মের সাত দিনের মাথায় তার নাম সৈয়দ বদিউর রহমান রাখা হলেও তার পিতা সৈয়দ দেলাওয়ার হোসাইন স্বপ্নে যোগে সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারীর আদেশ প্রাপ্ত হয়ে নাম বদলে রাখেন সৈয়দ জিয়াউল হক। তার মাতা সৈয়দা সাজেদা খাতুন ছিলেন বাবা ভান্ডারীর দ্বিতীয় কন্যা।[৬][৭]

শিক্ষা জীবন[সম্পাদনা]

প্রথমদিকে গৃহ শিক্ষক মৌলভী মোজাম্মেল হকের নিকট তিনি আরবী বর্ণমালাকলমা শিক্ষা লাভ করেন। এরপর মাইজভান্ডার আহমদীয়া জুনিয়র মাদ্রাসায় তিনি তৃতীয় শ্রেনী পর্যন্ত পড়ালেখা করেন। পঞ্চম শ্রেণীতে ভর্তি হয়ে নবম শ্রেণী পর্যন্ত তিনি পড়াশুনা করেন নানুপুর আবু সোবহান হাই স্কুলে। তৎপরবর্তীতে নবম ও দশম শ্রেনীর পাঠ শেষে চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল হতে এ্যান্ট্রেন্স বা প্রবেশিকা পরিক্ষায় উত্তীর্ণ্ হলে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার্জনের উদ্দেশ্যে ভর্তি হন চট্টগ্রাম কলেজে। কানুনগোপাড়া স্যার আশুতোস ডিগ্রী কলেজে বি.এ. বা স্নাতক ডিগ্রী সমাপনী পরীক্ষার তৃতীয় দিনে হঠাৎ তার স্বাভাবিক ভাবের পরিবর্তন পরিলক্ষ্যিত হয়। তিনি আধ্যাত্মিক কিছু অলৌকিক অভিজ্ঞতা প্রাপ্ত হতে থাকলে অবশেষে সাদা খাতা জমা দিয়ে পরীক্ষা কেন্দ্র পরিত্যাগ করে সরাসরি মাইজভান্ডার প্রত্যাগমন করেন। এ ছিল তার জীবনের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার শেষ প্রহর।[৬]

সুফি মতাদর্শ[সম্পাদনা]

একথা সর্বজন বিদিত যে, উপরিউক্ত ঘটনার পর তিনি বোয়ালখালী হতে মাইজভান্ডারে ফিরে এসে একাগ্রচিত্তে আধ্যত্ম সাধনায় আত্মনিয়োগ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় তার জীবন আধ্যাত্মিক রহস্যমন্ডিত ছুফিত্বে বিকশিত হয়। প্রকাশনাদি হতে জানাযায়, ছুফি তাত্ত্বিক সাধনাকালে নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে তিনি দিনের পর দিন অনাহারে নির্ঘুম অবস্থায় কাটিয়ে দিতেন। কখনো তীব্র শীতে পুকুড়ের কনকনে ঠান্ডা জলে দিন-রাত একাধারে ডুবে থাকতেন। আবার কখনো সকল প্রকার জৈবনিক ক্রিয়া কলাপ মুক্ত থেকে ঘরের দরজা বন্ধ অবস্থায় আপাদমস্তক চাদর মুড়ি দিয়ে কাটিয়ে দিতেন দিনের পর দিন।[৬]

সন্তানের এমতাবস্থায় তার পিতা যখন খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন তখন তাকে স্বপ্নযোগে সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী আদেশ করেন, ‘কেন তুমি এত উদ্বিগ্ন? যাও আমার লম্বা সবুজ জুব্বাটি(আলখেল্লা) তাকে পরিয়ে দাও’। তিনি সহসা গিয়ে সন্তানকে জুব্বাটি পরিয়ে দেন। এ ঘটনার পর হতে ধীর-স্থির হয়ে যাওয়ার মত সৈয়দ জিয়াউল হকের প্রাত্যহিক আচরনে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। তার জীবনী লেখকগণ তাকে মজ্জুবে ছালেক দরবেশ (الصّوفي المجذوب السالك‎)[৬] বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি কখনো সমূদ্রের তীরবর্তী অঞ্চলে, গহীন জঙ্গলে এবং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে বেড়াতেন। তার বহুল আলোচিত রহস্যময় অলৌকিক ঘটনাবহুল জীবন চিরস্মরণীয়। তিনি তরীকার ধারাবাহিকতায় তার পীর স্বীয় পিতার স্থলাভিষিক্ত হন। তার পীরগত শাজরা ছোট মৌলানা সৈয়দ আমিনুল হক ওয়াছেল মাইজভান্ডারী হয়ে সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারীর সাথে মিলিত হয়ে আব্দুল কাদের জিলানী ও আলী মারফত নবী মোহাম্মদ পর্যন্ত ব্যাপৃত।[৭]

উপনাম[সম্পাদনা]

প্রকাশিত তথ্য মতে, বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ[৪][৫] আশেক ভক্তগণের নিকট তিনি বেশ কিছু উপনামে বহুল পরিচিতি লাভ করেন। তন্মধ্যে দুইটি বিশেষ ভাবে উল্লেখ যোগ্য। ‘বিশ্ব অলী’ [৪][৫] তার মূল প্রসিদ্ধ উপাধি হলেও তিনি সাধনা কাল হতেই ‘শাহেনশাহ বাবাজান’[৪] বা জিয়া বাবা[৫] নামে সমাজে পরিচিত।

বংশধারা[সম্পাদনা]

তিনি জনৈক বদিউজ্জামান চৌধুরীর (বদন সিকদার) ছোট কন্যা সৈয়দা মনোয়ারা বেগমের সাথে ১৯৫৫ সালের ২৮ জানুয়ারি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তার সুফি তাত্ত্বিক পীর এবং পিতা, লেখক ও সুফি সাধক সৈয়দ দেলাওয়ার হোসাইন[৮] ১৯৮২ সালের ১৮ জানুয়ারি মৃত্যু বরণ করেন। সাজরা মোতাবেক তিনি নবী মোহাম্মদের বংশধর। এ ধারা সৈয়দ আব্দুল কাদের জিলানী[৯] এবং ফাতেমা জাহারা হয়ে নবী মোহাম্মদের সাথে যুক্ত হয়।[৭]

উত্তরাধিকার[সম্পাদনা]

তিনি ছিলেন পাঁচ কন্যা ও এক পুত্র সন্তানের জনক। তার একমাত্র পুত্র সৈয়দ মোহাম্মদ হাসান ইংরেজী বিষয়ে সম্মান ডিগ্রী লাভের পর তার সুফিধারা উত্তরাধিকার বা সাজ্জাদানশীন[৫][১০] হিসাবে স্থলাভিসিক্ত রয়েছেন। বর্তমানে তিনি আন্তর্জাতিক সুফি সম্মেলনের আয়োজক, মাইজভান্ডারী একাডেমীর সভাপতি ও শাহেন শাহ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক ট্রাষ্ট[৪] নামের একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান পৃষ্ঠপোষকের দায়িত্ব পালন করছেন। ট্রাষ্টটি কতিপয় স্কুল, এতিমখানা এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে।[৭][১১][১২]

মৃত্যু[সম্পাদনা]

তিনি ২৬ আশ্বিন ১৩৯৫ বঙ্গাব্ধ, ১৩ অক্টোবর ১৯৮৮ খৃষ্টাব্দ, হিজরী সনের পহেলা রবিউল আউয়াল রাত ১২টা ২৭ মিনিটে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।[৬][৭]

কবর[সম্পাদনা]

তার সমাধির উপর স্থপতি আলমগীর কবিরের[১৩] নকশায় শাপলা ফুলের আঙ্গীকে নতুন একটি মাজার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যা স্থাপত্য শৈলীর আঙ্গীকে একটি আধুনিক স্থাপনা.[১৪][১৫] হিসাবে নানা প্রকাশনায় প্রসংসিত হতে দেখা যায়। প্রতি বছর তার ওরছে লক্ষ লক্ষ আশেক-ভক্তের সমাগম ঘটে।[৪][৫][৬][১০]

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Dr. Alan Godlas, University of Georgia। "ছুফিজম - ছুফিস- ছুফি অর্ডারস্/সুফিজমস্ ম্যানি পাথ (Sufism -- Sufis -- Sufi Orders/ Sufism's Many Paths)" 
  2. "দৈনিক আজাদী, শিরোনামঃ আজ হতে গাউছুল আজম মাইজভান্ডারীর ওরছ, প্রাকাশকালঃ জানুয়ারী ২১, ২০১৪, শেষ পৃষ্ঠা, ৩য় কলাম" 
  3. শব্দ কোষ/ Dictionary.reference.com। "Sufi [soo-fee]" 
  4. Daily Time Watch (অক্টোবর ১১, ২০১৪)। "Annual ORS Shaif of Shahenshah Hadrath Sayed Ziaul Haq Maizbhanderi/ শাহানশাহ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভান্ডারীর (ক:) বার্ষিক ওরশ (Maizbhander Sharif became an ocean of people by millions of affectionate desiring to attend the ORS Sharif of Bishwa Wali ShahenShah Hadrath Sayed Ziaul Haq Maizbhanderi/ বিশ্বঅলি শাহানশাহ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভান্ডারীর বার্ষিক ওরশ শরিফ উপলক্ষে লাখো আশেক ভক্ত অংশগ্রহণে মুখরিত হয়ে উঠেছে মাইজভান্ডার শরিফ)," 
  5. Daily Ajadi (অক্টোবর ১২, ২০১৪)। "জিয়াউল হক মাইজভান্ডারীর ওরশে ভক্তের ঢল/ Steam of massive affectionate at the ORS of Ziaul Haq Maizbhanderi (Millions of people at 26th ORS Sharif of Bishwa Wali Sahenshah Hadrath Sayed Ziaul Haq Maizbhanderi.../ বিশ্বঅলি শাহানশাহ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভান্ডারী (ক.) এর ২৬ তম বার্ষিক ওরশ শরিফ লাখো ভক্ত-আশেকের উচ্ছ্বাসমুখর অংশগ্রহণে...)," 
  6. Maizbhander Sharif an emblem of human regalement। "শিরোনামঃ শাহেনশাহ হযরত মৌলানা শাহ সুফি সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভান্ডারী" 
  7. লেখকঃ জামাল উদ্দিন সিকদার, প্রথম প্রকাশঃ ১৯৮২, ৯ম প্রকাশঃ ২০১০। "জীবনীঃ শাহানশাহ জিয়াউল হক মাইজভান্ডারী, শাজরা অনুচ্ছেদ (ক্রমিক নাম্বার ৩৮), পৃষ্ঠাঃ ২০৬" (PDF) 
  8. দৈনিক পূর্বকোণ (মার্চ ৩০, ২০১৪)। "শিরোনামঃ অছিয়ে গাউছুল আজম শাহসুফি সৈয়দ দেলাওয়ার হোসাইন আল মাইজভান্ডারী হতে মহান তরীক্বতের শিক্ষা গ্রহন করেন" 
  9. "Benglai News Media: Daily Ajadi, Published on: December 9, 1998 Columnist: Sayed Golam Morshed, Column Title: (A Biography of) Qutub Al-Ershad Hadrath Moulana Sayed Aminul Haque Wasel Al-Maizbhanderi / কুতুবুল এরশাদ হযরত মওলানা সৈয়দ আমিনুল হক ওয়াছেল আল-মাইজভান্ডারী (কঃ)"। 
  10. Daily Prothom Alo (অক্টোবর ১৩, ২০১৩)। "ORS Shaif of Ziaul Haq Maizbhanderi/ জিয়াউল হক মাইজভান্ডারীর ওরস শরিফ (Sayed Mohammed Hasan, the Sajjadanashin of Haq Manjil/ হক মনজিলের সাজ্জাদানশীন সৈয়দ মোহাম্মদ হাসান)," 
  11. Daily Banglapost (আগস্ট ৫, ২০১৪)। "Conference regarding Shahenshah Hadrath Sayed Ziaul Haq at Hathazari (হাটহাজারী দক্ষিণ মাদার্শা মদুনাঘাট এলাকায় শাহানশাহ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভান্ডারী শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত)," 
  12. Daily Banglapost (অক্টোবর ২৫, ২০১৪)। "Fatheha of Shahenshah Hadrath Sayed Ziaul Haq held at Kashim Bazar (মাইজভান্ডারী গাউছিয়া হক কমিটি বাংলাদেশ হাসিম বাজার শাখার হযরত জিয়াউল হক মাইজভান্ডারী ফাতেহা অনুষ্ঠিত)," 
  13. Daily Destiny (মে ২০, ২০১১)। "Open Stage of JABI" 
  14. Daily Ajadi (জুন ১৪, ১৯৮৯)। "Shrine of Bishaw Wali Shahenshah will be reconstructed"। 
  15. Daily Purbakon (জুন ১৪, ১৯৮৯)। "Shrine of Bishaw Wali Shahenshah will be reconstructed"।