অন্নপূর্ণা পূজা

অন্নপূর্ণা পূজা, হিন্দুদের একটি ধর্মীয় উৎসব। চৈত্র মাসের শুক্লাষ্টমী তিথিতে অন্নপূর্ণা পূজা করা হয়।
হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, অন্নপূর্ণার পূজা করলে গৃহে অন্নাভাব থাকে না। এই দেবীর মহিমা সম্পর্কে 'অন্নদামঙ্গল'-এ ভারতচন্দ্র লিখেছেন:
| “ |
যে জন করয়ে অন্নপূর্ণা উপাসনা। বিধি হরি হর তার করয়ে মাননা।। ইহলোকে নানা ভোগ করে সেই জন। পরলোকে মোক্ষ পায় শিবের লিখন।। |
” |
কৃষ্ণানন্দ রচিত তন্ত্রসার গ্রন্থে এই পূজার বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়। কাশীতে (বারাণসী, উত্তর প্রদেশ) দেবী অন্নপূর্ণার একটি বিখ্যাত মন্দির আছে; এই মন্দিরে অন্নপূর্ণা পূজা ও অন্নকূট উৎসব প্রসিদ্ধ। পশ্চিমবঙ্গে অন্নপূর্ণা পূজার বিশেষ প্রচলন রয়েছে। পশ্চিম বাংলায় বাসন্তী পূজা, অন্নপূর্ণা পূজা এবং রাম নবমী - এই তিনটি উৎসব একসঙ্গে পালিত হয়।
ইতিহাস
[সম্পাদনা]বিবাহের পর কৈলাশ শিখরে শিব ও পার্বতী বেশ সুখেই দাম্পত্যজীবন কাটাচ্ছিলেন। শিব ছিলেন দরিদ্র। আর্থিক অনটনের জেরে বেশ কিছুদিন পরই শুরু হয় দাম্পত্যকলহ। দারিদ্র্যের কারণে পার্বতীর তিরস্কারে ঘর ছেড়ে ভিক্ষাবৃত্তি গ্রহণ করেন শিব। কিন্তু কোথাও ভিক্ষে পেলেন না। শেষে ব্যর্থ হয়ে কৈলাশে ফেরেন। পার্বতীর মায়ায় তিনি যে ভিক্ষে পাচ্ছিলেন না, তা ঘুমাক্ষরেও টের পাননি শিব। পরে অবশ্য কৈলাশে ফিরে সঘৃত পালান্ন, পায়েস, পিঠে প্রভৃতি খান। এরপর দেবীর মহিমাবৃদ্ধির জন্য কাশী নির্মাণ করে সেখানে অন্নপূর্ণার মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন উনি। চৈত্রমাসের শুক্লা অষ্টমী তিথিতে সেই মন্দিরে দেবী অবতীর্ণ হলেন। সেই থেকেই দেবী অন্নপূর্ণার পূজার প্রচলন বাড়ে।
পূজা প্রচলন
[সম্পাদনা]প্রচলিত কিংবদন্তি, নদিয়া রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ভবানন্দ মজুমদার বাংলায় অন্নপূর্ণা পুজোর প্রচলন করেন।[১]
কিছু বিখ্যাত পূজা
[সম্পাদনা]১৮৪৭-এ রানি রাসমণি তাঁর জামাই মথুরমোহন বিশ্বাস, আত্মীয়স্বজন ও অন্যান্যদের সঙ্গে কাশীযাত্রা করেছিলেন। রাতে নৌকায় তিনি দেবীর স্বপ্নাদেশ পান, কাশী না গিয়ে গঙ্গার পূর্ব পাড়ে দেবীর মন্দির প্রতিষ্ঠা করার। এর পরে রানি রাসমণি কাশীযাত্রা স্থগিত করে দক্ষিণেশ্বরে ১৮৫৫ সালে ভবতারিণীর মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন।[২] শোনা যায়, কাশীর অন্নপূর্ণা দর্শনে বিঘ্ন ঘটায় মথুরমোহন বিশ্বাসের মনে ইচ্ছে ছিল দেবী অন্নপূর্ণার মন্দির প্রতিষ্ঠা করার। তাঁর সেই স্বপ্নপূরণ করেছিলেন তাঁর স্ত্রী, রানি রাসমণির ছোট মেয়ে জগদম্বাদেবী। [৩] ১৮৭৫-এর ১২ এপ্রিল সেদিনের চাণক-এ,আজকের ব্যারাকপুর অন্নপূর্ণা মন্দির প্রতিষ্ঠা হয়। এই মন্দির প্রতিষ্ঠার যাবতীয় ব্যবস্থা করেছিলেন তাঁদের পুত্র দ্বারিকানাথ বিশ্বাস।[৪] এই মন্দিরে মূল অন্নকূট উৎসব হয় কালীপুজোর পরের দিন। এ ছাড়াও এই মন্দিরে অন্নকূট হয় অন্নপূর্ণা পুজোর দিন।[৫]
দেবী অন্নপূর্ণার আরও একটি মন্দির রয়েছে বেহালার বড়িশায়। সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের চন্দ্রকান্ত রায়চৌধুরী সেই সময়ের বড়িশা গ্রামে বড়বাড়ির মধ্যে ১৮৫০ সালে একটি পঞ্চরত্ন মন্দিরে অষ্টধাতুর দেবীমূর্তি এবং রুপোর শিবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।[৬] শোনা যায়, চন্দ্রকান্তের কোনও পুত্রসন্তান না থাকায় তাঁর দুই স্ত্রী প্রতিজ্ঞা করেছিলেন স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁরা কাশীবাসী হবেন। তাঁরা যাতে কাশী না যান - সেজন্যই চন্দ্রকান্ত তাঁদের কাশী যাওয়া আটকাতে বাড়িতেই দেবীর মন্দির নির্মাণ করান।[৭] অন্নপূর্ণা পুজো উপলক্ষে বিশেষ পুজোর আয়োজন করা হয় এখানে।
বিডন স্ট্রিটের ‘মিত্রাশ্রম’-এও রয়েছে মাতৃ মূর্তি। অতীতে শিমুলিয়ার নিজ গ্রামে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও গিরীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছ থেকে বাড়িটি কিনেছিলেন বিশ্বনাথ মিত্র।[৮] পরে রাস্তাটির নামকরণ হয় বিডন স্ট্রিট। এই পরিবারের বধূ শিবসুন্দরী মিত্র ১৯০৪ সালে নীলকমলেশ্বর শিব ও দেবীর মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন। মূর্তিটি ম্যানচেস্টারের প্রসিদ্ধ স্টুয়ার্ট কোম্পানি থেকে তৈরি করিয়ে আনা হয়েছিল।[৯]
বলরাম দে স্ট্রিটের খান পরিবারেরও অন্নপূর্ণা পুজো হয়ে। পুজো শুরু করেছিলেন বৈদ্যনাথ খান।[১০]
অন্নপূর্ণা পূজায় বাংলায় অন্নকূট
[সম্পাদনা]রানি রাসমণির কনিষ্ঠা কন্যা জগদম্বা ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে ব্যারাকপুরে দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের আদলে অন্নপূর্ণা মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। এই মন্দিরে বিরাজমান অষ্টধাতুর অন্নপূর্ণা ও মহাদেব। এই মন্দিরে অন্নপূর্ণা পুজোর দিন হয় অন্নকূট মহোৎসব।[১১]
উত্তর কলকাতার শ্যামপুকুরের বলরাম ঘোষ স্ট্রিটের ভট্টাচার্য বাড়িতেও দেবী অন্নপূর্ণার অন্নকূট মহাসমারোহে উদযাপিত হয়।[১২]
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ "মঙ্গলকাব্যের প্রভাবেই বাংলায় শুরু হয় অন্নপূর্ণা আরাধনা"।
- ↑ "মঙ্গলকাব্যের প্রভাবেই বাংলায় শুরু হয় অন্নপূর্ণা আরাধনা"।
- ↑ "মঙ্গলকাব্যের প্রভাবেই বাংলায় শুরু হয় অন্নপূর্ণা আরাধনা"।
- ↑ "মঙ্গলকাব্যের প্রভাবেই বাংলায় শুরু হয় অন্নপূর্ণা আরাধনা"।
- ↑ "মঙ্গলকাব্যের প্রভাবেই বাংলায় শুরু হয় অন্নপূর্ণা আরাধনা"।
- ↑ "মঙ্গলকাব্যের প্রভাবেই বাংলায় শুরু হয় অন্নপূর্ণা আরাধনা"।
- ↑ "মঙ্গলকাব্যের প্রভাবেই বাংলায় শুরু হয় অন্নপূর্ণা আরাধনা"।
- ↑ "মঙ্গলকাব্যের প্রভাবেই বাংলায় শুরু হয় অন্নপূর্ণা আরাধনা"।
- ↑ "মঙ্গলকাব্যের প্রভাবেই বাংলায় শুরু হয় অন্নপূর্ণা আরাধনা"।
- ↑ "মঙ্গলকাব্যের প্রভাবেই বাংলায় শুরু হয় অন্নপূর্ণা আরাধনা"।
- ↑ "অন্নের পর্বতে শাক ভাজা লুচি সন্দেশের অলঙ্করণ"।
- ↑ "অন্নের পর্বতে শাক ভাজা লুচি সন্দেশের অলঙ্করণ"।